আল্লাহর যিকির দুই প্রকার: মুক্ত যিকির ও বদ্ধ যিকির (স্থান, কাল বা সংখ্যাবদ্ধ)। আল্লাহর বাণীতে এই উভয় প্রকারের উল্লেখ এসেছে। তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْراً كَثِيراً * وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلاً
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করো। আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর তাসবীহ পাঠ করো।”[সূরা আহযাব: ৪১-৪২]
তিনি আরো বলেন:
وَاذْكُرْ رَبَّكَ كَثِيرًا وَسَبِّحْ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ
“বেশি বেশি আপনার রবের যিকির করুন এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাসবীহ পড়ুন।”[সূরা আলে-ইমরান: ৪১]
মুক্ত যিকির: এমন যিকির যা কোনো সময়, স্থান কিংবা অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট নয়। বরং যে যিকিরে মানুষ সর্বাবস্থায় তার রবকে স্মরণ করে; যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতেন। সহীহ মুসলিমে (৩৭৩) আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করতেন।
এ প্রকার যিকির বেশি পরিমাণে করার ব্যাপারে শরীয়ত উৎসাহ প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও নারী— আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও এক মহান পুরস্কার (জান্নাত) প্রস্তুত রেখেছেন।”[সূরা আহযাব: ৩৫]
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“তোমরা বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করবে; যাতে সফল হতে পারো।”[সূরা আনফাল: ৪৫]
মুসলিম (২৬৭৬) বর্ণনা করেন: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার পথে হাঁটছিলেন। তিনি জুমদান নামক একটি পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি বললেন: “তোমরা এগিয়ে চলো, এটি জুমদান। 'মুফার্রিদ' ব্যক্তিরা এগিয়ে গেছে।” সাহাবীরা বলল: ‘মুফাররিদ কারা?’ তিনি বলেন: “আল্লাহকে অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও নারীরা।”
বদ্ধ যিকির: এমন যিকির যা কোনো সময়, স্থান, অবস্থা, ভাষ্য বা সংখ্যার দ্বারা আবদ্ধ। এ ধরনের যিকিরের মূল অবস্থা হচ্ছে— দলিলে যেভাবে উদ্ধৃত হয়েছে ঠিক সেটা মানুষ মেনে চলবে।
এই প্রকার যিকিরের উদাহরণ হচ্ছে: নামাযের পরের যিকিরসমূহ, ঘুমের পূর্বের যিকিরসমূহ, সকাল-সন্ধ্যার যিকিরসমূহ প্রভৃতি বদ্ধ যিকিরসমূহ। এগুলোর ক্ষেত্রে মানুষ ভাষ্য ও সংখ্যা মেনে যিকির করবে।
হাফেয ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘এর থেকে উদ্ভাবন করা যায় যে, যিকির-আযকারের ক্ষেত্রে বর্ণিত সবিশেষ সংখ্যা মেনে চলা ধর্তব্য। নতুবা তাদেরকে বলা যেত: তোমরা এর সাথে তেত্রিশ বার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যুক্ত করে নাও। কিছু আলেম বলতেন: নামাযের পরের যিকিরের মত যে সব যিকিরের ব্যাপারে বিশেষ সংখ্যা উদ্ধৃত হয়েছে এবং সংখ্যার ভিত্তিতে বিশেষ নেকী পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, কেউ যদি উদ্ধৃত সংখ্যার চেয়ে বেশি পরিমাণে যিকির করে তাহলে সে বিশেষ নেকী পাবে না। কারণ হতে পারে ঐ সংখ্যার মাঝে এমন প্রজ্ঞা ও বিশেষত্ব রয়েছে যা ঐ সংখ্যা অতিক্রম করলে পাওয়া যাবে না। ...’[ইবনে হাজারের ‘ফাতহুল বারী’ (২/৩৩০)- শামেলা সংস্করণ]
ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ (২৪/২০৩)-তে এসেছে: ‘কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া ও যিকিরের সংখ্যা ও শব্দের ক্ষেত্রে মূল বিধান হচ্ছে সেগুলো তাওকিফি তথা আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক নির্ধারিত। সুতরাং মুসলিমের উচিত তা মেনে চলা ও রক্ষা করা। নির্দিষ্ট সেই সংখ্যা বা শব্দে বৃদ্ধি না করা, হ্রাস না করা এবং কোনো বিকৃতি না করা। আল্লাহই তৌফিকদাতা।”[সমাপ্ত]
বদ্ধ যিকিরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে সীমিত থাকতে হবে এর সপক্ষে আরও প্রমাণ হচ্ছে:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন কিছু বর্ণিত হয়নি যে তিনি নামায পরবর্তী যিকিরের মত কিছু যিকিরের শব্দে বৃদ্ধি করেছেন। বরং দরিদ্ররা মুহাজিররা যখন তাঁর কাছে অভিযোগ করলেন যে ধনীরাও নামাযের পরে যিকিরগুলো করছে, তখন তিনি তাদেরকে সংখ্যা (তেত্রিশের চেয়ে) বৃদ্ধি করার বিধান দেননি। বরং তিনি বলেছিলেন: “এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন।” এটি প্রমাণ করে যে যিকির নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমিত।
অন্যদিকে যে হাদীসে এসেছে: “যে ব্যক্তি প্রত্যেক সকাল-সন্ধ্যায় একশ বার পড়ে: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ তাহলে কিয়ামতের দিন তার চেয়ে উত্তম কিছু কেউ নিয়ে আসতে পারবে না। কেবল ঐ ব্যক্তি ছাড়া যে তার মতো কিছু বলবে বা তার চেয়ে বেশি কিছু বলবে।” এ ব্যাপারে বলা হবে: সে হাদিসটির ব্যাপারে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, সে হাদিসটিতে উদ্ধৃত যিকিরটাই বেশি পরিমাণে পড়া। সেক্ষেত্রে উক্ত হাদীসের মাধ্যমে শুধু সংশ্লিষ্ট যিকিরটির ক্ষেত্রে বৃদ্ধির বৈধতা সাব্যস্ত হবে। আবার এই সম্ভাবনাও রয়েছে যে, এই বৃদ্ধির ব্যাপারটি সব যিকিরের ক্ষেত্রে আম (সাধারণ)। তখন অর্থ হবে: বর্ণিত যিকির পড়ার পরে অন্য কোনো যিকির বৃদ্ধি করা।
ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “যে ব্যক্তি কোনো দিনে একশ বার বলবে: : لَا إِلَه إِلَّا اللَّه وَحْده لَا شَرِيك لَهُ، لَهُ الْمُلْك وَلَهُ الْحَمْد وَهُوَ عَلَى كُلّ شَيْء قَدِير তার চেয়ে বেশি উত্তম কিছু কেউ নিয়ে আসতে পারবে না। কেবল ঐ ব্যক্তিই পারবে যে তার চেয়ে বেশি আমল করবে।” এ হাদিসে প্রমাণ রয়েছে যে, কেউ যদি কোনো দিন এই তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ যিকির) একশ বারের বেশি পড়ে তাহলে সে হাদীসে বর্ণিত একশ বার পড়ার নেকী পাবে। আর অতিরিক্ত পড়ার জন্য তার পৃথক নেকী হবে। এটি এমন শ্রেণীয় নয় যার সীমা অতিক্রম করা বা সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে বৃদ্ধি করার মাঝে কোনো ফজিলত নেই কিংবা যাতে বৃদ্ধি করা আমলটিকে বাতিল করে দেয়। যেমনটি ঘটে পবিত্রতার সংখ্যা বা নামাযের রাকাতের সংখ্যার ক্ষেত্রে।
এখানে এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে: এই তাহলীলটি বেশি পড়া নয়; অন্য ভালো আমল বেশি করা। আবার যে কোনো বৃদ্ধিও উদ্দেশ্য হতে পারে; হোক সেটি এই তাহলীল অথবা অন্য কোনো যিকির। অথবা এই তাহলীলের সাথে অন্য যে কোনো কিছু। এই সম্ভাবনাই বেশি শক্তিশালী। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।’[শরহে সহীহ মুসলিম (১৭/১৭)- শামেলা সংস্করণ থেকে সমাপ্ত]
সারকথা হচ্ছে: যিকির দুই প্রকার: উন্মুক্ত ও বদ্ধ। উন্মুক্ত যিকিরের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। বরং মানুষ সাধ্যমত তার রবকে স্মরণ করবে। অন্যদিকে বদ্ধ যিকিরের ক্ষেত্রে যিকিরকারী বর্ণিত ভাষা ও সংখ্যা মেনে চলবে। কেবল যেখানে বৃদ্ধি করার দলিল আছে সেখানে বৃদ্ধি সে বৃদ্ধি করবে। যেমন: ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া-বিহামদিহি’ একশত বার এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া ‘আলা কুল্লি শাই-ইন কাদীর’ একশবার পড়া। এখন কেউ যদি একশ বারের বেশি পড়ে তাতে সমস্যা নেই।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।