শনিবার 26 জুমাদাল ছানী 1443 - 29 জানুয়ারী 2022
বাংলা

আল্লাহ তাআলা তাঁর আইন বাস্তবায়ন ও বান্দাদের প্রতি রহমতস্বরূপ হাতকাটা ও পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিধান দিয়েছেন

প্রশ্ন

প্রশ্ন: চুরির অভিযোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি তাঁর যামানায় কারো হাত কেটেছেন? ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার কারণে তিনি কি তাঁর যামানায় কাউকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করেছিলেন? আমি জনৈক দায়ীর কাছে শুনেছি ইসলামী হুকুমতের ইতিহাসে অর্থাৎ খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়্যা খিলাফত ও আব্বাসী খিলাফতকালে শুধু নয়জন ব্যক্তির হাত কাটা হয়েছে! এটি কি ঠিক?

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

আল্লাহ তাআলা দণ্ডবিধিগুলোর বিধান দিয়েছেন তাঁর নির্ধারিত সীমাগুলো লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করার জন্য, বান্দার অধিকারগুলো সংরক্ষণ করার জন্য; তিনি নিজে যেগুলো রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সীমা লঙ্ঘনকারীদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য ও পবিত্র করার জন্য। তিনি এ বিধানগুলোকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে জারী করেছেন যাতে করে জানা যায় কে তাঁর প্রতি ও তাঁর আইনের প্রতি প্রকৃত ঈমানদার, কে শুনে ও আনুগত্য করে। আর কে এ বিধানগুলোকে পরোয়া করে না এবং সীমাগুলো লঙ্ঘন করাকে কিছুই মনে করে না। তাছাড়া আল্লাহ এ বিধানগুলোকে তাদের জন্য প্রতিরোধক হিসেবে প্রদান করেছেন যারা নফসের তাড়নায় আল্লাহ যা কিছু নিষিদ্ধ করেছেন সেগুলোতে লিপ্ত হয়।

দুই:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যভিচারীকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করেছেন এবং চোরের হাত কেটেছেন। রজমের বিষয়টি সহিহ বুখারী (৬৮৩০) ও সহিহ মুসলিম (১৬৯১) এর বর্ণনায় এসেছে-

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিম্বরে উপবিষ্ট হয়ে বলেন: “আল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন। তাঁর প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাঁর প্রতি নাযিল হয়েছে রজমের (পাথর নিক্ষেপে হত্যার) আয়াত। আমরা এ আয়াতটি পড়েছি, মুখস্ত করেছি এবং বুঝেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজম করেছেন এবং তাঁর পরবর্তীতে আমরাও রজম করেছি। আমার আশংকা হচ্ছে- দীর্ঘ সময় পার হলে কেউ কেউ বলবে: আমরা আল্লাহর কিতাবে রজমের বিধান পাই না; এভাবে তারা পথভ্রষ্ট হবে এবং আল্লাহর নাযিলকৃত একটি বিধানকে বর্জন করবে। নিশ্চয় কোন বিবাহিত নর বা নারী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়; এবং এর প্রমাণ পাওয়া যায় কিংবা গর্ভধারণ সাব্যস্ত হয় কিংবা তাদের স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় তাহলে আল্লাহর কিতাবে তাদের জন্য রজমের বিধান সত্য।”

সহিহ মুসলিমে (১৬৯২) জাবের বিন সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “আমি দেখেছি মায়েয বিন মালেক (রাঃ) কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হাজির করা হল। তিনি ছিলেন খাটো ও বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী এক লোক। তার গায়ে চাদর ছিল। তিনি চারবার নিজের উপর ব্যভিচার করার সাক্ষ্য দিলেন। তার কথা শুনে রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: সম্ভবত তুমি (চুম্বন করেছ কিংবা জড়িয়ে ধরেছ)? তিনি বললেন: না; আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় সে ব্যভিচার করেছে। বর্ণনাকারী বলেন: এরপর তিনি তাকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করলেন..।”

ইবনুল কাইয়্যেম (রহঃ) বলেন:

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যিনার অভিযোগে যাদেরকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করেছেন তারা সবাই পরিচিত ও সংখ্যায় কম। তাদের ঘটনা সংরক্ষিত ও সবার জানা। তারা হচ্ছেন- গামেদিয়্যা বংশের এক নারী, মায়েয, ঐ মহিলা যিনি তার কাজের লোকের সাথে ব্যভিচার করেছেন এবং দুইজন ইহুদী লোক।”[আল-তুরুক আল-হুকমিয়্যা (পৃষ্ঠা-৫৩) থেকে সমাপ্ত]

আর চোরের হাত কাটার বিষয়টি: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষ চোর ও মহিলা চোরের হাত কটেছেন:

সহিহ বুখারী (৬৭৮৮) ও সহিহ মুসলিম (১৬৮৮)এ আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে মক্কা বিজয় অভিযানকালে যে মহিলা চুরি করেছিল তার ব্যাপারে কুরাইশরা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা বলে: তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কে সুপারিশ করবে? তারা বলল: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়ভাজন উসামা বিন যায়েদ ছাড়া আর কার সে সাহস আছে? সে মহিলাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাজির করা হল। তখন উসামা বিন যায়েদ সে মহিলার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কথা বললেন। তার কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লামের চেহারা লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন: “তুমি কি আল্লাহর হ্দ্দ (দণ্ডবিধি) এর ব্যাপারে সুপারিশ করতে এসেছ?” তখন উসামা বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। যখন সন্ধ্যা হল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়া শুরু করলেন। প্রথমে আল্লাহর যথাপোযুক্ত প্রশংসা করলেন। এরপর বললেন: “আম্মা বাদ (পর সমাচার): তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা ধ্বংস হয়েছে কারণ তাদের মধ্যে উচ্চ বংশের কেউ চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর তাদের মধ্যে দুর্বল কেউ চুরি করলে তারা তাকে শাস্তি দিত। ঐ সত্তার শপথ যার হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, যদি (আমার মেয়ে) ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ চুরি করত আমি তার হাত কেটে দিতাম।” এরপর ঐ মহিলার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন এবং তার হাত কাটা হল।

সাফওয়ান বিন উমাইয়্যা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: এক লোক একটি চাদর চুরি করল। তিনি বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উত্থাপন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। তখন সাফওয়ান বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি তাকে মাফ করে দিলাম। তিনি বললেন: “আবু ওহাব (ওহাবের বাপ), তুমি আমার কাছে আসার আগে এটা করলে না কেন?”? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাত কাটলেন।” [সুনানে আবু দাউদ (৪৩৯৪), সুনানে নাসাঈ (৪৮৭৯), হাদিসের এ ভাষ্যটি সুনানে নাসাঈর এবং আলবানি তার সহিহ সুনানে নাসাঈ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]

তিন:

যে ব্যক্তি বলে যে, ইসলামী খিলাফতের ইতিহাসে আব্বাসী খিলাফতের শেষ পর্যন্ত মাত্র নয়জন ব্যক্তির হাত কাটা হয়েছে এ দাবী একেবারে অবান্তর। বরং এর সঠিক পরিসংখ্যান করা সম্ভবপর নয়; ইসলামী রাজ্যগুলোর বিস্তৃতি এবং শহর-বন্দরের আধিক্যের কারণে। তাই এ দীর্ঘকালব্যপী এ সবগুলো শহরের পরিসংখ্যান করা অসম্ভব। আমরা এমন কোন ইতিহাস জানি না যে, খলিফারা ও তাদের গভর্নরবর্গ প্রতিটি ছোট ও বড় শহরে চুরির অভিযোগে যাদের হাতকাটা হত তাদের সংখ্যার পরিসংখ্যান করতেন। এটি ঘটাই সম্ভবপর নয়; থাকতো তারা এদের সংখ্যা ‘নয়’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে উল্লেখ করবেন! বরং নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই দীর্ঘ সময়কালে চুরির অভিযোগে যাদের হাত কাটা হয়েছে তাদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

এ উক্তির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার ও এর উপর নির্ভর করার সুযোগ নেই।

তাছাড়া এ উক্তিকারীর এর পেছনে উদ্দেশ্য কি। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহতে এ বিধান সাব্যস্ত হয়েছে। এ বিধান যে, ফরজ এ ব্যাপারে কোন আলেম দ্বিমত করেননি‍?‍!

আরও জানতে দেখুন নং 993514312 নং প্রশ্নোত্তর।

আল্লাহই ভাল জানেন।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব