147601: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ সম্পর্কে আলেমগণের একাধিক অভিমত ও অগ্রগণ্য মতের উল্লেখ


প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ কোনটি? আমার জানা মতে এ বিষয়ে অনেকগুলো অভিমত। এর মধ্যে বিশুদ্ধ অভিমত কোনটি- কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে দলিলসহ জানতে চাই ?

Published Date: 2015-02-17

উত্তর:

আল-হামদুলিল্লাহ।

এক:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের দিন ও মাস নির্দিষ্ট করা নিয়ে সিরাতপ্রণেতা ও ঐতিহাসিকগণ মতানৈক্য করেছেন। এ মতানৈক্যের যৌক্তিক কারণও রয়েছে। যেহেতু কারো জানা ছিল না যে, এ নবজাতক ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? অন্য নবজাতকের জন্মকে যেভাবে নেয়া হত তার জন্মকেও সেভাবে নেয়া হয়েছে। এ জন্য কারো পক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেননি।

ড. মুহাম্মদ তাইয়েব আন-নাজ্জার -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন:

“সম্ভবত এর রহস্য হলো- যখন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন তখন তার থেকে কেউ এমন বিপদ আশঙ্কা করেনি। এ জন্যই জন্মলগ্ন থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত সময়ে আলোচনায় আসেননি। চল্লিশ বছর বয়সে যখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে রিসালাতের দাওয়াত পৌঁছানোর নির্দেশ প্রদান করেন তখন থেকে মানুষ এ নবী সংক্রান্ত তাদের স্মৃতিতে গেঁথে থাকা ঘটনাগুলো স্মরণ করতে থাকে এবং একে অপরকে তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি সব ইতিহাস জিজ্ঞেস করতে থাকে। এ বিষয়ে তাদেরকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছে বুঝবান হওয়ার পর থেকে নিজের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা- যে ঘটনাগুলো তিনি পার করেছেন অথবা তাঁর উপর দিয়ে পার হয়েছে। অনুরূপভাবে তার সাহাবীগণের বর্ণনা ও এসব ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গদের বর্ণনা। এভাবে মুসলমানেরা তাদের নবীর ইতিহাস সংক্রান্ত শ্রুত সব ঘটনা সংগ্রহ করা আরম্ভ করেন, যেন কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য তা বর্ণনা করে যেতে পারেন”।[আল-কাওলুল মুবিন ফী সীরাতে সায়্যিদিল মুরসালীন, (পৃষ্ঠা নং-৭৮]

দুই:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সম্পর্কিত যে তথ্যগুলোর ব্যাপারে সকলে একমত সেটা হচ্ছে- জন্মের সাল ও দিন।

জন্মের সাল: তার জন্মের বছর ছিল “আমুল ফিল” তথা হস্তি বাহিনীর বছর। ইমাম ইবনুল কাইয়ূম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অভ্যন্তরে হস্তি বাহিনীর বছর জন্ম গ্রহণ করেন।”[যাদুল মা‘আদ, পৃষ্ঠা- ১/৭৬]

মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালেহি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “ইবনে ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: তার জন্ম ছিল হস্তি বাহিনীর বছর। ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: অধিকাংশ আলেমের নিকট এ অভিমতটি প্রসিদ্ধ। ইমাম বুখারির উস্তাদ ইবরাহিম ইবনে মুনযির বলেছেন: এ ব্যাপারে কোন আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। খলিফা ইবনে খাইয়্যাত, ইবনুল জাযযার, ইবনে দিহইয়াহ, ইবনুল জাওযি ও ইবনুল কাইয়্যেম প্রমুখ আরেকটু বাড়িয়ে এ মতের উপর সকল সিরাতপ্রণেতার ইজমা (মতৈক্য) উল্লেখ করেছেন।” [সুবুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ (১/৩৩৪-৩৩৫)]

ড. আকরাম জিয়া আল-উমরি বলেন:

“সত্য হলো: বিপরীত বর্ণনাগুলোর প্রত্যেকটির সনদ দুর্বল। যে বর্ণনাগুলোতে বলা হয়েছে যে, তাঁর জন্ম ছিল হস্তি বাহিনীর ১০ বছর অথবা ২৩ বছর অথবা ৪০ বছর পর। কিন্তু অধিকাংশ আলেম বলেছেন তাঁর জন্ম হয়েছে হস্তি বাহিনীর বছর। আধুনিক যুগে মুসলিম ও পাশ্চাত্যপন্থী গবেষকদের পরিচালিত গবেষণাও এ মতকে সমর্থন করে। তাদের মতে, হস্তি বাহিনীর বছর হচ্ছে- ৫৭০ অথবা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ।” [আস-সিরাতুন নববিয়াহ আস-সাহিহাহ (১/৯৭)]

জন্মদিন: সোমবার। তিনি সোমবারে জন্ম গ্রহণ করেন, সোমবারে নবুওয়ত পান এবং সোমবারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আবু কাতাদা আনসারি (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

سئل صلى الله عليه وسلم عن صوم  يوم الاثنين ؟ قال : ذاك يوم ولدت فيه ، ويوم بعثت - أو أنزل علي فيه). رواه مسلم : (1162)

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারে রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন: এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে অথবা এ দিনে আমার উপর (অহি) নাযিল হয়েছে।” [সহিহ মুসলিম (১১৬২)]

ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “যারা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন রবিউল আউয়াল মাসের সতের তারিখ জন্ম গ্রহণ করেছেন, তাদের কথা সুদূর পরাহত; বরং ভুল। জনৈক শিয়া মতাবলম্বী কর্তৃক লিখিত “ইলামুর রুওয়া বি আলামিল হুদা” নামক গ্রন্থ থেকে হাফেজ ইবনে দিহইয়াহ এ মতটি উদ্ধৃত করেছেন। এরপর তিনি এ মতের দুর্বলতা প্রমাণ করেছেন। এ মতটি আসলেই দুর্বল। যেহেতু এটি হাদিসের বিপরীত”। [আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ (১/১৯৯)]

তিন:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের ব্যাপারে মতবিরোধ হচ্ছে মাস ও তারিখ নিয়ে। এ বিষয়ে আমরা আলেমদের বহু অভিমত জানতে পেরেছি, যেমন:

১. কেউ কেউ বলেছেন: ২ রা রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন।

ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ কেউ বলেছেন ২ রা রবিউল আউয়াল। ইবনে আব্দুল বারর “ইস্তেআব” গ্রন্থে এ অভিমত উল্লেখ করেন এবং ওয়াকেদি এ বর্ণনাটি আবু মাশার নাজিহ ইবনে আব্দুর রহমান আল-মাদানি থেকেও উদ্ধৃত করেন”।[আস-সিরাতুন নববিয়াহ” (১/১৯৯)]

২. কেউ কেউ বলেন: ৮ ই রবিউল আউয়াল।

ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ বলেছেন: ৮ ই রবিউল আউয়াল। হুমাইদি এ বর্ণনাটি ইবনে হাজম থেকে বর্ণনা করেন। আর মালেক, উকাইল ও ইউনুস ইবনে ইয়াযিদ প্রমুখ এটি বর্ণনা করেন জুহরি থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতয়িম থেকে। ইবনে আব্দুল বারর বলেন, ঐতিহাসিকরা এ মতটিকে সঠিক বলেছেন। হাফেজ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারজেমি এ তারিখের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। হাফেজ আবুল খেতাব ইবনে দিহইয়াহ ‘আত-তানবির ফি মাওলিদিল বাশিরিন নাজির’ গ্রন্থে এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন”।[আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯)]

৩. কেউ কেউ বলেছেন: ১০ রবিউল আউয়াল।

ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ বলেন: ১০ রবিউল আউয়াল। এ মতটি ইবনে দিহইয়াহ তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে আসাকের এ মতটি আবু জাফর আল-বাকের থেকে এবং মুজালিদ নামক রাবী শা‘বি থেকে বর্ণনা করেন”।[আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯)]

৪. কেউ কেউ বলেছেন: ১২ রবিউল আউয়াল।

ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ বলেন, ১২ রবিউল আউয়াল। ইবনে ইসহাক এ মতটি উল্লেখ করেন। ইবনে আবু শায়বাহ তার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে এ মতটি আফ্‌ফান থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে মিনা থেকে, তিনি জাবের ও ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তারা উভয়ে বলেছেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হস্তি বাহিনীর বছর, ১২ ই রবিউল আউয়াল, সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন। এ দিনেই তাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়, এ দিনেই তার মিরাজ হয়েছিল, এ দিনেই তিনি হিজরত করেছেন এবং এ দিনেই তিনি মারা যান’। জমহুর আলেমদের নিকট এ মতটিই বেশী প্রসিদ্ধ”।[আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯)]

কেউ কেউ বলেন: তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন রমযান মাসে, কারো কারো মতে, সফর মাসে; ইত্যাদি আরও অভিমত রয়েছে।

আমাদের নিকট যে মতটি অগ্রগণ্য মনে হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসের আট বা বারো তারিখের কোন একদিন জন্ম গ্রহণ করেন। কিছু কিছু মুসলিম গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ গবেষণা করে বের করেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ সোমবার ছিল! তাহলে এটা আরেকটি মত হল। এ মতটিও শক্তিশালী, এ তারিখটি ৫৭১ খৃষ্টাব্দের নিসান (এপ্রিল) মাসের বিশ তারিখ পড়ে। সমকালীন সিরাতপ্রণেতাদের কেউ কেউ এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খুদারি ও শফিউর রহমান মোবারকপুরি অন্যতম।

আবু কাসেম আস-সুহাইলি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “গণিতবিদগণ বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সৌরমাস “নিসান” এর বিশ তারিখে ছিল”। [আর-রওদুল উন্‌ফ (১/২৮২)]

উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খুদারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “মিসরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মরহুম মাহমুদ পাশা (মৃত্যু : ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) -যিনি একাধারে জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, গণিতবিদ্যা, বই লেখা ও গবেষণায় পারদর্শী ছিলেন- বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ছিল সোমবার সকাল বেলা, রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ মোতাবেক এপ্রিল/নিসান-এর ২০ তারিখ, ৫৭১খ্রিষ্টাব্দ। এ বছরটি হস্তি বাহিনীর ঘটনার প্রথম বছর। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন বনু হাশেম পল্লীতে আবু তালেবের ঘরে”।[নূরুল ইয়াকিন ফি সিরাতে সাইয়্যেদিল মুরসালিন, পৃষ্ঠা-৯; আরও দেখুন: আর-রাহিকুল মাখতুম (পৃষ্ঠা নং: ৪১)]

চার:

মৃত্যুদিন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, তিনি সোমবার দিন মারা গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুধবার মারা গেছেন মর্মে ইবনে কুতাইবার বর্ণনা সঠিক নয়। তবে এর দ্বারা যদি তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাফন করা বুঝিয়ে থাকেন তাহলে ঠিক আছে।

মৃত্যু সাল: এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, তিনি ১১ হিজরিতে মারা যান।

মৃত্যু মাস: এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, তিনি রবিউল আউয়াল মাসে মৃত্যুবরণ করেন।

কিন্তু এ মাসের নির্দিষ্ট তারিখের ব্যাপারে আলেমগণের মতপার্থক্য রয়েছে:

১. অধিকাংশ আলেম বলেছেন: রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ।

২. খাওয়ারেযমি বলেছেন : রবিউল আউয়ালের প্রথম তারিখ।

৩. ইব্‌নুল কালবি ও আবু মিখনাফ বলেছেন : রবিউল আউয়াল মাসের ২ তারিখ। সুহাইলি ও হাফেজ ইবনে হাজার এ মতের দিকেই ঝুঁকেছেন।

তবে অধিকাংশ আলেমের প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন: সুহাইলি প্রণীত “আর-রওদুল উন্‌ফ (৪/৪৩৯-৪৪০), ইবনে কাছিরের “আস-সিরাহ আন-নববিয়াহ” (৪/৫০৯), ইবনে হাজারের “ফাতহুল বারি” (৮/১৩০)।

আল্লাহই ভাল জানেন।

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব
Create Comments