বুধবার 19 রজব 1442 - 3 মার্চ 2021
বাংলা

দামী দামী জিনিস কেনা কি অপচয় হিসেবে গণ্য?

প্রশ্ন

নিজের বোন কিংবা মা যে দামী দামী জিনিস দাবী করেন সেগুলো খরিদ করা কি অপচয় হিসেবে গণ্য হবে? এমন কি সেসব জিনিস যদি ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং সেগুলো কিনতে ব্যক্তিকে কোন বেগ পেতে না হয় তবুও?

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: "হে বনী আদম! তোমরা প্রত্যেক মসজিদে (সিজদাস্থলে) সাজসজ্জা গ্রহণ কর আর পানাহার করো; তবে অপচয় করো না নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না"[সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১]

শাইখ সা’দী (রহঃ) বলেন:

“অপচয় হতে পারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণের মাধ্যমে এবং খাবারদাবারের মাত্রাতিরিক্ত লোভ থাকা যা শরীরের ক্ষতি করে কিংবা খাবার, পানীয় ও পোশাকাদির বাহাদুরি ও জৌলুশ বৃদ্ধির মাধ্যমে; কিংবা হালালকে ডিঙ্গিয়ে হারামে পর্যবসিত হওয়ার মাধ্যমে।”[তাফসিরে সা’দীতে থেকে সমাপ্ত (পৃষ্ঠা-২৮৭)]

আল্লাহ্‌তাআলা আরও বলেন:

নিকটাত্মীয়কে তার অধিকার প্রদান কর এবং মিসকীন পথিককেও তবে, অপচয় করো না নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানদের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ[সূরা বনী ইসরাইল (২৬-২৭)]

ইবনে কাছির (রহঃ) বলেন: “যখন তিনি (আল্লাহ্‌) খরচ করার নির্দেশ দিলেন তখন এর সাথে অপচয় থেকেও নিষেধ করলেন। বরং ব্যয় হবে মধ্যমপন্থায়। যেমনটি তিনি অন্য এক আয়াতে বলেছেন: আর যারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কৃচ্ছতা অবলম্বন করে না; বরং তাদের ব্যয় হয় উভয়টির মাঝামাঝি[সূরা ফুরক্বান, আয়াত: ৬৭] এরপর তিনি অপব্যয় ও অপচয় থেকে নিরুৎসাহিত করতে গিয়ে বলেন: নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানদের ভাই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তারা শয়তানদের মত।

ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন: تبذير (অপব্যয়) হল: অসঠিক খাতে ব্যয় করা। অনুরূপ কথা ইবনে আব্বাস (রাঃ)ও বলেছেন।

মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: কোন মানুষ যদি যথাযথ খাতে তার সকল সম্পতি ব্যয় করে তবুও সে অপচয়কারী হবে না। কিন্তু কেউ যদি শুধু এক মুদ্দ অসঠিক খাতে ব্যয় করে সেটাই অপচয় হবে।

কাতাদা (রহঃ) বলেন: অপচয় হচ্ছে আল্লাহ্‌র অবাধ্যতার খাতে, অসঠিক খাতে ও দুর্নীতির খাতে ব্যয় করা।[তাফসিরে ইবনে কাছির (৫/৬৯) থেকে সমাপ্ত]

শাইখ সা’দী (রহঃ) বলেন: আল্লাহ্‌তাআলা বলেন: নিকটাত্মীয়কে দানসদকা ও সম্মান পাওয়ার প্রাপ্য অধিকার দাও, সেটা আবশ্যকীয় হোক কিংবা মুস্তাহাব হোক। এ অধিকার পরিস্থিতির ভিন্নতা, আত্মীয়ের ভিন্নতা, প্রয়োজন থাকা বা না-থাকা এবং সময়ের ভিন্নতার ভিত্তিতে তারতম্য হয়ে থাকে।

মিসকীনকে তার প্রাপ্য যাকাতের অধিকার কিংবা অন্য সম্পদের অধিকার প্রদান কর; যাতে করে তার দারিদ্র দূর হয়।

আর পথিক হচ্ছে— এমন ব্যক্তি যে ভিনদেশী, নিজের দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। উল্লেখিত সকল ব্যক্তিকে দানকারী এ পরিমাণ দিবেন যাতে করে দানকারীর ক্ষতি না হয় এবং উপযুক্ত পরিমাণের চেয়েও বেশি না হয়। যেহেতু এটাই تبذير (অপচয়); যা থেকে আল্লাহ্‌নিষেধ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। কেননা শয়তান মানুষকে সকল মন্দ অভ্যাসের দিকে আহ্বান করে। মানুষকে কৃপনতা ও খরচ না করার দিকে আহ্বান করে। যদি মানুষ তার অবাধ্য হয় তখন তাকে অপচয় ও অপব্যয়ের দিকে আহ্বান করে। আল্লাহ্‌তাআলা মানুষকে ন্যায়পূর্ণ বিষয় ও ভারসাম্যপূর্ণ বিষয়ের নির্দেশ দেন এবং এর জন্য প্রশংসা করেন। যেমনটি তিনি রহমানের পূন্যবান বান্দাদের সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন: আর যারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কৃচ্ছতা অবলম্বন করে না; বরং তাদের ব্যয় হয় উভয়টির মাঝামাঝি[সূরা ফুরক্বান, আয়াত: ৬৭][তাফসিরে সা’দী (৪৫৬)]

এর মাধ্যমে পরিস্কার হয়ে গেল যে, আল্লাহ্‌তাআলা তার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের জন্য বৈধ করেছেন যে, তিনি তাদের জন্য যে পবিত্র জিনিস নাযিল করেছেন; খাবার-দাবার বা পোশাকাদি তারা এগুলো উপভোগ করবে। এবং তিনি তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ক রক্ষা করবে, মিসকীনদেরকে খাওয়াবে এবং তিনি তাদেরকে অপচয় ও অপব্যয়মূলক খরচ থেকে বারণ করেছেন।

তাই হারাম খাতে ব্যয় করা অপচয় ও অপব্যয়। আর বৈধ খাতের ব্যয় ব্যয়কারীর আর্থিক অবস্থা, ব্যয়ের খাত ও অপরাপর পারিপার্শ্বিক সময়, স্থান ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে অপচয়ের বিষয়টি তারতম্য হয়ে থাকে।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:

আমরা শুনি যে, অপচয় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তারতম্য হয়ে থাকে; ব্যক্তির সম্পদের ভিত্তিতে; চাই সে ব্যক্তি ব্যবসায়ী হোক কিংবা বিত্তশালী হোক?

জবাবে তিনি বলেন:

এ কথা সঠিক যে, অপচয় আপেক্ষিক। এটি কর্মের সাথে নয়; বরং কর্তার সাথে সম্পৃক্ত। উদাহরণতঃ কোন দরিদ্র নারী যদি এমন কোন অলংকার গ্রহণ করে যা ধনী নারীর অলংকারের সমতুল্য; তাহলে এ নারী কি অপচয়কারী গণ্য হবেন? যদি এই অলংকারটি কোন ধনী নারী গ্রহণ করে আমরা বলব: এতে কোন অপচয় নেই। যদি দরিদ্র নারী গ্রহণ করে আমরা বলব: এতে অপচয় রয়েছে। বরঞ্চ খাবার ও পানীয় অপচয়ের ক্ষেত্রেও মানুষের ভেদাভেদ রয়েছে। যেমন কোন ব্যক্তি দরিদ্র; অর্থাৎ তার খাবারের দস্তরখানে অল্প কিছুই যথেষ্ট। কিন্তু, অন্যের দস্তরখানে এইটুকু যথেষ্ট নয়। আবার এদিক থেকেও ব্যবধান হতে পারে যে, কোন ব্যক্তির কোনদিন মেহমান আসবে বিধায় সে ব্যক্তি মেহমানের সম্মানে এমন কিছু আয়োজন করলেন যা সাধারণতঃ তার বাসায় খাওয়া হয় না। এটা অপচয় হবে না। সারকথা হল: অপচয় কর্তার সাথে সম্পৃক্ত; কর্মের সাথে নয়। যেহেতু এতে মানুষের ভেদাভেদ রয়েছে।”[লিকাউল বাব আল-মাফতুহ (৮৮/৩৪) থেকে সমাপ্ত]

