এটা সর্বজনবিদিত যে, পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় বর্তমানে চাহিদা ও প্রসারের দিক থেকে স্থাবর সম্পত্তির অবস্থা ভিন্ন। এর বিভিন্নতা অনুযায়ী যাকাতের বিধান বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।
স্থাবর সম্পত্তি বলতে উদ্দেশ্য: মানুষ যে জমির মালিক এবং এর উপরে তৈরি করা স্থাপনাসমূহ। যেমন: বাড়ি, প্রাসাদ, দালান, ফ্ল্যাট, দোকান, পেট্রল পাম্প, বিশ্রামাগার ইত্যাদি।
যাকাতের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য হচ্ছে:
১- এই অধ্যায়ের সাধারণ মূলনীতি হচ্ছে: স্থাবর সম্পত্তি যাকাতীয় সম্পদ নয়। তাই এর মূল অবস্থা হচ্ছে ব্যবসার উদ্দেশ্য না থাকলে এতে যাকাত ওয়াজিব হয় না।
২- যে স্থাবর সম্পত্তি মানুষ বসবাসের জন্য কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য গ্রহণ করে থাকে, যেমন: গুদামঘর ইত্যাদি; তাতে আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে যাকাত নেই।
কারণ এ অবস্থায় স্থাবর সম্পত্তি ব্যক্তিগত সংরক্ষণমূলক সম্পদ। এমন সম্পদে সর্বসম্মতিক্রমে যাকাত আবশ্যক হয় না। (224770) নং প্রশ্নের উত্তর দেখুন।
চাই সম্পদটি কেনার সময় সংরক্ষণের নিয়ত থাকুক কিংবা পরবর্তীতে যুক্ত হোক। স্থাবর সম্পত্তি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণের নিয়ত করামাত্র সেটি এমন সম্পদে পরিণত হবে যাতে যাকাত ওয়াজিব হয় না; এমনকি যদি বহু বছরও এভাবে থেকে যায়। যতক্ষণ এর মালিকের নিয়ত সংরক্ষণের উদ্দেশ্য থেকে পরিবর্তিত না হয়।
৩- কৃষি ক্ষেতে যাকাত নেই। বরং যাকাত ফরয হবে শস্য ও ফলের উপর।
তবে যদি কেউ ব্যবসার উদ্দেশ্যে জমি ক্রয় করে, এবং বিক্রি করার আগ পর্যন্ত তাতে চাষাবাদ করে, ফলে খেজুর গাছে ফল ধরে ও ফসল উৎপন্ন হয়; তখন সে ফল ও শস্যের যাকাত আদায় করবে: উশর (এক দশমাংশ)। আর জমির যাকাত আদায় করবে জমির মূল্য অনুযায়ী। কারণ এ দুটি আলাদা হক, এ দু’টো ওয়াজিব হওয়ার কারণ ভিন্ন ভিন্ন। তাই একটি অন্যটির দ্বারা রহিত হবে না।
যাকারিয়া আল-আনসারী বলেন: ‘যদি ব্যবসার জন্য নির্ধারিত জমিতে নিজের ব্যবহারের জন্য ফসল চাষ করা হয়, তবে উভয়টির হুকুম আলাদা। ফলে ফসলের উপর শস্যের যাকাত ওয়াজিব হবে। আর জমির উপর ব্যবসায়িক যাকাত ওয়াজিব হবে।’[আসনাল মাত্বালিব (১/৩৮৫) থেকে সমাপ্ত]
৪- যে স্থাবর সম্পত্তি আয়ের উদ্দেশ্যে মালিকানায় নেওয়া হয় অর্থাৎ ভাড়া দেওয়া এবং এর ভাড়া ও ফসল থেকে উপার্জন করা এ সম্পত্তির মূল্যের উপর যাকাত নেই। বরং এর থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে; যদি সেই ভাড়ার উপর এক পূর্ণ হিজরী বছর অতিক্রান্ত হয়।
সুতরাং বাড়ি, গুদাম, ফার্নিশড ফ্ল্যাট, হোটেল, বহুতল ভবন— এই সব সম্পত্তি যদি ভাড়ার জন্য নির্ধারিত হয় তবে অধিকাংশ আলেমের মতে এগুলোর মূল্যের ওপর যাকাত নেই। প্রতি বছর এই সম্পত্তিগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে যাকাত দেওয়াও আবশ্যকয় নয়।
এ বিষয়টি ইতিপূর্বে (223513) ও (47760) নং প্রশ্নোত্তরে আলোচনা করা হয়েছে।
৫- যে স্থাবর সম্পত্তি ব্যবসার নিয়তে মালিকানায় নেওয়া হয়: অধিকাংশ আলেমের মতে এতে যাকাত ফরজ। ব্যবসার নিয়ত বলতে বোঝায়, এই সম্পত্তি মালিকানায় নেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো তা থেকে উপার্জন করা ও লাভ করা।
মারদাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “ব্যবসার নিয়তের অর্থ হলো: এটি বিক্রি করে টাকা উপার্জন করার নিয়ত করা।”[আল-ইনসাফ (৩/১৫৪) থেকে সমাপ্ত]
শুধু বিক্রি করার ইচ্ছা থাকলে কোনো সম্পত্তি ব্যবসায়িক পণ্য হয়ে যায় না।
কারণ বিক্রি করার পেছনে অনেক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। যেমন: সম্পত্তি থেকে মুক্তি পাওয়া, এ সম্পত্তির প্রতি আগ্রহ না থাকা, আর্থিক সংকট ইত্যাদি।
কিন্তু ব্যবসা বলতে বোঝায়: লাভ ও মুনাফার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা এবং বিক্রি করা।
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি একটি জমি কিনে সেখানে ঘর বানানোর উদ্দেশ্য করে, পরে সে উদ্দেশ্য থেকে সরে এসে অপ্রয়োজনীয় মনে করে তা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়; অথবা কোনো ব্যক্তির একাধিক জমি আছে, পরে সে প্রয়োজনবশতঃ একটি জমি বিক্রি করার নিয়ত করে, তাহলে তিনি বলেন:
“এই অবস্থায় তার ওপর যাকাত নেই; না এই জমিতে, না আগেরটিতে। কারণ এখানে বিক্রির নিয়ত ব্যবসার জন্য নয়। বরং প্রথম ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ার কারণে। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রয়োজন মেটানোর জন্য। কিন্তু ব্যবসায়িক পণ্যের মালিক শুরু থেকেই কেবল লাভের উদ্দেশ্যই করে থাকে।”[ফাতহু যিল জালাল (৬/১৭৩) থেকে সমাপ্ত]
৬- যে ব্যক্তি স্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছে, কিন্তু ব্যবসার নিয়ত চূড়ান্ত নয় বা কোনো নির্দিষ্ট নিয়ত নেই; তাতে যাকাত নেই।
কারাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যদি কেউ কোনো জিনিস ক্রয় করে। এতে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ত না থাকে, তবে সেটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য গণ্য হবে। কারণ এটাই মূল অবস্থা।”[আয-যাখীরাহ (৩/১৮) থেকে সমাপ্ত]
শাইখ ইবন উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহুকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:
এক ব্যক্তির কাছে একটি জমি আছে। কিন্তু তার নিয়ত নিয়ে সে দ্বিধায় আছে। সে জানে না, সে কি এটি বিক্রি করবে, নাকি নির্মাণ করবে, নাকি ভাড়া দেবে, নাকি নিজে বসবাস করবে। এ অবস্থায় এক বছর পূর্ণ হলে কি যাকাত দিতে হবে?
তিনি উত্তর দেন: “এই জমিতে আদৌ কোনো যাকাত নেই, যতক্ষণ না তার স্পষ্ট ও দৃঢ় সংকল্প হয় যে এটি ব্যবসার জন্য। সে যদি দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, এমনকি মাত্র এক শতাংশ হলেও, তবে তার উপর যাকাত নেই।”[মাজমুউ ফাতাওয়াল উছাইমীন (১৮/২৩২)]
৭- যদি স্থাবর সম্পত্তি ব্যবহার ও বসবাসের জন্য মালিকানায় নেওয়া হয়, তারপর সেটা দিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্য করে, তাহলে এ ক্ষেত্রে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইতিপূর্বে এ মাসয়ালায় যাকাত ফরয হওয়ার মতটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
৮- যদি স্থাবর সম্পত্তি ব্যবসার নিয়তে মালিকানায় নেওয়া হয়, পরে নিয়ত পরিবর্তন করে সেটিকে সংরক্ষণ, ব্যবহার বা ভাড়ার নিয়ত করা হয়; তাহলে এতে কোনো যাকাত নেই।
কারণ যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হলো ব্যবসার নিয়তটি হিজরী বছরের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকা। তাই যদি বছর শেষ হওয়ার আগেই নিয়ত পরিবর্তন করে ফেলা হয়, তবে যাকাত মওকূফ হয়ে যায়।
নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘যদি কোনো ব্যক্তি তার কাছে থাকা ব্যবসায়িক সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত সংরক্ষণের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে তা সংরক্ষণের সম্পত্তিতে পরিণত হবে।”[মাজমুউ (৬/৪৯) থেকে সমাপ্ত]
৯- যদি কোনো স্থাবর সম্পত্তি মালিকানায় নেওয়ার সময় সংরক্ষণের সাথে কিংবা ব্যবসার সাথে সংরক্ষণ দুই ধরনের নিয়তই থাকে তবে যেটা মূল নিয়ত সেটাই ধর্তব্য হবে।
সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো পণ্যকে ব্যবহারের নিয়তে সংগ্রহ করে এবং পাশাপাশি এই চিন্তা রাখে যে, যদি এতে লাভ পাওয়া যায় তাহলে বিক্রি করে দিবে, তাহলে তার উপর কোনো যাকাত নেই।
আর যে ব্যক্তি কোনো পণ্য (বা সম্পত্তি) ব্যবসার নিয়তে ক্রয় করেছে এবং বিক্রি হওয়া পর্যন্ত সেটি ব্যবহার করছে ও তা থেকে উপকার নিচ্ছে, তাহলে বিক্রি হওয়া পর্যন্ত প্রতি বছর তার উপর যাকাত ওয়াজিব থাকবে।
অনুরূপভাবে কেউ যদি বিক্রি করার পূর্বে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেটি ব্যবহার করা ও এর দ্বারা উপকৃত হওয়ার নিয়ত করে তাহলে সেটার ওপর ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত ওয়াজিব হবে। কারণ প্রথমে ব্যবহার করার নিয়ত থাকা পণ্যটি ব্যবসার জন্য উত্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
১০- যদি কোনো স্থাবর সম্পত্তি এখনো নির্মাণের পর্যায়ে থাকে এবং তা ব্যবসার উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে, তাহলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে; চাই তা বর্তমানে বিক্রির জন্য উপস্থাপিত হোক কিংবা নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভবপর না হোক। এক্ষেত্রে যাকাত ফরয হওয়ার সময় উক্ত সম্পত্তির বাজারমূল্য অনুসারে যাকাত আদায় করতে হবে।
১১- যে স্থাবর সম্পত্তির মালিক মূল্য বাড়ার অপেক্ষায় থাকে, যদি তা বহু বছর ধরে তার কাছে পড়ে থাকে তবুও ঐ সম্পত্তির উপর প্রতি বছর মূল্য অনুসারে যাকাত ওয়াজিব হবে।
দূর ভবিষ্যতে লাভের উদ্দেশ্যে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করলে তা থেকে যাকাত মওকূফ হবে না।
এর উদাহরণ হচ্ছে: শহর থেকে বহুদূরের প্লানকৃত প্রজেক্টগুলো ক্রয় করা এবং মানুষের চাহিদা ও দাম বাড়ার সময়ের অপেক্ষায় থাকা। ভবিষ্যৎ জমিবিক্রির এই নিয়ত উক্ত সম্পতির যাকাত ওয়াজিব করবে। বিলম্বে বিক্রির নিয়ত যাকাত ওয়াজিব হওয়াকে প্রভাবিত করবে না, যতক্ষণ জমিটি ব্যবসার উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে
এবং এর থেকে উদ্দেশ্য হয় সম্পদ বৃদ্ধি করা।
ফকীহরা এ ধরনের ব্যক্তিকে ‘অপেক্ষমাণ ব্যবসায়ী’ বলে থাকেন। এ বিষয়ে বিশুদ্ধতম মত হচ্ছে জমহুর আলেমের মত: প্রতি বছর এতে যাকাত ওয়াজিব হবে।
১২- যদি কোনো ব্যক্তি শুধু সম্পদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করে, তাহলে এতে যাকাত নেই। কিন্তু যদি যাকাত থেকে পালিয়ে যাওয়া বা যাকাত ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে তাহলে যাকাত ওয়াজিব হবে।
এ বিষয়ে ইতিপূর্বে (231857) নং প্রশ্নোত্তরে আলোচনা করা হয়েছে।
১৩- যদি কেউ ব্যবসার উদ্দেশ্যে কোনো স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করে, কিন্তু সেটি হস্তগত করার আগে যেই অর্থ দিয়ে সেটি খরিদ করেছে সেই অর্থের এক বছর পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে তাতে যাকাত আবশ্যক হবে। কারণ নিছক ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমেই স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তন হয়ে যায়। তার পক্ষে সেটি হস্তগত করা সম্ভবপর।
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: এক ব্যক্তি ব্যবসার উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিয়ে একটি জমি কিনেছে। উল্লেখ্য, সে জমিটি এখনো গ্রহণ করেনি, এমনকি জমির দলিলও পায়নি; এমতাবস্থায় এই জমির ওপরে কি যাকাত আছে?
তিনি উত্তর দেন: হ্যাঁ, এই জমির উপর যাকাত আছে; যদিও সে দলিল গ্রহণ করেনি। যেহেতু বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে ও অনিবার্য হয়ে গেছে। তাকে ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত হিসেবে এর যাকাত দিতে হবে। যাকাত ফরজ হওয়ার সময় জমিটির যে বাজারমূল্য নির্ধারণ করবে এবং উক্ত মূল্যের চল্লিশ ভাগের একভাগ (২.৫%) যাকাত আদায় করবে।”[মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া-রাসাইলিশ শাইখ আল-উছাইমীন (১৮/২৩৪)]
১৪- বন্ধক রাখা স্থাবর সম্পত্তি: যদি এই সম্পদ ব্যবসার জন্য প্রস্তুত করা হয় তাহলে এতে যাকাত ওয়াজিব হবে।
শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যদি আপনি সেটাকে ব্যবসার জন্য প্রস্তুত করে থাকেন এবং সেটা বন্ধক রাখা হয় তাহলে আপনার ওপর এর যাকাত ওয়াজিব হবে। আর যদি সেটা বন্ধকে থাকে, কিন্তু ব্যবসার জন্য প্রস্তুত না করা হয়, বরং পাওনা পরিশোধ করা পর্যন্ত বন্ধকে থাকে, যদি পরবর্তীতে আপনি পাওনা পরিশোধ করার পর সেটি বসবাস করা বা ভাড়া দেয়ার জন্য হয় তাহলে এর ওপর কোনো যাকাত নেই।”[ফাতাওয়া নূরুন ‘আলা আদ-দারব (১৫/৪৩)]
১৫- যে স্থাবর সম্পত্তি একাধিক ব্যক্তির যৌথ মালিকানায় রয়েছে, সেটার ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদার নিজ নিজ অংশের যাকাত আদায় করবে; যদি তার অংশ নেসাব পরিমাণে পৌঁছে। এটা জমহুরের (অধিকাংশ মাযহাবের) মত।
শাইখ বকর আবু যাইদ বলেন: “যৌথ মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদারের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হলো: তার অংশের মূল্য এককভাবে নেসাব পরিমাণে পৌঁছাতে হবে অথবা তার অন্য যাকাতযোগ্য ব্যবসায়িক সম্পদের সঙ্গে মিলিয়ে নেসাব পূর্ণ হতে হবে।”[ফাতাওয়া জামি’আ ফি যাকাতিল ‘আক্বার (পৃ. ১২) থেকে সমাপ্ত]
(147855) নং প্রশ্নের উত্তরে ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে যে, শাফেয়ী মাযহাবের মতে নেসাব নির্ধারণে মোট সম্পত্তির মূল্যই বিবেচ্য; প্রত্যেক ব্যক্তির অংশ আলাদাভাবে নেসাব পূর্ণ করা শর্ত নয়। অতএব, যদি পুরো সম্পত্তির মূল্য নেসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তাহলে প্রত্যেক অংশীদারের ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে, যদিও তার নিজ অংশ নেসাব পরিমাণে না পৌঁছায়। এই মতটিই গ্রহণ করেছে ইসলামি ফিকহ একাডেমি এবং শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহও এই মতের দিকে ঝুঁকেছেন।
১৬- যে স্থাবর সম্পত্তি সাধারণ কল্যাণমূলক খাতে ওয়াকফকৃত; যেমন: দরিদ্রদের জন্য; তাতে কোনো যাকাত নেই। এর কারণ হলো: এতে ব্যক্তিগত মালিকানা নেই।
এ বিষয়ে আরও দেখুন (99694) ও (118309) নং প্রশ্নের উত্তর।
১৭- যাকাত ফরয হওয়ার ক্ষেত্রে সচল (সহজে বিক্রয়যোগ্য) ও অচল (যা সহজে বিক্রি হচ্ছে না) —এমন স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; যতক্ষণ পর্যন্ত তার এমন একটি মূল্য থাকে যাতে সেটি বিক্রি করা সম্ভব।
আর এটিই জমহুর (অধিকাংশ) উলামায়ে কেরামের মাযহাব বা মত। কারণ ব্যবসায়ী পণ্যের ওপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার ভিত্তি হলো— এগুলো সম্পদের সেই শ্রেণী যা বৃদ্ধির (মুনাফার) জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে, ঠিক মুদ্রার (টাকা-পয়সার) মতো; চাই তা বাস্তবে বৃদ্ধি পাক বা না পাক এবং তাতে লাভ হোক বা ক্ষতি হোক।
অতএব, ব্যবসায়িক মন্দাভাব যাকাতের উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না, যতক্ষণ ঐ পণ্যের একটি বাস্তবিক বাজারমূল্য থাকে এবং সেটা ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য হয়।
‘ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ’ (৮/১০২)-তে রয়েছে: ‘বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপিত জমির উপর প্রতি বছর যাকাত ওয়াজিব হবে। কারণ তা ব্যবসায়িক পণ্যের অন্তর্ভুক্ত। বছর শেষে এর বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে এবং উক্ত মূল্যের চল্লিশ ভাগের একভাগ (২.৫%) যাকাত পরিশোধ করতে হবে; চাই জমিটি সচল হোক কিংবা অচল হোক। কারণ বিক্রয় ও ব্যবসার জন্য প্রস্তুতকৃত সম্পদের ওপর যাকাত আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে দলীলসমূহ সাধারণ ও ব্যাপক।’[ইবনে বায, আলুশ শাইখ, আল-ফাওযান, আল-গুদাইয়্যান]
শাইখ আব্দুর রহমান আল-বাররাক বলেন: ‘স্থাবর সম্পত্তির অচলতা যাকাত মওকূফ করে না; বরং যাকাতের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। কারণ অচল জমি যে দামে ক্রয় করা সম্ভব সে দামেই এর মূল্য নির্ধারণ করা হবে, সেটা যত কমই হোক না কেন।’
তবে যদি স্থাবর সম্পত্তি এমনভাবে অচল হয়ে যায় যে মালিক সেটা বিক্রির জন্য উপস্থাপন করলেও কেনার জন্য কাউকে না পায়, তাহলে কিছু আলেমের মতে সে ক্ষেত্রে মালিক যখন সেটি বিক্রি করতে পারবে তখন বিগত এক বছরের যাকাত আদায় করবে।
দেখুন: (119602) নং প্রশ্নের উত্তর।
১৮- রিয়েল এস্টেটের শেয়ারগুলোরগুলোর যাকাত ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। কারণ এসব রিয়েল এস্টেট কোম্পানি
ব্যবসার উদ্দেশ্যেই জমি ক্রয় করে।
তাই শেয়ারহোল্ডারের উপর ওয়াজিব বছর শেষে এই কোম্পানিতে তার শেয়ার বা অংশের বর্তমান বাজার মূল্য নির্ধারণ করা এবং উক্ত মূল্যের চল্লিশ ভাগের একভাগ (২.৫%) যাকাত আদায় করা।
আরও জানতে দেখুন: (74989) ও (97124) নং প্রশ্নের উত্তর।
১৯- যে স্থাবর সম্পত্তি সংরক্ষিত করে রাখা হয় এবং যে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার শেয়ার ব্যর্থ (মালিক সেটিতে কোনো হস্তক্ষেপ বা লেনদেন করতে পারছে না), তাতে কোনো যাকাত নেই। এটি ‘দ্বিমার সম্পদের’ অন্তর্ভুক্ত।
‘তাই হাউজিং প্রকল্পে যে জমি সেবা প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা ইত্যাদির জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়, যে জমির মালিক এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না সে জমিতে কোনো যাকাত নেই। বরং যে তারিখে মালিককে তাতে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে, কেবল সেই দিন থেকেই যাকাতের বছর গণনা করা হবে।’[আল-মাসাইলুল মুস্তাজাদ্দাহ ফিয-যাকাহ (পৃ. ৮৭)]
অনুরূপ বিধান ব্যর্থ রিয়েল এস্টেট শেয়ারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিভিন্ন কারণে শেয়ার ব্যর্থ হতে পারে। যেমন: কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের প্রতারণা, রাষ্ট্রের আইনী প্রতিবন্ধকতা, জমি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা বা দাবি-দাওয়া। কারণ যেটাই হোক না কেন যদি শেয়ারহোল্ডার তার শেয়ারে বাস্তবে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তাহলে সে সম্পত্তিতে যাকাত নেই।
এ বিষয়ে (143816) নং প্রশ্নের উত্তর দেখুন।
২০- স্থাবর সম্পত্তির এক বছর পূর্ণ হওয়ার সময়ের বাজারদর অনুযায়ী এর মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এই মূল্য ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম হতে পারে অথবা ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হতে পারে।
এ বিষয়ে দেখুন (65515) নং প্রশ্নের উত্তর।
২১- স্থাবর সম্পত্তির যাকাত-বর্ষ গণনা সম্পত্তিটি কেনার সময় থেকে শুরু হবে না। বরং যে অর্থ দিয়ে সম্পত্তিটি ক্রয় করা হয়েছে সেই অর্থের বর্ষপূর্তিই স্থাবর সম্পত্তির যাকাত-বর্ষ।
এ বিষয়ে (161816) নং প্রশ্নের উত্তর দেখুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।