বুধবার 4 রবীউছ ছানী 1440 - 12 ডিসেম্বর 2018
বাংলা

জন্ম নিরোধক পিল সেবনের ফলে হায়েয অনিয়মিত

প্রশ্ন

আমার স্বাস্থ্যগত কিছু সমস্যার কারণে আমি জন্ম নিরোধক পিল ব্যবহার করছি। ভুল বশতঃ আমি সে পিল সেবন করিনি। এখন আমার রক্তপাত হচ্ছে। আমি যে দিনগুলো রক্তপাতের সমস্যায় ভুগি এ দিনগুলোর মধ্যে দুইদিন আমি নামায পড়ি। তদুপরি আমি গুনাহ করছি বলে মনে হয়। এ বিষয়ে সঠিক অভিমত কি? দয়া করে এ বিষয়টি জানবেন যে, আমি স্বাস্থ্যগত কিছু সমস্যার কারণে এ পিলগুলো সেবন করছি এবং আমার স্বামী এ বিষয়ে পূর্ণ অবগত আছেন। কারণ হয়তো আমি এ পিলগুলো সেবন করব কিংবা আমি স্বাস্থ্যগত এ সমস্যাগুলো মোকাবিলা করব। জাযাকুমুল্লাহু খাইরা।

উত্তর

এক:

নিম্নের শর্ত দুটো পূর্ণ না হলে কোন নারীর জন্ম নিরোধক পিল সেবন করা উচিত নয়।

১। এ পিল সেবন করার প্রয়োজন থাকা। যেমন- অসুস্থ হওয়া, শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়া এবং গর্ভধারণ করলে অসুস্থতা ও দুর্বলতা আরও বৃদ্ধি পাওয়া।

২। স্বামী অনুমতি দেওয়া। কেননা স্বামীর সন্তান লাভের অধিকার আছে।

এসব সত্ত্বেও এ পিলগুলো ব্যবহারের আগে নির্ভরযোগ্য ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা আবশ্যকীয়— নারীর  স্বাস্থ্যের জন্য এ পিলগুলো কতটুকু উপযুক্ত এবং ভবিষ্যতে এর কোন ক্ষতি আছে কিনা।

এ বিষয়টি ইতিপূর্বে 21169 নং প্রশ্নোত্তরে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেখানে শাইখ মুহাম্মদ বিন উছাইমীনের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।

দুই:

এ রক্তপাতের হুকুম ও এ অবস্থায় নামায ও রোযার হুকুম: এটা সুবিদিত যে, এ পিলগুলো সেবন করলে মহিলাদের হায়েযে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। হায়েযের মেয়াদকাল বেড়ে যায়। কখনও কখনও এগিয়ে আসে।

আলেমগণ এ মাসয়ালায় মতভেদ করেছেন যে: এটা কি হায়েয; নাকি হায়েয নয়?

শাইখ উছাইমীনের মনোনীত অভিমত হচ্ছে— এ পিলগুলো সেবনের কারণে হায়েযের মেয়াদকাল যে কয়দিন বাড়বে সেটা হায়েযই হবে। তিনি বলেন:

এ পিলগুলোর কুফল হচ্ছে: এগুলো নারীর স্বভাবগত হায়েযকে বিশৃঙ্খল করে ফেলে এবং নারীকে সন্দেহ ও পেরেশানীতে ফেলে দেয়। অনুরূপভাবে মুফতিদেরকেও সন্দেহ ও পেরেশানীতে ফেলে দেয়। কেননা মুফতিরা জানেন না যে, এই যে রক্ত নিঃসরিত হচ্ছে—এটা কি হায়েয; নাকি হায়েয নয়।

অতএব, এ নারীর স্বাভাবিক অভ্যাস যদি হয় পাঁচদিন হায়েয হওয়া এবং জন্ম নিরোধক পিল সেবনের ফলে হায়েযের মেয়াদকাল বেড়ে যায় তাহলে এ বেড়ে যাওয়া সময়টা মূলের অনুবর্তী হবে। অর্থাৎ এটাকে হায়েয হিসেবে গণ্য করা হবে; যতক্ষণ না এ রক্তপাত পনের দিনের বেশি সময় অতিক্রম না করে। যদি পনের দিনের বেশি সময় অতিক্রম করে তাহলে সেটা ইস্তিহাযা (রোগজনিত রক্তস্রাব)। তখন সে নারী তার স্বাভাবিক হায়েযের মেয়াদকে ধর্তব্য ধরবেন। তার স্বাভাবিক মেয়াদকাল হচ্ছে—পাঁচদিন।[সমাপ্ত]

[ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব (১/১২৩)]

স্থায়ী কমিটির আলেমগণের মনোনীত অভিমত হচ্ছে—এ অবস্থার শিকার নারী রক্তটাকে যাচাই করে দেখবেন। যদি দেখেন যে, এ রক্তে হায়েযের রক্তের বৈশিষ্ট্য রয়েছে তাহলে সেটা হায়েয। আর যদি সাধারণ রক্তের বৈশিষ্ট্য হয় তাহলে সেটা রক্তপাত; হায়েয নয়।

তাদেরকে আরও জিজ্ঞেস করা হয় যে:

বর্তমানে মহিলারা নানা রকম কৃত্রিম জন্ম নিরোধক উপায় গ্রহণ করে থাকে; যেমন—পিল ও কপার-টি। যে কোন ডাক্তার কপার-টি সেট করা বা পিল দেয়ার আগে মহিলাকে দুটো ট্যাবলেট খেতে দেন যাতে করে গর্ভধারণ না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন। এ অবস্থায় গর্ভধারণ যদি না হয়ে থাকে তাহলে রক্তপাত হওয়া আবশ্যকীয়।

প্রশ্ন হচ্ছে— কয়েক দিন ধরে নারীর এই যে রক্তপাত হয় এটার হুকুম কি হায়েযের রক্তের হুকুম যে, নামায, রোযা ও সহবাস পরিত্যাগ করতে হবে? উল্লেখ্য, এ রক্তপাত হায়েয়ের স্বভাবগত স্বাভাবিক সময়ে হয় না।

অনুরূপভাবে কোপার-টি কিংবা পিল ব্যবহারের পর কিছু কিছু মহিলাদের হায়েয আবর্তনের সিস্টেম পরিবর্তন হয়ে যায়। জন্ম নিরোধক ব্যবহার করার পর হঠাৎ করে মেয়াদ বেড়ে যায়। এমনকি কোন কোন নারী মাসে মাত্র এক সপ্তাহের বেশি পবিত্র থাকে না। আর বাকী তিন সপ্তাহ লাগাতরভাবে তার রক্তপাত হতে থাকে। এ সময়ে নিঃসরিত রক্ত হায়েযের রক্তের মতোই। অনুরূপভাবে গর্ভধারণ না থাকা নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে দুটো ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়; পূর্বের প্রশ্নে যা উল্লেখ করা হয়েছে; সে সময়ের রক্তও হায়েযের রক্তের মতোই।

প্রশ্ন হচ্ছে—এই তিন সপ্তাহব্যাপী সময়ে নারীর হুকুম কী? সেটা কি হায়েয? নাকি নারী জন্ম নিরোধক ব্যবহার করার আগে তার যে অভ্যাস ছিল সেটা মেনে চলবেন; নাকি দশদিন হায়েয ধরবেন?

জবাবে তারা বলেন:

দুটো ট্যাবলেট খাওয়ার পরে যে রক্তপাত শুরু হয়েছে সেটা যদি হায়েযের রক্তের মতো হয়ে থাকে তাহলে সেটা হায়েয। এ সময় মহিলারা নামায-রোযা বর্জন করবেন। আর যদি সেটা হায়েযের রক্তের মতো না হয় তাহলে সেটা হায়েযের রক্ত হিসেবে গণ্য হবে না; যার কারণে নামায, রোযা ও সহবাস নিষিদ্ধ হয়। কেননা এ রক্ত ট্যাবলেটের কারণ নিঃসরিত হচ্ছে।[সমাপ্ত][ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ্‌ দায়িমা (৫/৪০২)]

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) থেকে আরও বর্ণনা করা হয় যে, তাঁকে পিল খাওয়ার কারণে যে হায়েয শুরু হয় সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: নারীর কর্তব্য হল ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করা। ডাক্তার যদি বলেন: এটা হায়েয; তাহলে সেটা হায়েয। আর যদি বলেন: এটা এই ঔষধের কারণে নিঃসরিত রস; তাহলে সেটা হায়েয নয়।[ফাতাওয়া ওয়া দুরুসুল হারাম আল-মাক্কী (২/২৮৪)]

এটি উত্তম অভিমত। এর ভিত্তিতে আর কোন আপত্তি থাকে না।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

মতামত প্রেরণ