ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “দোয়া ও ঝাড়ফুঁক অস্ত্রের ন্যায়। অস্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উপর, কেবল ধারালো হওয়ার উপর নয়। সুতরাং যখন অস্ত্র সম্পূর্ণ নিখুঁত হয়, বাহু শক্তিশালী হয় এবং কোনো বাধা না থাকে, তখন তা দ্বারা শত্রুর ওপর আঘাত হানা যায়। আর যখন এই তিনটির কোনো একটি অনুপস্থিত থাকে, তখন প্রভাবও অনুপস্থিত হয়।”[আদ্-দা ওয়াদ্-দাওয়া: পৃ. ৩৫]
এ থেকে বোঝা যায় যে, দোয়া ও দোয়াকারীর জন্য কিছু অবস্থা, আদব ও বিধান থাকা আবশ্যক। আবার এমন কিছু প্রতিবন্ধকতা এবং পর্দাও আছে যা দোয়া পৌঁছানো ও কবুল হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। সেগুলো দোয়াকারী ও দোয়া থেকে দূর হওয়া জরুরি। যখন এসব পূর্ণ হয়, তখনই দোয়া কবুল বাস্তবায়িত হয়।
দোয়া কবুল হওয়ার সহায়ক কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে:
১- দোয়াতে ইখলাস (খাঁটি নিয়ত)। এটি আদবের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মহান। আল্লাহ তাআলা ইখলাসের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ “তোমরা দ্বীনদারিকে তাঁর জন্য একনিষ্ঠ করে তাঁকে ডাকবে।”[সূরা আ’রাফ: ২৯] দোয়াতে ইখলাস অর্থ হলো: এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, যাঁকে ডাকা হচ্ছে তথা আল্লাহ তাআলা, তিনিই একমাত্র প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম এবং এ ক্ষেত্রে মানুষের সামনে দেখানোর মনোভাব থেকে দূরে থাকা।
২ - তওবা করা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। কেননা গুনাহ দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করে। তাই দোয়াকারীর উচিত দোয়ার আগে তওবা ও ইস্তিগফার করায় বিলম্ব না করা। আল্লাহ তাআলা নূহ আলাইহিস সালামের কথা উদ্ধৃত করে বলেছেন:
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
“আমি বললাম: তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তাহলে তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন; তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান দ্বারা শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা সৃষ্টি করবেন এবং তোমাদের জন্য নদ-নদী প্রবাহিত করবেন।”[সূরা নূহ: ১০-১২]
৩- মিনতি, ঐকান্তিকতা, নম্রতা, আশা ও ভয়। এটাই দোয়ার আত্মা, নির্যাস ও মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
“তোমরা মিনতিভরে ও সঙ্গোপনে তোমাদের রবকে ডাকো। তিনি তো সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।”[সূরা আ’রাফ: ৫৫]
৪ - বারবার দোয়া করা এবং বিরক্ত বা ক্লান্ত না হওয়া। দোয়া দুই বা তিনবার পুনরাবৃত্তি করলে আবেদন জোরালো হয়। তিনবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণের কারণে উত্তম। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার দোয়া করা এবং তিনবার ইস্তিগফার করা পছন্দ করতেন।[আবু দাউদ ও নাসাঈ এটি বর্ণনা করেছেন]
৫ - সুখ ও স্বচ্ছলতার সময় দোয়া করা এবং সে সময় বেশি বেশি দোয়া করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সচ্ছলতার সময় আল্লাহকে চিনে নাও, তিনি কষ্টের সময় তোমাকে চিনবেন।”[হাদীসটি আহমদ বর্ণনা করেছেন]
৬ - দোয়ার শুরুতে বা শেষে আল্লাহর সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর কাছে চাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلِلّهِ الأَسْمَاء الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا
“আর আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম আছে, তোমরা তাকে সেসব নামে ডাকবে।”
৭ - ব্যাপক অর্থবোধক, সর্বোত্তম ও সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ দোয়া নির্বাচন করা। সর্বোত্তম দোয়া হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দোয়া। তবে মানুষের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য দোয়া করাও বৈধ।
আরও কিছু আদব আছে, যদিও তা আবশ্যক নয়: কিবলার দিকে মুখ করা, পবিত্র অবস্থায় দোয়া করা, আল্লাহর প্রশংসা ও হামদ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করে দোয়া শুরু করা। দোয়ার সময় হাত উত্তোলন করা সুন্নত।
দোয়া কবুল হওয়ার সহায়ক বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তম সময় ও স্থান অনুসন্ধান করা।
উত্তম সময়সমূহের মধ্যে রয়েছে: সেহরীর সময় (ফজরের আগে), রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, জুমার দিনের শেষ সময়, বৃষ্টি নামার সময় এবং আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়।
উত্তম স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে: সাধারণভাবে সব মসজিদ, বিশেষ করে মাসজিদুল হারাম।
আর যে অবস্থাগুলোতে দোয়া কবুল হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: মযলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, রোযাদারের দোয়া, অসহায় ব্যক্তির দোয়া এবং কোনো মুসলিমের তার ভাইয়ের জন্য গোপনে করা দোয়া।
দোয়া কবুল না হওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১- দোয়াটি নিজেই দুর্বল হওয়া। তথা এতে সীমালঙ্ঘন বা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে অসৌজন্য আচরণ থাকার কারণে। সীমালঙ্ঘন বলতে বোঝায়: আল্লাহ তাআলার কাছে এমন কিছু চাওয়া যা চাওয়া বৈধ নয়; যেমন কেউ দোয়া করল যে তাকে দুনিয়াতে চিরস্থায়ী করে দেওয়া হোক অথবা গুনাহ বা হারাম বিষয়ে দোয়া করা কিংবা নিজের জন্য মৃত্যু কামনা করা ইত্যাদি। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “বান্দার দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হতে থাকে যতক্ষণ না সে কোনো গুনাহের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।”[মুসলিম বর্ণনা করেছেন]
২- দোয়াকারী নিজেই দুর্বল হওয়া। তথা আল্লাহ তাআলার প্রতি তার অন্তরের আগ্রহ ও মনোনিবেশ দুর্বল হওয়ার কারণে। আল্লাহর সঙ্গে অসৌজন্যের উদাহরণ হলো: দোয়ার সময় উচ্চস্বরে চিৎকার করা কিংবা এভাবে দোয়া করা যেন সে আল্লাহর মুখাপেক্ষী নয় বরং উদাসীন, শব্দচয়নে অতিরিক্ত কৃত্রিমতা করা এবং অর্থের দিকে মনোযোগ না দিয়ে শব্দ নিয়েই ব্যস্ত থাকা অথবা প্রকৃত অনুভূতি ছাড়াই কৃত্রিমভাবে কান্না ও চিৎকার করা এবং এতে বাড়াবাড়ি করা।
৩- দোয়া কবুল না হওয়ার আরেকটি কারণ হলো: আল্লাহর হারামকৃত বিষয়গুলোতে লিপ্ত হওয়া; যেমন হারাম উপার্জন খাওয়া, পান করা, পরিধান করা, বাস করা ও আরোহন করা এবং হারাম পেশার আয়। অনুরূপভাবে অন্তরের উপর গুনাহর কুপ্রভাব পড়া, দ্বীনের মধ্যে বিদআত সৃষ্টি করা এবং অন্তরের ওপর গাফিলতি আধিপত্যশীল হওয়া।
৪- হারাম উপার্জন ভক্ষণ করা। এটি দোয়া কবুল না হওয়ার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “হে মানুষ! আল্লাহ ভালো। তিনি কেবল ভালো জিনিসই গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে সেই বিষয়েরই আদেশ দিয়েছেন, যে বিষয়ে রাসূলদেরকে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন: ‘হে রাসূলগণ! তোমরা ভালো বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎকর্ম করো। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ আর তিনি বলেন: ‘হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে পবিত্র রিযিক দিয়েছি তা থেকে খাও।’
এরপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, ধুলো-মলিন ও এলোমেলো অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে বলে: হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ তার খাবার হারাম, তার পানীয় হারাম এবং সে হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট; তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?!”[হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে দোয়া কবুল হওয়ার কিছু কারণ ছিল; যেমন সে মুসাফির ছিল এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি মুখাপেক্ষী ছিল। কিন্তু হারাম উপার্জন ভক্ষণ করার কারণে তার দোয়া কবুল হওয়া থেকে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও সুস্থতা কামনা করি।
৫- দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা এবং দোয়া ছেড়ে দেওয়া। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয় যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে: আমি দোয়া করেছি কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।”[হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন]
৬- দোয়াকে শর্তের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা। যেমন এভাবে বলা: ‘হে আল্লাহ, আপনি চাইলে আমাকে ক্ষমা করুন।’ বরং দোয়াকারীর উচিত দৃঢ়তার সঙ্গে দোয়া করা, আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা এবং বারবার মিনতি করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেন এভাবে না বলে: হে আল্লাহ, তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করো। তুমি চাইলে আমাকে দয়া করো। বরং সে যেন দৃঢ়ভাবে প্রার্থনা করে। কেননা আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই।”[হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন]
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য এই সব আদব পুরোপুরি পালন করা এবং সব প্রতিবন্ধকতা সম্পূর্ণরূপে দূর করা আবশ্যক এমন নয়; কারণ এটি অর্জন করা খুব কঠিন। তবে মানুষের উচিত সাধ্য অনুযায়ী এগুলো বাস্তবায়নে চেষ্টা করা।
যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বান্দার জানা উচিত তা হলো, দোয়া কবুল বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে: কখনো আল্লাহ তাআলা সরাসরি তার দোয়া কবুল করেন এবং তার কাম্য বিষয়টি তাকে দান করেন, কখনো তার দোয়ার মাধ্যমে কোনো অকল্যাণ দূর করে দেন, কখনো তার জন্য তার দোয়ার চেয়েও উত্তম কিছু সহজ করে দেন, আর কখনো তা কিয়ামতের দিনের জন্য তাঁর কাছে সঞ্চিত করে রাখেন, যেদিন বান্দার তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে।
আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।