উক্ত মাসআলাটা আলেমদের মাঝে মতভেদপূর্ণ প্রসিদ্ধ একটি মাসআলা। অধিকাংশ আলেম মনে করেন কোনো কাপড় বা জুতায় নাপাকি পাওয়া গেলে পানি দিয়ে দূর করা ছাড়া সেটাকে পবিত্র করা যায় না। হানাফীরা মনে করেন, যে কোনো কিছু দিয়ে নাপাকি দূর করলে সেটাই যথেষ্ট হবে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাসহ বর্তমান সময়ের বেশ কিছু মুহাক্কিক আলেম তাদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। আর এটাই সঠিক মত।
ইব্রাহীম ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আউফের এক উম্মে ওয়ালাদ (মনিবের সন্তান জন্ম দিয়েছে এমন দাসী) বর্ণনা করেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী উম্মে সালামাহকে বলেন, আমি এমন এক নারী যে তার কাপড়ের ঝুল লম্বা করে দিই, আর অপবিত্র জায়গায় চলি। (এখন আমি কী করব?) তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “পরের পবিত্র জায়গার মাটি এটাকে পবিত্র করে দেয়।” [হাদীসটি তিরমিযী (১৪৩), আবু দাউদ (৩৮৩) ও ইবন মাজাহ (৫৩১) বর্ণনা করেছেন। শাইখ আলবানী তার সহীহুত তিরমিযী বইয়ে এটাকে সহীহ বলেছেন।]
আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন তার জুতাজোড়া দেখে নেয়। তাতে ময়লা বা নাপাক বস্তু দেখলে সে যেন জুতাকে মুছে নেয় এবং জুতাদ্বয় পরে নামায পড়ে।” [আবু দাউদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। শাইখ আলবানী তার সহীহু আবি দাউদে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]
উক্ত দুই হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে নাপাকি দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“পানি দিয়ে ধোয়ার নির্দেশ এসেছে আসমাকে লক্ষ্য করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে: “তা খুঁটবে, তারপর পানি দিয়ে রগড়াবে, তারপর তা ধুয়ে তাতে নামায আদায় পড়বে।” [হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন] অগ্নিপূজারীদের ব্যবহৃত পাত্রের ব্যাপারে তাঁর বাণী: “তোমরা সেগুলাকে পানি দিয়ে ধুয়ে নাও।” [হাদীসটি তিরমিযী, আবু দাউদ ও ইবন মাজাহ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন]। এ হাদিস আহলে কিতাবদের পাত্রের ব্যাপারে; অগ্নিপূজারীদের পাত্রের ব্যাপারে নয়। এবং যে বেদুঈন মসজিদে পেশাব করে দিয়েছিল তার ব্যাপারে তাঁর বাণী: “তার পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।” [হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত]।
অতএব, তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে পানি দিয়ে নাপাকি দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সকল নাপাকি পানি দিয়ে দূর করার ব্যাপক নির্দেশ দেননি।
নবীজী পানি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে নাপাকি দূর করার অনুমতি দিয়েছেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পাথর দিয়ে শৌচকার্য করা।
- জুতা জোড়ার ব্যাপারে বলেন: “তারপর যেন মাটি দিয়ে তা ঘষে, কেননা এই দুটির জন্য মাটি পবিত্রকারী।”
- কাপড়ের আঁচলের বিষয়ে বলেন: “পরের পবিত্র জায়গার মাটি এটাকে পবিত্র করে দেয়।”
- “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে কুকুর আসা-যাওয়া করত এবং পেশাব করে দিত। কিন্তু তারা সেগুলোর কিছু ধৌত করত না।” [হাদীসটি বুখারী বর্ণনা করেন।]
- বিড়ালের বিষয়ে বলেন: “এগুলো তোমাদের আশেপাশে বিচরণকারী ও বিচরণকারিণী।” [হাদীসটি তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবন মাজাহ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন]। অথচ বিড়াল সাধারণত ইঁদুর খায়। আর সেখানে এমন কোনো পানির উৎস ছিল না যে এরা সেখান থেকে পানি পান করে এবং এর মাধ্যমে তাদের মুখ পবিত্র হয়ে যায়। বরং এদের মুখনিঃসৃত লালাই এদের মুখকে পবিত্রকারী।
- মুসলিমদের সর্বসম্মতিক্রমে মদ যদি নিজে সিরকায় রূপান্তরিত হয়, তাহলে পবিত্র হয়ে যায়।
যেহেতু বিষয়গুলো এমন তাই আলোচিত মাসআলায় অগ্রগণ্য মত হলো নাপাকি যে কোনোভাবে দূর হলেই এর হুকুম দূর হয়ে যায়। হুকুম যদি কোনো কারণে সাব্যস্ত হয়, সে কারণটা দূর হয়ে গেলে হুকুমও দূর হয়ে যায়। কিন্তু, প্রয়োজন ছাড়া নাপাকি দূর করার কাজে খাদ্য ও পানীয় ব্যবহার করা জায়েয নেই। কারণ এতে সম্পদ নষ্ট হয়। অধিকন্তু, খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে শৌচকার্য করা জায়েয নেই।
যারা বলেন: ‘পানি ছাড়া নাপাকি দূর হয় না’ তাদের কেউ কেউ বলেন: এটি ইবাদত হিসেবে পালনীয় (অর্থাৎ যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে)। কিন্তু বিষয়টা এমন নয়। শরীয়ত প্রণেতা বিকল্প না থাকায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে পানি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা যে পানীয়গুলো দিয়ে মুসলিমরা উপকৃত হয়, সেগুলো দিয়ে নাপাকি দূর করার অর্থ সেগুলোকে নষ্ট করা। আর কঠিন বস্তু দিয়ে নাপাকি দূর করা সম্ভবপর নয়। যেমন: কাপড়, পাত্র কিংবা যমীনকে পানি দিয়ে ধৌত করা লাগে। যেহেতু এটা সুবিদিত যে, তাদের কাছে যদি গোলাপ জল, সিরকা বা অন্য কিছু থাকত, তাহলে তিনি সেগুলোকে (ধোয়ায় ব্যবহার করে) নষ্ট করার নির্দেশ দিতেন না। আর যখন তাদের কাছে এমন কিছু ছিলই না, তখন কীভাবে (নির্দেশ) দিতে পারেন?
কেউ কেউ বলেন: পানির এমন এক সূক্ষ্মতা বা কোমলতা রয়েছে যা অন্য কোনো তরল পদার্থের মধ্যে নেই, যার কারণে অন্য কিছু পানির সমকক্ষ হতে পারে না। কিন্তু বিষয়টা এমন নয়। বরং সিরকা, গোলাপ জল এবং এ জাতীয় অন্যান্য তরল পদার্থও পাত্রে থাকা নাপাকি দূর করতে পারে, ঠিক পানির মতোই কিংবা তার চেয়ে প্রকৃষ্টভাবে।।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/৪৭৪-৪৭৬)]।
উপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, কোনো নারীর পোশাকের নিচের অংশে (ঝুলে) যদি নাপাকি লাগে, তারপর সে যদি মাটি, পিচঢালা পথ (অ্যাসফল্ট), রাস্তা বা টাইলস বিছানো মেঝের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় এবং এতে করে নাপাকিটা এমনভাবে দূর হয়ে যায় যে, নাপাকির কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে এর মাধ্যমেই তার পোশাক পবিত্র হয়ে যাবে। ঐ নাপাকি দূর করার জন্য পানি ব্যবহার করা আবশ্যক হবে না।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।