বৃষ্টির কারণে মাগরিব ও এশার নামায একত্রে পড়ার পক্ষে সুন্নাহ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। মুসলিম (৭০৫) বর্ণনা করেন: সাঈদ ইবনে জুবাইর বর্ণনা করেন: ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় কোনো ভীতি বা বৃষ্টি ছাড়াই যোহর ও আসরের নামায এবং মাগরিব ও এশার নামায একত্রে পড়েছেন। আমি ইবনে আব্বাসকে প্রশ্ন করলাম: কেন তিনি এমনটি করলেন? তিনি উত্তর দিলেন: ‘যাতে করে তার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হয়।’
বৃষ্টিপাতের উপর কিয়াস করে তুষারপাতের কারণেও দুই নামায একত্রে আদায় করা জায়েয।
কাশ্শাফুল ক্বিনা’ গ্রন্থে এসেছে: ‘বৃষ্টির হুকুমে পড়ায় তুষারপাত ও শীতের কারণে দুই এশা (মাগরিব ও এশা) একত্রে আদায় করা জায়েয, দুই যোহর (যোহর ও আসর) নয়। হিমশৈলের কারণেও দুই এশা একত্রে আদায় করা যাবে; কারণ হিমশৈল তীব্র শীতের কারণে জমে।’
শাইখ ইবনে উছাইমিন রাহিমাহুল্লাহ শীতের কারণে দুই নামায একত্র করা প্রসঙ্গে বলেন: ‘এটা জায়েয নেই। তবে যদি শীতের সাথে এমন তীব্র বায়ু প্রবাহিত হয় যা মানুষকে কষ্ট দেয় কিংবা যদি এর সাথে তুষারপাতও হয় তাহলে জায়েয। কারণ তুষারপাত নিঃসন্দেহে মানুষকে কষ্ট দেয়; এমন অবস্থায় নামায একত্রে আদায় করা জায়েয।’[পূর্ণ বক্তব্য]
জেনে রাখুন, দুই নামায একত্রে পড়ার বৈধতা দেয় এমন ওজরের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি প্রশস্ততা আছে হাম্বলী মাযহাবে। আমরা সেই ওজরগুলো এখানে উল্লেখ করছি যাতে পুরোপুরি উপকৃত হতে পারেন।
বুহূতী রাহিমাহুল্লাহ ‘কাশ্শাফুল ক্বিনা’ গ্রন্থে (২/৫) বলেন:
‘দুই নামায একত্র করা সংক্রান্ত অধ্যায়। ... যোহর ও আসরের নামাযকে দু'টির যে কোনো একটির ওয়াক্তে একত্রে পড়া জায়েয। মাগরিব ও এশার নামাযকে দু'টির যে কোনো একটির ওয়াক্তে একত্রে পড়া জায়েয। এই চার নামায একত্রে পড়া যায়। যোহরের সাথে আসর এবং মাগরিবের সাথে এশা। ওয়াক্তদ্বয়ের যে কোনো একটির ওয়াক্তে। প্রথমটির ওয়াক্তে একত্র করা হলে একে বলা হয় جمع التقديم (অগ্রিম একত্রিকরণ)। আর দ্বিতীয়টির ওয়াক্তে একত্র করা হলে একে বলা হয় جمع التأخير (বিলম্বে একত্রিকরণ)।
আট অবস্থায়:
প্রথম অবস্থা: এমন মুসাফিরের জন্য যে নামায কসর (হ্রাস) করে পড়ে। অর্থাৎ যার জন্য চার রাকাতকে হ্রাস করা জায়েয এই শর্তে যে, সফরটি মাকরূহ বা হারাম হবে না।
দ্বিতীয় অবস্থা: এমন অসুস্থ ব্যক্তি যিনি একত্রে না পড়লে তার কষ্ট হয় ও তাকে দুর্বলতা পায়। ইস্তিহাযাগ্রস্ত নারীর জন্য দুই নামায একত্র পড়ার বৈধতা প্রমাণিত। 'ইস্তিহাযা' এক প্রকার ঋতুস্রাবজনিত রোগ। ইমাম আহমদ এভাবে দলীল দেন যে, অসুস্থতা সফর থেকে মারাত্মক। তিনি নিজে সূর্যাস্তের পরে শিঙ্গা দিয়ে, রাতের খাবার খেয়ে, তারপর দুই নামায একত্রে পড়েছেন।
তৃতীয় অবস্থা: এমন দুগ্ধদাত্রী মা যাকে ব্যাপকহারে নাপাকির কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। অর্থাৎ প্রত্যেক নামাযের জন্য নাপাকি থেকে পবিত্র হওয়ার কষ্ট। আবুল মা’আলী বলেন: তার অবস্থা অসুস্থ ব্যক্তির মতোই।
চতুর্থ অবস্থা: প্রত্যেক নামাযের জন্য পানি দ্বারা কিংবা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনে অক্ষম ব্যক্তি। কারণ মুসাফির ও রোগীর জন্য কষ্টের কারণে নামায একত্রিতকরণের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আর প্রত্যেক নামাযেই পবিত্রতা অর্জনে অক্ষম ব্যক্তি তাদের অনুরূপ।
পঞ্চম অবস্থা: যার ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে এই বক্তব্যের মাধ্যমে: অথবা ওয়াক্ত জানতে অক্ষমের জন্য। যেমন: অন্ধ ব্যক্তি অথবা ভূগর্ভে আটক ব্যক্তি। ইমাম আহমদ এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর-রি’আয়াহ গ্রন্থকার এটি উল্লেখ করেছেন। আল-ইনসাফ প্রণেতাও এতে সীমিত থেকেছেন।
ষষ্ঠ অবস্থা: ইস্তিহাযাগ্রস্ত নারী ও তার অনুরূপ ব্যক্তি। যেমন: অনবরত পেশাব-ঝরা রোগী, কিংবা সর্বদা কামরস নির্গত হওয়া রোগী কিংবা সর্বদা নাক থেকে রক্ত পড়ে এমন ও অনুরূপ রোগী। কারণ হামনা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, তিনি যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইস্তিহাযার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন তখন নবীজী তাকে বললেন: “তোমার যদি সক্ষমতা থাকে তাহলে যোহর পিছিয়ে এবং আসর এগিয়ে এনে গোসল করে উভয় নামায একত্রে পড়বে। তারপর মাগরিব পিছিয়ে এবং এশা এগিয়ে এনে গোসল করে দুই নামায একত্রে পড়বে।”[ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং সহিহ বলে গণ্য করেন] যে ব্যক্তির অনবরত পেশাব ঝরে বা যার অবস্থা এমন, সেও একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে।
সপ্তম ও অষ্টম অবস্থা: যে ব্যক্তির এমন ব্যস্ততা বা ওজর আছে যার দরুন জুমার নামায ও জামাতের সাথে নামায ত্যাগ করা বৈধ হয়ে যায়। যেমন: নিজের জীবন, সম্মান বা সম্পদ হানির আশঙ্কাকারী। অথবা নামায একত্রে না পড়লে যার জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে জীবিকা তার একান্ত প্রয়োজন।’
এই সমস্ত ওজর যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার নামায একত্রে পড়ার বৈধতা প্রদান করে।
আর মাগরিব ও এশার নামায একত্রে পড়ার বৈধতা দেয় এমন বিশেষ ছয়টি ওজর রয়েছে, সেগুলোর বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন:
‘দুই এশার নামায একত্রে পড়া জায়েয এমন বৃষ্টির কারণে যা কাপড়, জুতা কিংবা শরীর ভিজিয়ে দেয় এবং যা কষ্টদায়ক হয়ে থাকে। বুখারী তার সনদে বর্ণনা করেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বৃষ্টিমুখর রাতে মাগরিব ও এশার নামায একত্রে পড়েন। আবু বকর, উমর ও উসমানও অনুরূপ করেন। শিশির পড়লে কিংবা কাপড় ভিজে না এমন হালকা বৃষ্টি হলে; মাযহাব অনুসারে নামায একত্রিত করা জায়েয নয়; কেননা সেটি কষ্টদায়ক নয়।
তুষারপাত ও শীতের কারণে দুই এশার নামায একত্রে পড়া জায়েয আছে; তবে দুই যোহরের নামায নয়। যেহেতু এগুলো বৃষ্টির হুকুমে পড়ে।
হিমশৈল জমার কারণে দুই এশার নামায একত্রে পড়া জায়েয। কারণ হিমশৈল জমে তীব্র শীতের কারণে। এছাড়া কাদা ও তীব্র শীতল বায়ুপ্রবাহের কারণে দুই এশার নামায একত্রে পড়া জায়েয। আল-মাইমূনীর বর্ণনায় ইমাম আহমদ বলেন: ‘ইবনে উমর শীতল রাতে দুই নামায একত্রে পড়তেন।’ একাধিক ব্যক্তি যোগ করেন: ‘রাতের বেলায়’। আল-মাযহাবে, আল-মুস্তাওইবে এবং আল-কাফীতে আরেকটু বাড়ান: ‘অন্ধকার থাকলে।’ কাযী বলেন: আর যখন শীতের কারণে জামাত ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি এসেছে তখন তাতে কাদা-পানির প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ শীতের কষ্ট কাদা-পানির কষ্টের চেয়ে বেশি নয়। এর দলীল হচ্ছে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় কোনো প্রকার ভীতি ও বৃষ্টি ছাড়াই দুই নামায একত্রে পড়েছেন। এ হাদিসকে কাদা-পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে ব্যাখ্যা করার উপায় নেই। অর্থাৎ অসুস্থতা না থাকা অবস্থায়।
কাযী বলেন: আর এটি (হাদীসটিকে কাদা-পানির উপর ব্যাখ্যা করা) ওজর ছাড়া বা মানসূখ (রহিত) হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেয়ে অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ এভাবে ব্যাখ্যায় অতিরিক্ত তথ্য আছে। সুতরাং এই সমস্ত ওজর থাকা অবস্থায় একত্রে নামায পড়া বৈধ। এমনকি যে তার নিজের ঘরে নামায পড়ে তার জন্য অথবা যে ব্যক্তি এমন মসজিদে নামায পড়ে যার পথ ছাউনিযুক্ত অথবা যে ব্যক্তি মসজিদেই থাকে অথবা অনুরূপ যে কোনো ব্যক্তির (যেমন কারো বাড়ি থেকে মসজিদ যদি মাত্র কয়েক কদমের দূরত্ব হয় এবং সেখানে যেতে তার সামান্য সময় লাগে) জন্য একত্র করা বৈধ হবে। যদিও তাকে সামান্য কষ্টই স্পর্শ করে। কারণ সাধারণ রুখসত (ছাড়) এর ক্ষেত্রে কষ্টের অস্তিত্ব থাকা এবং না থাকা উভয়ই সমান, যেমন সফরের ক্ষেত্রে। আর এই ছাড় কেবল মাগরিব ও এশার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, কারণ এই দু'টি ছাড়া অন্য নামাযের ক্ষেত্রে এই ছাড় উদ্ধৃত হয়নি। আর এই দুটির কষ্ট অধিক যেহেতু এগুলো অন্ধকারে পড়া হয়। সফরের কষ্ট হলো পথচলার কারণে ও সঙ্গীদেরকে হারিয়ে ফেলার কারণে। এখানে যা রয়েছে তার বিপরীত।’[সমাপ্ত]
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ এই সমস্ত ওজরের কারণে কষ্ট হলে দুই যোহর একত্র করাও বৈধ মনে করার মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন:
‘এই ব্যাপারে সঠিক মত হচ্ছে: এই সমস্ত ওজরের কারণে দুই যোহর (যোহর ও আসর) একত্র করা জায়েয; যেমনিভাবে মাগরিব ও এশাকে একত্র করা জায়েয। হেতু হলো: কষ্ট। অতএব, রাতে বা দিনে কষ্ট পাওয়া গেলে একত্র করা জায়েয।’[সমাপ্ত][আশ-শারহুল মুমতি’ (৪/৩৯৩)]
তিনি বলেন: ‘যখন তীব্র শীত পড়বে এবং এমন বায়ু প্রবাহিত হবে যা মানুষকে কষ্ট দেয়, তখন মানুষের জন্য যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা একত্রে পড়া জায়েয। কারণ সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় কোনো প্রকার ভীতি বা বৃষ্টি ছাড়া দুই নামায একত্রে পড়েছেন। সকলে ইবনে আব্বাসকে প্রশ্ন করলেন: এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল? তিনি বলেন: যাতে তাঁর উম্মতের জন্য কষ্টকর না হয়। এটি প্রমাণ করে যে দুই নামায একত্র করার মাঝে নিহিত প্রজ্ঞা হচ্ছে মুসলিমদের কষ্ট দূর করা। নতুবা একত্র করা জায়েয নয়। শীতে কষ্ট তখনই হবে যখন শীতের সাথে বাতাস ও শৈত্যপ্রবাহ থাকবে। যদি শীতের সাথে বাতাস না থাকে তাহলে মানুষ বেশি জামা-কাপড় পরে শীত থেকে বেঁচে থাকতে পারবে এবং কষ্ট হবে না। তাই কেউ যদি প্রশ্ন করে: শুধু তীব্র শীতের কারণে কি দুই নামায একত্রে পড়া জায়েয? আমরা বলব: জায়েয নেই। তবে শর্ত হচ্ছে এর সাথে এমন শীতল বায়ু প্রবাহিত হবে যা মানুষকে কষ্ট দেয়। অথবা এর সাথে যদি তুষার পড়ে। তুষার পড়লে নিঃসন্দেহে সেটি কষ্টদায়ক। এ অবস্থায় একত্রে পড়া যাবে। নিছক শীত এমন কোনো ওজর নয় যা নামায একত্র করার বৈধতা দিবে। যে ব্যক্তি কোনো শরয়ি ওজর ছাড়া দুই নামায একত্রে পড়বে সে পাপী। সে পরের যে নামাযটি পূর্বের নামাযের সাথে একত্রে পড়েছে সেটি সঠিক হয়নি এবং গ্রহণযোগ্য নয়। বরং তাকে পুনরায় সেটি পড়তে হবে। আর যদি বিলম্বে একত্র করে, তাহলে প্রথম নামাযটি সে যথাসময়ে পড়েনি। এর জন্য সে পাপী হবে। আমি এই মাসয়ালাটির ব্যাপারে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম। কারণ কিছু মানুষ আমাকে জানিয়েছে যে দুই রাত আগে তারা তীব্র শীতের কারণে নামায একত্র করে পড়েছে, অথচ এমন কোনো বায়ুপ্রবাহ ছিল না যা মানুষদের জন্য কষ্টকর ছিল। এভাবে একত্র করা তাদের জন্য বৈধ নয়।’[লিকাউল বাবিল মাফতূহ (১/১৮)]
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।