এক:
মানবজাতির প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি দয়া ও মমতায় ভরপুর। এছাড়া অন্য কোনো কিছু হতেই পারে না। কারণ দ্বীন ইসলাম আল্লাহ তাআলা প্রণীত সর্বশেষ ধর্ম। আল্লাহ সকল মানুষকে এই ধর্মে প্রবেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া আল্লাহ এই দ্বীন ওহী হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং সবচেয়ে দয়ালু সৃষ্টি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে অবতীর্ণ করেছেন। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর কিতাবে তাঁর বাণী:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
“আমি আপনাকে সারা বিশ্ববাসীর জন্য রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।”[সূরা আম্বিয়া: ১০৭]
আমরা এর সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত থেকে দলীল পেশ করার প্রয়াশ পাব। এ ভাবটি বেশি কিছু দিক থেকে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। যথা:
১. ইসলামের প্রতি দাওয়াত দান এবং শির্ক-কুফর থেকে মানুষকে রক্ষা করা।
কুরআন-সুন্নাহতে মুসলিমদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন তারা মানুষকে আল্লাহর তাওহীদের দিকে আহ্বান করে এবং এই পথে অর্থ, সময় ও জীবন ব্যয় করে। আর এটি কেবল বিশ্ববাসীর প্রতি রহমতের কারণেই। যাতে করে তাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে রক্ষা করে মানুষের প্রভুর দাসত্বের দিকে উদ্ধার করা যায় এবং দুনিয়াবী সংকীর্ণতা থেকে বের করে এনে দুনিয়া-আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে ধাবিত করা যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তোমাদের মধ্যে যেন এমন একটি দল থাকে যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে এবং ভালো কাজ করতে আদেশ দিবে ও খারাপ কাজ করতে নিষেধ করবে। এরাই সফলকাম।”[সূরা আলে-ইমরান: ১০৪]
২. পিতা-মাতা কাফের হলেও তাদের প্রতি আনুগত্য ও সদাচরণ।
এমনকি তারা যদি তাদের সন্তানদেরকে ইসলাম থেকে বিমুখ করার সংগ্রাম চালায় ও শির্ক-কুফরের নির্দেশ দেয় তবুও! এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
وَوَصَّيْنَا الْأِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْناً عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ . وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفاً وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
“আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই। কিন্তু যদি তারা উভয়ে এই চেষ্টা করে যে, তুমি আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে সৎভাবে সঙ্গ দেবে। আর যে আমার দিকে ফিরে এসেছে তার পথ অনুসরণ করবে। অবশেষে আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন (নির্ধারিত আছে)। তখন আমি তোমাকে তোমাদের অতীত কৃতকর্ম অবহিত করব।”[সূরা লুকমান: ১৪-১৫]
৩. প্রতিবেশীদের প্রতি সদাচরণের উপদেশ, যদিও তারা অমুসলিম হয়ে থাকে।
আপনি ইসলামের মতো এমন কোনো ধর্ম, আদর্শ বা আইন পাবেন না যা প্রতিবেশীকে গুরুত্ব দেওয়া, তার দেখভাল করা, তার অধিকার ও সম্মান সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئاً وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالاً فَخُوراً
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো; তাঁর সাথে কোনো কিছু শরীক করো না। পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। আর আত্মীয়, এতিম, মিসকীন, কাছের প্রতিবেশি, দূরের প্রতিবেশি, পাশের সঙ্গি, পথিক ও তোমাদের ডানহাত যাদের মালিক (দাস-দাসীদের) তাদের সাথেও (সদ্ব্যবহার করো)। আল্লাহ কখনো দাম্ভিক ও বড়াইকারীকে পছন্দ করেন না।”[সূরা নিসা: ৩৬]
কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “নাওফ আশ-শামী বলেছেন: কাছের প্রতিবেশি মুসলিম, দূরের প্রতিবেশী ইহুদি- খ্রিষ্টান। আমি বলব: এর উপর ভিত্তি করে বলা যায়, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করা আদিষ্ট ও পছন্দনীয় বিষয়; হোক সে মুসলিম কিংবা কাফের। এটাই সঠিক মত। সদ্ব্যবহার হতে পারে সমবেদনা জানানো অর্থে, আবার উত্তম সঙ্গ দেয়া, কষ্ট না দেয়া ও তাদের পক্ষে দাঁড়ানো অর্থে। বুখারী বর্ণনা করেন: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “জিবরীল আমাকে প্রতিবেশির ব্যাপারে এত উপদেশ দিল যে আমি ভাবতে লাগলাম যে সে তাকে ওয়ারিশই বানিয়ে দিবে।” আবু শুরাইহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আল্লাহর কসম, সে ঈমানদার হবে না। আল্লাহর কসম, সে ঈমানদার হবে না। আল্লাহর কসম, সে ঈমানদার হবে না।” তাকে জিজ্ঞাসা করা হল: ‘হে আল্লাহর রাসূল, কে?” তিনি বলেন: “যার প্রতিবেশি তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ না।”
এটি সকল প্রতিবেশির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কষ্ট দেওয়া পরিত্যাগের বিষয়টি তিনবার বলে জোরদার করেছেন। তিনি এটাও জানিয়েছেন যে, কেউ প্রতিবেশিকে কষ্ট দিলে পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার হতে পারবে না। সুতরাং মুমিনের উচিত তার প্রতিবেশিকে কষ্ট দেওয়া থেকে সতর্ক থাকা, আল্লাহ ও তার রাসূল যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর তারা যা করার ব্যাপারে সন্তুষ্ট এবং বান্দাদেরকে যা করতে উৎসাহ দিয়েছেন তা করতে আগ্রহী হওয়া।”[তাফসীরুল কুরতুবী (৫/১৮৩-১৮৪)]
৪. হারবী নয় এমন কাফেরে সাথে ন্যায়সঙ্গত ও উত্তম আচরণ
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
لا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
“যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সাথে সদাচার করতে ও তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।”[সূরা মুমতাহিনা: ৮]
শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা’দী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে আত্মীয়-অনাত্মীয় মুশরিকদের প্রতি সদাচরণ, সম্পর্ক রক্ষা, ভালো প্রতিদান দেওয়া, ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা থেকে নিষেধ করেন না, যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে, তোমাদেরকে ঘর থেকে বের না করে দেয়। এমনটি হলে তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষায় কোনো আপত্তি নেই। এ অবস্থায় তাদের সাথে সম্পর্কে কোনো সতর্কতার বিষয় বা অনিষ্ট নেই।” [তাফসীরুস সা’দী (পৃ. ৮৬৫)]
৫. চুক্তিবদ্ধ কাফের হত্যা হারাম হওয়া এবং এ ব্যাপারে তীব্র হুমকি।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ কাফেরকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যাবে।”[হাদীসটি বুখারী (২৯৯৫) বর্ণনা করেন]
হাফেয ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: যে ব্যক্তির মুসলিমদের সাথে চুক্তি রয়েছে; হোক সেটি জিযইয়া, শাসকের সাথে সন্ধি কিংবা মুসলিমের থেকে প্রাপ্ত নিরাপত্তা।’[ফাতহুল বারী (১২/২৫৯)]
৬. চুক্তিবদ্ধ কাফেরের প্রতি যুলুম ও তাকে সাধ্যাতীত কিছু চাপিয়ে দেওয়া হারাম হওয়া।
হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তির উপর যুলুম করবে বা তার প্রাপ্য কম দিবে কিংবা তাকে তার সামর্থ্যের বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামাতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হব।”[হাদীসটি আবু দাউদ (৩০৫২) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহু আবি দাউদ গ্রন্থে এটিকে সহীহ বলে গণ্য করেন]
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘আমাদের দেশে কাফেরদের মাঝে কেউ যদি কাজ অথবা ব্যবসার জন্য আসে এবং তাকে সেটি করার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে সে হয় চুক্তিবদ্ধ নতুবা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত। তার উপর আক্রমণ করা জায়েয নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: “কেউ যদি চুক্তিবদ্ধ কাউকে হত্যা করে, তাহলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।” আমরা মুসলিম, আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণকারী, ইসলামে চুক্তিবদ্ধ ও নিরাপত্তাপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান করার যে দাবি রয়েছে সেটির আমরা সম্মান করি। কেউ যদি এটি না মানে, তাহলে সে ইসলামের অনিষ্ট করল এবং মানুষের সামনে ইসলামকে সন্ত্রাস, গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতার রূপে উপস্থাপন করল। অন্যদিকে যে ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলে, চুক্তি-অঙ্গীকারকে সম্মান করে, তার উত্তমতা ও সফলতা আশা করা যায়।”[ফাতাওয়াশ শাইখ আল-উছাই্মীন (২৫/৪৯৩)]
৭. আক্রমণ হারাম এবং ন্যায় আবশ্যক।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلاَ يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُواْ
“তোমাদেরকে পবিত্র মসজিদে (কাবায়) যেতে বাধা দিয়েছিল বলে কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে বাড়াবাড়ি করতে প্ররোচিত না করে।”[সূরা মায়েদা: ২]
তিনি আরো বলেন:
وَلاَ يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلاَّ تَعْدِلُواْ اعْدِلُواْ هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন ন্যায়বিচার না করতে তোমাদেরকে প্ররোচিত না করে।”[সূরা মায়েদা: ৮]
শাইখ শাঙ্কীত্বী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘এই আয়াতগুলোতে উত্তম চরিত্রের যে উদাহরণ এবং যে আপনার ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, তার ক্ষেত্রে আপনি আল্লাহর আনুগত্য করার যে নির্দেশ রয়েছে তা দেখুন।’[আদ্বওয়াউল বায়ান (৩/৫০)]
দুই:
উপর্যুক্ত বিবরণের পাশাপাশি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া প্রয়োজন তা হলো:
১. উপর্যুক্ত আলোচনার বিপরীত যে সমস্ত কাজ বিশ্বে দেখা যায় তা ব্যক্তিদের নিজেদের কাজের ফলাফল। এটি ইসলামের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা যাবে না। প্রত্যেক ধর্মেরই এমন অনুসারী রয়েছে যে এর শিক্ষার বিপরীতে যায় এবং বিধানগুলো মেনে চলে না।
২. পৃথিবী ও এর অধিবাসীরা ইতিমধ্যে ‘কাফেরদের’ যে কাজকর্ম দেখেছে তা কোনোভাবে মুসলিমদের কাজের সাথে তুলনীয় হতে পারে না। যে দুই বিশ্বযুদ্ধের নিহতের পরিমাণ ছিল সাত কোটি, তা ‘খ্রিষ্টান’দের ছিল।
ক্রুসেডের সময় লক্ষ লক্ষ মুসলিমরা খ্রিষ্টানদের হাতে নিহত হয়। এছাড়া সমাজতন্ত্রী, ইহুদি, হিন্দু, শিখ ধর্মের অনুসারীদের হাতেও মুসলিমরা নিহত হয়। এর বিবরণ দিলে দীর্ঘ হবে। এই হত্যাকাণ্ড কেউ অস্বীকার করবে না, কেবল যার আকল কাজ করে না সেই অস্বীকার করবে।
তারপর মুসলিমদের ভূমি দখল ও এর ধন-সম্পদ লুট সব মিল্লাতের কাফেরদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। সুতরাং মানবতার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, ভালোবাসা ও দয়ার ব্যাপারে আলোচনা করার সময় এই বিষয়টি যেন মাথায় থাকে। ইনসাফগার ইতিহাসবিদেরা যেন মুসলিমদের বিভিন্ন অঞ্চল বিজয় ও ক্রুসেডারদের হামলাগুলোর তুলনা করে দেখে উভয়টির অবস্থা কেমন ছিল। তাহলে তারা দয়া ও নিষ্ঠুরতা, ভালোবাসা ও ঘৃণা এবং জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্টরূপে দেখতে পাবে।
৩. আমরা ইতঃপূর্বে ইসলামে কাফেরদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে দয়া, ভালোবাসা ও অনুগ্রহের ক্ষেত্রে যে সমস্ত বিধি-বিধান উল্লেখ করেছি তার অর্থ কখনো এই না যে, এতে ইসলামের এমন কিছু বিধান থেকে আমরা নিজেদেরকে মুক্ত ঘোষণা করব যেগুলোকে আমাদের দ্বীনের বিকৃতিকারী কিছু মানুষ গোপন করে ফেলে। তন্মধ্যে রয়েছে:
ক. ইসলামে কাফেরদের প্রতি আন্তরিক সৌহার্দ্য ও মিত্রতা হারাম। যে ব্যক্তির আকল-বুদ্ধি আছে সে কাফেরদের প্রতি আমরা যে সদাচরণ, ন্যায়, দয়া ও অনুগ্রহের ব্যাপারে আদিষ্ট সেটির সাথে কাফেরদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসার যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার পার্থক্য করতে পারবে। কাফেরদের প্রতি ভালোবাসার এই নিষেধাজ্ঞার কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ব্যাপারে তাদের কুফরী এবং ইসলাম গ্রহণ না করা।
খ. আমাদের জন্য আমাদের মেয়ে, বোন ও নারীদেরকে কোনো কাফেরের কাছে বিয়ে দেওয়া হালাল হবে না, সে কাফের যে ধর্মেরই হোক না কেন। কিন্তু আমাদের জন্য সচ্চরিত্রা কিতাবী ইহুদি-খ্রিষ্টান নারীদের বিয়ে করা জায়েয হবে। নিঃসন্দেহে উক্ত বিধানে আকীদা ও তাওহীদের মৌলিক ভূমিকা রয়েছে। কিতাবী নারী মুসলিম পুরুষকে বিবাহ করলে তার ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে মুসলিম নারী অমুসলিম পুরুষকে বিবাহ করলে তার দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উক্ত বিধানটি এই মহান দ্বীনের আনীত রহমতের সাথে খুবই মানানসই; কিতাবী নারীর প্রতি রহমত যেন সে ইসলাম গ্রহণ করে, আর মুসলিম নারীর প্রতি রহমত যেন সে দ্বীন ত্যাগ না করে।
গ. ইসলামে কাফেরকে ইসলামে প্রবেশে জোর-জবরদস্তি করা হয়নি। কারণ ইখলাস ও সত্যবাদিতা ইসলাম কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন: لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ “দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি নেই।”
ঘ. ইসলামে বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর নিক্ষেপ করা, চোরে হাত কাটা, অপবাদদাতাকে চাবুকাঘাত করার বিধান রয়েছে। আমরা এই সমস্ত বিধান নিয়ে সংকোচ বোধ করি না। বরং আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি যে পুরো পৃথিবী এই বিধানগুলো বাস্তবায়নের মুখাপেক্ষী। যারা এগুলো বাস্তবায়ন করে, তারা নিজেদের সম্মান, অর্থ-সম্পদ ও জীবনের ক্ষেত্রে অনিষ্টকর কোনো কিছু থেকে রক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ জীবনযাপন করে। আকলবানদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই বিধানগুলো নিয়ে ভাবে, সে জানে যে এই বিধানগুলো প্রারম্ভিকভাবে প্রণীত হয়েছে যাতে করে কেউ এগুলো করার দুঃসাহস না দেখায়। যে ব্যক্তি অন্যান্য জাতির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে, তাদের মাঝে ধর্ষণ, চুরি, হত্যার আধিক্য দেখতে পাবে, সে বুঝতে পারবে যে এমনটি থামানো খুবই প্রয়োজন, আর ইসলামের বিধানসমূহেই আছে প্রজ্ঞা, রহমত, ইনসাফ ও কল্যাণ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।