অপচয় হল— সীমালঙ্ঘন করা। আল্লাহ্‌রব্বুল আলামীন তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। আমরা যদি বলি, অপচয় হচ্ছে— সীমালঙ্ঘন; তাহলে অপচয়ে ভেদাভেদ থাকবে। কোন জিনিস এক ব্যক্তির জন্য অপচয়; অন্য ব্যক্তির জন্য অপচয় নয়। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি দুই মিলিয়ন দিয়ে বাড়ী কিনল, ছয় লক্ষ রিয়ালের ফার্নিচার দিয়ে বাসা সাজাল, গাড়ী কিনল; যদি এ ব্যক্তি ধনী হয় তাহলে সে অপচয়কারী নয়। কেননা বড় মাপের ধনীদের জন্য এটি সহজ। পক্ষান্তরে, এ ব্যক্তি যদি ধনী না হয়ে গরীব হয় কিংবা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হয়; তাহলে এ ব্যক্তি অপচয়কারী হবে। কারণ কিছু কিছু মানুষ বিলাসিতা করে। আপনি দেখবেন যে, সে বিরাট এক প্রাসাদ কিনে ফেলেছে, জৌলুশপূর্ণ ফার্নিচার দিয়ে প্রাসাদকে সাজিয়েছে। হতে পারে মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এসব করেছে। এটি ভুল।

মানুষ তিন প্রকার: এক. ধনী ও বিত্তশালী। আমরা আমাদের বর্তমান যামানা সম্পর্কে বলব (সকল যামানা সম্পর্কে নয়): যদি সে দুই মিলিয়ন রিয়াল দিয়ে একটি বাড়ী খরিদ করে, ৬ লক্ষ রিয়াল দিয়ে ফার্নিচার কিনে বাসা সাজায়, গাড়ী কিনে— এমন ব্যক্তি অপচয়কারী নয়।

দুই. মধ্যবিত্ত। তার ক্ষেত্রে এটি অপচয় হিসেবে গণ্য হবে।

তিন. দরিদ্র। তার ক্ষেত্রে এটি নির্বুদ্ধিতা হিসেবে গণ্য হবে। কেননা সে ব্যক্তি বিলাস সামগ্রী ক্রয় করতে গিয়ে ঋণ করেছে; যা তার প্রয়োজনে ছিল না।”[লিকাউল বাব আল-মাফতুহ (২৩/১০৭)]

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে: নিজের মা ও বোন যা দাবী করেন সেগুলো যদি বৈধ জিনিস হয়, সেগুলো ক্রয় করা আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকে ও আপনার জন্য কষ্টকর না হয় এবং এতে করে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন খরচাদি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; তাহলে এমন জিনিস ক্রয় করা আপনার জন্য জায়েয। এ ধরণের ক্রয় অপচয়ের মধ্যে পড়বে কিনা; সেটার মানদণ্ড উপরে আলোচিত হয়েছে। যদি আপনাদের সম পর্যায়ের মানুষ এ ধরণের জিনিসপত্র কিনে থাকে তাহলে এটা আপনাদের জন্য অপচয় হবে না।

আর এ ধরণের জিনিস ক্রয় করার দিকটা আপনার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে: যদি আপনি সেগুলো ক্রয় করার সামর্থ্য রাখেন, এগুলো ক্রয় করার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা হয় এবং তাদের মন রক্ষা হয় কিংবা এগুলো না কিনলে আত্মীয়তার সম্পর্কে ছেদ ঘটে কিংবা সম্পর্ক নষ্ট হয়।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

আরও জানতে দেখুন: 101903 নং প্রশ্নোত্তর।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব