বিদআত

বিদআত

ওসিলার প্রকারভেদ. বে-নামাযীকে দাওয়াত দেয়া ও বিদাতীর সাথে মুয়ামালাতের আদর্শ পদ্ধতি. রজব মাসে উমরা পালন.

ওসিলার প্রকারভেদ
প্রশ্ন: ওসিলার প্রকারগুলো কি কি?

আলহামদুলিল্লাহ।

ওসিলা ধরা বা মাধ্যম গ্রহণ করার চারটি অর্থের কোন একটি উদ্দেশ্য হতে পারে:

এক. যে ওসিলা গ্রহণ করা ব্যতীত ঈমান সম্পূর্ণ হবে না। সেটা হচ্ছে- আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান, তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান, আল্লাহ্‌র আনুগত্য করা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নৈকট্য তালাশ করা। আল্লাহ্‌ বাণী: “হে ঈমানদারেরা! তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য ওসিলা অনুসন্ধান কর।[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩৫] [এ প্রকারের মধ্যে আল্লাহ্‌র নাম ও গুণাবলী দিয়ে ওসিলা দেয়াও অন্তর্ভুক্ত হবে। ওসিলা প্রার্থনাকারীর নিজের নেক আমল দিয়ে আল্লাহ্‌র কাছে ওসিলা দেয়াও অন্তর্ভুক্ত হবে।]

দুই. রাসূলের জীবদ্দশায় তার থেকে দোয়া চেয়ে আল্লাহ্‌র কাছে ওসিলা দেয়া এবং মুমিনদের একে অপরের কাছে দোয়া চাওয়া। এই প্রকারের ওসিলা প্রথম প্রকারের অধিভুক্ত এবং এটা পালনেও উৎসাহ এসেছে।

তিন. কোন মাখলুকের মর্যাদার দোহাই দিয়ে কিংবা মাখলুকের সত্তার দোহাই দিয়ে ওসিলা দেয়া। যেমন এমনটি বলা যে, আমি আপনার নবীর মর্যাদার দোহাই দিয়ে আপনার অভিমুখী হচ্ছি কিংবা এ জাতীয় কোন কথা– কোন কোন আলেম এ প্রকারের ওসিলাকে জায়েয বলেছেন; কিন্তু তাদের অভিমত দুর্বল। সঠিক মত হচ্ছে­– এমন ওসিলা দেয়া হারাম। কেননা আল্লাহ্‌র কাছে দোয়ার মধ্যে তাঁর নাম ও গুণাবলী ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ওসিলা দেয়া যাবে না।

চার. পরবর্তী যামানার অনেকের কাছে ওসিলার প্রচলিত অর্থ হচ্ছে– নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ডাকা, বিপদ উদ্ধারের জন্য নবীর কাছে প্রার্থনা করা (মৃতব্যক্তি ও ওলিদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা): এটি বড় শির্ক। কেননা যা করার ক্ষমতা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো নাই সেটা করার জন্য ডাকা ও সাহায্য চাওয়া–ইবাদত। এই ইবাদত আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো জন্য সম্পন্ন করা বড় শির্ক।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ


বে-নামাযীকে দাওয়াত দেয়া ও বিদাতীর সাথে মুয়ামালাতের আদর্শ পদ্ধতি
প্রশ্ন: বে-নামাযীকে দাওয়াত দেয়ার আদর্শ পদ্ধতি কী? বিদাতী সম্পর্কেও কি বলবেন?

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

নামায আদায় ও অন্যান্য ইবাদত পালনের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে টার্গেটকৃত ব্যক্তির অবস্থা দেখতে হবে, তার সাথে উৎসাহপ্রদান ও ভীতিপ্রদর্শন এ দুটো পদ্ধতির কোনটি উপযোগী সেটা বিবেচনায় রাখতে হবে। যদিও শরিয়তের সাধারণ নীতি হচ্ছে উভয় পদ্ধতি একত্রে প্রয়োগ করা। তাছাড়া দাওয়াতের টার্গেটকৃত ব্যক্তির অগ্রসরতা কিংবা পিছুটান, ওয়াযের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া কিংবা না-হওয়া এ বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।

দুই:

বে-নামাযীকে দাওয়াত দেয়ার আদর্শ পদ্ধতি সংক্ষেপে নিম্নরূপ:

১। তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া যে, নামায একটি ফরয ইবাদত এবং ঈমানের পর নামায ইসলামের সবচেয়ে মহান রুকন।

২। তাকে নামাযের কিছু ফযিলত অবহিত করা; যেমন- আল্লাহ্‌ বান্দার উপর যা কিছু ফরয করেছেন তার মধ্যে নামায সর্বোত্তম। রবের নৈকট্য হাছিলের সর্বোত্তম মাধ্যম নামায। ধর্মীয় ইবাদতগুলোর মধ্যে বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব নেয়া হবে। কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকলে পাঁচ ওয়াক্ত নামায এর মধ্যবর্তী সকল পাপ মোচন করে। একটিমাত্র সেজদার মাধ্যমে বান্দার এক ধাপ মর্যাদা সমুন্নত হয় এবং একটি পাপ মোচন হয়...ইত্যাদি নামাযের ফযিলতের ব্যাপারে আরও যা কিছু বর্ণিত হয়েছে। এর মাধ্যমে আশা করি, তার অন্তর খুলে যাবে এবং নামায তার চক্ষুশীতলে পরিণত হবে, যেভাবে নামায নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লামের চক্ষু শীতল ছিল।   

৩। নামায বর্জনকারীর ব্যাপারে যে কঠোর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে এবং আলেমগণ নামায বর্জনকারী কাফের হয়ে যাওয়া ও মুরতাদ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে যে মতভেদ করেছেন তাকে সে সব অবহিত করা। নামায বর্জনকারীকে ইসলাম স্বাধীনভাবে সমাজে বসবাস করার সুযোগ দেয় না- তাকে এটি জানিয়ে দয়া। কারণ নামায বর্জনকারীর ক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে তাকে নামাযের দিকে আহ্বান করা। যদি সে উপর্যুপরি নামায বর্জন করতেই থাকে তাহলে ইমাম আহমাদ ও তার মতানুসারীদের মাযহাব অনুযায়ী তাকে মুরতাদ হিসেবে হত্যা করা হবে। ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মাযহাব মতে, তাকে হদ্দ বা শরয়ি শাস্তি হিসেবে হত্যা করা হবে। আর ইমাম আবু হানিফার মাযহাব মতে, তাকে গ্রেফতার করা হবে ও জেলে পাঠানো হবে। তাকে মুক্তভাবে ছেড়ে দেওয়ার কথা আলেমগণের কেউই বলেননি। নামায বর্জনকারীকে বলা হবে: আপনি কি এতে সন্তুষ্ট যে, আলেমগণ আপনার কাফের হওয়া, কিংবা আপনাকে হত্যা করা কিংবা গ্রেফতার করা নিয়ে মতভেদ করুক?!

৪। তাকে আল্লাহ্‌র সাক্ষাত, মৃত্যু ও কবরের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। নামায বর্জনকারীর যে, খারাপ মৃত্যু হয় ও কবরে আযাব হয় তাকে সেটা স্মরণ করিয়ে দেয়া।

৫। নির্ধারিত সময় এর চেয়ে দেরীতে নামায আদায় করা কবিরা গুনাহ্‌। তাদের পরে এল অযোগ্য উত্তরসূরীরা, তারা সালাত নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। কাজেই অচিরেই তারা গাইয়্য (ক্ষতিগ্রস্ততার) সম্মুখীন হবে।[সূরা মারিয়াম, আয়াত: ৫৯] ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন: গাইয়্য হচ্ছে জাহান্নামের একটি উপত্যকা; যেটা সুগভীর ও এর স্বাদ মন্দ। আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: সেসব নামাযীদের জন্য ধ্বংস যারা তাদের নামাযের ব্যাপারে গাফেল [সূরা মাউন, আয়াত: ৪,৫]

৬। বে-নামাযীকে কাফের ঘোষণা করার যে অভিমত রয়েছে এর ভিত্তিতে মহা জটিল কিছু বিষয় ঘটবে সেগুলো তাকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেওয়া। যেমন, তারা বিবাহ বাতিল হয়ে যাবে, বৈবাহিক সম্পর্ক ও স্ত্রীর সাথে সংসার করা হারাম হয়ে যাবে, মৃত্যুর পর তাকে গোসল করানো হবে না, তার জানাযার নামায পড়ানো হবে না। যে দলিলগুলো বে-নামাযীর কাফের হওয়া প্রমাণ করে এর মধ্যে রয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: কোন ব্যক্তির মাঝে এবং শির্‌ক ও কুফরের মাঝে সংযোগ হচ্ছে সালাত বর্জন।[সহিহ মুসলিম (৮২)] তিনি আরও বলেছেন: আমাদের ও তাদের মধ্যে চুক্তি হলো নামাযের। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করল, সে কুফরি করল।[জামে তিরমিযী (২৬২১), সুনানে নাসাঈ (৪৬৩), সুনানে ইবনে মাজাহ (১০৭৯)]  

৭। তাকে নামায সংক্রান্ত, নামায বর্জনকারী ও অবহেলাকারীর শাস্তি সংক্রান্ত কিছু পুস্তিকা ও ক্যাসেট উপহার দেওয়া।

৮। উপর্যুপরি সে নামায ত্যাগ করতে থাকলে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ও তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া।

আর বিদাতীর বিদাতের প্রকার ও মাত্রার ভিত্তিতে তার সাথে আচরণ ভিন্ন ভিন্ন হবে। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে- তাকে নসীহত করা, আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান করা, তার সামনে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা, তার সন্দেহ-সংশয় দূর করা। এর পরেও সে যদি তার বিদাত চালিয়ে যেতে থাকে তাহলে তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলে যদি সেটা ফলপ্রসু হয় তাহলে তার সম্পর্কচ্ছেদ করা ও তাকে হুমকি-ধমকি দেয়া। কোন লোককে বিদাতী বলার আগে নিশ্চিত হওয়া জরুরী। এক্ষেত্রে আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া এবং বিদাত ও বিদাতকারীর মধ্যে পার্থক্য করা উচিত। কেননা হতে পারে ব্যক্তি অজ্ঞতা কিংবা ভুল ব্যাখ্যার কারণে তার অজুহাত গ্রহণযোগ্য।

আরও জানতে দেখুন শাইখ সাঈদ বিন নাছের আল-গামেদির লিখিত হাক্বীকাতুল বিদআহ্‌ ওয়া আহকামুহা

আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব


রজব মাসে উমরা পালন
প্রশ্ন: রজব মাসে উমরা পালন করা মুস্তাহাব মর্মে বিশেষ কোন ফজিলত বর্ণিত আছে কি?

উত্তর:

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

আমাদের জানা মতে, রজব মাসে উমরা করার বিশেষ কোন ফযিলত কিংবা এ ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়নি। বরং রমজান মাসে ও হজ্জের মাসসমূহে (শাওয়াল, যিলক্বদ ও যিলহজ্জ) উমরা করার বিশেষ ফযিলত সাব্যস্ত আছে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাসে উমরা করেছেন বলে সাব্যস্ত হয়নি। বরং আয়েশা (রাঃ) অস্বীকার করে বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাসে কখনও উমরা করেননি [সহিহ বুখারী (১৭৭৬) ও সহিহ মুসলিম (১২৫৫)]

দুই:

কিছু কিছু লোক যে, বিশেষ ফযিলত মনে করে রজব মাসে উমরা পালন করে এটি বিদআত। কেননা কোন মুমিনের জন্য শরয়ি দলিল ছাড়া বিশেষ কোন সময়কে বিশেষ কোন ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা সঙ্গত নয়।

ইমাম নববীর ছাত্র ইবনুল আত্তার (রহঃ) বলেন:

আমার কাছে মক্কাবাসীদের (আল্লাহ্‌ মক্কার সম্মান বৃদ্ধি করুন) সম্পর্কে সংবাদ এসেছে যে, রজব মাসে তারা বেশি বেশি উমরা করে থাকেন। এমন আমলের কোন ভিত্তি আমার জানা নেই। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে যে, রমযান মাসে একটি উমরা পালন করা হজ্জের সমান।[সমাপ্ত]

 শাইখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম (রহঃ) তাঁর ফতোয়াসমগ্রে (৩/১৩১) বলেন:

রজব মাসের কিছু দিনকে কিছু কিছু আমলের জন্য খাস করা, যেমন- যিয়ারত ও অন্যান্য আমল; এর কোন ভিত্তি নেই। আবু শামা আল-বিদা ওয়াল হাওয়াদিস গ্রন্থে যে সিদ্ধান্ত টেনেছেন সে সিদ্ধান্তের কারণে। সেখানে এসেছে- শরিয়ত যে সময়ের সাথে কোন ইবাদতকে খাস করেনি সে সময়ের সাথে কোন একটি ইবাদতকে খাস করা অনুচিত। কেননা কোন এক সময়ের উপর অপর সময়ের বিশেষ কোন মর্যাদা নেই; যদি না শরিয়ত বিশেষ কোন ইবাদতের মাধ্যমে কিংবা সব ধরণের ইবাদতের মাধ্যমে বিশেষ সময়কে অন্য সময়ের উপর মর্যাদা দিয়ে থাকে সেটা ছাড়া। এ কারণে আলেমগণ রজব মাসে বেশি বেশি উমরা করার নিন্দা করেছেন।[সমাপ্ত]

তবে, কেউ যদি বিশেষ কোন ফযিলতের বিশ্বাস না করে, ঘটনাক্রমে কিংবা সময় সুযোগের কারণে রজব মাসে উমরা পালন করে এতে কোন অসুবিধা নেই।

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব
বিদআত