হাওযে কাউসার ও নহরে কাউসার

প্রশ্ন 48995

কাউসার কী? এটি কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

আরবী ভাষায় কাউসার শব্দটি দ্বারা আধিক্যের অতিশয়ন বুঝানো হয়।

শরীয়তে এর দুটি অর্থ রয়েছে:

প্রথম অর্থ:

এটি জান্নাতের একটি নহর বা নদী, যা আল্লাহ তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিয়েছেন। আল্লাহর বাণী: إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ  “আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি”[সূরা কাউসার: ১] দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউসারকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সহিহ মুসলিমে (৬০৭) বর্ণিত হয়েছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছিলাম। তিনি হঠাৎ সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন। তারপর মাথা তুলে মুচকি হাসলেন। আমরা বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! কীসে আপনাকে হাসালো?’ তিনি বললেন: ‘আমার উপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি পড়লেন:

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ

“আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি। অতএব, (কৃতজ্ঞতাস্বরূপ) তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়ো ও কুরবানী করো। আসলে তোমার প্রতি বিদ্বেষপোষণকারী লেজকাটা (নির্বংশ)।” তারপর বললেন: “তোমরা কি জানো কাউসার কী?” আমরা বললাম: ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালো জানেন।’ তিনি বললেন: “এটি এমন একটি নদী যার ওয়াদা আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। এতে রয়েছে প্রভূত কল্যাণ। এটি একটি হাওয যাতে পানি পান করতে আমার উম্মতের লোকেরা কিয়ামতের দিন আসবে।” সম্পূর্ণ হাদীস।

তিরমিযী (৩২৮৪)-তে ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কাউসার জান্নাতের একটি নদী। এর দুই তীর স্বর্ণের। আর এর পানির প্রবাহ মুক্তা ও ইয়াকূতের উপর।... পূর্ণ হাদীস”[তিরমিযী বলেন: হাদীসটি হাসান। শাইখ আলবানী সহীহু সুনানিত তিরমিযী (৩/১৩৫)-তে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]

দ্বিতীয় অর্থ:

এটি একটি বিশাল হাওয। হাওয মানে: জলাশয়। কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে এটি স্থাপন করা হবে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত এতে আসবে। এই হাওযের পানি জান্নাতের কাউসার নদী থেকে উৎসারিত হবে। তাই এর নাম হাওযে কাউসার। এর সপক্ষে দলীল হচ্ছে সহিহ মুসলিমে (৪২৫৫) বর্ণিত হাদীস, আবু যার রাদিয়াল্লাহু বর্ণনা করেন: “জান্নাত থেকে দুটি নালা হাওযে প্রবাহিত হবে।” হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে জান্নাতের পাশে হাওয স্থাপন করা হবে যেন জান্নাতের ভেতরের নদী থেকে এতে পানি প্রবাহিত হয়— যেমনটি ফাতহুল বারী (১১/৪৬৬) গ্রন্থে বলেছেন ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

কাউসার কি অন্যান্য নবীদের পরিবর্তে কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস; নাকি এমনটি নয়?

কাউসার নদী; যার থেকে হাওযে কাউসারে পানি প্রবাহিত হবে এমন কোনো কাউসারের কথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কোনো নবীর ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়নি। আল্লাহ সূরা কাউসারে এই কাউসারের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অনুগ্রহ করার কথা উল্লেখ করেছেন। তাই এটি অন্য নবীদের পরিবর্তে কেবল আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস— এই সম্ভাবনা দূরবর্তী নয়।

হাওযে কাউসার: আলেমদের মধ্যে মশহুর হলো: এটি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস। ইমাম কুরতুবী ‘আল-মুফহিম’ গ্রন্থে এ কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তিরমিযী (২৩৬৭) কর্তৃক সংকলিত সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “প্রত্যেক নবীরই হাওয রয়েছে। নবীগণ একে অন্যের সাথে তার হাওযে আগত ব্যক্তিদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করবে। আমি আশা করি যে আমিই হব সর্বোচ্চ-সংখ্যক।” হাদীসটির সকল সনদ দুর্বল। কিন্তু, কিছু আলেম উক্ত হাদীসের সনদের আধিক্যের কারণে হাদিসটিকে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন, যেমনটি শাইখ আলবানী ‘সহীহাহ’ (১৫৮৯) গ্রন্থে বলেছেন। কেউ কেউ এটি দুর্বল বলে গণ্য করেছেন। যদি হাদীসটি প্রমাণিত হয় তাহলে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য কেবল কাউসার নদী খাস হবে; হাওযে কাউসার নয়। আর যদি প্রমাণিত না হয় তাহলে হাওযও তার জন্য খাস হওয়া দূরবর্তী নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সহীহ সুন্নাতে জান্নাতে বিদ্যমান নদী ও হাশরের ময়দানে স্থাপিত হাওযের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণিত হয়েছে। জান্নাতের কাউসার নদীর বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে রয়েছে:

সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি যখন জান্নাতে হাঁটছিলাম তখন এমন এক নদীর কাছে এলাম যার দুই ধার ফাঁপা মুক্তার গম্বুজ। আমি বললাম: ‘হে জিব্‌রীল! এটা কি?’ তিনি বললেন: ‘এটা সেই কাউসার যা আপনার রব আপনাকে দিয়েছেন।’ এরপর ফেরেশতা হাত দিয়ে আঘাত করলেন তখন দেখলাম এর মাটি কিংবা ঘ্রাণ (রাবীর সন্দেহ) মিসকে আযফার (তীব্র সুগন্ধিযুক্ত)।”

মুসনাদ আহমদে (১২০৮৪) বর্ণিত হয়েছে: আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আমাকে কাউসার দেওয়া হয়েছে। এটি হচ্ছে মাটির উপর প্রবাহিত একটি নদী। এর দুই প্রান্ত মুক্তার গম্বুজ। এর কোনো ছাদ নেই। আমি দুই হাত দিয়ে এর মাটিতে আঘাত করে দেখতে পেলাম এর মাটি মিসকে আযফার (উত্তম মানের মিসক)। এর নুড়িপাথর হচ্ছে মুক্তা।”[হাদীসটি শাইখ আলবানী ‘সহিহাহ’ (২৫১৩) গ্রন্থে সহীহ বলে গণ্য করেন]

আনাস (রাঃ) থেকে মুসনাদ আহমাদের এক রেওয়ায়েত (১২৮২৮) এ বর্ণিত হয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাউসার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: ‘এটি এমন এক নদী যা আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন; অর্থাৎ জান্নাতে। এটি দুধের চেয়েও সাদা ও মধুর চেয়েও মিষ্টি। এতে এমন কিছূ পাখি আছে যেগুলোর গলা উটের গলার মত (লম্বা)। উমর বলে উঠলেন: ‘নিশ্চয় ঐ পাখিগুলো নেয়ামতপ্রাপ্ত।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘পাখিগুলোর ভক্ষণকারীরা আরও অধিক নেয়ামতপ্রাপ্ত।’[শাইখ আলবানী সহীহুত তারগীব ওয়াত-তারহীব (৩৭৪০) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]

অন্যদিকে হাশরের ময়দানে অবস্থিত হাওযের বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে রয়েছে:

বুখারী (৬০৯৩) ও মুসলিম (৪২৪৪) বর্ণনা করেন: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার হাওযের প্রশস্ততা এক মাসের পথের সমান। এর কোণগুলো সমান। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা। এর ঘ্রাণ মিসকের চেয়ে বেশি সুগন্ধযুক্ত এবং এর পানপাত্রগুলো হবে আকাশের তারকার মতো অধিক। যে ব্যক্তি এর থেকে পান করবে সে আর কখনও পিপাসার্ত হবে না।”

সহিহ মুসলিমে (৪২৬১) বর্ণনা করেন: আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এতে থাকা স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রগুলোর সংখ্যা হবে আসমানের তারকার সমান।” অন্য বর্ণনায়: “আসমানের তারকাসমূহের চেয়েও সংখ্যায় অধিক।”

সহিহ মুসলিমে (৪২৫৬) সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাওযের পানীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: “এটি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। জান্নাত থেকে দুটি নালা এতে পানি প্রবাহিত করবে। একটি স্বর্ণের ও অন্যটি রৌপ্যের।”

নিঃসন্দেহে হাওয সংক্রান্ত হাদীসগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির সনদে (বিপুল সংখ্যক সনদে) বর্ণিত হয়েছে, যেমনটা হাদীসবিদরা বলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পঞ্চাশের বেশি সাহাবী এ হাদিসগুলো বর্ণনা করেছেন। হাফেয ইবনে হাজার ফাতহুল বারী (১১/৪৬৮) গ্রন্থে এই হাদীসগুলোর বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখ করেছেন। এমনকি কুরতুবী সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আল-মুফহিমে বলেছেন: ‘শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত (মুকাল্লাফ) প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যা জানা ও বিশ্বাস করা জরুরী তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষভাবে একটি হাওয প্রদান করেছেন। এর নাম, বৈশিষ্ট্য ও পানীয়ের কথা প্রসিদ্ধ ও সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। এই হাদীসগুলো সমষ্টিগতভাবে অকাট্য জ্ঞানের তথ্য প্রদান করে।...’

হাশরের ময়দানে এর অবস্থানস্থল সম্পর্কে আলেমরা মতভেদ করেছেন:

কেউ কেউ বলেছেন এটি পুলসিরাতের পরে থাকবে। কেউ বলেছেন এটি পুলসিরাতের আগে থাকবে। শেষোক্ত মতটিই অধিকাংশের মত এবং প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। কারণ হাওযে আসবে এমন কিছু ব্যক্তিকে জাহান্নামে নেওয়া হবে। যদি এর অবস্থান পুলসিরাতের পরে হত তাহলে তারা এতে পৌঁছাতে পারত না। কেননা এর আগে তারা জাহান্নামে পড়ে যেত। আল্লাহর কাছে (জাহান্নাম থেকে) পানাহ চাই।

এই আলোচনার শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, সেটি হলো:

উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রত্যেক সদস্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাওয এবং তার সম্মানিত হাত থেকে পান করার সৌভাগ্য ও নিয়ামত লাভ করবে না। বরং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে এই উম্মতের কিছু মানুষকে হাওয থেকে সজোরে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাই। তাহলে কারা এর থেকে পান করবে, আর কাদেরকেই বা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হবে?

উক্ত প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, স্পষ্ট ও যথাযথ উত্তর দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; ফলে কোনো ওজর পেশকারীর কৈফিয়ত এবং পিছিয়ে পড়া ব্যক্তির প্রমাণ বাকি নেই। সহীহ মুসলিমে (৩৬৭) বর্ণিত আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একবার) কবরস্থানে এসে (কবরবাসীকে উদ্দেশ্য করে) বললেন:

السَّلامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاحِقُونَ

ঈমানদার কবরবাসীরা! তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অচিরেই আল্লাহর মর্জি আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো। এরপর তিনি বললেন: “নিশ্চয় আমাদের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছিল আমরা যদি আমাদের ভাইদেরকে দেখতে পেতাম।” তারা বলল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আপনার ভাই নই?’ তিনি বললেন: “তোমরা আমার সাহাবী। আর যারা আমাদের পরে আসবে তারা আমার ভাই।” তারা জিজ্ঞেস করল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমন লোকদের আপনার উম্মত হিসেবে কীভাবে চিনবেন, যারা এখনো (দুনিয়াতে) আগমন করেনি?’ তিনি বললেন: ‘তোমরা বল তো, যদি কোন ব্যক্তির একদল কুচকুচে কালো ঘোড়ার মধ্যে সাদা কপাল ও সাদা পা-বিশিষ্ট একটি ঘোড়া থাকে, তবে কি সেই ব্যক্তি তার ঘোড়াকে চিনতে পারবে না?’ তারা বলল: ‘হ্যাঁ; নিশ্চয় চিনতে পারবে।’ তিনি বললেন: ‘তারা কিয়ামতের দিন অযুর বদৌলতে সাদা চেহারা ও সাদা পা-বিশিষ্ট অবস্থায় আসবে। আমি তাদের আগেই হাওয কাওছারে উপস্থিত থাকব। একদল লোক আমার হাওয থেকে বিতাড়িত হবে, যেভাবে পথভোলা উটকে বিতাড়িত করা হয়। আমি তাদেরকে ডেকে বলব: তোমরা এদিকে এসো। তখন বলা হবে: ‘এসব লোক আপনার পর (দ্বীনকে) পরিবর্তন করেছে’ তখন আমি বলব: “দূর হও, দূর হও।”

সহীহ বুখারী (৬৫২৮) ও মুসলিমে (৪২৪৩) আবু হাযেম থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি সাহলকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: ‘আমি হাউযের কাছে তোমাদের আগে উপস্থিত থাকব। যে ব্যক্তি হাওযে পৌঁছবে সে পান করবে এবং যে পান করবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর আমার কাছে এমন কিছু লোক আসবে, যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। তারপর আমার ও তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হবে।’ বর্ণনাকারী আবু হাযেম বলেন, আমি যখন তাঁদের কাছে হাদীসটি পেশ করি, তখন নু’মান ইবনু আবি ‘আইয়্যাশ শুনে বললেন: তুমি কি সাহলকে এমনই বলতে শুনেছ? তিনি বলেন, আমি বললাম: হ্যাঁ! তিনি বললেন: আর আমি আবু সাঈদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তিনি আরো যোগ করেন: এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন: “তারা আমারই।” তখন তাকে বলা হবে: “আপনি জানেন না তারা আপনার পরে কী কাজ করেছে। আমি বলব: “আমার পরে যে পরিবর্তন করেছে, সে দূর হয়ে যাও, সে দূর হয়ে যাও।”

সহিহ বুখারী (২১৯৪) ও মুসলিমে (৪২৫৭)-তে বর্ণিত আছে: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি: অচেনা উটকে যেমনিভাবে হাওয থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সেভাবে আমি কিছু মানুষকে আমার হাওয থেকে সরিয়ে দিব।”

কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমাদের সমস্ত আলেম (আল্লাহ তাদের প্রতি রহম করুন) বলেন: কেউ যদি আল্লাহর দ্বীন ত্যাগ করে অথবা তাতে এমন কিছু উদ্ভাবন করে যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট নন এবং যার অনুমতি তিনি দেন না সে হাওয থেকে বিতাড়িত ও প্রত্যাখ্যাত হবে। এদের মধ্যে সর্বাধিক জঘন্যভাবে বিতাড়িত হবে এমন ব্যক্তি যে মুসলিমদের জামায়াত ত্যাগ করেছে এবং তাদের পথ ছেড়ে দিয়েছে। যেমন: খারেজীরা ও তাদের নানা দল-উপদল, রাফেজিরা তাদের বিভিন্ন বিভ্রান্তিসহ, মুতাযিলা সম্প্রদায় এবং আরো যারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। অনুরূপভাবে ঐ সমস্ত যালেম যারা যুলুম-সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে, সত্যকে চাপা দিয়েছে, সত্যপথের অনুসারীদের হত্যা ও লাঞ্ছনা করেছে, প্রকাশ্যে কবীরাহ গুনাহতে লিপ্ত হয়েছে ও তা নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে এবং বিচ্যুত-বিভ্রান্ত-বিদাতীদের দল ...।”[কুরতুবীর ‘আত-তাযকেরাহ’ (৩০৬)]

সুতরাং বান্দার করণীয় হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে প্রচেষ্টা করা এবং কোনো আদর্শিক বিষয়ে তাঁর বিরোধিতা না করা; তাহলে আশা করা যায় যে আল্লাহ তাকে এই বরকতময় হাওয থেকে পানি পান করার অনুগ্রহ দান করবেন। নতুবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে থেকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে বড় লাঞ্ছনা ও অপমানের বিষয় আর কীইবা হতে পারে! অথচ ব্যক্তি তখন এতটাই পিপাসার্ত হবে যে সে আর সহ্য করতে পারবে না। এমন অবস্থায় তাকে পবিত্র, ঠাণ্ডা পানি পান করা থেকে বাধা দেয়া হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দূরে সরে যাওয়া ও বিতাড়িত হওয়ার দোয়া করার মাধ্যমে তার শাস্তি, লাঞ্ছনা ও আফসোসের মাত্রা আরও বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে। আমরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। এমনটি কল্পনা করাও তো একপ্রকার শাস্তি। আর স্বচক্ষে দেখা ও এর সম্মুখীন হওয়া কেমন হতে পারে?!

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ও আমাদের মুসলিম ভাইদেরকে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং বিদআত ও অবাধ্যতা পরিহার করার তৌফিক দান করেন। ... আমীন। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের রব আল্লাহর জন্য।

দেখুন শাইখ উমর আল-আশক্বার রচিত ‘আল-কিয়ামাতুল কুবরা’ (পৃ. ২৫৭-২৬২), ‘আল-জান্নাহ ওয়ান-নার’ (পৃ. ১৬৬-১৬৭) এবং হাফেয ইবনে হাজার রচিত ‘ফাতহুল বারী’ (১১/৪৬৬)।

সূত্র

শেষদিবসের প্রতি ঈমান এবং কিয়ামতের আলামত

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android