বুধবার 14 রবীউল আউওয়াল 1443 - 20 অক্টোবর 2021
বাংলা

মুসলিমের দোয়া প্রার্থিত বিষয় দিয়ে কিংবা অন্য বিষয় দিয়ে কবুল করা হয়

প্রশ্ন

কেউ যদি আন্তরিকভাবে তার দ্বীনদারির পরিশুদ্ধির জন্য দোয়া করে সেটা কি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়; যেমন সে আল্লাহ্‌র কাছে একীন চাইল। এবং কেউ যদি আন্তরিকভাবে তার আখিরাতের শুদ্ধির জন্য দোয়া করে সেটা কি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়; যেমন সে আল্লাহ্‌র কাছে ফেরদাউস চাইল?

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

মুসলিমের কর্তব্য হল দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র ইবাদত করা— দোয়া কবুল হওয়ার একীন নিয়ে, আল্লাহ্‌র প্রতি সুধারণা রেখে ও দোয়া কবুলের কারণগুলো গ্রহণ করে। এরপর আল্লাহ্‌র উপর তাওয়াক্কুল করা এবং কবুলের বিষয়টি আল্লাহ্‌র রহমত, তাঁর অনুগ্রহ ও প্রজ্ঞার উপর ছেড়ে দেয়া। যেহেতু আল্লাহ্‌ সর্বাধিক ভাল জানেন দুনিয়াতে বান্দার জন্য যা কল্যাণকর এবং আখিরাতে যা তাকে নাজাত দিবে। গুরুত্বপূর্ণ হল: ধৈর্য ও অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও হতাশ না হওয়া এবং তাড়াহুড়া না করা। অর্থাৎ এভাবে না বলা যে, আমি দোয়া করেছি; কিন্তু কবুল হয়নি। কারণ স্বয়ং দোয়াটাই (আল্লাহ্‌র জন্য নির্দিষ্টকৃত) একটি ইবাদত; যা সত্তাগতভাবে উদ্দিষ্ট; নিছক কবুল হওয়ার জন্য নয়।

আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “কোন মুসলিম যদি এমন কোন দোয়া করে যাতে কোন পাপ নেই কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের বিষয় নেই তাহলে আল্লাহ্‌এ দোয়ার বদৌলতে তাকে তিনটি জিনিসের কোন একটি দান করেন: তার দোয়াটি অবিলম্বে কবুল করা কিংবা তার দোয়াটিকে আখিরাতের জন্য সংরক্ষিত করে রাখা কিংবা অনুরূপ কোন অনিষ্ট তার থেকে দূর করা। তারা (সাহাবীরা) বলল: তাহলে আমরা অধিক দোয়া করব। তিনি বললেন: আল্লাহ্‌ও অধিক দাতা।”[হাদিসটি ইমাম আহমাদ ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে (১৭/২১৩) বর্ণনা করেছেন। ‘মুআস্‌সাসা রিসালা’-র ভার্সনের মুহাক্কিকগণ হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন এবং ‘আত-তারগীব ওয়াত তারহীব’ গ্রন্থে মুনযিরি হাদিসটির সনদকে ‘জায়্যিদ’ (ভাল) বলেছেন। আলবানী ‘সাহিহুল আদাব’ গ্রন্থে (৫৪৭) হাদিসটিকে ‘সহিহ’ বলেছেন।]

ইমাম নববী তাঁর ‘আল-আযকার’ গ্রন্থে (৪০১) এ হাদিসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে: “মুসলিমের দোয়া প্রার্থিত বিষয় কিংবা অন্য বিষয়ের মাধ্যমে কবুল হওয়া মর্মে দলিল শীর্ষক পরিচ্ছেদ।”

তাই সুনির্দিষ্ট কোন প্রার্থিত বিষয় (যেমন দ্বীনের পরিশুদ্ধি কিংবা আখিরাতের শুদ্ধি কিংবা দুনিয়ার পরিশুদ্ধি) হয়তো বাস্তবায়িত নাও হতে পারে। বরঞ্চ আল্লাহ্‌দুনিয়া বা আখিরাতে প্রার্থিত বিষয়ের বদলে অন্য কিছুও বাস্তবায়ন করতে পারেন কিংবা তার থেকে দুনিয়ার কোন অকল্যাণ দূরীভূত করতে পারেন।

ইবনে আব্দুল বার্‌র (রহঃ) পূর্বোক্ত হাদিস সম্পর্কে বলেন: “এ হাদিসে দলিল রয়েছে যে, এ তিনটির কোন এক পদ্ধিতে দোয়া কবুল হবেই হবে। এর ভিত্তিতে আল্লাহ্‌তাআলার বাণী: এবং যে কষ্টের জন্য তাঁকে ডাক (দোয়া কর) তিনি ইচ্ছা করলে তা দূর করে দেন[সূরা আনআম, আয়াত: ৪১] এর ব্যাখ্যা হবে (আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ): তিনি ইচ্ছা করবেন। তবে তাঁকে বাধ্যকারী কেউ নেই। এবং “আমি দোয়াকারীর দোয়াতে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে” আয়াতটি এর বাহ্যিক অর্থে ও সাকুল্য অর্থে বলবৎ থাকবে— আবু সাঈদ খুদরীর হাদিসের উল্লেখিত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে। আল্লাহ্‌তাঁর বাণী দ্বারা কী বুঝাতে চেয়েছেন এবং তাঁর রাসূল কী বুঝাতে চেয়েছেন তিনিই ভাল জানেন।

দোয়া— সর্বৈব কল্যাণ, ইবাদত ও ভাল আমল। আল্লাহ্‌কোন নেক আমলকারীর আমল বিনষ্ট করেন না। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলতেন: ‘আমি দোয়া কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় করি না; কিন্তু আমি দোয়া করা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় করি।’ আমার মতে, তিনি দোয়া কবুল হওয়া ও প্রতিশ্রুতির আয়াতকে সাকুল্য অর্থে ব্যাখ্যা করে এমন উক্তি করেছেন। যেহেতু আল্লাহ্‌প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।”[‘আত-তামহীদ’ (১০/২৯৭-২৯৯) থেকে সমাপ্ত]

ইবনে হাজার (রহঃ) বলেন:

“প্রত্যেক দোয়াকারীর দোয়াই কবুল হয়। তবে কবুলের প্রকার বিভিন্ন: কখনও দোয়াকৃত বিষয়টি দেয়া হতে পারে, কখনও এর বিনিময়ে অন্যটি দেয়া হতে পারে। এ ব্যাপারে সহিহ হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে। সে হাদিসটি তিরমিযি ও হাকেম সংকলন করেছেন উবাদা বিন সামেত (রাঃ) এর মারফু হাদিস হিসেবে: জমিনের উপরে কোন মুসলিম কোন দোয়া করলে আল্লাহ্‌তাকে সেটি দান করেন কিংবা অনুরূপ কোন অনিষ্ট তার থেকে দূর করেন এবং ইমাম আহমাদ (রহঃ) আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হাদিস সংকলন করেছেন যে, হতে পারে তিনি অবিলম্বে দোয়া কবুল করবেন; কিংবা সে দোয়াকে তার জন্য পুঞ্জীভুত করে রাখবেন[ফাতহুল বারী (১১/৯৫) থেকে সমাপ্ত]

ইবনে বায (রহঃ) বলেন:

“দোয়াতে অনুনয়-বিনয় করা, আল্লাহ্‌র প্রতি সুধারণা রাখা, হতাশ না হওয়া দোয়া কবুলের মহান কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত। তাই ব্যক্তির উচিত দোয়াতে অনুনয়-বিনয় প্রকাশ করা, আল্লাহ্‌র প্রতি সুধারণা রাখা এবং এ কথা জানা যে, আল্লাহ্‌হচ্ছেন প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। হতে পারে তিনি তাঁর প্রজ্ঞাবলে কখনও অবিলম্বে দোয়া কবুল করেন। আবার কখনও তাঁর প্রজ্ঞাবলে বিলম্বে দোয়া কবুল করেন। আবার কখনও দোয়াকারীকে তার প্রার্থিত বিষয়ের চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।”[মাজমুউ ফাতাওয়া বিন বায (২৬/১২২)]

শাইখ আব্দুর রহমান আল-বার্‌রাক (হাফিঃ) বলেন:

“দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি প্রয়োজন পূরণের চেয়ে অধিক আম। তাই প্রার্থিত কিছু হাছিল না হওয়ার অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ্‌আপনার দোয়া কবুল করেননি। অর্থাৎ আপনি বলবেন যে, আল্লাহ্‌আমার দোয়া কবুল করেননি। কীসে আপনাকে সেটা জানাবে? হতে পারে আল্লাহ্‌আপনাকে এ তিনটির কোন একটি দিয়েছেন। এ কারণে আমি বলেছি, গ্রন্থাকারের উক্তি “তিনি প্রয়োজন পূরণ করেন” এটি “তিনি দোয়া কবুল করেন” এ কথার চেয়ে খাস।”[শারহুল আকিদা আত-তাহাবিয়্যা (পৃষ্ঠা-৩৪৮) থেকে সমাপ্ত]

এ আলোচনার মর্ম হল: আপনি দোয়া কবুল হওয়ার একীন (দৃঢ় বিশ্বাস) নিয়ে দোয়া করবেন; হোক দুনিয়াতে আপনি সেটা প্রত্যক্ষ করেন কিংবা আপনার আখিরাতের জন্য সেটাকে বিলম্বিত করে রাখা হোক। কারণ প্রত্যেক যে ব্যক্তি দোয়া কবুলের কারণগুলো নিশ্চিত করবে আল্লাহ্‌র বদান্যতাও তার জন্য নিশ্চিত।

এ বিষয়ে আমাদের ওয়েবসাইটে অনেকগুলো প্রশ্নোত্তর রয়েছে; সেগুলো থেকে উপকৃত হওয়া যেতে পারে। দেখুন: 212629 নং ও 135085 নং প্রশ্নোত্তর।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব