সোমবার 3 সফর 1442 - 21 সেপ্টেম্বর 2020
বাংলা

মূর্তি ভাঙ্গার আবশ্যকতা

প্রশ্ন

ইসলামে প্রতিকৃতি ভাঙ্গা কি আবশ্যক; এমনকি সেটা যদি মানব ঐতিহ্য ও সভ্যতার ঐতিহ্য হয় তবুও? সাহাবায়ে কেরাম যখন বিভিন্ন দেশ জয় করলেন তখন তারা বিজিত দেশগুলোতে প্রতিকৃতিগুলো দেখা সত্ত্বেও সেগুলো ভাঙ্গেননি কেন? 

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

শরয়িতের দলিলগুলো মূর্তি ভাঙ্গা আবশ্যক হওয়ার সপক্ষে প্রমাণ বহন করে। এমন দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১। আবুল হাইয়্যাজ আল-আসাদি (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, আলী বিন আবু তালেব (রাঃ) আমাকে বললেন: “আমি কি তোমাকে সে কাজে পাঠাব না; যে কাজে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তুমি যত প্রতিকৃতি পাবে সেগুলোকে নষ্ট করবে এবং যত উঁচু কবর পাবে সেগুলোকে সমান করে দিবে।”[সহিহ মুসলিম (৯৬৯)]

২। আমর বিন আবাসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন: “আপনি কী নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন? তিনি বললেন: ‘আমি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, মূতি ভাঙ্গা এবং আল্লাহ্‌র এককত্ব প্রতিষ্ঠা ও তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করা নিয়ে’ প্রেরিত হয়েছি।”[সহিহ মুসলিম (৮৩২)]

মূর্তি ভাঙ্গার আবশ্যকতা আরও তাগিদপূর্ণ হয় যখন আল্লাহ্‌র বদলে সে সব মূর্তির পূজা করা হয়।

৩। জারীর বিন আব্দুল্লাহ্‌ আল-বাজালি (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন: হে জারীর! তুমি আমাকে যুল খালাসা (এটি খাছআম গোত্রের একটি ঘর যাকে ইয়ামেনী কাবা ডাকা হত) থেকে প্রশান্তি দিতে পার না? তিনি বলেন: তখন আমি দেড়শ অশ্বারোহী নিয়ে অভিযানের প্রস্তুতি নিলাম। আমি আমার ঘোড়ার উপর স্থির থাকতে পারতাম না। এ বিষয়টি আমি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উল্লেখ করলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দিয়ে আমার বুকের উপর আঘাত করলেন এবং বললেন: اللهم ثبته واجعله هاديا مهديا (হে আল্লাহ্! তাকে স্থির রাখুন এবং পথপ্রদর্শক ও সুপথপ্রাপ্ত বানিয়ে দিন।) বর্ণনাকারী বলেন: জারীর (রাঃ) রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং গিয়ে সে কাবাকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য আমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে পাঠালেন; যার কুনিয়ত ছিল আবু আরতা। সেই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন: আমরা সেই মন্দিরটিকে এমন অবস্থায় রেখে আপনার কাছে এসেছি যেন সেটি রোগের কারণে আলকাতরা দেয়া (কালো) উট। তখন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহমাস গোত্রের ঘোড়া ও বীরপুরুষদের জন্য পাঁচবার বরকতের দোয়া করলেন।”[সহিহ বুখারী (৩০২০) ও সহিহ মুসলিম (২৪৭৬)]

ইবনে হাজার (রহঃ) বলেন:

এ হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে: যে জিনিস দ্বারা মানুষ ফিতনাগ্রস্ত হয় সেটি দূর করা শরয়ি বিধান; হোক সেটি কোন ভবন বা অন্য কিছু; যেমন- মানুষ, প্রাণী বা ঝড় পদার্থ।[সমাপ্ত]

৪। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে উজ্জা নামক মূর্তিকে ধ্বংস করার জন্য অভিযান পাঠিয়েছিলেন।

৫। তিনি সাদ বিন যায়েদ আল-আশহালি (রাঃ) এর নেতৃত্বে মানাত নামক মূর্তিকে ধ্বংস করার জন্য অভিযান পাঠিয়েছেন।

৬। তিনি আমর বিন আ’স (রাঃ) এর নেতৃত্বে সুআ’ নামক মূর্তিটি ধ্বংসের জন্য অভিযান পাঠিয়েছেন। এ সবগুলো অভিযান হয়েছে মক্কা বিজয়ের পর।

[‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (৪/৭১২, ৭৭৬, ৫/৮৩) এবং ড. আলী সাল্লাবীর রচিত ‘আস-সিরাতুন নাবাওয়িয়্যাহ’ (২/১১৮৬)]

ইমাম নববী ‘শারহে মুসলিম’ এ تصوير (প্রতিকৃতি তৈরী, ছবি অংকন/নির্মাণ) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: “আলেমগণ ইজমা করেছেন যে, যেটার ছায়া আছে এমন ছবি তৈরী করা নিষিদ্ধ এবং এটি বিকৃত করা আবশ্যক।”[সমাপ্ত]

যে ছবিগুলোর ছায়া হয় সেগুলো তো এই মূর্তিগুলোর মত দেহের অবকাঠামোবিশিষ্ট ছবিগুলো।

আর সাহাবায়ে কেরাম বিজিত দেশসমূহে প্রতিমাগুলো না ভাঙ্গার যে কথা বলা হয় সেটি নিছক ভিত্তিহীন ধারণা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীবর্গ মূর্তি ও প্রতিমা রেখে দেয়ার কথা নয়। বিশেষতঃ যেহেতু ঐ যামানায় এগুলোর পূজা করা হত।

যদি বলা হয়: তাহলে এই ফেরাউনদের প্রতিকৃতি, ফিনিকীনদের প্রতিকৃতি কিংবা অন্যান্য প্রতিকৃতিগুলো বিজয়ী সাহাবীগণ কিভাবে রেখে দিলেন?

জবাব হল: এই মূর্তিগুলোর ব্যাপারে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে:

এক. এ মূর্তিগুলো এত দূরবর্তী স্থানে ছিল যে, সাহাবায়ে কেরাম সে সব স্থানে পৌঁছেননি। উদাহরণস্বরূপ সাহাবীদের মিশর জয় করার মানে এটা নয় যে, তারা মিশরের সকল স্থানে পৌঁছেছেন।

দুই. কিংবা সেই মূর্তিগুলো দৃশ্যমান ছিল না। বরং সেগুলো ফেরাউনদের ও অন্যদের বাসাবাড়ীর অভ্যন্তরে ছিল। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ছিল জালিম ও শাস্তিপ্রাপ্তদের বাসস্থান অতিক্রমকালে দ্রুত গমন করা। বরং ঐ সমস্ত স্থানে প্রবেশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে এসেছে যে, “তোমরা শাস্তিপ্রাপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করলে কেবল ক্রন্দনরত অবস্থায় প্রবেশ করবে। যেন তাদেরকে যা পাকড়াও করেছে তোমাদেরকে সেটা পাকড়াও না করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরবাসীদের এলাকা অতিক্রম করাকালে এ কথা বলেছেন। যেটা ছিল হুদ আলাইহিস সালামের কওম ছামুদ সম্প্রদায়ের বাসস্থান।

সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের অপর এক রেওয়ায়েতে আছে: “যদি তোমাদের কান্না না আসে তাহলে এদের গৃহে প্রবেশ করো না; যেন তাদেরকে যা পাকড়াও করেছে তোমাদেরকে সেটা পাকড়াও না করে।”

সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে যে ধারণা রাখা যায় সেটা হল তাঁরা যদি এদের মন্দির বা বাড়ীঘর দেখেও থাকেন তারা সেগুলোতে প্রবেশ করেননি এবং এগুলোর অভ্যন্তরে যা রয়েছে সেসব তারা দেখেননি।

এর মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক পিরামিড এবং এর মধ্যে যা কিছু ছিল সেগুলো ধ্বংস না করার যে আপত্তি আসতে পারে সেটার জবাব হয়ে যায়। তবে এর সাথে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, সে যামানায় পিরামিডের প্রবেশপথগুলো বালির স্তুপ দিয়ে ঢাকা ছিল।

তিন. বর্তমানে দৃশ্যমান মূর্তিগুলো তখন বালিতে ঢাকা ছিল, অদৃশ্য ছিল কিংবা এগুলো নব আবিষ্কৃত কিংবা এগুলোকে অনেক দূরবর্তী স্থান থেকে নিয়ে আসা হয়েছে; যে স্থানগুলোতে সাহাবায়ে কেরাম পৌঁছেননি।

ইতিহাসবিদ যিরিকলিকে পিরামিড ও আবুল হুল (একটি মূর্তির নাম) ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, যে সকল সাহাবী মিশর প্রবেশ করেছেন তারা কি এগুলোকে দেখেছেন? জবাবে তিনি বলেন: এ মূর্তিগুলোর অধিকাংশই ছিল বালিতে ঢাকা। বিশেষতঃ আবুল হুল।[শিবহু জাযিরাতিল আরব (৪/১১৮৮)]

যদি ধরে নেয়া হয় যে, কোন একটি মূর্তি দৃশ্যমান ছিল; বালিতে ঢাকা ছিল না; সেক্ষেত্রেও সাহাবীরা ঐ মূর্তিটিকে দেখেছেন এবং তারা ঐ মূর্তিটি ভাঙ্গতে সক্ষম ছিলেন এটা সাব্যস্ত হওয়া আবশ্যক।

বাস্তবতা হচ্ছে কোন কোন মূর্তি ধ্বংস করতে সাহাবায়ে কেরাম অক্ষম ছিলেন। কেননা এ ধরণের কোন কোন মূর্তি ভাঙ্গতে মেশিনারি, যন্ত্রপাতি, বিস্ফোরক ও লোকবল থাকা সত্ত্বেও বিশদিন সময় লেগেছে; যেগুলো সাহাবীদের যামানায় ছিল না।

সাহাবীরা যে এগুলো ভাঙ্গতে অক্ষম ছিলেন এর প্রমাণ হল যা ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’-তে (পৃষ্ঠা-৩৮৩) উল্লেখ করেছেন যে, একবার খলিফা আর-রশিদ পারস্যের বাদশার প্রাসাদ ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি সেটি ভাঙ্গার কাজ শুরু করে দেন এবং এর লক্ষ্যে লোকবল জমায়েত করেন, কুঠার সংগ্রহ করেন, প্রাসাদটিকে আগুনে উত্তপ্ত করেন, এর উপরে শির্কা ঢালেন। কিন্তু অবশেষে তিনি ব্যর্থ হন। এবং খলিফা মামুন মিশরের পিরামিডগুলো ভাঙ্গার লক্ষ্যে হাতি জড়ো করেন। কিন্তু তিনিও সক্ষম হননি।

আর মূর্তিগুলো না ভাঙ্গার পক্ষে এ কথা বলে কারণ দর্শানো যে, এ মূর্তিগুলো মানব ঐতিহ্য- এমন কথার প্রতি দৃষ্টিপাতের সুযোগ নাই। কেননা লাত, উজ্জা, হুবাল, মানাত ও অন্যান্য মূর্তিগুলোর যারা পূজা করত কুরাইশরা কিংবা আরব উপদ্বীপের অন্যান্য লোকেরা তাদের নিকট এগুলো তো মানব ঐতিহ্যই ছিল।

এগুলো ঐতিহ্য ঠিকই; কিন্তু হারাম ঐতিহ্য যা ধ্বংস করা ওয়াজিব। যখন আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ এসে যায় তখন একজন মুমিন দেরী না করে সে নির্দেশ পালন করে। এ সমস্ত দুর্বল যুক্তি দিয়ে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আদেশকে প্রত্যাখ্যান করে না। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “রাসূল তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবেন, এই উদ্দেশ্য যখন তাদেরকে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের দিকে ডাকা হয় তখন মুমিনদের কথা হয় এটাই: তারা বলে আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। আর তারাই সফলকাম।”[সূরা নূর, আয়াত: ৫১]

আমরা আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন সকল মুসলিমকে তিনি যা পছন্দ করেন ও যেটার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট তা পালন করার তাওফিক দেন।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব