এক:
কেউ যদি কোনো গাড়ি কেনার পর তাতে এমন ত্রুটি পায় যা এর মূল্য কমিয়ে দেয়, তাহলে তার জন্য দুটি পথ খোলা থাকে: হয় সে গাড়িটি ফেরত দেওয়া নতুবা নিজের কাছে রেখে দিয়ে বিক্রেতার কাছ থেকে ঐ ত্রুটির সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিবে। ফকীহরা এই ক্ষতিপূরণকে 'আর্শ' (الأرش) বলেন।
কাশ্শাফুল ক্বিনা (৩/২১৮) বইয়ে আছে: “কেউ যদি চুক্তির সময় ত্রুটি সম্পর্কে না জেনে কোনো ত্রুটিযুক্ত পণ্য কেনে, তাহলে তার 'খিয়ার' (সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার) থাকবে। বিক্রেতা ঐ ত্রুটি সম্পর্কে জেনে সেটা গোপন করুন বা না জানুক (উভয় ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য)।... ক্রেতাকে পছন্দ করার সুযোগ দেওয়া হবে:
হয় সে পণ্যটি ফেরত দেবে। যাতে করে আগে সে যে ত্রুটির ব্যাপারে জানেনি সেটার প্রতিবিধান করতে পারে এবং পণ্যটি নিজের কাছে রেখে দিলে তার প্রাপ্য অধিকারে ঘাটতির যে ক্ষতি হবে সেটাকে দূর করতে পারে...।
আর ফেরত দিলে সে সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পাবে। যেহেতু ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে ক্রেতা সম্পূর্ণ ক্রয়মূল্য ফেরত নেয়ার অধিকারী হয়েছে।
অথবা সে পণ্যটি নিজের কাছে রেখে ত্রুটির জন্য 'আর্শ' (ক্ষতিপূরণ) গ্রহণ করবে; এমনকি ফেরত দেওয়া অসম্ভব না হলেও; বিক্রেতা 'আর্শ' (ক্ষতিপূরণ) দিতে রাজী থাকুক বা না-থাকুক।
কারণ ক্রেতা ও বিক্রেতা এই শর্তে সম্মত হয়েছিল যে, পণ্যের বিনিময়ে মূল্য পরিশোধ করা হবে। সুতরাং মূল্যের প্রতিটি অংশ পণ্যের প্রতিটি অংশের বিপরীতে নির্ধারিত। যেহেতু পণ্যটি ত্রুটিযুক্ত, সেহেতু পণ্যের একটি অংশ এখানে অনুপস্থিত। ফলে ক্রেতা সেই অনুপস্থিত অংশের বিনিময় বা ক্ষতিপূরণ (আর্শ) ফেরত পাওয়ার হকদার।"[সংক্ষেপে সমাপ্ত]।
এর থেকে বোঝা যায় যে, ত্রুটিজনিত কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই অধিকার (খিয়ার আল-আইব) সাব্যস্ত হবে; বিক্রেতা ঐ ত্রুটি সম্পর্কে জানুক বা না- জানুক, কিংবা ক্রেতা আগে গাড়ি পরীক্ষা করুক বা না করুক। যখনই ত্রুটি আবিষ্কৃত হবে ক্রেতা এই অধিকার লাভ করবে।
আপনার ভাই যদি ত্রুটি সম্পর্কে না জেনে থাকেন, তবে তার কোনো গুনাহ হবে না। কিন্তু ক্রেতার অধিকার থাকবে হয় গাড়িটি ফেরত দেওয়ার অথবা সেটি রেখে দিয়ে ক্ষতিপূরণ (আর্শ) দাবি করার।
আর্শ (ক্ষতিপূরণ) হলো: ত্রুটিহীন অবস্থায় গাড়িটির দাম কত হতো এবং এই ত্রুটিসহ গাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য কত— এই দুইয়ের যে পার্থক্য, সেটিই হলো আর্শ।
শাইখ ইবনে উছাইমীন আর্শ-কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:
“তার বক্তব্য: "আর্শ-এর বিনিময়ে": আর এটি হলো ত্রুটিহীন অবস্থার মূল্য ও ত্রুটিযুক্ত অবস্থার মূল্যের মধ্যবর্তী আনুপাতিক অংশ।
লেখক ‘আর্শ’-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: এটি একটি ‘কিশত’ বা অনুপাত। অর্থাৎ ত্রুটিহীন অবস্থার মূল্য ও ত্রুটিযুক্ত অবস্থার মূল্যের মধ্যবর্তী আনুপাতিক অংশ।
তিনি মূল্য (قيمة) শব্দটি ব্যবহার করেছেন, দাম (ثمن) বলেননি। ‘মূল্য’ ও ‘দাম’-এর মধ্যে পার্থক্য হলো— ‘মূল্য’ হলো সর্ব সাধারণের নিকট বস্তুটির মূল্য। আর ‘দাম’ হলো যার উপর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি এমন একটি জিনিস কেনেন যার বাজারমূল্য আট রিয়াল, কিন্তু আপনি তা ছয় রিয়ালে কিনলেন; তাহলে এখানে ‘মূল্য’ হলো আট রিয়াল, আর ‘দাম’ হলো ছয় রিয়াল।
এ কারণেই তিনি বলেছেন— ত্রুটিহীন ও ত্রুটিযুক্ত অবস্থার মূল্যের মধ্যবর্তী অনুপাত: অর্থাৎ এই বস্তুটির ত্রুটিহীন অবস্থার মূল্য নির্ধারণ করা হবে, এরপর ত্রুটিযুক্ত অবস্থার মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর ত্রুটিহীন ও ত্রুটিযুক্ত মূল্যের মাঝে যে ব্যবধান পাওয়া যাবে, সেটিই হবে ‘আর্শ’। অতঃপর দাম (ক্রয়মূল্য) থেকে সেই ব্যবধান কমিয়ে দেওয়া হবে।
আর এই মূল্য নির্ধারণ হতে হবে চুক্তির সময়ের হিসেবে; ত্রুটি জানার সময়ের হিসেবে নয়। কারণ চুক্তির সময় এবং ত্রুটি প্রকাশ পাওয়ার সময়ের ব্যবধানে বস্তুটির বাজারমূল্য পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।"[আশ-শারহুল মুমতি' থেকে সমাপ্ত (৮/৩১৮)]।
আপনার ভাইয়ের কাছে যে ব্যক্তি প্রথমে গাড়ীটি বিক্রি করেছিল তিনি তার কাছে তিনি গিয়ে ত্রুটির ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন।
দুই:
ইতঃপূর্বে যে মতটা বলা হল— ক্রেতার এখতিয়ার আছে, সে গাড়ি নিজের কাছে রেখে দিয়ে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে— এটা জুমহুরের (অধিকাংশ মাযহাবের) আলেমদের মত।
আর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার মত হলো তার ক্ষতিপূরণ নেওয়ার এখতিয়ার নেই। হয় সে পণ্য ফেরত দিবে নতুবা কোনো কিছু দাবী করা ছাড়া পণ্যটি নিজের কাছে রেখে দিবে। বিক্রেতার সম্মতি ছাড়া সে কোনো ‘আর্শ’ (ক্ষতিপূরণ) পাবে না।
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“তার (গ্রন্থকারের) ভাষ্য: অথবা সে ফিরিয়ে দিয়ে দাম ফেরত নিবে। অর্থাৎ আপনি চাইলে ক্রয়কৃত পণ্যটি ফেরত দিয়ে বিক্রয় বাতিল করে দিতে পারেন এবং দাম নিতে পারেন। অর্থাৎ ক্রেতার সামনে এখতিয়ার আছে। ফিকাহবিদদের মত এটাই।
কিন্তু শাইখুল ইসলাম বলেন: হয় সে কোনো কিছু দাবী করা ছাড়া পণ্যটি নিজের কাছে রেখে দিবে কিংবা পণ্যটি ফেরত দিবে। তবে ‘আর্শ’ (ক্ষতিপূরণ) পেতে হলে বিক্রেতার সম্মতি লাগবে। কেননা এটি একটি বিনিময়।
বিক্রেতা বলতে পারেন: আমি আপনার কাছে পণ্যটি বিক্রি করেছি। আপনি হয় পণ্যটি নিবেন কিংবা ফেরত দিবেন। কিন্তু, ‘আর্শ’ (ক্ষতিপূরণ) চাওয়া তো একটি নতুন চুক্তি।
শাইখুল ইসলাম যে মত গ্রহণ করেছেন সেটা যুক্তিসঙ্গত। তবে আমরা যদি জানতে পারি যে, বিক্রেতা প্রতারক, অর্থাৎ দোষ জানা সত্ত্বেও গোপন করেছে, তাহলে ক্রেতার ক্ষতিপূরণসহ রেখে দেওয়া কিংবা ফেরত দেওয়া এ দুটোর মাঝে এখতিয়ার থাকবে। যাতে করে প্রতারকের সাথে সংকীর্ণতর আচরণ করা হয়।
এভাবে একই কথা দোষ গোপন করার কারণে প্রাপ্ত এখতিয়ার ও মূল্যে ঠকানোর কারণে প্রাপ্ত এখতিয়ারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।” [আশ-শারহুল মুমতি (৮/৩১৯) থেকে সমাপ্ত]।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।