সোমবার 11 রবীউল আউওয়াল 1440 - 19 নভেম্বর 2018
বাংলা

কেউ যদি নফল রোজা শুরু করে ভেঙ্গে ফেলে তাকে কি সে রোজাটি কাযা করতে হবে

প্রশ্ন

প্রশ্ন: জনৈক ব্যক্তি শাওয়াল মাসের ছয় রোজা রাখতে চান। একদিন তিনি রোজা রাখার নিয়ত করলেন; কিন্তু কোন ওজর ছাড়াই রোজাটি ভেঙ্গে ফেলেন; রোজাটি পূর্ণ করেনি। যে দিনের রোজাটি তিনি ভেঙ্গেছেন সে দিনের রোজাটি কি ছয় রোজা রাখা শেষে কাযা করতে হবে? এতে করে তার সর্বমোট সাতদিন রোজা রাখা হবে? নাকি শাওয়াল মাসের শুধু ছয়দিন রোজা রাখলেই চলবে?

উত্তর

আলহামদুলিল্লাহ।

নফল রোজা শুরু করলে সেটা পরিপূর্ণ করা কি ফরজ নাকি ফরজ নয়; এ ব্যাপারে আলেমগণের দুইটি অভিমত রয়েছে:

প্রথম অভিমত:

নফল রোজা সমাপ্ত করা অনিবার্য। এটি শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবের অভিমত। তাঁদের দলিল হচ্ছে-

১. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে এসে বললেন: কোন খাবার আছে? আমি বললাম: না। তিনি বললেন: তাহলে আমি রোজাদার। পরবর্তীতে অন্য একদিন তিনি আমার ঘরে আসলেন; তখন আমি বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদেরকে ‘হাইস’ (খেজুর ও পনিরের মিশ্রণে তৈরী খাবার) হাদিয়া দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন: আমাকে দেখাও তো; আমি তো রোজা রেখে ভোর করেছি। অতঃপর তিনি খেয়েছেন।[সহিহ মুসলিম (১১৫৪)]

২. আবু জুহাইফা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “... আবু দারদা এলেন এবং তাঁর জন্য অর্থাৎ সালমানের জন্য খাবার প্রস্তুত করলেন। এরপর বললেন: আমি রোজা রেখেছি; আপনি খান। সালমান বললেন: আপনি না খেলে আমি খাব না। বর্ণনাকারী বলেন: অবশেষে তিনি খেলেন। এরপর সালমান বললেন: আপনার উপর আপনার প্রভুর অধিকার রয়েছে; আপনার আত্মার অধিকার রয়েছে। আপনার পরিবারের অধিকার রয়েছে। প্রত্যেক প্রাপককে তার অধিকার প্রদান করুন। এরপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে ঘটনাটি তাঁকে বললেন; তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: সালমান সঠিক বলেছে।”[সহিহ বুখারি (১৯৬৮)]

৩. আবু সাঈদ আল-খুদরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য খাবার তৈরী করলাম। খাবার যখন সামনে পেশ করা হলো তখন উপস্থিত একজন বলল: আমি রোজা রেখেছি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমার ভাই তোমাকে নিমন্ত্রণ করেছে, কষ্ট করে খাবার তৈরী করেছে, তাই তুমি রোজাটি ভেঙ্গে ফেল এবং চাইলে এর বদলে অন্য একটি রোজা রেখে নিও।”[দারাকুতনি (২৪); ফাতহুল বারী গ্রন্থে (৪/২১০) ইবনে হাজার হাদিসটিকে হাসান বলেছেন]

দ্বিতীয় অভিমত:

নফল রোজা সমাপ্ত করা তার উপর অনিবার্য। যদি সে নফল রোজা নষ্ট করে; তাহলে তাকে সে রোজা কাযা করতে হবে। এটি ইমাম আবু হানিফার অভিমত। কাযা করা ওয়াজিব হওয়ার পক্ষে তারা নিম্নোক্ত দলিল পেশ করেন:

১. আয়েশা (রাঃ) বলেন: আমাকে ও হাফসাকে কিছু খাবার হাদিয়া পাঠানো হল; সেদিন আমরা দুইজন রোজা রেখেছিলাম। তবে হাদিয়া পেয়ে আমরা রোজা ভেঙ্গে ফেললাম। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে আসলে আমরা বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের কাছে কিছু হাদিয়া পাঠানো হয়েছিল; সেটা খাওয়ার জন্য আমাদের তীব্র আগ্রহ হল বিধায় আমরা রোজা ভেঙ্গে ফেললাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: উচিত হয়নি; তোমাদেরকে এ দিনের বদলে অন্য একদিন রোজা রাখতে হবে।[সুনানে আবু দাউদ (২৪৫৭), সুনানে তিরমিযি (৭৩৫), হাদিসটির সনদে যামিল নামে এক রাবী আছে। ‘তাকরিব’ গ্রন্থে বলা হয়েছে- তিনি অজ্ঞাত পরিচয়। আল-মাজমু গ্রন্থে (৩৯৬) ইমাম নববি, যাদুল মাআদ গ্রন্থে ইবনুল কাইয়্যেম তাকে দুর্বল বলেছেন এবং আলবানি হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন।

২. ইমাম মুসলিম কর্তৃক সংকলিত পূর্বোক্ত আয়েশা (রাঃ) এর হাদিসের বর্ণনায় কেউ কেউ বাড়তি বর্ণনা করেন যে, “আমি তো রোজাদার হিসেবে ভোর করেছি; এরপর তিনি খেয়েছেন এবং বলেছেন: আমি এদিনের পরিবর্তে অন্যদিন রোজা রাখব”।

এর জবাবে বলা হয় যে, ইমাম নাসাঈ এ বাড়তি অংশকে দুর্বল বলেছেন। তিনি আরও বলেন: এটি ভুল। অনুরূপভাবে দারাকুতনি ও বাইহাকী এ বাড়তি অংশকে দুর্বল বলেছেন।

দলিল-প্রমাণের বলিষ্ঠতার কারণে প্রথম অভিমতটি অগ্রগণ্য। উম্মে হানির বর্ণিত রেওয়ায়েতও প্রথম অভিমতটির সমর্থন যোগায়। সে রেওয়ায়েতে এসেছে- “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি রোজা রেখেছিলাম; কিন্তু রোজাটি ভেঙ্গে ফেলেছি। তিনি তাকে বললেন: তুমি কি কাযা রোজা রাখছিলে? উম্মে হানি বললেন: না। তিনি বললেন: যদি নফল রোজা হয় তাহলে কোন অসুবিধা নেই।[সুনানে আবু দাউদ (২৪৫৬), আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন: যদি কোন লোক রোজা রাখে, এরপর এমন কিছু হয় যাতে করে তার রোজা ভাঙ্গাটা পরিস্থিতির দাবী হয় তাহলে সে রোজা ভেঙ্গে ফেলবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমল থেকে এটি জানা যায়। একবার তিনি মুমিনদের মা আয়েশা (রাঃ) এর কাছে এসে বললেন: তোমাদের কাছে কোন খাবার আছে? আয়েশা (রাঃ) বললেন: আমাদেরকে হাইস (একজাতীয় খাবার) হাদিয়া দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন: “আমাকে দেখাও তো; আমি তো রোজা রেখে ভোর করেছি”। এরপর তিনি খেয়েছেন। এটি নফল রোজার ক্ষেত্রে; ফরজ রোজার ক্ষেত্রে নয়।[ফতোয়াসমগ্র, পৃষ্ঠা-২০]

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, যে দিনের রোজা আপনি ভেঙ্গেছেন সেদিনের রোজা আপনাকে কাযা করতে হবে না। কারণ নফল রোজা পালনকারী নিজের কর্তৃত্বশীল। তাকে শাওয়ালের ছয় রোজা পরিপূর্ণ করতে হবে।

আল্লাহই ভাল জানেন।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

মতামত প্রেরণ