বাজারে বিদ্যমান প্রতিযোগিতা এবং পণ্যের প্রচার-প্রসারে মালিকদের আগ্রহের কারণে পণ্য প্রচারণার ক্ষেত্রে এটি নতুন একটি মাসআলা। সমকালীন আলেমরা উক্ত মাসআলায় দুটি মতে বিভক্ত। প্রথম মত: সাধারণভাবে এটি নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় মত: শর্ত সাপেক্ষে এটি বৈধ। এর নিষিদ্ধতা ও হারাম হওয়ার মত দিয়েছেন ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি ও শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ। নিম্নে তাদের কিছু ফতোয়া উল্লেখ করা হলো।
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়: ‘আমেরিকায় কিছু খাদ্যদ্রব্য বিক্রির বাণিজ্যিক দোকান রয়েছে। আপনি যদি সেখান থেকে কিছু কিনেন তারা আপনাকে গোপন কিছু নম্বর দেয়। যদি দোকান কর্তৃক নির্ধারিত কিছু নম্বর আপনার কাছে একত্রিত হয় তাহলে আপনি একটি পুরস্কার জিতবেন। পুরস্কারটি হলো নগদ অর্থ। প্রশ্ন হলো: একজন মুসলমানের জন্য কি এই পুরস্কার গ্রহণ করা জায়েয হবে? উল্লেখ্য, এর জন্য তাকে আলাদা করে কিছু পরিশোধ করতে হয় না; বরং শুধু তাদের কাছ থেকে কেনাকাটা করা বা দোকান ভিজিট করাই এই নম্বরগুলো পাওয়ার কারণ হয়, যেগুলোর মাধ্যমে পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’
তারা উত্তর দেয়: “যদি বিষয়টি আপনি যেভাবে উল্লেখ করেছেন সেভাবেই হয়ে থাকে, তাহলে আপনার জন্য সেই পুরস্কার গ্রহণ করা জায়েয নয়; যে পুরস্কার পাওয়ার কারণ আপনি সে দোকান থেকে কেনাকাটা করা বা দোকানটি ভিজিট করা এবং একটি নম্বর বাছাই করে নেয়া; বাছাইয়ের সময় যে নম্বরটি আপনার কাছে অজ্ঞাত ছিল; পরে জানা গেছে। যেহেতু এটি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। কুরআন, সুন্নাহ এবং আলেমদের সর্বসম্মত মতের মাধ্যমে জুয়ার নিষিদ্ধ হওয়া প্রমাণিত।”[ফতোয়া নং: ৫৮৪৭, ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (১৫/১৯১)]
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে আরও একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল:
“আমাদের এখানে কিছু বিক্রেতা আছে যারা পপকর্নের কার্টন একশ রিয়ালে বিক্রি করে। অথচ অন্যান্য দোকানে একই জিনিস প্রায় বিশ রিয়ালে পাওয়া যায়। তবে, তারা একটি গাড়ি ও অন্যান্য পুরস্কার ঘোষণা করে। যার ফলে পুরস্কার পাওয়ার আশায় মানুষ হুমড়ি খেয়ে তাদের কাছ থেকে কিনছে। এটি কি বৈধ? আমাদের ফতোয়া দিন, আল্লাহ আপনাদের প্রতিদান দিন।”
তারা উত্তরে বলেন:
“আপনি যে কাজটির কথা জিজ্ঞাসা করেছেন, তা বৈধ নয়। বরং এটি একটি নিন্দনীয় কাজ এবং জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। যা আল্লাহ হারাম করেছেন। কারণ এতে ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা এবং অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করার বিষয় রয়েছে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (90) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمْ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنْ الصَّلاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ(91)
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের এক একটি ঘৃণ্য কাজ; অতএব, এসব থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা সফল হতে পারো। বস্তুত মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শয়তান চায় তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা কি এসব ছাড়বে?”[সূরা মায়েদা: ৯০-৯১]
আল্লাহ আরো বলেছেন:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।”[সূরা নিসা: ২৯]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি অনিশ্চয়তাপূর্ণ (গারার) বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহ আপনাকে সকল ভালো কাজের তৌফিক দান করুন, আপনাকে সাহায্য করুন এবং আপনার বিষয়কে সহজ করে দিন।’[সমাপ্ত][ফতোয়া নং (১৮৩২৪), ফাতাওয়াল-লাজনাহ (১৫/১৯৫)]
স্থায়ী কমিটিকে আরো জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:
“কিছু কল সেন্টার কলকারীকে বারবার ফোন করতে উৎসাহিত করার জন্য যে পুরস্কার দেয়, সেগুলোর বিধান কী?”
তারা উত্তরে বলেন:
“উল্লেখিত পদ্ধতিতে সাধারণ কল সেন্টারগুলো পুরস্কার নামে যে উপহারগুলো কলকারীদের দেয়, সেগুলো বৈধ নয়। যেহেতু এতে জুয়া রয়েছে, মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে প্রলুব্ধ করা এবং টেলিফোন যোগাযোগ প্রচার ও আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করার বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি এর ফলে কল সেন্টারগুলোর মালিকদের মধ্যে এবং কলকারীদের মধ্যে শত্রুতা, বিদ্বেষ ও বৈরিতা সৃষ্টি হয়।
অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ(90)إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمْ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنْ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ(91)
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের এক একটি ঘৃণ্য কাজ; অতএব, এসব থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা সফল হতে পারো। বস্তুত মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শয়তান চায় তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা কি এসব বর্জন করবে?”[সূরা মায়েদা: ৯০-৯১][ফতোয়া নং (১৯৫৬০), ফাতাওয়াল-লাজনাহ (১৫/১৯৬)]
শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল:
“আমাদের শহরে একটি সমবায় সমিতি তাদের অফিসের প্রবেশপথে একটি গাড়ি প্রদর্শন করেছে। যে কেউ তাদের কাছ থেকে একশ দিরহাম বা তার বেশি মূল্যের পণ্য কিনবে তাকে বিনামূল্যে নম্বরযুক্ত একটি কুপন দেওয়া হবে, যার ওপরে লেখা আছে: ‘এর মূল্য দশ দিরহাম’। পরবর্তীতে একটি ড্র অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত ড্রতে (তাদের ভাষায়) ‘সৌভাগ্যবান ব্যক্তি’ প্রদর্শিত ওই গাড়িটি জিতবে। আমার প্রশ্ন হলো:
১- বিনামূল্যে দেওয়া ওই কুপনের মাধ্যমে এই ড্রতে অংশগ্রহণের হুকুম কী, যেখানে না জিতলেও অংশগ্রহণকারী কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হবে না?
২- শুধু উল্লিখিত কুপনটি পাওয়ার উদ্দেশ্যে এবং লটারিতে অংশ নেওয়ার জন্য ওই সমবায় সমিতি থেকে কেনাকাটা করার হুকুম কী?
যেহেতু এখানকার মানুষ (শিক্ষিতরাও) এই বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ও দিশেহারা। তাই অনুগ্রহ করে দলীলসহ এই দুই প্রশ্নের উত্তর দিন, যাতে মুসলমানরা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা পায়। আল্লাহ আপনাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন।”
তিনি উত্তরে বলেন:
“এই লেনদেনটি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ হারাম করেছেন এবং যেটির কথা আল্লাহর এই বাণীতে উল্লেখ আছে:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (90) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمْ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنْ الصَّلاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ(91)
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের এক একটি ঘৃণ্য কাজ; অতএব, এসব থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা সফল হতে পারো। বস্তুত মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শয়তান চায় তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা কী এসব বর্জন করবে?”[সূরা মায়েদা: ৯০-৯১] তাই ফুজাইরা ও অন্যান্য স্থানের শাসকগণ ও আলেমদের ওপর কর্তব্য হলো এই লেনদেনের বিরোধিতা করা এবং এর থেকে সতর্ক করা। কারণ এতে আল্লাহর মহান গ্রন্থের বিরোধিতা রয়েছে এবং এর দ্বারা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করা হয়। আল্লাহ সবাইকে হেদায়াত দান করুন এবং সত্যের ওপর অবিচল রাখুন।”[মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ, সংখ্যা: ১১৪৫, ২৯/১০/১৪০৮ হিজরি]
অন্যদিকে শাইখ ইবনে উছাইমীন রহিমাহুল্লাহ এর মতে এই ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের হুকুম ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যেহেতু তিনি দুটি শর্তে এটাকে বৈধ বলেছেন। তিনি বলেন:
“বর্তমানে কোম্পানিগুলো তাদের কাছ থেকে কেনাকাটা করলে পুরস্কার দেয়। আমরা বলব: এতে কোনো সমস্যা নেই, তবে দুটি শর্তে।
প্রথম শর্ত: পণ্যের মূল্য তার প্রকৃত মূল্যই হতে হবে; অর্থাৎ পুরস্কারের কারণে দাম বাড়ানো যাবে না। যদি পুরস্কারের জন্য দাম বাড়ানো হয়, তাহলে তা জুয়া হবে এবং তা হালাল নয়।
দ্বিতীয় শর্ত: কেউ যেন কেবল পুরস্কারের আশায় পণ্য না কেনে। যদি কেউ শুধু পুরস্কারের আশায় পণ্য কেনে, অথচ তার এই পণ্যের কোনো প্রয়োজন নেই, তবে এটি সম্পদ নষ্ট করা হিসেবে গণ্য হবে। আমরা শুনেছি কিছু মানুষ এমন দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যের কৌটা কেনে যা তাদের দরকার নেই; তবুও শুধু পুরস্কার পাওয়ার আশায় কিনে। পরে দেখা যায় সে দুধটি বা দুগ্ধজাত পণ্যটি বাজারে বা বাড়ির কোনো কোণয় ঢেলে ফেলে দেয়। এটি জায়েয নয়। কারণ এটি সম্পদ নষ্টকরণ। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পদ নষ্ট করা থেকে নিষেধ করেছেন।”[আসইলাতুল বাবিল মাফতূহ: প্রশ্ন নং ১১৬২]
ইনশা-আল্লাহ এই মতটিই সবচেয়ে নিকটবর্তী; যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি নিজের অন্তরে নিশ্চিত থাকে যে দ্বিতীয় শর্তটি তার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ হয়েছে। কারণ অন্তরের অবস্থা কেবল সে নিজেই জানে; অন্য কোনো মানুষ নয়।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে হালাল ও পবিত্র রিজিক দান করেন। তিনি যেন আমাদেরকে তুষ্টি ও সন্তুষ্টি দান করেন এবং হারাম ও হারামের মাধ্যমসমূহ থেকে দূরে রাখেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।