প্রমোদের জন্য শিকার করার হুকুম, প্রজনন ও বাচ্চা জন্ম দেওয়ার মওসুমে শিকার

প্রশ্ন 171618

শখের বশে ও বিনোদনের জন্য শিকার করা কি শরীয়তে জায়েয? প্রজনন ঋতুতে পাখি শিকারের হুকুম কী? আমি শুনেছি এটা জায়েয নেই। এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তার অর্থ জালালি কবুতর শিকার করা নিষিদ্ধ, কেননা এটা সারা বছর প্রজনন করে?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

এক:

শিকার দুই রকমের হয়ে থাকে:

এক:

শিকারকৃত প্রাণী থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য শিকার। সেটা খাওয়া, বিক্রি করা, অভাবীদের দান করা, বন্ধু-আত্মীয়দের উপহার দেওয়া ছাড়াও উপকৃত হওয়ার নানা উপায় হতে পারে। আলেমদের ইজমা বা সর্বসম্মত অভিমত: এটা মুবাহ বা বৈধ।

শাইখ ইবনে উছাইমীন বলেন: এটার বৈধতার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ তার কিতাবে একে হালাল করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ মর্মে সুন্নাহ সাব্যস্ত হয়েছে এবং মুসলিমরাও এ মর্ম ইজমা (ঐকমত্য) পোষণ করেছেন। [আশ-শারহুল মুমতি (১৫/৯৮) থেকে সমাপ্ত]।

দুই:

কেবল বিনোদন, খেল-তামাশা বা প্রমোদের জন্য শিকার। এক্ষেত্রে শিকারী শিকার করার পর শিকারকৃত পশু ছেড়ে দেয়, এর থেকে কোনোভাবে উপকৃত হয় না।

এ ধরনের শিকার কিছু আলেমের মতে মাকরূহ। আবার কেউ কেউ এটা হারাম হওয়ার মতের দিকে ঝুঁকেছেন।

এই পশু মাকরূহ হওয়ার পক্ষে দলীল হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কেউ যদি অধিকার না দিয়ে চড়ুই পাখি হত্যা করে, আল্লাহ তাকে সেটার জন্য জিজ্ঞাসা করবেন।” জিজ্ঞাসা করা হল, এর অধিকার কী? তিনি উত্তর দিলেন: “এর অধিকার হলো এটাকে যবেহ করে খাওয়া এবং মাথাকে নিক্ষেপ না করা।” [হাদীসটি নাসাঈ (৪৩৪৯) ও দারেমী (১৯৭৮) বর্ণনা করেছেন। যাহাবী মুহায্‌যাব বইয়ে (৭/৩৬১৪) বলেছেন: এর সনদ ‘উত্তম’। ইবনুল মুলাক্কিন আল-বদরুল মুনীর (৯/৩৭৬) বইয়ে এটাকে ‘সহিহ’ বলেছেন। ইবনে কাসীর ইরশাদুল ফকীহ (১/৩৬৮) বইয়ে এটাকে ‘হাসান’ বলেছেন। শাইখ আলবানী সহীহুত তারগীবে (১০৯২) এটাকে ‘হাসান’ বলেছেন।]

শাইখ ইবনে উছাইমীন বলেন: “এটা মাকরূহ। যদি এই কাজকে হারাম বলা হয়, তাহলেও সে মতটার গ্রহণযোগ্যতা থাকে। কারণ এটা অনর্থক কাজ। এতে অর্থ-সম্পদ ও সময় নষ্ট হয়।” [আশ-শারহুল মুমতি (১৫/৯৮) থেকে সমাপ্ত]।

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী বলেন: “যদি শিকারের দ্বারা উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে সেটা হারাম। কারণ তখন সেটা অনর্থক প্রাণ সংহারের মাধ্যমে যমীনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অন্তর্ভুক্ত হয়।” [ফাতহুল বারী (৯/৬০২) থেকে সমাপ্ত]।

ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (২২/৫১২)-তে আছে: “নিছক খেল-তামাশা ও বিনোদনের জন্য হত্যা করা নিষিদ্ধ। কারণ এতে অর্থ-সম্পদ নষ্ট হয় এবং পশুকে কষ্ট দেওয়া হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কাজ করতে নিষেধ করেছেন।” [সমাপ্ত]।

বিস্তারিত জানতে (152261) নং প্রশ্নের উত্তর দেখা যেতে পারে।

দুই:

প্রজনন বা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার মওসুমে শিকার করতে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে এমন কোনো শরয়ী বক্তব্য আমাদের জানা নেই। এ সময়ে শিকার করা মৌলিক বৈধতার হুকুমে থেকে যাবে।

শাইখ ইবনে উছাইমীন বলেন: “বাহ্যিক শরয়ী বিধান অনুযায়ী এটা জায়েয। তবে উত্তম হলো বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময়ে যেন তাকে হত্যা না করা হয়। অর্থাৎ বাচ্চাগুলোর অবস্থান জানার পরই শুধু শিকার করবে। শিকার করার পর বাচ্চাগুলো নিয়ে আসবে। তারপর সেগুলোও যবাই করে উপকৃত হবে।” [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ্দারব (১/৭৫) থেকে সমাপ্ত]।

শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম আলুশ শাইখকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: কিছু শিকার বা পাখি যদি সন্তানসম্ভবা হয় অথবা সেগুলোর যদি বাচ্চা থাকে, তাহলে সেগুলো কি ছেড়ে দেওয়া উচিত?

তিনি উত্তর দেন: “আমি এ প্রসঙ্গে কিছু শুনিনি; (অর্থাৎ আমি এমন কোনো শরয়ী দলীল জানি না যেটা এই ধরনের শিকার ত্যাগ করতে বলে)। তবে বাচ্চার মা এমন পাখি ছেড়ে দেওয়ার মাঝে কিছু কল্যাণ আছে। এটাই উপযুক্ত কাজ। কিন্তু এই শিকার হারাম হবে না।” [ফাতাওয়া ওয়া-রাসাইলুশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইব্রাহীম (১২/২২৩) থেকে সমাপ্ত]।

কিছু আলেম এমন মা-পাখি শিকার করাকে মাকরূহ বলেছেন, যেগুলোর ছোট বাচ্চা তাদের মুখাপেক্ষী।

ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দাইমাহ-তে এসেছে: “বাচ্চার মা হত্যা করা কিংবা মায়ের পরিচর্যার মুখাপেক্ষী এমন বাচ্চা থাকা অবস্থায় বাচ্চার মাকে জীবিত অবস্থায় নিয়ে নেওয়া জায়েয হবে না।” [ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (২২/৫১২) থেকে সমাপ্ত]।

শাইখ ইবনে জিবরীন রাহিমাহুল্লাহ তায়ালা বলেন: “যে সমস্ত পাখির ছোট ছোট বাচ্চা আছে, সেগুলো শিকার করা মাকরূহ। কারণ এর মাধ্যমে বাচ্চাগুলোর ক্ষতি করা হয়। অনুরূপভাবে ছোট থাকা অবস্থায় বাচ্চা নিয়ে নেওয়া মাকরূহ। কারণ এমন কাজ করে বাচ্চাগুলোর মাকে কষ্ট দেওয়া হয়। আল্লাহ মায়ের স্বভাবে তাদের প্রতি মমতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

তবে যদি মা-পাখি শিকার করে বাচ্চাগুলো নিয়ে নেয়, তাহলে বাহ্যত তাতে নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ যে শিকারকৃত পশু বা পাখি খাওয়া যায়, সেটা শিকার করা মৌলিকভাবে বৈধ।” [সমাপ্ত]।

সারকথা:

প্রজনন আর বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময়ে কিংবা ছোট বাচ্চা আছে এমন পাখি শিকার করা বৈধ, এতে কোনো সমস্যা নেই। যদিও এই কাজ ছেড়ে দেওয়াই উত্তম।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

প্রাণী শিকার

সূত্র: 

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
answer

সংশ্লিষ্ট প্রশ্নোত্তরসমূহ

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android