এক:
মসজিদে হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া বা তার পরিচয় তুলে ধরা বৈধ নয়। কারণ মসজিদ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি। বরং মসজিদ নির্মিত হয়েছে আল্লাহর যিকির প্রতিষ্ঠার জন্য। সহিহ মুসলিমে (৫৬৮) আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মসজিদে কাউকে হারানো জিনিসের ঘোষণা দিতে শুনবে, সে যেন বলে: ‘আল্লাহ তোমাকে তা ফিরিয়ে না দেন।’ কেননা মসজিদ এ জন্য নির্মিত হয়নি।”
সহিহ মুসলিমে (৫৬৯) বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি মসজিদে ঘোষণা দিল: ‘লাল উটটির সন্ধান কে দিতে পারবে?’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তুমি যেন সেটা আর খুঁজে না পাও! নিশ্চয় মসজিদ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি।”
‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: ‘তুমি যেন তা আর খুঁজে না পাও’ এটি তার অবাধ্যতা ও ভুলের শাস্তিস্বরূপ। যে ব্যক্তি এমন ঘোষণা শুনবে, তার উচিত এটা বলা: ‘তুমি যেন না আর খুঁজে না পাও; নিশ্চয় মসজিদ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি।’ অথবা বলা: ‘তুমি যেন তা আর খুঁজে না পাও; মসজিদ তো যে উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে, কেবল সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই নির্মিত হয়েছে।’ যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।”[সমাপ্ত]
ইবনে আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“আল্লাহ তা‘আলা মসজিদসমূহ সম্পর্কে বলেছেন: এগুলো এমন ঘর, যেগুলোকে উঁচু করার ও তাতে তাঁর নাম স্মরণ করার এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ উদ্দেশ্যেই মসজিদগুলো নির্মিত হয়েছে। সুতরাং যে উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি, তা থেকে মসজিদকে পবিত্র রাখা উচিত।”[আল-ইস্তিযকার (২/৩৬৮)]
বাইহাকী ‘আস-সুনান’ (২০৭৬৩) গ্রন্থে বর্ণনা করেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদের পাশে একটি খোলা জায়গা তৈরি করেন, যার নাম দেন ‘আল-বুতাইহা’। তিনি বলতেন: “যে ব্যক্তি উচ্চস্বরে কথা বলতে চায়, কবিতা আবৃত্তি করতে চায় বা কোলাহল করতে চায়, সে যেন এই খোলা জায়গায় বেরিয়ে যায়।” দেখুন: আল-ইস্তিযকার (২/৩৬৮)।
যে ব্যক্তি হারানো জিনিসের ঘোষণা দিতে চায়, সে যেন মসজিদের বাইরে যায়। এমনকি সে যদি একটি কাগজে লিখে মসজিদের বাইরের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।
আর যদি কারো জিনিস মসজিদের ভেতরে হারিয়ে যায় এবং সে ইমাম, মুয়াজ্জিন বা কর্মচারীকে গোপনে জানায়, যাতে যিনি জিনিসটি পেয়েছেন তিনি মালিকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই, যদি বিষয়টি তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
‘হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া বা ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য মসজিদ নির্মিত হয়নি। বরং তা নির্মিত হয়েছে আল্লাহর ইবাদত, নামায, যিকির, ইলমের মজলিস ইত্যাদির জন্য।
যদি মসজিদের বাইরের দেয়ালে বা বাইরের দরজায় কাগজ লিখে ঝুলানো হয়, তবে তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু ভেতরে ঝুলানো উচিত নয়। কারণ তা কথা বলার মতো হয়ে যায় এবং মানুষকে কাগজ পড়ায় ব্যস্ত করে দিতে পারে।
অতএব, আমাদের কাছে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, মসজিদের ভেতরে কাগজ ঝুলানো জায়েয নয়। কারণ এর অর্থই হলো হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া। তবে যদি মসজিদের পেছনের বাইরের দেয়ালে বা মসজিদের বাইরে দরজায় লেখা হয়, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই।”[সংক্ষেপিত][ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব (২/৭০৯)]
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘যেহেতু আল্লাহ মসজিদকে নিজের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদকে তাঁর রবের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন, আর আল্লাহ এগুলোকে মর্যাদা দিয়েছেন, তাই এগুলোর সম্মান, বিধান ও মর্যাদা রয়েছে।
মসজিদের বিধানের অন্তর্ভুক্ত হলো: এতে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয নয়, তা কম হোক বা বেশি হোক। তেমনি হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া যাবে না। কেউ যদি এসে বলে: আমার অমুক জিনিস হারিয়ে গেছে, যেমন: টাকা-পয়সার থলে, এটি হারাম; জায়েয নয়। এমনকি যদি প্রবল ধারণা হয় যে তা মসজিদেই চুরি হয়েছে, তবুও নয়। তুমি বলবে না: আমি কীভাবে তা উদ্ধার করব? বরং মসজিদের দরজার বাইরে বসে বলুন: আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন, আমার অমুক জিনিস হারিয়ে গেছে। ভাইয়েরা, মূল কথা হলো মসজিদকে সম্মান করা আবশ্যক।”[সংক্ষেপিত][শরহু রিয়াদিস সালেহীন (পৃষ্ঠা ২০১৪)]
স্থায়ী কমিটির আলেমগণ বলেন:
“মসজিদের দরজার বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে বিজ্ঞপ্তি টাঙানো যেতে পারে, যাতে লোকেরা তা জানতে পারে।”[সমাপ্ত][ফাতাওয়াল-লাজনা আদ-দায়িমা (৫/২৭৫)]
দুই:
মসজিদে হারানো জিনিস খোঁজার ব্যাপারে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে সেটা সব ঘোষণা বা উচ্চবাচ্যের ব্যাপারে সাধারণ। তবে যদি তা আনুগত্য ও সৎকাজের আহ্বান সংক্রান্ত হয়, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই।
স্থায়ী কমিটির আলেমগণ বলেন:
“মসজিদসমূহকে অথবা এর কোনো অংশকে কিংবা মসজিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাইরের আঙিনাকে নোটিশ, প্রচারপত্র, বিজ্ঞাপন বোর্ড ও বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা জায়েয নয়; চাই তা স্কুলের হোক, কারখানার হোক, প্রতিষ্ঠানের হোক কিংবা অন্য কিছুরই হোক। কারণ মসজিদ মূলত নির্মিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্য। যেমন নামাজ, যিকির, দ্বীনি জ্ঞান শেখা ও শেখানো, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এ জাতীয় দ্বীনি কাজের জন্য।
অতএব, মসজিদকে এসব বিষয় থেকে পবিত্র রাখা আবশ্যক, এর মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি এবং মানুষকে এমন বিষয়ে ব্যস্ত না করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে যা তাদেরকে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিচ্যুত করে এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে।” [ফাতাওয়াল-লাজনা আদ-দায়িমা (৫/২৭৬–২৭৭) থেকে সংক্ষেপিত]
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: একটি মসজিদে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, প্রতি বৃহস্পতিবার যারা রোযা রাখতে চান তাদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা আছে। এর হুকুম কী?
তিনি উত্তরে বলেন: “এই ঘোষণা দিতে কোনো সমস্যা নেই; কারণ এটি কল্যাণের দিকে আহ্বান। এর উদ্দেশ্য ক্রয়-বিক্রয় নয়। হারাম হলো বেচাকেনা করা, ভাড়া দেওয়া বা ভাড়া নেওয়ার ঘোষণা দেওয়াসহ আরো যেসব কাজের জন্য মসজিদ নির্মিত হয়নি সেগুলো করা। কল্যাণের দিকে আহ্বান করা, মানুষকে খাবার খাওয়ানো ও সদকা সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নেই।”[সমাপ্ত]
তাঁকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: ‘মসজিদে কিছু বিজ্ঞপ্তি টাঙানোর বিধান কী? যেমন: হজ বা উমরার কাফেলার বিজ্ঞপ্তি বা কোনো বয়ান বা দারসের বিজ্ঞপ্তি।’
তিনি উত্তরে বলেন: “যা আনুগত্য সংক্রান্ত ঘোষণা, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ আনুগত্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। আর মসজিদগুলো আল্লাহর আনুগত্যের জন্যই নির্মিত।
আর যা দুনিয়াবি বিষয়সংক্রান্ত, তা জায়েয নয়। বরং তা মসজিদের বাইরের দেয়ালে ঘোষণা করা যাবে। যেমন: হজ্জের কাফেলা একটি দুনিয়াবি বিষয়; তাই আমরা এটাকে মসজিদের ভেতরে ঘোষণা দেওয়ার পক্ষপাতী নই।
আর যিকিরের মজলিস তথা ইলমি কোর্স এগুলো নিখাদ নেকীর কাজ, তাই এগুলোর ঘোষণা মসজিদের ভেতরে দেওয়া যেতে পারে। কারণ এগুলো নেকীর কাজ।”[শরহু মানযূমাতিল কাওয়ায়িদ আল-ফিকহিয়্যা (পৃ. ৫২) থেকে সংক্ষেপিত]
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।