সোমবার 4 রবীউল আউওয়াল 1440 - 12 নভেম্বর 2018
বাংলা

দুই ঈদের নামাযের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ

প্রশ্ন

প্রশ্ন:
আমি দুই ঈদের নামাযের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ কী সেটা জানতে চাই।

উত্তর

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই ঈদের সালাত ঈদগাহে আদায় করতেন। তিনি ঈদের সালাত মসজিদে আদায় করেছেন এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ইমামশাফেয়ি‘আলউম্ম’ নামক গ্রন্থেবলেছেন: “আমাদেরকাছেএই মর্মে রেওয়ায়েতপৌঁছেছেযে, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লাম দুইঈদেরদিনমদিনারঈদগাহেযেতেন।তাঁর ওফাতেরপরেওসবাইসেটাইপালন করত;যদিনা বৃষ্টি বা এ জাতীয় অন্যকোন প্রতিবন্ধকতানা থাকে।মক্কাবাসীব্যতীত অন্য সবঅঞ্চলেরলোকেরাওসেটাইকরতেন।” সমাপ্ত

তিনিতাঁরসবচেয়েসুন্দরপোশাকপরেঈদেরনামাযের জন্য বেরহতেন। রাসূলসাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লাম এর হুল্লাহনামক এক সেটপোশাক ছিল। তিনিসেটিপরেদুইঈদএবংজুমারসালাতআদায়করতেযেতেন।

হুল্লাহ হচ্ছে-এক জাতীয় কাপড় দিয়ে তৈরী দুই অংশবিশিষ্ট এক সেটপোশাক।

তিনি ঈদুল ফিতরের সালাত আদায় করতে যাওয়ার আগে খেজুর খেতেন।খেজুরগুলো বেজোড় সংখ্যায় খেতেন। ইমামবুখারী (৯৫৩)আনাস ইবনে মালিকরাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন সকালবেলা খেজুর না খেয়ে বের হতেন না।তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন।”

ইবনেক্বুদামাহবলেছেন:

“ঈদুলফিতরেরদিনআগে আগেখাবারখাওয়ামুস্তাহাব্ব-এব্যাপারেকোনভিন্নমতআমাদেরজানানেই।”সমাপ্ত

ঈদুলফিতরেরদিননামাযআদায়েরআগেইখেয়েফেলারপিছনেহিকমতহলো-কেউযেনএটিনাভাবেযেসালাতআদায়করাপর্যন্তনাখেয়েথাকাঅপরিহার্য। আবার কারো কারো মতে, আগে আগেখাবার খাওয়ারপিছনেহিকমতহল-উপবাসের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ পালন করার পর অনতিবিলম্বে খাবার খাওয়ার নির্দেশ পালন করা।

যদি কোন মুসলিম খেজুর না পায় তাহলে তিনি অন্য যে কোন কিছু এমনকি পানি হলেও পান করবেন। যাতে তিনিঅন্তত সুন্নতেরমূল উদ্দেশ্যটা অনুসরণ করতে পারেন।তা হল- ঈদুল ফিতরের নামাযের আগে কিছু খাওয়া বা পান করা।

পক্ষান্তরে ঈদুল আযহার দিন তিনি ঈদগাহ থেকে ফেরার আগ পর্যন্ত কিছু খেতেন না।ঈদগাহ থেকে ফেরার পর তিনি কোরবানীর পশুর গোশত খেতেন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আরো বর্ণিত আছে যে তিনি দুই ঈদের দিন গোসল করতেন।ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন: “এ সম্পর্কে দুইটি দুর্বল হাদিস রয়েছে...। তবে ইবনে উমররাদিয়াল্লাহু আনহু যিনি সুন্নত অনুসরণের ব্যাপারে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন, তাঁর থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি ঈদের দিন নামাযে বের হওয়ার আগে গোসল করতেন।”সমাপ্ত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পায়ে হেঁটে ঈদের নামাযে যেতেন এবংপায়ে হেঁটে ঈদের নামায থেকে ফিরে আসতেন।

ইবনে মাজাহ (১২৯৫)ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন:“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামপায়ে হেঁটে ঈদের নামাযে যেতেন এবংপায়ে হেঁটে ঈদের নামায থেকে ফিরে আসতেন।”[আলবানী সহীহ ইবনে মাজাহ গ্রন্থেএ হাদিসকে হাসান বলে আখ্যায়িত করেছেন।]

ইমাম তিরমিযী (৫৩০) আলী ইবনে আবু ত্বালেব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:“ঈদেরনামাযে হেঁটে যাওয়া সুন্নত।”[আলবানী সহীহ তিরমিযী’গ্রন্থে এ হাদিসকে হাসান বলেআখ্যায়িত করেছেন। ]

ইমাম তিরমিযী আরো বলেছেন:

“অধিকাংশআলেমএইহাদিসঅনুসরণকরেছেনএবংঈদেরদিনপায়ে হেঁটেসালাতআদায়েরজন্যবেরহওয়াকেমুস্তাহাব্বহিসেবেআখ্যায়িতকরেছেন . . .। কোন গ্রহণযোগ্য অজুহাত ছাড়া যানবাহন ব্যবহার না-করা মুস্তাহাব্ব।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামঈদগাহে পৌঁছেইনামায শুরু করে দিতেন। আযান, ইকামত অথবা “আসসালাতু জামেআ” (নামাযের জামাতে হাজির হও) এ ধরনের কোন ঘোষণা দিতেন না।তাই এগুলোর কোনটি না-করাই সুন্নত।

তিনি ঈদগাহে ঈদের নামাযের আগে বা পরে আর কোন নামায আদায় করতেন না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামখোতবা দেয়ার আগে নামাযশুরু করতেন। দুই রাকাত সালাতের প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমাসহ পরপর সাতটি তাকবীরদিতেন। প্রতি দুই তাকবীরের মাঝে কিছু সময় বিরতি নিতেন। দুই তাকবীরের মাঝখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ কোন দু‘আ পড়েছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে ইবনে মাসঊদ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “আল্লাহর প্রশংসা করবে, সানা পড়বে এবং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়া সাল্লামের উপর দরুদপাঠ করবে।”

সুন্নতের অনুসরণের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতনইবনে উমর (রাঃ) প্রতি তাকবীরের সাথে হাত উঠাতেন।

তাকবীর বলার পরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকুরআন তেলাওয়াত করতেন। প্রথমে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। তারপর দুই রাকাতের যে কোন এক রাকাতে“ক্বাফ ওয়াল ক্বুর’আনিল মাজীদ” (৫০ নং সূরা ক্বাফ) এবং অপর রাকাতে“ইক্ব্‌তারাবাতিস সা‘আতু ওয়ান শাক্বক্বাল ক্বামার” (৬৪ নং সূরা ক্বামার) তেলাওয়াত করতেন। আবার কখনো “সাব্বিহিস্‌মা রাব্বিকাল আ‘লা” (৮৭ নং সূরাহ আল-আ‘লা) ও “হাল আতাকা হাদীসুল গাশিয়াহ” (৮৮নং সূরা আল- গাশিয়াহ) দিয়ে দুই রাকাত নামায পড়তেন। সহীহ রেওয়ায়েতে এ সূরাগুলোর কথা পাওয়া যায়। এছাড়া আর কোন সূরার কথা সহীহ বর্ণনায় পাওয়া যায়না। ক্বিরাতশেষ করার পর তিনি তাকবীর বলে রুকূ‘ করতেন। এরপর সেইরাকাত শেষ করে উঠে দাঁড়ানোর পর পরপর পাঁচটি তাকবীর দিতেন। পাঁচবার তাকবীর দেয়া শেষ করার পর তেলাওয়াত করতেন।অতএব প্রত্যেক রাকাতের শুরু করতেন তাকবীর দিয়ে।তেলাওয়াতের পরপরই রুকূ‘ করতেন।

ইমাম তিরমিযিএকটি হাদিস সংকলন করেছেন কাছীর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আওফ এর সূত্রে, তিনি তাঁর বাবা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে যে-“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই ঈদের সালাতে প্রথম রাকাতেকুরআন তেলাওয়াতের পূর্বে সাতবার তাকবীর দিতেন এবং অপর রাকাতেকুরআন তেলাওয়াতের পূর্বে পাঁচবার তাকবীরদিতেন।”ইমাম তিরমিযিবলেন: “আমিমুহাম্মাদকে অর্থাৎইমামবুখারীকেএইহাদিসসম্পর্কেজিজ্ঞেসকরেছিলাম। তিনিবলেছেন: “এইবিষয়েএরচেয়েসহীহআরকোনহাদিসনেই এবংআমি নিজেওএইমতপোষণ করি।”সমাপ্ত

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়া সাল্লামযখন সালাত শেষ করতেন তখন তিনি ঘুরে সবার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন। সবাই তখন নিজ নিজ কাতারে বসে থাকত। তখন তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন, নসীহত করতেন, আদেশ করতেন ও নিষেধ করতেন, কোন মিশন পাঠাতে চাইলে সে নির্দেশ দিতেন অথবা কাউকে অন্য কোন আদেশ করতে চাইলেসে ব্যাপারে আদেশ করতেন।সেখানে কোন মিম্বর রাখা হত না যার উপর তিনি দাঁড়াবেন অথবামদিনার মিম্বরও এখানে আনা হত না। বরং তিনি মাটির উপর দাঁড়িয়েই তাদের উদ্দেশ্যেখোতবা দিতেন।

জাবের (রাঃ) বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসাথে ঈদের সালাতে উপস্থিত ছিলাম।তিনি খোতবার আগে আযান ও ইক্বামাত ছাড়া সালাত শুরু করলেন। নামাযের পর বিলালের কাঁধে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি আল্লাহকে ভয় করার আদেশ দিলেন, আনুগত্য করার ব্যাপারে উৎসাহিত করলেন, মানুষকে নসীহতকরলেন, আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। এরপর তিনি মহিলাদের কাছে গেলেন, তাদেরকে আদেশ দিলেন ও আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন।”[সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহে যেতেন। প্রথমে নামায আদায় করতেন।নামায শেষে লোকদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন। তখন লোকেরা সবাই কাতারে বসে থাকত।”[এই হাদিসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।]

রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লাম তাঁরসকলবক্তৃতাআল্লাহরপ্রশংসাদিয়েশুরুকরতেন। এমন একটি হাদিসও পাওয়া যায়নিযে,তিনিদুইঈদেরখোতবাতাকবীরদিয়েশুরুকরেছেন। বরংইবনেমাজাহতাঁরসুনানগ্রন্থে (১২৮৭) নবীসাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লাম এর মুয়াজ্জিনসাদআল-ক্বারাজথেকেবর্ণনাকরেছেন: “নবীসাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লাম খোতবারমাঝখানে তাকবীরপাঠকরতেনএবংদুইঈদেরখোতবায় তিনিবেশিবেশিতাকবীরবলতেন।”[আলবানী‘জয়ীফুইবনেমাজাহ’ গ্রন্থেএ হাদিসকেদুর্বলহিসেবেচিহ্নিতকরেছেন] এইহাদিসটিদুর্বলহলেওএতেএমনকোনইঙ্গিতপাওয়াযায় নাযেতিনিঈদেরখোতবা তাকবীরদিয়েশুরুকরতেন।]

আলবানী ‘তামামুল মিন্নাহ’গ্রন্থে বলেন: “এই হাদিসটি ইঙ্গিত করেনা যে ঈদের খোতবা তাকবীর দিয়ে শুরু করা শরিয়তসম্মত।উপরন্তু এ হাদিসটির সনদ দুর্বল। এতে এমন একজন রাবী আছেন যিনি যয়ীফ (দুর্বল) এবং অপর একজন রাবী মাজহুল(অজ্ঞাতপরিচয়)।তাই এ হাদিসকে খোতবাচলাকালীন সময়ে তাকবীরবলা সুন্নাহ হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা জায়েয নয়।”

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন: “দুই ঈদ ও ইস্‌তিস্‌ক্বা’ (বৃষ্টি প্রার্থনারনামায)এর খোতবা কি দিয়ে শুরু হবে তা নিয়ে আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, উভয় (দুই ঈদ ও ইস্‌তিস্‌ক্বা) খোতবা তাকবীর দিয়ে শুরু হবে।কেউ কেউ বলেছেন, ইস্‌তিস্‌ক্বা’ (বৃষ্টি প্রার্থনার নামায)এর খোতবা ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) দিয়ে শুরু হবে । আবার কেউ বলেছেন, উভয় (দুই ঈদ ও ইসতিসক্বাএর) খোতবা আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু হবে।শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: এই মতটি সঠিক...। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামতাঁর সব খোতবা আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু করতেন।”সমাপ্ত

যারা ঈদের সালাতে উপস্থিত হয়েছেননবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বসে খোতবা শুনা অথবা খোতবা না-শুনে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।

আবু দাউদ (১১৫৫) আবদুল্লাহ ইবনে আল-সায়িব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়া সাল্লাম এর সাথে ঈদের সালাতে উপস্থিত ছিলাম।তিনি সালাত আদায় শেষ করে বললেন, “আমরা এখন খোতবা (বক্তৃতা)দিব।আপনাদের কেউ ইচ্ছা করলে বসে খোতবা শুনতে পারেন। আর কেউ চাইলে চলে যেতে পারেন।”[আলবানী এ‘সহীহ আবুদাউদ’গ্রন্থেহাদিসকেসহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের দিন (আসা-যাওয়ার জন্য)ভিন্ন ভিন্ন পথ ব্যবহার করতেন। তিনি এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং আরেক রাস্তা দিয়ে ফিরে আসতেন। ইমাম বুখারী (৯৮৬) জাবির ইবনে আব্দুল্লাহরাদিয়াল্লাহু আনহুমাথেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: “ঈদের দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলাদা আলাদা রাস্তা ব্যবহার করতেন।”

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

মতামত প্রেরণ