এক:
সম্মানিত ভাই,
আপনি নিজের চিকিৎসা সর্বোত্তম যেভাবে করতে পারেন তা হলো: আপনি মাধ্যম ও মাধ্যমগুলোর স্রষ্টার মাঝে পার্থক্য করতে পারা। আল্লাহ তাআলা হলেন মাধ্যমগুলোর নির্ধারক ও স্রষ্টা। আর মানুষ, চাকুরি, কাজ— এ সব কিছু নিছক মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলাই রিযিকদাতা। তিনি রিযিকের জন্য বিভিন্ন মাধ্যম নির্ধারণ করে রেখেছেন। যে ব্যক্তির আকীদায় সমস্যা রয়েছে, সে মাধ্যমকে মাধ্যমের স্রষ্টার মর্যাদা দিয়ে ফেলে। ইসলামে একজন মুসলিম কখনো মাধ্যমের স্রষ্টার দিকে না তাকিয়ে কেবল মাধ্যমের উপর নির্ভর করে না। আবার ইসলামে মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ও মাধ্যম পরিত্যাগ করাও সমর্থন করা হয় না।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “একদল আলেম যা বলেছেন সেটা জানা জরুরী। তাদের বলেন: মাধ্যমের প্রতি অতি মনোনিবেশ তাওহীদের ক্ষেত্রে শির্ক। মাধ্যমকে মাধ্যম বলে স্বীকৃতি প্রদান না করা আকলের ক্ষেত্রে কমতি। 'মাধ্যম' থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শরীয়তের ব্যাপারে আপত্তি। তাওয়াক্কুল ও আশাবাদ এমন একটি ভাব যা তাওহীদ, আকল ও শরীয়তের দাবীর সমন্বয়ে গঠিত।
এর ব্যাখ্যা হলো: মাধ্যমের দিকে মনোনিবেশ মানে অন্তর দিয়ে মাধ্যমের উপর নির্ভর করা, অন্তরে আশা করা এবং এর উপরই ভরসা করা। সৃষ্টিকুলের মাঝে কেউ এটা পাওয়ার অধিকার রাখে না। কারণ সৃষ্টির কেউ স্বতন্ত্র নয়। সৃষ্টির অংশীদার ও প্রতিপক্ষ থাকা অনিবার্য। তদুপরি, যদি মাধ্যমের স্রষ্টা মাধ্যমকে সেবা দেয়ার জন্য অনুগত না করতেন, তাহলে সে অনুগত হত না। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে আল্লাহ সব কিছুর প্রভু ও মালিক। আসমান-যমীন, এই দুইয়ের মাঝে যা আছে, গ্রহ-নক্ষত্র এবং এগুলো যা কিছুকে ধারণ করে আছে এই সব কিছুর একজন স্রষ্টা ও পরিচালক রয়েছেন।”[মাজমুউল ফাতাওয়া (৮/১৬৯)]
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন: “সুতরাং বান্দার উচিত তার অন্তরকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল করা। কোনো মাধ্যমের উপর নয়। আল্লাহই দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণকর মাধ্যমসমূহ তার জন্য সহজ করে দিবেন। যদি মাধ্যমগুলো তার সাধ্যের মধ্যে থাকে এবং মাধ্যমগুলো গ্রহণ করতে সে আদিষ্ট হয়, তাহলে সে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার সাথে ঐ মাধ্যমগুলো গ্রহণ করবে। যেভাবে সে ফরয বিধানগুলো আদায় করে। যেভাবে সে শত্রুর সাথে জিহাদ করে। তথা সে অস্ত্র বহন করে, যুদ্ধের ঢাল পরিধান করে। শত্রুকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সে আদিষ্ট জিহাদ বাদ দিয়ে কেবল তাওয়াক্কুল করাকে যথেষ্ট মনে করে না। যে ব্যক্তি আদিষ্ট মাধ্যম গ্রহণ করে না: সে অক্ষম, অবহেলাকারী ও নিন্দিত।”[মাজমুউল ফাতাওয়া (৮/৫২৮, ৫২৯) থেকে সমাপ্ত]
দুই:
উদাহরণস্বরূপ আপনার ক্ষেত্রে আপনার পিতা-মাতা আপনার খরচপ্রাপ্তির 'মাধ্যম'। আপনার এটা জানা আবশ্যক যে, আল্লাহই তাদেরকে 'মাধ্যম' বানিয়েছেন। আপনার উপর এই বিশ্বাস করাও আবশ্যক যে আল্লাহ আপনাকে রিযিক দেওয়া ও আপনার খরচ বহন করার একাধিক মাধ্যম নির্ধারণ করতে সক্ষম। আপনার আশেপাশে তাকান। সকল ছাত্রের খরচ কি তাদের পরিবার বহন করছে?! উত্তর: নিঃসন্দেহে না। আপনি যদি তাদের রিযিকের মাধ্যমসমূহ দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন তা অনেক, বহুবিধ ও বহুরূপ। সুতরাং রিযিক কেবল পিতা-মাতার মাঝে সীমিত নয় যে আপনি রিযিকের 'মাধ্যম' ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করবেন। তাদের দুইজনকে রিযিকদাতা আল্লাহর সমমর্যাদা দেয়ার অধিকার আপনার নেই। কারণ সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে তফাৎ অনেক। মাধ্যমের স্রষ্টা ও মাধ্যমের মাঝে ব্যবধান বহুদূর।
কুরআনে এসেছে:
أَمْ مَنْ هَذَا الَّذِي يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَهُ بَلْ لَجُّوا فِي عُتُوٍّ وَنُفُورٍ
“তিনি যদি তার রিযিক বন্ধ করে দেন, তাহলে কে আছে যে তোমাদেরকে রিযিক দিতে পারে? (কেউ নেই,) বরং (নির্বোধের মত) তারা অবাধ্যতা ও অনীহার মধ্যে অটল রয়েছে।”[সূরা মুলক: ২১]
আপনি আল্লাহর এই বাণীটি নিয়ে একটু ভাবুন, তাহলে দেখবেন বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট। এখানে আল্লাহ তাআলা কাফেরদেরকে জানাচ্ছেন যে রিযিকের মাধ্যমসমূহ যেমন: বৃষ্টি, নদ-নদী, ঝরনাসমূহ ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি রিযিক নির্ধারণ করেন। তিনি যদি চান তাহলে এই মাধ্যমগুলোকে বাধা দিতে পারেন। বৃষ্টিপতনকে তিনি থামিয়ে দিতে পারেন। নদীপ্রবাহকে তিনি স্থবির করে দিতে পারেন। ঝরনাকে তিনি শুকিয়ে দিতে পারেন। কার পক্ষে রিযিকের এই মাধ্যমগুলোকে বাধা দেয়া সম্ভব? কিংবা এই মাধ্যমগুলোকে এনে দেয়া সম্ভব!
আপনার ইস্যুটির নিরসনে নিম্নোক্ত আয়াত নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করুন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا . وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
“যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য (সংকট থেকে) বের হওয়ার পথ করে দেবেন। আর তাকে এমন জায়গা থেকে জীবিকার ব্যবস্থা করবেন যা সে ধারণাও করে না। যে আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার উদ্দেশ্য পূরণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি মাত্রা ঠিক করেছেন।”[সূরা ত্বালাক: ২,৩]
আপনি মনে করছেন যে, আপনার বাবা-মা মারা গেলে আপনার খরচ বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ আল্লাহ আপনাকে লক্ষ্য করে বলছেন, যদি বান্দা আল্লাহকে ভয় করে, তথা তাঁর আদেশ পালন করে, তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে তাহলে আল্লাহ তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দিবেন যা সে ভাবেনি! অর্থাৎ রিযিকের এমন সব 'মাধ্যম' সহজ করে দিবেন যা তার ভাবনায়ও ছিল না, যা সে কল্পনাও করেনি। যদি বান্দা আল্লাহ তাআলার ওপর প্রকৃত তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুঃশ্চিন্তাগুলো দূর করে দেবেন এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। আর এটিই আপনার অবস্থার প্রকৃত চিকিৎসা—যেখানে আপনি রিযিকের মাধ্যম ও মাধ্যমের স্রষ্টার মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছেন এবং যে দুঃশ্চিন্তা ও উদ্বেগে আক্রান্ত হয়েছেন তার প্রকৃত চিকিৎসা এটাই।
আপনি এই ইমামের বক্তব্যটুকু পড়ুন, এর মাঝে আপনি আপনার উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার উপযুক্ত ঔষধ পাবেন। শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা’দী রাহিমাহুল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেন:
وَإِنْ يَتَفَرَّقَا يُغْنِ اللَّهُ كُلًّا مِنْ سَعَتِهِ وَكَانَ اللَّهُ وَاسِعًا حَكِيمًا
“আর যদি তারা (স্বামী-স্ত্রী) পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে আল্লাহ তাঁর প্রাচুর্য (সম্পদ) থেকে প্রত্যেককে অভাবমুক্ত করবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাবান।”[সূরা নিসা: ১৩০]
‘উক্ত আয়াতে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে যে বান্দার উচিত তার আশাকে কেবল আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করা। আল্লাহ যদি তার জন্য রিযিক ও প্রশান্তির কোনো মাধ্যম নির্ধারণ করে রাখেন, তাহলে এর জন্য তার উচিত আল্লাহর প্রশংসা করা এবং আল্লাহ যেন এতে বরকত দেন সেই দোয়া করা। যদি সেই 'মাধ্যম' নিঃশেষ হয়ে যায় বা অক্ষম হয়ে যায়, তাহলে এর জন্য তার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে না। কেননা এই মাধ্যমটি অসংখ্য মাধ্যমের মধ্য থেকে একটি মাধ্যম মাত্র। ঐ নির্দিষ্ট মাধ্যমের জন্য বান্দার রিযিক থেমে থাকবে না। বরং তার জন্য এর থেকে উত্তম ও উপকারী মাধ্যম খুলে যাবে। হয়তো তার জন্য একাধিক মাধ্যম খুলে যাবে। সুতরাং তার উচিত হলো সর্বাবস্থায় নিজের রবের অনুগ্রহ ও দয়ার প্রতি আশাবাদকে সামনে রাখা ও মনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা। আশা নিয়ে অধিক পরিমাণে দোয়া করা। কারণ আল্লাহ তাঁর নবীর বচনে বলেছেন: “বান্দা আমার ব্যাপারে যেমন ধারণা করে আমি তেমনই। যদি সে আমার ব্যাপারে উত্তম ধারণা করে, তাহলে আমি তার জন্য সে রকম। আর যদি সে আমার ব্যাপারে মন্দ ধারণা করে, তাহলে আমি তার জন্য সে রকম।”[হাদীসটি আহমাদ বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহিহুত তারগীব’ (৩৩৮৬) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন] তিনি আরও বলেন: "তুমি যতক্ষণ আমার কাছে দোয়া করবে এবং আমার কাছে আশা করবে, আমি ততক্ষণ তোমার থেকে সংঘটিত সকল কিছু ক্ষমা করে দিব। আমি কোনো কিছুর পরোয়া করব না।”[হাদীসটি তিরমিযী (২৮০৫) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহীহুত তিরমিযী’ গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন][তাইসীরুল লাত্বীফুল মান্নান ফী-খুলাসাতি তাফসীরিল আহকাম (পৃ. ৮৫) আল-মাআরেফ ছাপা]
আল্লাহর বান্দা!
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসটি মনোযোগ দিয়ে ভাবুন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন: “তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথাযথ তাওয়াক্কুল করতে তাহলে তিনি তোমাদেরকে সেভাবে রিযিক দিতেন যেভাবে তিনি পাখিকে রিযিক দেন। পাখি সকালে খালি পেটে বের হয়ে যায় সন্ধ্যায় ভরপেটে ফেরে।”[হাদীসটি আহমাদ (২০৫) ও তিরমিযী (২৩৪৪) বর্ণনা করেছেন। শাইখ আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]
জেনে রাখুন, আপনার বিষয়টি হচ্ছে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বাস্তবায়ন করা, তাঁর উপরেই সত্যিকার আশা করা এবং তাঁকে আঁকড়ে ধরা। কারো মৃত্যু কিংবা কারো জীবনকে নয়। কোন সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহর চিরায়ত নিয়ম কারো জীবন কিংবা মৃত্যুর কারণে পরিবর্তিত হয় না!!
তিন:
সর্বশেষ একটি বিষয়ের মাধ্যমে আপনার সাথে আলোচনা শেষ করব। সেটি হচ্ছে: হতে পারে আপনার মনে যত দুঃশ্চিন্তা আসছে, যত দুর্ভাবনায় আপনি আক্রান্ত হচ্ছেন এটি আপনার দ্বারা ঘটে যাওয়া পাপের কারণে। আপনি নিজের দিকে নজর দিন। আপনি কোন গুনাহতে লিপ্ত থাকলে সেটার প্রতিকার করুন। কারণ যার অবস্থা এমন আল্লাহ তাকে দ্রুত শাস্তি দিয়ে দিতে পারেন। সহশিক্ষা রয়েছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কত ধরনের অনিষ্ট ও পাপ বিদ্যমান তা আমরা জানি। তাই আপনি এমন পাপাচার থেকে বিরত থাকতে ও সেগুলো থেকে তাওবা করতে সচেষ্ট হোন।
ইমাম ইবনু কাইয়্যিমিল জাওযিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
‘পাপের অন্যতম শাস্তি হলো: আল্লাহ তা‘আলা পাপীর অন্তরে ভয় ও আতঙ্ক ঢেলে দেন। ফলে আপনি সবসময় তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় দেখতে পাবেন। নিশ্চয় আল্লাহর আনুগত্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দুর্গ। যে ব্যক্তি এই দুর্গে প্রবেশ করে সে দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তি থেকে নিরাপত্তা লাভকারীদের একজন। আর যে ব্যক্তি এই দুর্গ থেকে বেরিয়ে যায় ভয়-ভীতি তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে তার ক্ষেত্রে ভয় নিরাপত্তায় পরিণত হয়। আর যে আল্লাহর অবাধ্যতা করে তার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ভয়ে রূপ নেয়। তাই আপনি পাপী ব্যক্তিকে এমন অবস্থায় পাবেন যেন তার অন্তর পাখির দুই ডানার মাঝে কাঁপছে। বাতাসে দরজা ধাক্কা দিলে সে ভাবে: ‘আমাকে ধরতে এসেছে।’ পদধ্বনি শুনলে সে আশঙ্কা করে: ‘মৃত্যুর দূত চলে এসেছে।’ সে মনে করে: যে কোনো চেঁচামেচি বা চিৎকারই তার বিরুদ্ধে, যে কোনো অমঙ্গলই তাকে টার্গেট করছে। তাই, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তাকে সব কিছুর ভয় থেকে নিরাপত্তা দেন। আর যে আল্লাহকে ভয় করে না আল্লাহ তাকে সব কিছু থেকেই ভয় দেখান।’[আল-জাওয়াবুল কাফী (পৃ. ৫০) থেকে সমাপ্ত]
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।