সোমবার 11 যুলহজ্জ 1445 - 17 জুন 2024
বাংলা

যে ব্যক্তি পরীক্ষাতে নকল করেছে এবং আল্লাহ্‌ তার দোষ গোপন রেখেছেন; তার উপর কি নিজের দোষ প্রকাশ করা অনিবার্য?

প্রশ্ন

যে ব্যক্তি পরীক্ষাতে নকল করেছে এবং আল্লাহ্‌ তার দোষ গোপন রেখেছেন; তার উপর কি নিজের দোষ প্রকাশ করা অনিবার্য? প্রশ্ন হলো: কয়েক দিন আগে আমাদের একজন শিক্ষিকা এসেছেন। তিনি ক্লাস শেষ করার পর এবং আমরা তার কাছে পরীক্ষার উত্তরপত্র জমা দেয়ার পর; যারা পরীক্ষাতে নকল করেছে কিংবা কোন ছাত্রীকে নকল করতে সহযোগিতা করেছে তাদের জন্য বদদোয়া করা শুরু করলেন এভাবে: আল্লাহ্‌ যেন সে সব ছাত্রীর মুখোশ উন্মোচন করে দেন, তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পথ রুদ্ধ করে দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেও আল্লাহ্‌ যেন তাদের সময়ে বরকত দান না করেন। এভাবে তিনি ভবিষ্যতের সাথে সম্পৃক্ত যা কিছু আছে সেগুলো নিয়ে বদদোয়া করতে থাকলেন। তিনি আরও বললেন: কিয়ামতের দিন তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করবেন না। ফাযিলাতুশ শাইখ! ‘আমি নকল না-করা’ এটা কি আমার উপর এই শিক্ষিকার প্রাপ্য অধিকার? উল্লেখ্য, আমি শেষ বর্ষে পড়ছি। ইতিপূর্বে আমি স্বেচ্ছায় বিশেষতঃ এই সাবজেক্টে নকল করিনি। শুধু একবার এক ছাত্রীর কাছ থেকে উত্তরটি শুনেছিলাম। যে ছাত্রীর সাথে আমার ক্লাসে সহপাঠিনীর সম্পর্ক ছাড়া আর কোন সম্পর্ক নেই। তার কাছ থেকে আমি জবাবটি শুনে লিখেছিলাম। আমি জানি যে, নকল করা হারাম। এখন আমার উপর কি স্বীকার করা আবশ্যক? যদি আল্লাহ্‌ আমাকে আচ্ছাদিত রাখেন; আমি কি নিজে নিজের মুখোশ উন্মোচন করব? উল্লেখ্য, আমি আসলেই ভীতসন্ত্রস্ত। আমার চূড়ান্ত আশা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া।

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

পরীক্ষাতে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নকল করা হারাম। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি জালিয়াতি করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়[সহিহ মুসলিম (১০১)]

যে ব্যক্তি এমন কিছু করে ফেলেছে তার উপর আবশ্যক আল্লাহ্‌র কাছে তাওবা করা। নিজেকে উন্মোচন করা তার উপর আবশ্যকীয় নয়। বরঞ্চ আল্লাহ্‌র আচ্ছাদনে নিজেকে আচ্ছাদিত রাখাই বাঞ্চনীয়। সে নিজের গুনাহর জন্য অনুতপ্ত হবে এবং এমন গুনাহ পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করবে। ইমাম মুসলিম সহিহ গ্রন্থে (২৫৯০) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ্‌ যে ব্যক্তির গুনাহ দুনিয়াতে ঢেকে রেখেছেন; তিনি তার গুনাহ কিয়ামতের দিনও ঢেকে রাখবেন।

এটি তাওবাকারীর জন্য সুসুংবাদ যে, যার দোষ আল্লাহ্‌ দুনিয়াতে ঢেকে রেখেছেন আখিরাতেও তিনি তার দোষ ঢেকে রাখবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মর্মটিকে আরও তাগিদ করতে গিয়ে বলেন যা ইমাম আহমাদ মুসনাদ গ্রন্থে (২৩৯৬৮) আয়িশা (রাঃ) থেকে সংকলন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তিনটি বিষয়ে আমি হলফ করতে পারি। ইসালামে যার একটি হলেও শেয়ার রয়েছে আল্লাহ্‌ তাকে ঐ ব্যক্তির মত বিবেচনা করবেন না ইসলামে যার কোন শেয়ার নাই। ইসলামের শেয়ার তিনটি: নামায, রোযা ও যাকাত। আল্লাহ্‌ তাআলা দুনিয়াতে যে বান্দার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন; এমনটি হবে না যে, কিয়ামতের দিন তিনি তাকে অন্য কারো অভিভাবকত্বে ছেড়ে দিবেন। যদি কোন ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়কে ভালোবাসে আল্লাহ্‌ তাকে তাদের সাথেই রাখবেন। আর চতুর্থটির উপর আমি যদি হলফ করি আশা করি আমি গুনাহগার হব না। সেটি হলো: যদি আল্লাহ্‌ দুনিয়াতে কোন বান্দার দোষ ঢেকে রাখেন তাহলে কিয়ামতের দিনও তিনি তার দোষ ঢেকে রাখবেন।[আলবানী ‘আস-সিলসিলাতুস সাহিহা’ গ্রন্থে (১৩৮৭) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

বরঞ্চ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আত্মত্রুটি ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন: তোমরা এসব নোংরা কাজ থেকে বেঁচে থাক; যেগুলো থেকে আল্লাহ্‌ নিষেধ করেছেন। কেউ যদি কোনটি করে ফেলে তাহলে সে যেন আল্লাহ্‌র আচ্ছাদন দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখে।[সুনানে বাইহাক্বী, আলবানী ‘আস-সিলসিলাতুস সাহিহা’ গ্রন্থে (৬৬৩) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

পূর্বোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে:

যে ব্যক্তি পরীক্ষাতে নকল করেছে তার উচিত এর থেকে তাওবা করা, পুনরায় এটি না করা এবং নিজের দোষ ঢেকে রাখা।

আর আপনি যদি আপনার সহপাঠিনীকে জিজ্ঞেস না করে থাকেন; বরঞ্চ তার কাছে জিজ্ঞেস করা ছাড়া এমনিতে শুনে থাকেন তাহলে এটি নকল (জালিয়াতি) হিসেবে গণ্য হবে না। ইনশাআল্লাহ্‌, আপনি আপনার সহপাঠিনীকে জিজ্ঞেস করা বা ইশারা-ইঙ্গিতে চাওয়া ব্যতীত তার কাছ থেকে শুনে যা লিখেছেন এর জন্য আপনার কোন গুনাহ হবে না।

নকলকারীর জন্য শিক্ষিকার বদদোয়া করা; যেভাবে প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে; আমাদের কাছে মনে হচ্ছে: এতে সীমালঙ্ঘন ঘটেছে। যেহেতু নকল করা (জালিয়াতি করা) এটি শিক্ষিকার অধিকার নয় এবং ব্যক্তি শিক্ষিকার সাথে এটি সম্পৃক্ত নয়। বরঞ্চ এটি আল্লাহ্‌র অধিকার। এ কারণে শিক্ষিকা ক্ষমা করা বা না-করার সাথে এটি সম্পৃক্ত নয়। যদি শিক্ষিকা কেবল নকল কারিনীর পরিচয় তার সামনে উন্মোচন করার দোয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতেন তাহলে হয়তো এর কোন যুক্তিকতা থাকত। কিন্তু তিনি বদদোয়া করতে গিয়ে উচিতের চেয়ে বেশি সীমালঙ্ঘন করেছেন। সম্ভবতঃ তিনি ছাত্রীদেরকে ভয় দেখাতে চেয়েছেন এবং নকল থেকে নিবৃত করতে চেয়েছেন।

আল্লাহ্‌ আমাদেরকে, সেই শিক্ষিকাকে ও সকল মুসলিমকে ক্ষমা করে দিন।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব