লেনদেনের চুক্তিগুলোতে জরিমানার শর্ত করা বৈধ; তবে এমন লেনদেনগুলোতে নয় যেগুলোর মূল আর্থিক দায় বাকীতে (নগদে নয়)। এ কারণে কেউ যদি (বাকীতে) কিস্তিতে কোনো পণ্য খরিদ করে, সে যদি কিস্তি পরিশোধে দেরী করে তাহলে তার উপর মূল্যের অতিরিক্ত কিছু পরিশোধের শর্ত করা জায়েয নেই। কারণ এই বৃদ্ধিটা হবে ঋণের উপর বৃদ্ধি, যা স্পষ্ট সুদ। পক্ষান্তরে, যে লেনদেনগুলো ‘বাকী’-তে নয় সেগুলোর ক্ষেত্রে বাস্তবে ঘটিত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে জরিমানার শর্ত করা জায়েয আছে। জরিমানার শর্তের প্রসঙ্গে ইসলামী ফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে:
“এক: আইনের ভাষায় ‘জরিমানার শর্ত’ হলো: লেনদেনকারী পক্ষদ্বয়ের কোনো এক পক্ষ তার করণীয় বাস্তবায়ন না করলে কিংবা বাস্তবায়নে বিলম্ব করলে এর ফলে অপর পক্ষের যে ক্ষতি হবে সেটার বিনিময়ের ব্যাপারে উভয় পক্ষ একমত হওয়া।
দুই: কাউন্সিল ‘বাইয়ে সালাম’ (সালাম ক্রয়-বিক্রয়) সংক্রান্ত পূর্ববর্তী ৮৫ (৯/২) নম্বর সিদ্ধান্তে উল্লেখিত ‘জরিমানার শর্ত’(penalty clause)-এর ব্যাপারে আগের সিদ্ধান্তসমূহ পুনর্ব্যক্ত করছে। যার মূল পাঠ হলো: “মুসলাম ফিহি বা পণ্য হস্তান্তরে বিলম্বের কারণে ‘সালাম’ চুক্তিতে কোনো জরিমানার শর্ত আরোপ করা বৈধ নয়। কারণ এটি একটি ঋণ। আর ঋণ পরিশোধে বিলম্বের কারণে অতিরিক্ত অর্থ শর্ত করা শরিয়তে বৈধ নয়।
এবং ‘ইস্তিসনা’ (পণ্য তৈরির অর্ডার) চুক্তি সংক্রান্ত তার ৬৫ (৩/৭) নম্বর সিদ্ধান্তটি পুনর্ব্যক্ত করছে। যার মূল পাঠ হলো: “চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয়ের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ‘ইস্তিসনা’ চুক্তিতে জরিমানার শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা বৈধ, যদি না সেখানে কোনো অনিবার্য পরিস্থিতি বা নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত বাধা বিদ্যমান থাকে।
এবং ‘বাই বিত-তাকসিত’ (কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয়) সংক্রান্ত মজলিসের ৫১ (৬/২) নম্বর সিদ্ধান্তটি পুনর্ব্যক্ত করছে। যার মূল পাঠ হলো: “যদি ক্রেতা (ঋণগ্রহীতা) নির্ধারিত সময়ের পর কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব করে, তবে পূর্বশর্ত অনুযায়ী হোক কিংবা কোনো শর্ত ছাড়া হোক প্রাপ্য ঋণের ওপর অতিরিক্ত কোনো কিছু (জরিমানা) প্রদানে তাকে বাধ্য করা বৈধ নয়। কারণ তা নিশ্চিতভাবেই হারাম ‘সুদ’।
তিন: জরিমানার শর্ত মূল চুক্তির সমসাময়িক হওয়া বৈধ। অনুরূপভাবে পরবর্তী একটি চুক্তির মাধ্যমে কিন্তু ক্ষতি সংঘটনের আগে হওয়াও বৈধ।
চার: সব ধরনের লেনদেনের চুক্তিতে জরিমানার শর্ত করা বৈধ; তবে এমন লেনদেনগুলো ছাড়া যেগুলোর আর্থিক দায় বাকীতে (নগদে নয়)। কারণ এটা সুস্পষ্ট সুদ।
এর উপর ভিত্তি করে বলা যায়, ঠিকাদারির চুক্তিতে ঠিকাদারের জন্য এমন শর্ত করা জায়েয। আমদানির চুক্তিতে আমদানিকারকের জন্য এমন শর্ত করা জায়েয এবং ‘ইস্তিসনা’ (পণ্য তৈরির অর্ডার) চুক্তিতে প্রস্তুতকারক বা বিক্রেতার জন্য এমন শর্ত করা জায়েয; যদি তারা চুক্তি ভঙ্গ করে কিংবা বাস্তবায়নে বিলম্ব করে।
আর যা জায়েয নয় তাহলো: উদাহরণস্বরূপ কিস্তিতে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে দেনাদার ব্যক্তি অবশিষ্ট কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব করার কারণে এ ধরনের জরিমানার শর্ত করা। বিলম্বের কারণ হোক সেটা আর্থিক সংকট কিংবা পরিশোধে গড়িমসির। অনুরূপভাবে ‘ইস্তিসনা’ (পণ্য তৈরির অর্ডার) চুক্তিতে অর্ডারকারী বা ক্রেতার জন্য এমন শর্ত করা জায়েয নেই, যদি ক্রেতা তার উপর যা আবশ্যক সেটা পরিশোধে বিলম্ব করে।
পাঁচ: যে ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেয়া বৈধ সে ক্ষতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে: আর্থিক প্রকৃত ক্ষতি, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রকৃত যে ক্ষতি হয়েছে এবং যে সুনিশ্চিত লাভ তার হাতছাড়া হয়েছে। আর অবস্তুগত ক্ষতি বা শাস্তিমূলক ক্ষতি এর অন্তর্ভুক্ত হবে না।
ছয়: জরিমানার শর্ত বাস্তবায়ন করা যাবে না যদি প্রমাণিত হয় যে, যার বিরুদ্ধে এই শর্ত করা হয়েছে চুক্তিটি তার অনিচ্ছায় কোনো কারণে লঙ্ঘিত হয়েছে কিংবা প্রমাণিত হয় যে, এই চুক্তি লঙ্ঘনের ফলে যার পক্ষে শর্ত করা হয়েছিল তার কোনো ক্ষতি হয়নি।
সাত: উভয়পক্ষের যে কোনো এক পক্ষের দাবির প্রেক্ষিতে আদালত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বদলে দিতে পারে, যদি এর যৌক্তিক কোনো কারণ পাওয়া যায় কিংবা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে থাকে। [ইসলামী ফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্তসমূহ থেকে সমাপ্ত (পৃ. ৩৭১), কাতারের ওয়াক্বফ মন্ত্রণালয়ের ছাপা]
অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছে সৌদি আরবের উচ্চ উলামা পরিষদ। কারণ আল-বুহুসুল ইসলামিয়্যার ম্যাগাজিনে (২/১৪৩) জরিমানার শর্ত সংক্রান্ত গবেষণাপত্রগুলো পর্যালোচনা করার পর উল্লেখ করা হয়েছে:
এই পরিষদ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: আর্থিক লেনদেনের চুক্তিতে জরিমানার যে শর্ত করা হয়, সেটা ধর্তব্য ও সঠিক এবং এটা মেনে চলা ওয়াজিব; যদি না এমন কোনো ওজর থাকে যেটার কারণে শরীয়ত কর্তৃক আবশ্যককৃত শর্ত না মানার সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে ওজর দূর না হওয়া পর্যন্ত আবশ্যকতা মওকূফ থাকবে। আর যদি প্রচলিত প্রথার বিবেচনায় জরিমানার পরিমাণ এত বেশি হয় যে, সেটি দ্বারা আর্থিক হুমকি দেয়াই উদ্দেশ্য এবং শরয়ী মূলনীতি যেমনটা দাবি করে তার চেয়ে দূরবর্তী হয়; তাহলে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া লাভ ও ঘটিত ক্ষতি বিবেচনা করে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ পুনঃ নির্ধারণ করতে হবে। এ নিয়ে মতভেদ হলে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নির্ধারণ করানোর জন্য শরয়ী বিচারকের শরণাপন্ন হতে হবে। এটি আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীর বাস্তবায়নে: “তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।” এবং তাঁর বাণী: “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করবে, এটা তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী।” আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “ক্ষতি করা নেই, ক্ষতির বিপরীতেও ক্ষতি করা নেই।” আল্লাহই তৌফিক দান করেন। দরূদ ও সালাম মুহাম্মাদ, তার পরিবার ও সাহাবীদের উপর। [সমাপ্ত]
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হলো যে, আপনাদের উপর ক্রেতা জরিমানার শর্ত দিতে পারবে, যদি আপনারা চুক্তি মোতাবেক নির্ধারিত সময়ের ভেতর পণ্য হস্তান্তরে বিলম্ব করেন। তবে পণ্যের মূল্য পরিশোধে সে বিলম্ব করলে আপনারা এমন শর্তারোপ করতে পারবেন না। যে কোম্পানি আপনাদের কাছে রপ্তানি করে তাদের উপরও আপনারা জরিমানার শর্তারোপ করতে পারবেন, যদি আপনাদের মাঝে সম্পাদিত চুক্তির ব্যতিক্রম কিছু ঘটে যায়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।