রবিবার 8 রবীউল আউওয়াল 1442 - 25 অক্টোবর 2020
বাংলা

ব্যাংকিং আমানতের প্রকারভেদ ও এর হুকুম

113852

প্রকাশকাল : 24-10-2020

পঠিত : 60

প্রশ্ন

‘ফয়সাল ইসলামী ব্যাংক’-এর মতো কোন ইসলামী ব্যাংকে আমানত রাখার হুকুম কি?

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

লেনদেনের অধিকার না দিয়ে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে অন্যের কাছে যা কিছু জমা রাখা হয় সেটাকে আমানত বলা হয়। হোটেল বা এ জাতীয় স্থানগুলোতে ‘লকার’ নামে যা থাকে সেটার ক্ষেত্রে এ সংজ্ঞা প্রযোজ্য হয়। হতে পারে কোন কোন ব্যাংকেও এ ধরণের লকার রয়েছে। পক্ষান্তরে, যেটাকে ‘ব্যাংকিং আমানত’ বলা হয় সেটি এ সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। যেহেতু ব্যাংক জমাকৃত অর্থ সংরক্ষণ করে রাখে না; বরং এ অর্থ দিয়ে লেনদেন করে।

এই হল আমানতের পরিচতি সংক্রান্ত আলোচনা। আর হুকুমের ব্যাপারে কথা হল— আমানত দুই প্রকার:

এক. লাভজনক আমানত। এটাকে চাহিবামাত্র প্রদেয় আমানত কিংবা চলতি হিসাব বলা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হল: গ্রাহক ব্যাংকে তার অর্থ জমা রাখবেন এবং যখন ইচ্ছা তখন উত্তোলন করতে পারবেন। তবে কোন লাভ পাবেন না। এ ধরণের লেনদেনে কোন আপত্তি নেই। যেহেতু এটি প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ। কিন্তু, যদি ব্যাংকটি সুদি ব্যাংক হয় তাহলে এমন ব্যাংকে অর্থ জমা রাখা জায়েয নয়। যেহেতু সুদি ব্যাংক এ অর্থ থেকে উপকৃত হবে এবং এ অর্থের মাধ্যমে তার হারাম কর্মকাণ্ডগুলোকে মজবুত করবে। তবে, কোন গ্রাহকের যদি তার অর্থ ব্যাংকে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয় এবং অন্য কোন ইসলামী ব্যাংক না পান সেক্ষেত্রে তার সম্পদ সুদি ব্যাংকে সংরক্ষণ করলে গুনাহ হবে না।

আরও জানতে দেখুন: 22392 নং প্রশ্নোত্তর।

দুই: সঞ্চয়ী আমানত। এর বৈশিষ্ট্য হল: গ্রাহক মুনাফার বিনিময়ে তার অর্থ ব্যাংকে রাখবেন। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদে মেয়াদে তিনি সেই মুনাফা পাবেন। এ প্রকার আমানতের কিছু জায়েয পদ্ধতি রয়েছে। আবার কিছু হারাম পদ্ধতি রয়েছে।

জায়েয পদ্ধতির মধ্যে হল গ্রাহক ও ব্যাংকের মধ্যকার চুক্তিটি মুদারাবা চুক্তি হওয়া। অর্থাৎ ব্যাংক নির্দিষ্ট আনুপাতিক লাভ দেয়ার বিপরীতে মুবাহ (শরিয়ত অনুমোদিত) প্রজেক্টসমূহে আমানতের অর্থ বিনিয়োগ করা। এ ধরণের চুক্তির ক্ষেত্রে শর্তগুলো হল:

১। ব্যাংক কর্তৃক মুবাহ খাতগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করা। যেমন: উপকারী প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়ন, আবাসন তৈরী, ইত্যাদি। সুদি ব্যাংক বা সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করা কিংবা অস্বচ্ছল লোকদেরকে সুদভিত্তিক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ করা জায়েয হবে না।

তাই ব্যাংক কি কি খাতে বিনিয়োগ করে সেটা জানা আবশ্যক।

২। মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টি না দেয়া। অর্থাৎ লোকসান হলে ব্যাংক গ্রাহকের মূলধন ফেরত দেয়ার দায় গ্রহণ না করা; যতক্ষণ না ব্যাংকের পক্ষ থেকে কসুরের কারণে লোকসান না হয় এবং ব্যাংকই এ লোকসানের প্রধান কারণ না হয়।

কেননা যদি মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টি দেয়া হয় এমন চুক্তি প্রকৃতপক্ষে ঋণের চুক্তি। অতিরিক্ত যে মুনাফা আসে সেটি সুদ হিসেবে গণ্য হবে।

৩। শুরু থেকে লাভ নির্দিষ্ট থাকা ও চুক্তিতে উল্লেখিত থাকা। তবে লাভ নির্দিষ্ট করতে হবে লভ্যাংশের সাধারণ অনুপাতের ভিত্তিতে; মূলধন থেকে নয়। উদাহরণতঃ এক পক্ষ পাবে লাভের এক তৃতীয়াংশ কিংবা অর্ধেক কিংবা ২০%। অবশিষ্টাংশ পাবে অপর পক্ষ। যদি লাভ অজ্ঞাত ও অনির্দিষ্ট থাকে তাহলে এমন চুক্তি সঠিক হবে না। ফিকাহবিদ আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, লাভের অনুপাত অজ্ঞাত থাকলে মুদারাবা চুক্তি নষ্ট হয়ে যায়।

মুদারাবার হারাম পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১। মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টি দেয়া। উদাহরণতঃ গ্রাহক ১০০ মুদ্রা আমানত রাখল; যাতে করে তার মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টিসহ সে ১০ মুদ্রা মুনাফা পায়। এটি সুদভিত্তিক ঋণ। অধিকাংশ ব্যাংকে এ লেনদেন চলে। এ ধরণের লেনদেনকে আমানত কিংবা ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট কিংবা সঞ্চয়ী বই নামে অভিহিত করা হয়। এ মুনাফা বিভিন্ন মেয়াদে বিতরণ করা হয় কিংবা লটারীর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়; যেমনটি করা হয় ‘সি’ ক্যাটাগরীর ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে। উল্লেখিত সব লেনদেন হারাম। ইতিপূর্বে 98152 নং ও 97896 নং প্রশ্নোত্তরে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

২। ব্যাংক কর্তৃক হারাম প্রজেক্টগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করা। যেমন- সিনেমা হল বানানো, পর্যটন ভিলেজ তৈরী করা; যেসব ভিলেজে শরিয়ত গর্হিত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়, পাপের সয়লাব ঘটে। এমন ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হারাম। যেহেতু এর মাধ্যমে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হয়।

ব্যাংকগুলো যে ধরণের আমানতগুলোর লেনদেন করে সেগুলোর ব্যাপারে এটাই সার কথা।

ওআইসি-এর অধিভুক্ত ‘ইসলামী ফিকাহ একাডেমী’ এর সিদ্ধান্তে এসেছে যে:

“এক: চাহিবামাত্র প্রদেয় (চলতি হিসাব) আমানতগুলো ইসলামী ব্যাংকসমূহে হোক কিংবা সুদি ব্যাংকসমূহে হোক ইসলামী ফিকাহর দৃষ্টিতে এগুলো ঋণ। এই আমানতগুলোর উপর গ্রহণকারী ব্যাংকের কর্তৃত্ব হচ্ছে ফেরত দেয়ার গ্যারান্টিযুক্ত কর্তৃত্ব। গ্রাহক চাহিবামাত্র ব্যাংক আমানতের এ অর্থ ফেরত দিতে আইনতঃ বাধ্য।

ব্যাংক (ঋণগ্রহীতা) সামর্থ্যবান হওয়ায় এ ঋণের হুকুমের উপর কোন প্রকার প্রভাব পড়বে না।

দুই: ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান লেনদেনের ভিত্তিতে ব্যাংকিং আমানত দুই ধরণের:

ক. যে আমানতগুলোর বিপরীতে মুনাফা দেয়া হয়। সুদি ব্যাংকগুলোতে যা বিদ্যমান। এ ঋণগুলো সুদভিত্তিক ও হারাম; চাই সেগুলো চাহিবামাত্র প্রদেয় (চলতি হিসাব) শ্রেণীর আমানত হোক কিংবা মেয়াদী আমানত হোক কিংবা নোটিশসহ আমানত হোক কিংবা সঞ্চয়ী হিসাব হোক।

খ. যে ব্যাংকগুলো বাস্তবে ইসলামী শরিয়ার বিধিবিধান মেনে চলে সে সব ব্যাংকে বিনিয়োগের চুক্তিতে মুদারাবার মূলধন হিসেবে যে আমানতগুলো জমা করা হয়; এই শর্তে যে লভ্যাংশের একটি ভাগ গ্রাহক পাবে। এমন আমানতগুলোর ক্ষেত্রে ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রে উল্লেখিত মুদারাবার বিধিবিধানগুলো প্রযোজ্য। যে বিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, মুদারিব (ব্যাংক) এর জন্য মুদারাবার মূলধনের গ্যারান্টি দেয়া নাজায়েয।”[মাজাল্লাতুল মাজমায়িল ফিকহ, সংখ্যা-৯, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৯৩১]

ফয়সাল ব্যাংক যদি অর্থকে বৈধ প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা, গ্রাহকের মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টি না দেয়া, নির্দিষ্ট আনুপাতিক লাভের উপর চুক্তিবদ্ধ হওয়া ইত্যাদি বিধিগুলো মেনে চলে তাহলে এ ব্যাংকে বিনিয়োগ হিসেবে আমানত রাখতে কোন অসুবিধা নেই। অনুরূপভাবে এ ব্যাংকে চলতি হিসাব খুলতেও কোন অসুবিধা নাই।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব