নাপাকি থেকে সতর্ক থাকার বাধ্যবাধকতা
একজন মুসলিমের জন্য নাপাকি থেকে দূরে থাকা এবং যথাসাধ্য তা থেকে সতর্ক থাকার চেষ্টা করা ওয়াজিব। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং বললেন: ‘জেনে রেখো, এই দুই জনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তবে কোনো বড় বিষয়ের জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। তাদের একজন চোগলখুরি করে বেড়াত। আর অন্যজন তার প্রস্রাব থেকে নিজেকে বাঁচাত না।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে: “অন্যজন প্রস্রাব থেকে পবিত্র থাকত না।”[হাদীসটি মুসলিম (তাহারাত/৪৩৯) বর্ণনা করেন]
‘প্রস্রাব থেকে পবিত্র থাকত না’ এর অর্থ হলো: সে তা এড়িয়ে চলত না এবং এ থেকে সতর্ক থাকত না। তাই দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা জায়েজ এই শর্তে যে, প্রস্রাবের ছিটা কাপড় বা শরীরে লাগার আশঙ্কা থাকবে না। (9790) নম্বর প্রশ্নের উত্তর দেখুন।
প্রশ্নের অন্য অংশগুলোর জবাব:
কাপড়ে নাপাকি লাগলে কি গোসল ওয়াজিব হয়?
১. কারো কাপড়ে নাপাকি লাগলে তার উপর গোসল ওয়াজিব হয় না। কারণ নাপাকি লাগা ওযু বা গোসল ভঙ্গের কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। গোসল ওয়াজিব হয় বড় অপবিত্রতার কারণে, আর ওযু ওয়াজিব হয় ছোট অপবিত্রতার কারণে। নাপাকি কোনো ‘হাদাস’ (অপবিত্রতার অবস্থা) নয়। তাই কেউ যদি পবিত্র অবস্থায় থাকে এবং তার কাপড়ে নাপাকি লেগে যায়, তাহলে সে অপবিত্র হয়ে যায় না। এ অবস্থায় তার কর্তব্য শুধু নাপাকি দূর করা।
বান্দাকে তার কাপড় থেকে নাপাকি দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলার বাণী:
وَثِيابَكَ فطهِّر
“এবং তোমার পোশাক পবিত্র রাখো।”[সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৪]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋতুস্রাবের রক্ত কাপড়ে লাগলে বলেছেন: “তুমি তা (রক্ত) ঘষে ফেলবে, তারপর পানি দিয়ে রগড়াবে, তারপর তা ধুয়ে ফেলে সেই কাপড়ে নামায পড়বে।”[হাদীসটি বুখারী (হায়েয/২৯৭) বর্ণনা করেন] যদি নাপাকিযুক্ত বস্তুটি নিংড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে তা নিংড়ানো আবশ্যক।
নাপাকি কীভাবে দূর করব?
২. নাপাকি ধুয়ে দূর করতে হবে যতক্ষণ না এর চিহ্ন দূর হয়ে যায়। কাপড়ে নাপাকি লাগলে শুধু কাপড়ের যে অংশে নাপাকি লেগেছে সেইটুকু ধোয়া ওয়াজিব। বাকি অংশ ধোয়া জরুরি নয় এবং কাপড় পরিবর্তন করাও আবশ্যক নয়। তবে কেউ যদি কাপড় পরিবর্তন করতে চায়, তাতে কোনো অসুবিধা নেই।
নাপাকিযুক্ত কাপড়ে নামাজ পড়ার বিধান
৩. নাপাকিযুক্ত কাপড়ে নামায পড়ার বিধান প্রসঙ্গে বলব: জেনে রাখা আবশ্যক: নাপাকি থেকে পবিত্রতা নামায শুদ্ধ হওয়ার শর্ত। কেউ যদি নাপাকি থেকে পবিত্র না হয়ে নামায পড়ে, তাহলে তার নামায বাতিল। কারণ সে নাপাকি সহকারে নামায পড়েছে। আর কেউ যদি নাপাকি সহকারে নামায পড়ে তাহলে সে এমনভাবে নামায পড়ল যেভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল চাননি এবং নির্দেশ করেননি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাই্হি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত: “যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করে যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।”
কাপড়ে নাপাকি লাগার বিবিধ অবস্থা
১. যদি ব্যক্তি নিশ্চিত হয় যে নাপাকি কাপড়ের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে লেগেছে, তাহলে সেই স্থানটি ধোয়া ওয়াজিব।
২. যদি প্রবল ধারণা হয় যে নাপাকি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে লেগেছে।
৩. যদি নাপাকের স্থান সম্পর্কে কেবল সম্ভাবনা থাকে।
তাহলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থায় ব্যক্তিকে অনুসন্ধান করতে হবে। যে স্থানে নাপাকি লেগেছে বলে প্রবল ধারণা হয়, সেটি ধুয়ে ফেলবে। দেখুন: ইবনে উছাইমীনের ‘আশ-শারহুল মুমতি’ (২/২২১)।
সামান্য (অল্প) নাপাকির বিধান
কিছু আলেম বলেছেন: কোনো অবস্থাতেই সামান্য নাপাকি ক্ষমার্হ নয়।
আবার কেউ কেউ বলেছেন: সব ধরনের নাপাকির সামান্য পরিমাণ ক্ষমার্হ। এটি ইমাম আবু হানীফার মাযহাব ও শাইখুল ইসলাম (ইবনে তাইমিয়্যা)-র নির্বাচিত অভিমত। বিশেষতঃ এমন বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে যেগুলোর দ্বারা মানুষ প্রায়শই আক্রান্ত হয়। কারণ এগুলো থেকে সতর্ক থাকা ও পবিত্র হওয়া কষ্টকর, অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো কষ্ট চাপিয়ে দেননি।”[সূরা আল-হাজ্জ: ৭৮]।
তাই আবু হানীফা ও শাইখুল ইসলামের অভিমতই সঠিক। যেসব সামান্য নাপাকি থেকে বাঁচা কঠিন বলে ক্ষমার্হ, তার মধ্যে রয়েছে প্রস্রাব ঝরা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সামান্য প্রস্রাব, যদি সে যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। দেখুন ইবনে উছাইমীনের ‘আশ-শারহুল মুমতি’ (১/৩৮২)।
আর সামান্যের সীমানা হলো— মধ্যম শ্রেণির মানুষ যেটাকে 'বেশি' বলে গণ্য করে, সেটা বেশি; আর যেটাকে তারা 'সামান্য' বলে গণ্য করে, সেটা সামান্য।"
সুতরাং বলা যায়: মূলনীতি হলো কারো কাপড়ে প্রস্রাবের কয়েক ফোঁটা লাগলে সে যতটুকু লেগেছে ততটুকু ধুয়ে ফেলবে যতক্ষণ না নাপাকি দূর হওয়ার প্রবল ধারণা হয়। আর যেটুকু ধোয়া যায়নি সেটা উপরে উল্লিখিত ক্ষমার যোগ্য সামান্য নাপাকির অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
নাপাকি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলে এর বিধান
নাপাকি সম্পর্কে যে জানত না তার ব্যাপারে শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহুকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
“যদি সে নামায শেষ হওয়ার পরেই কেবল নাপাকির বিষয়টি জানতে পারে, তাহলে তার নামায শুদ্ধ। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে থাকা অবস্থায় জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁকে জানালেন যে তাঁর জুতায় ময়লা রয়েছে, তখন তিনি জুতা খুলে ফেললেন। কিন্তু নামায নতুন করে শুরু করলেন না। একইভাবে কেউ যদি নামাযের আগে নাপাকির কথা জেনে থাকে, তারপর ভুলে গিয়ে নামায পড়ে ফেলে এবং নামাযের পরে মনে পড়ে; তাহলেও তার নামায শুদ্ধ। এটি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর আলোকে: “হে আমাদের রব, আমরা যদি বিস্মৃত হই বা ভুল করি তাহলে আমাদেরকে পাকড়াও করো না। ...”
আর যদি নামাজে থাকা অবস্থায় কাপড়ে নাপাকি আছে কিনা এমন সন্দেহ হয়, তাহলে নামায ছেড়ে দেওয়া জায়েয নেই; চাই সে ইমাম হোক বা একাকী নামাযী। বরং তার কর্তব্য নামাজ পূর্ণ করা।"[ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে বায (১২/৩৯৬-৩৯৭)]
নাপাকি দূর হয়েছে কিনা এ বিষয়ে সন্দেহের বিধান
৪. নাপাকি দূর হয়েছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের মাসআলা: কাপড়ে নাপাকি লাগলে এটি মূল অবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ মূল অবস্থাটি নিশ্চিত বিষয়, যতক্ষণ না তা দূর হয়। সুতরাং যদি সন্দেহ হয় যে নাপাকি দূর করা হয়েছে কিনা, তাহলে নিশ্চিত বিষয়ের উপর নির্ভর করবে। আর তা হলো নাপাকি এখনো দূর হয়নি।
এর বিপরীতে, যদি কেউ নিশ্চিত থাকে যে সে পবিত্র, তারপর সন্দেহ হয় যে তার কাপড়ে নাপাকি লেগেছে কিনা; তাহলে বলা হবে যে মূল অবস্থা হলো পবিত্রতা। কারণ সেটাই নিশ্চিত।
শাইখ ইবনে উছাইমীন বলেন: ‘একজন মানুষের কাপড়ের মূল অবস্থা হলো পবিত্র হওয়া, যতক্ষণ না শরীর বা কাপড়ে নাপাকি লাগার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। এই মূলনীতির সপক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী প্রমাণ দেয়, যখন এক ব্যক্তি নামাযে কিছু অনুভব করার (অর্থাৎ অযু ভাঙার) অভিযোগ করলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “সে ততক্ষণ পর্যন্ত নামায ছাড়বে না যতক্ষণ না শব্দ শুনতে পায় বা গন্ধ পায়।”
তাই যদি ব্যক্তি বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়, তাহলে মূল অবস্থা হলো পবিত্রতা। কাপড়ে নাপাকি লাগার প্রবল ধারণা হতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ নিশ্চিত না হওয়া যায় ততক্ষণ মূল অবস্থা হলো পবিত্রতা বহাল থাকা।’[ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন (১১/১০৭)]
৫. কাপড়ে নাপাকি থাকা অবস্থায় কেবল নামায পড়া নিষিদ্ধ, এমনকি যদি অপবিত্র অবস্থা (হাদাস) থেকে পবিত্র থাকে তবুও। অন্যান্য আমল, যেমন কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদত; সেগুলো নিষিদ্ধ নয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।