বুধবার 17 রবীউছ ছানী 1442 - 2 ডিসেম্বর 2020
বাংলা

কোন ক্ষতির শিকার না হয়ে তাবিজ-কবচ থেকে মুক্ত হওয়া যায় কিভাবে?

প্রশ্ন

এক লোক আমার বাসায় কাজ করে। আমার পিতা তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, সে বদনজরে আক্রান্ত। তিনি তার জন্য একটি পাথর নিয়ে এসে বললেন: পাথরটি তোমার পকেটে রাখ; যাতে করে এটি তোমাকে বদনজর থেকে রক্ষা করে। কিছুদিন পর তার জন্য একটি কাগজ নিয়ে আসলেন সে কাগজে লেখা ছিল: ا, ب, ع, د (আরবী বর্ণ)। কাগজটির নীচে লেখা ছিল: الله الحامي (আল্লাহ্‌ই রক্ষাকারী)। আরও কিছু অবোধগম্য লেখা, নকশা ও আঁকিবুকি ছিল। আমরা এ কাগজটি থেকে মুক্ত হতে চাই। যেহেতু এটি শরিয়ত অনুমোদিত নয়। কিন্তু আমরা জানি না এর ক্ষতির শিকার না হয়ে কিভাবে এর থেকে মুক্ত হতে পারি। আমরা আপনাদের কাছ থেকে কিছু উপদেশ বাণী ও কল্যাণকর কথা আশা করি।

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

এক:

বদনজর লাগা সত্য; যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন। এর থেকে বাঁচতে হবে শরিয়ত অনুমোদিত রুকিয়া (ঝাড়ফুঁক) এবং প্রাত্যহিক দোয়াদুরুদের মাধ্যমে; কবিরাজ ও যাদুকরেরা যে কবচ দেয় ও তাবিজ লেখে সেগুলো দিয়ে নয়। বদনজরের স্বরূপ ও বাঁচার উপায় জানতে দেখুন: 20954 নং ও 11359 নং প্রশ্নোত্তর।

দুই:

বদনযর কিংবা যাদু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পাথর বা তাবিজ সাথে রাখা নিষিদ্ধ তাবিজ লটকানোর মধ্যে পড়বে। উকবা বিন আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, "একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একদল লোক উপস্থিত হল। তিনি দলটির নয়জনকে বাইআত করান। একজনকে বাইআত করাননি। তারা (সাহাবীরা) বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আপনি নয়জনকে বাইআত করিয়েছেন; একে করাননি কেন? তিনি বললেন: তার সাথে কবচ রয়েছে। তখন লোকটি হাত ঢুকিয়ে কবচটি ছিঁড়ে ফেলল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বাইআত করালেন। আর বললেন: যে ব্যক্তি কবচ লটকালো সে শির্ক করল।"[মুসনাদে আহমেদ (১৬৯৬৯), শাইখ আলবানী 'আস-সিলসিলাতুস সাহিহা' গ্রন্থে (৪৯২) হাদীসটিকে সহিহ বলেছেন]

উকবা বিন আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্‌সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন: "যে ব্যক্তি কবচ ঝুলাবে আল্লাহ্‌যেন তার উদ্দেশ্য পূর্ণ না করেন। যে ব্যক্তি ودعة(পাথর) লটকাবে আল্লাহ্‌যেন তাকে স্বস্তিতে না রাখেন।"[ইমাম আহমাদ (১৭৪৪০); আরনাউত হাদিসটিকে 'হাসান' বলেছেন]

ودعة: শব্দটি ودع শব্দের একবচনের রূপ। অর্থ- সমুদ্র থেকে সংগৃহীত পাথর যা বদনযরকে প্রতিহত করার জন্য তারা ঝুলাত।

খাত্তাবী (রহঃ) বলেন: "تَمِيْمَة (কবচ) সম্পর্কে বলা হয় এটি এক ধরণের পুঁতি যা তারা বিপদাপদকে প্রতিহত করার জন্য লটকাতো"।

বাগাভী বলেন: تَمَائِم শব্দটি تَمِيْمَة শব্দের বহুবচন। অর্থ- এক ধরণের পুঁতি যা বেদুইনরা তাদের সন্তানদের গলায় ঝুলিয়ে দিত; বদনযর থেকে বাঁচানোর বিশ্বাস থেকে; শরিয়ত সেটাকে বাতিল ঘোষণা করেছে"।[আত-তারিফাত আল-ইতিকাদিয়্যা (পৃষ্ঠা-১২১)]

আলেমগণের দুটো অভিমতের মধ্যে বিশুদ্ধ অভিমত হচ্ছে তাবিজ-কবচ লটকানো হারাম; এমনকি সেটা যদি কুরআন দিয়ে হয় তবুও। দেখুন: 10543 নং প্রশ্নোত্তর। আর পক্ষান্তরে, যে তাবিজে এমন বর্ণ ও অপরিচিত শব্দাবলী রয়েছে সে সব তাবিজ হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন মতভেদ নাই। সেগুলো যাদু হওয়া বা জ্বিনকে ব্যবহার করা থেকে নিরাপদ নয়।

তিন:

কোন তাবীয-কবচ ও যাদুকর্ম পাওয়া গেলে সেটা থেকে মুক্তি লাভের উপায় হল যদি এতে গিঁট থাকে তাহলে সেগুলো খুলে ফেলা। এর অংশগুলোর একটি থেকে অপরটিকে বিচ্ছিন্ন করা। এরপর পুড়িয়ে বা অন্য কোনভাবে সেগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা। যেহেতু যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) এর হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে যে, "এক ইহুদী লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসত এবং তিনি তাকে নিরাপদ মনে করতেন। সেই লোক তাঁকে যাদু করার জন্য সুতাতে গিঁট দিয়ে সেটা জনৈক আনসারী সাহাবীর কূপে রেখে দেয়। ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুদিন অসুস্থ থাকেন। আয়েশা (রাঃ) এর হাদিস অনুযায়ী: ছয়মাস। এরপর দুইজন ফেরেশতা তাঁকে দেখতে এল। তাদের একজন তাঁর মাথার কাছে বসল। অপরজন তাঁর পায়ের কাছে বসল। তাদের দুইজনের একজন বলল: তুমি কি জান তাঁর অসুখটা কী? সে বলল: অমুক লোকটি যে তাঁর কাছে আসত সেই লোক তাঁর জন্য সুতায় গিঁট মেরে (যাদু করে) অমুক আনসারীর কূপে ফেলে দিয়েছে। তিনি যদি সেই গিঁটের সুতাটি উঠানোর জন্য লোক পাঠান সে দেখতে পাবে যে, কূপের পানি হলুদ হয়ে গেছে। এরপর তাঁর কাছে জিব্রাইল (আঃ) আসলেন এবং সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস নাযিল করলেন। তিনি বললেন: জনৈক ইহুদী লোক আপনাকে যাদু করেছে। ঐ যাদুকর্মটি অমুক লোকের কূপে আছে। বর্ণনাকারী বলেন: তখন তিনি আলী (রাঃ) কে পাঠালেন। তিনি গিয়ে দেখলেন কূপের পানি হলুদ হয়ে গেছে। তিনি সুতাটি উঠালেন এবং সেটি নিয়ে হাযির হলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একটি করে আয়াত পড়ে গিঁটগুলো খোলার আদেশ দেন। তিনি আয়াত পড়ে পড়ে গিঁট খুলতে লাগলেন। যখনই কোন একটি গিঁট খোলা হত তখনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুটা হালকা বোধ করতেন। এভাবে তিনি সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে উঠেন।"[আলবানী 'সিলসিলাতুস সাহিহা' গ্রন্থে (৬/৬১৫) হাদিসটি বর্ণনা করেন এবং হাদিসটিকে হাকেম (৪/৪৬০), নাসাঈ (২/১৭২), আহমাদ (৪/৩৬৭) ও তাবারানীর হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেন।]

শাইখ বিন বায (রহঃ) বলেন: "যাদুকর (কবিরাজ) যে তদবির করেছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। উদাহরণতঃ যদি জানা যায় যে, সে কিছু চুল কোন এক স্থানে রেখেছে কিংবা চিরুনীতে রেখেছে কিংবা অন্য কোথাও রেখেছে; যদি জানা যায় যে, সে অমুক স্থানে রেখেছে তাহলে ঐ জিনিসটি সে স্থান থেকে সরিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে ও ধ্বংস করে ফেলতে হবে। এর ফলে যাদুর ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাবে এবং যাদুকর যা করতে চেয়েছে সেটা ভণ্ডুল হয়ে যাবে।"মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাতিস্‌ শাইখ বিন বায (৮/১৪৪)]

আপনার বাবার কাছে যে কাগজটি আছে সেটা মুক্ত হতে হবে ঐ কাগজটি ছিঁড়ে পুড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে। এর সাথে আপনার বাবাকে তাবিজ ঝুলানো ও তাবিজের সাথে সম্পৃক্ত থাকার গুনাহ থেকে তওবা করার উপদেশ দিতে হবে।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব