শরীয়তের দৃষ্টিতে মূলনীতি হলো: সব বস্তু ও সৃষ্টিজীব স্বভাবতই পবিত্র। কোনো কিছুকে নাপাক বলা যাবে না, যতক্ষণ না তার নাপাক হওয়ার ব্যাপারে শরয়ি দলিল পাওয়া যায়।
প্রাণীরা বিভিন্ন প্রকার ও জাতের। তাদের পবিত্রতা ও অপবিত্রতা সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে নীচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১- যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া হালাল সেগুলো পবিত্র হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে।
ইবনে হাযম বলেন: “যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া যায়, সেগুলো পবিত্র হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيُحِلُّ لَهُمْ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمْ الْخَبَائِثَ
‘তিনি তাদের জন্য ভালো খাদ্যসামগ্রী হালাল করেন এবং খারাপ খাদ্যসামগ্রী হারাম করেন।’ অতএব যা হালাল তা-ই ভালো। আর যা ভালো তা নাপাক হতে পারে না; বরং তা অবশ্যই পবিত্র।”[আল-মুহাল্লা (১/১২৯)]
ইবনে মুনযির বলেন: “সব আলেম এ মর্মে ইজমা (ঐকমত্য) পোষণ করেছেন যে: যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া যায় তাদের উচ্ছিষ্ট পানীয় (সু’র) পবিত্র। তা পান করা ও তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা জায়েয।”[আল-আওসাত: (১/২৯৯)]
সু’র (سؤر) অর্থ: কোনো পানীয়ের অবশিষ্টাংশ।[দেখুন, তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত (৩/১৩২)]
২- যেসব প্রাণীর রক্ত (নফস) প্রবাহিত হয় না, সেগুলো পবিত্র। যেমন: মাছি, পঙ্গপাল, পিঁপড়া, মৌমাছি, বিচ্ছু, তেলাপোকা, গুবরে পোকা, মাকড়সা ইত্যাদি।
এখানে ‘নফস’ বলতে রক্ত বোঝানো হয়েছে। এসব পোকামাকড়ের প্রবহমান রক্ত নেই।
এদের পবিত্রতার প্রমাণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস: “তোমাদের কারো পাত্রে যদি মাছি পড়ে তবে সে যেন পুরো মাছিটিকে ডুবিয়ে দেয়, তারপর মাছিটিকে ফেলে দেয়। কেননা তার এক ডানায় আছে নিরাময়ক এবং অন্য ডানায় আছে রোগ।”[হাদীসটি বুখারী (৫৭৮২) বর্ণনা করেন] যদি মাছি নাপাক হতো তবে মাছিকে পাত্রের মধ্যে ডুবানোর আদেশ করা হতো না।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: “এ হাদীস স্পষ্ট প্রমাণ যে, মাছি যদি পানি বা তরল পদার্থে মারা যায় তখন মাছি সেটাকে নাপাকে পরিণত করে না। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। এ বিষয়ে সালাফদের মধ্যে কোনো বিরোধী মত জানা যায় না।
এ হাদীস থেকে দলীল গ্রহণের দিক হলো: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাছিকে খাবারের মধ্যে ডুবাতে আদেশ করেছেন। এ কথা সুবিদিত যে, এতে করে মাছিটি মারা যাবে। বিশেষতঃ খাবার গরম হলে। যদি মাছি নাপাকে পরিণত করত তাহলে এটি খাবার নষ্ট করার আদেশ হতো। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারকে সংশোধন করার আদেশ দিয়েছেন; নষ্ট করার নয়।
পরবর্তীতে এ বিধান এমন সব প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে যাদের প্রবহমান রক্ত নেই। যেমন: মৌমাছি, বোলতা, মাকড়সা ইত্যাদি।”[সমাপ্ত][যাদুল মা‘আদ (৪/১০১)]
৩- যেসব প্রাণী মানুষের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করে এবং যাদের থেকে বেঁচে থাকা কঠিন¾ তারা পবিত্র; যদিও সেগুলোর গোশত খাওয়া হালাল নয় কিংবা সেগুলো হিংস্র প্রাণী হয়। যেমন: বিড়াল, গাধা, খচ্চর, ইঁদুর এবং ঘরে বসবাসকারী অনুরূপ প্রাণী।
এর প্রমাণ কাবশা বিনতে কা‘ব ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস। তিনি ছিলেন আবু কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্রবধূ। একদা আবু কাতাদাহ তার ঘরে গেলেন। কাবশা বলেন: আমি তাঁর জন্য অজুর পানি ঢালছিলাম। তখন একটি বিড়াল এসে (সেই পাত্র থেকে) পানি পান করতে লাগল। তিনি পাত্রটিকে বিড়ালটির দিকে কাত করে ধরলেন, যাতে সে (স্বাচ্ছন্দ্যে) পান করতে পারে।
কাবশা বলেন: তিনি আমাকে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলেন।
তখন তিনি বললেন: ‘ভাতিজি, তুমি কি আশ্চর্য হচ্ছ?’
আমি বললাম: ‘হ্যাঁ।’
তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “বিড়াল নাপাক নয়। সে তো তোমাদের মাঝে অধিক আবর্তনকারীদের ও আবর্তনকারিনীদের অন্তর্ভুক্ত।”[চার সুনান প্রণেতা হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। বুখারী, তিরমিযী, উকাইলি ও দারাকুত্বনী সহীহ বলেছেন]
‘হাদীসে “আবর্তনকারীদের” বলতে বোঝানো হয়েছে: যারা আমাদের সঙ্গে চলাফেরা ও মেলামেশা করে।’[আত-তামহীদ: (১/৩১৯)]
“আবর্তনকারী (তাওয়্যাফুন) হলো এমন মানুষ, যারা একে অপরের কাছে বারবার আসে। আর ‘তাওয়্যাফাত’ (আবর্তনকারিনী) হলো: গৃহপালিত পশু, যেগুলোর উপস্থিতি মানুষের মাঝে অধিক। যেমন: ভেড়া-ছাগল, গরু ও উট। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিড়ালকে এ দু’ই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কারণ তা মানুষের সঙ্গে খুব বেশি মেশে। তিনি আধিক্যের দিকে ইঙ্গিত করার জন্য تَفْعِيْل এর শব্দরূপ ব্যবহার করেছেন। কেননা এটি আধিক্যের অর্থ বোঝায়।”[আইনীর শরহু আবি দাউদ: (১/২২০)]
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইঙ্গিত করেছেন যে, বিড়াল নাপাক না হওয়ার কারণ হলো: এটি বাসাবাড়ীতে অধিক ঘোরাফেরা করার প্রেক্ষিতে অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা। ফলে পাত্রকে এদের থেকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। হাদিসের মর্ম হলো: বিড়াল তোমাদের ঘরে ও বাসস্থানে ঘোরাফেরা করে বড়োয়, তোমরা তোমাদের শরীর ও কাপড় দিয়ে তাদেরকে স্পর্শ কর। যদি বিড়াল নাপাক হতো তাহলে আমি তোমাদেরকে বিড়ালকে এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিতাম।”[সমাপ্ত][আউনুল মাবূদ: (১/১৪১)]
ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “এ বিষয়ে শরীয়তের বিধান পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা ও কল্যাণে ভরপুর। যদি বিড়াল ও অনুরূপ প্রাণীকে নাপাক বলা হতো তবে উম্মতের উপর চরম কষ্ট আরোপ হতো। কারণ এ ধরণের প্রাণী দিন-রাত মানুষের ঘরে, বিছানায়, কাপড়চোপড়ের মধ্যে ও খাবারদাবারের মধ্যে ঘোরাফেরা করে।”[ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন: (২/১৭২)]
বিড়াল পবিত্র হওয়ার মতটি ‘মদিনা, কুফা, শাম, হিজায ও ইরাকের ফকীহবৃন্দ ও মুহাদ্দিসদের মত।’[আল-আওসাত: (১/২৭৬)]
অতএব, বিড়াল যদি কোনো পাত্র থেকে পান করে বা কোনো খাবার খায় তাহলে সেটা নাপাক হবে না।
বিড়ালের ওপর কিয়াস করা হবে সেই সমস্ত প্রাণীকেও যেগুলো বিড়ালের মত। অর্থাৎ যেগুলো বিড়ালের মতো মানুষের ঘরবাড়ীতে থাকে।
সুতরাং প্রত্যেক যে প্রাণী মানুষের সঙ্গে অধিক চলাফেরা করে এবং যাদের থেকে বেঁচে থাকা কঠিন সেগুলোর হুকুমও বিড়ালের মতোই। তবে এ বিধানের একটি ব্যতিক্রম আছে। সেটি হচ্ছে কুকুর। যদিও কুকুর মানুষের মাঝে অধিক ঘোরাফেরা করে তবুও শরীয়ত কুকুরকে নাপাক ঘোষণা করেছে।
শাইখ ইবনে উছাইমীন বলেন: “হাদীসের বাহ্যিক অর্থ হলো: বিড়ালের পবিত্রতার কারণ হচ্ছে, তার থেকে বাঁচা কঠিন হওয়া। কারণ সে আমাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। যদি সে নাপাক হতো তবে মানুষের জন্য কষ্ট হতো।
অতএব, হুকুমের ভিত্তি হলো: এমন ঘোরাফেরা যা থেকে বাঁচা কষ্টকর। সুতরাং যে প্রাণী থেকে বেঁচে থাকা কঠিন; সেটা পবিত্র। এর ভিত্তিতে খচ্চর ও গাধাও পবিত্র। আর এটাই শক্তিশালী অভিমত, যা বহু আলেম গ্রহণ করেছেন।”[আশ-শরহুল মুমতি‘ (১/৪৪৪)]
অতএব, আলেমদের সঠিক মত অনুযায়ী গাধা ও খচ্চরকে বিড়ালের সঙ্গে তুলনা করা হবে। তাই এদের উচ্ছিষ্ট পানি ও ঘাম পবিত্র। এটি মালেকী ও শাফেয়ী মাজহাবের মত। কারণ উল্লিখিত হেতু এবং আরোহন করা ও বোঝা বহনের কাজে মানুষের এই প্রাণীগুলোর প্রয়োজন হওয়া।
ইবনে কুদামা বলেন: “আমার কাছে সঠিক মত হলো: খচ্চর ও গাধা পবিত্র। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলোতে আরোহণ করতেন, সাহাবীদের যুগেও সেগুলো ব্যবহৃত হতো। যদি সেগুলো নাপাক হতো, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা স্পষ্ট করে বলে দিতেন। আর এগুলো থেকে এগুলোর মালিকদের বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। তাই এগুলো বিড়ালের মতোই।”[আল-মুগনী (১/৬৮)]
শাইখ আবদুর রহমান আস-সাদী বলেন: “নিঃসন্দেহে সঠিক মত হলো: খচ্চর ও গাধা জীবিত অবস্থায় বিড়ালের মতোই পবিত্র। অতএব, এদের লালা ও ঘাম পবিত্র। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই এগুলোতে আরোহণ করতেন এবং তাঁর যুগেও এগুলোতে আরোহণ করা হতো। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিড়াল সম্পর্কে বলেছেন: ‘এটি তোমাদের মাঝে অধিক ঘোরাফেরা করে।’ তিনি এর কারণ হিসেবে বিড়ালের অধিক ঘোরাফেরাকে উল্লেখ করেছেন এবং তা থেকে বেঁচে থাকা কষ্টকর হওয়ার কথা বলেছেন। গাধা ও খচ্চরের ক্ষেত্রে এ কষ্ট আরও তীব্র।”[আল-মুখতারাতুল জালিয়্যা: (পৃ. ২৭)]
৪- কুকুর ও শূকর: উভয়েই নাপাক।
শূকরের নাপাক হওয়ার প্রমাণ আল্লাহ তাআলার বাণী:
قُلْ لَا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ
“বলুন, আমার প্রতি যে বিধান নাযিল হয়েছে তাতে আমি কোনো আহারকারীর জন্য কোনো খাদ্য হারাম পাই না, তবে মৃত প্রাণী বা প্রবাহিত রক্ত অথবা শূকরের গোশত ছাড়া; কারণ তা অপবিত্র।”[সূরা আন‘আম: ১৪৫]
শূকর নাপাক হওয়ার মতটি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধিকাংশ আলেমের মত।
ইবনে হাযম বলেন: “তারা (ফকীহরা) একমত যে, শূকরের গোশত, চর্বি, গলিত চর্বি, তরুণাস্থি, মগজ ও স্নায়ু সবই হারাম, আর এগুলো সবই নাপাক।”[মারাতিবুল ইজমা‘ (পৃ. ২৩)]
নববী বলেন: “ইবনে মুনযির আলেমদের ইজমা (ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন যে, শূকর নাপাক। যদি এ ঐকমত্য প্রমাণিত হয়, তবে সেটাই সবচেয়ে শক্ত দলিল। তবে ইমাম মালেকের মাযহাব হলো: শূকর জীবিত অবস্থায় পবিত্র।”[আল-মাজমূ‘(২/৫৬৮)]
আর কুকুরের নাপাক হওয়ার প্রমাণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস: “তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর মুখ দেয় (চেটে খায়), তবে এর পবিত্রতা হল: সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।”[হাদীসটি মুসলিম (২৭৯) বর্ণনা করেছেন]
খাত্তাবী বলেন: “এ হাদীসে যে ফিকহী বিধান রয়েছে তাহলো: কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক। যদি সে নাপাক না হতো তবে কুকুরের মুখ দেওয়ার কারণে পাত্রকে ধোয়ার আদেশ করার কোনো অর্থ থাকে না। মূলতঃ পবিত্র করা হয় অপবিত্র অবস্থা (হাদাস) দূর করার জন্য অথবা নাপাকি (নাজাস) দূর করার জন্য। আর পাত্রের ক্ষেত্রে হাদাস (অপবিত্র অবস্থা) প্রযোজ্য নয়। অতএব বোঝা গেল, ধোয়ার নির্দেশ করা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল নাপাকি (নাজাস) দূর করা।
যেহেতু প্রমাণিত হলো যে, তার জিহ্বা (যা দিয়ে সে পানি খায়) নাপাক এবং তা থেকে পাত্রকে পবিত্র করা জরুরী, সেহেতু এটাও বোঝা গেল যে, কুকুরের দেহের অন্যান্য অংশও নাপাক হওয়ার ক্ষেত্রে কুকুরের জিহ্বার মতোই। অতএব, কুকুরের দেহের যে অংশই কোনো কিছুকে স্পর্শ করবে সেটাকেই ধৌত করা ও পবিত্র করা ওয়াজিব।”[মা‘আলিমুস সুনান: (১/৩৯)]
কিছু আলেম বলেছেন: এ হাদীস কেবল তার লালা, থুতু ও মুখ নাপাক হওয়ার প্রমাণ করে। আর কুকুরের শরীরের বাকি অংশ মূল বিধানের উপর বলবৎ থাকবে। আর তা হলো পবিত্র হওয়া। এটি হানাফী মাযহাবের মত। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ মতটি গ্রহণ করেছেন।[দেখুন: মাজমূউল ফাতাওয়া: (২১/৫৩০)]
ইবনে দাকিকিল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন: কুকুরের পুরো দেহকে নাপাক বলা আলেমদের ইজতিহাদ; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সরাসরি বক্তব্য নয়।
তিনি বলেন: “এতে স্পষ্ট হলো যে, হাদীসটি কেবল মুখের সাথে সম্পৃক্ত কিছু নাপাক হওয়া প্রমাণ করে। আর দেহের বাকি অংশ নাপাক হওয়া দলিল থেকে উদ্ভাবিত (ইস্তিনবাতকৃত)।”[ইহকামুল আহকাম: (পৃ. ২৪) থেকে সমাপ্ত]
কুকুরের সবকিছুকে নাপাক বলা এটি শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের অভিমত।
ইবনে কুদামা বলেন: “কুকুর ও শূকরের সর্বাঙ্গ, এদের ত্যাগকৃত বর্জ্য ও এদের থেকে যা কিছু বিচ্ছিন্ন হয়; সবই নাপাক।”[আল-মুগনী (২/৬৭) থেকে সমাপ্ত]
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির নির্বাচিত মতও এটি। তারা বলেন: “কুকুর সর্বৈব নাপাক; এর লালা ও অন্য সবকিছু।”[ফাতাওয়া আল-লাজনাহ (২৩/৮৯) থেকে সমাপ্ত]
৫- যেসব প্রাণী পূর্বোক্ত শ্রেণিবিভাগে পড়ে না সেগুলোর ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। চাই সেই প্রাণী হিংস্র পশু হোক; যেমন- সিংহ, বাঘ, চিতা, নেকড়ে ইত্যাদি অথবা শিকারি পাখি হোক; যেমন- বাজপাখি, শকুন, ঈগল ইত্যাদি কিংবা এমন প্রাণী হোক যাদের গোশত খাওয়া যায় না, কিন্তু তারা হিংস্রও নয়; যেমন- হাতি, বানর ইত্যাদি ...।
- মালেকি মাযহাব: জীবিত অবস্থায় সব প্রাণীই পবিত্র। এর ব্যতিক্রম কিছু নেই।
- হানাফি মাযহাব: শূকর ছাড়া সব প্রাণী পবিত্র।
- শাফেয়ি মাযহাব: কুকুর ও শূকর ছাড়া সব প্রাণী পবিত্র।
- হাম্বলি মাযহাব: কুকুর, শূকর, হিংস্র পশু ও হিংস্র পাখি নাপাক। আর বাকি সব পবিত্র।
এ ধরণের প্রাণী নাপাক হওয়া বা পবিত্র হওয়ার ব্যাপারে একাধিক হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো হয়তো দুর্বল অথবা সেগুলোর দ্বারা দলিল প্রদান সঠিক নয়।
এ প্রাণীগুলো পবিত্র হওয়ার পক্ষে সর্বাধিক শক্তিশালী যে প্রমাণ দেয়া হয় সেটি হলো:
মূল অবস্থাকে আঁকড়ে ধরা (অর্থাৎ সব কিছু মূলতঃ পবিত্র) এবং বিড়ালের ওপর কিয়াস করা।
ইবনে আব্দুল বার বলেন: “বিড়াল হিংস্র ও মৃত প্রাণীও খাওয়া সত্ত্বেও যেহেতু সুন্নাহতে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিড়াল নাপাক নয়; এটি প্রমাণ করে যে, প্রত্যেক জীবিত প্রাণীই মূলতঃ নাপাক নয়।”[আত-তামহীদ: (১/৩৩৬) থেকে সমাপ্ত]
আর এ প্রাণীগুলো নাপাক হওয়ার পক্ষে সর্বাধিক শক্তিশালী প্রমাণ হলো:
১- বিড়াল হিংস্র হওয়া সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র বলেছেন এবং কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন: “সে তোমাদের মাঝে ঘোরাফেরা করে।”
এর থেকে বোঝা যায়, অন্য হিংস্র প্রাণী যারা এমন ঘোরাফেরা করে না, তারা নাপাক। তা না হলে বিড়াল ও অন্য হিংস্র প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য করা অর্থহীন হয়ে যায়ু।
২- আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস: তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যখন তাঁকে মরুভূমির উন্মুক্ত প্রান্তরে থাকা পানি এবং তাতে হিংস্র পশু ও অন্যান্য জীবজন্তুর যাতায়াত (বা পানি পান করা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন: “যখন পানির পরিমাণ দুই কুল্লা (একটি নির্দিষ্ট পরিমাপ) সমপরিমাণ হয়, তখন তা অপবিত্রতা বহন করে না।” যদি হিংস্র পশুর পান করা পানিকে নাপাক না করত তাহলে এই প্রশ্ন ও এর উত্তরের কোনো অর্থ থাকে না।
ইবনে তুরকমানি বলেন: “এই হাদিসটির বাহ্যিক মর্ম হল: হিংস্র পশুর উচ্ছিষ্ট নাপাক। কারণ যদি তা না হতো তাহলে এ শর্ত যোগ করার কোনো অর্থ থাকে না।”[আল-জাওহারুন নাক্বী: (১/২৫০) থেকে সমাপ্ত]
তবে ইমাম নববী বলেন: “কেউ কেউ এ হাদিস দ্বারা হিংস্র পশুর উচ্ছিষ্ট নাপাক হওয়ার পক্ষে প্রমাণ পেশ করেন। যেহেতু হাদিসে এসেছে: ‘তাতে হিংস্র পশু ও অন্যান্য জীবজন্তুর যাতায়াত’। কিন্তু এ কথায় এমন কোনো প্রমাণ নেই। কারণ সাধারণত হিংস্র পশু যখন জলাশয়ে আসে তখন এরা জলাশয়ের ভেতরে নেমে যায় ও এতে প্রস্রাব করে দেয়। পশুগুলোর পা ও দেহ সাধারণতঃ নাপাক থেকে মুক্ত থাকে না। এ কারণে তারা প্রশ্ন করেছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে একটি সাধারণ নিয়ম বলে দেন: পানি যদি দুই কুল্লা সমপরিমাণ হয় তাহলে তাতে নাপাকি পড়লেও পানি নাপাক হয় না। সাধারণতঃ মরূদ্যান ও জলাশয়ের পানি দুই কুল্লার কম হয় না।”[আল-ঈজায ফি শরহি সুনানি আবি দাউদ: (পৃ. ২৮৭)]
এছাড়া উবাইদুল্লাহ মুবারকপুরি বলেন: “দুই কুল্লার হাদিস হিংস্র পশুর উচ্ছিষ্ট নাপাক হওয়া প্রমাণ করে না, যেমনটি তারা (নাপাক দাবিকারীরা) ধারণা করেছেন। প্রশ্নের কারণ ছিল এই যে, সাধারণত হিংস্র পশু পানিতে নেমে যায়, প্রস্রাব করে দেয় এবং এদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রস্রাব ও মলের নাপাকি থেকে মুক্ত থাকে না।”[মির‘আতুল মাফাতীহ: (২/১৮৫)]
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির আলেমরা পবিত্রতার মতটিকেই গ্রহণ করেছেন। তারা বলেন: “সঠিক মত হলো: হিংস্র পশু; যেমন- নেকড়ে, বাঘ, সিংহ এবং শিকারি পাখি; যেমন- বাজপাখি, চিল ইত্যাদি পবিত্র।... আর এ অভিমত শরঈ দলিলসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”[ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ: (৫/৩৮০), শাইখ ইবনে বাযের সভাপতিত্বে]
শাইখ ইবনে উছাইমীনও এ মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন: “সঠিক মত হলো: এগুলো পবিত্র। কারণ যদি আমরা এগুলোকে নাপাক বলি তবে মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। মরুপ্রান্তরে অনেক পানির গর্ত দুই কুল্লার কম হয়। আর নিঃসন্দেহে হিংস্র পশু ও পাখিরা সেখান থেকে পান করে। যদি আমরা বলি তা নাপাক তবে মানুষের জন্য বড় কষ্টকর হয়ে যাবে। আর আমাদের কাছে অগ্রগণ্য মনে হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের পানির পাশ দিয়ে গমন করতেন এবং এ পানি দিয়ে অজু করতেন।”[আত-তা‘লীকাত আলাল কাফি: (১/৪১), শামেলা সংস্করণ অনুসারে]
সারকথা:
জীবিত অবস্থায় সব প্রাণীই পবিত্র; সেটা গোশত খাওয়া যায় এমন প্রাণী হোক বা হিংস্র পশু হোক বা পোকামাকড় হোক বা অন্য কিছু হোক। এ বিধান থেকে কেবল দু’টি প্রাণী ব্যতিক্রম: কুকুর ও শূকর। এ দু’টি প্রাণী নাপাক।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।