আল্লাহর নাম ও গুণাবলির অর্থ ও ধরনের ব্যাপারে মুমিনের অবস্থান

প্রশ্ন 178915

এটা জ্ঞাত বিষয় যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামায়াত মহান রবের গুণাবলি সাব্যস্ত করে; কোনো ধরন নির্ধারণ (تكييف), প্রতিরূপ নির্ধারণ (تمثيل), উপমা দান (تشبيه), ও অর্থবিযুক্তকরণ (تعطيل) ছাড়া। তারা যখন গুণাবলি সাব্যস্ত করে, তখন ধরনকে ব্যাখ্যা করে, আর অর্থকে জানে। এক্ষেত্রে তারা ইমাম মালেকের প্রসিদ্ধ বাণী দিয়ে দলীল পেশ করে: ‘আল্লাহর উর্ধ্বে ওঠা জ্ঞাত, এর ধরন অজ্ঞাত’। আমার কাছে যে বিষয়টি প্রশ্নের উদ্রেক করেছে সেটি হলো আমরা যদি সকল গুণাবলির ক্ষেত্রে এমন কথা বলি তাহলে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হতে পারে: ‘তাহলে আল্লাহর হাসির অর্থ কী’? অথবা ‘আল্লাহর চেহারার অর্থ কী’? অথবা ‘আল্লাহর দয়ার অর্থ কী’? অথবা ‘আল্লাহর পায়ের গোছার অর্থ কী’? এছাড়া আরো গুণাবলি। আমাদের জন্য কি এ গুণগুলোর আল্লাহর সাথে উপযোগী অর্থ জানা অনিবার্য হয়ে যায় না যাতে করে আমরা তাফবিদপন্থী (অর্থ সমর্পনবাদী) ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত না হই? সমস্যা হলো: আরবরা যখন অর্থকে ব্যাখ্যা করে তখন তারা যেসব সৃষ্টজীবকে দেখে সে আলোকে ব্যাখ্যা করে। এ ব্যাপারে আমাদেরকে অবহিত করুন। আমি বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় আছি। কিছু বিদআতী আশআরী এ নিয়ে আমাদের মাঝে সংশয় সৃষ্টি করেছে।

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

এক:

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত আল্লাহর গুণাবলির ‘ধরন’ ব্যাখ্যা করে না; বরং এর জ্ঞান আল্লাহর কাছেই সোপর্দ করে। তারা মহান রবের গুণাবলির প্রতি ঈমান আনে, গুণগুলোর অর্থের প্রতিও ঈমান আনে এবং গুণগুলোর ‘ধরন’ আল্লাহ তাআলার নিকট অর্পণ করে।

ইবনুল মাজিশূন, ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল এবং অন্যান্য সালাফ বলেছেন: “আল্লাহ নিজ সম্পর্কে যা সংবাদ দিয়েছেন এর ‘ধরন’ আমরা জানি না, যদিও আমরা এর ব্যাখ্যা ও অর্থ জানি।”[ দার্‌উ তাআরুদিল ‘আকলি ওয়ান্‌-নাকল (১/১১৫)]

আবু হাফস ইবনে শাহীন রাহিমাহুল্লাহুর পিতা আবুত তায়্যিব বলেন: “আমি আবু জাফর আত-তিরমিযীর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তাঁকে রবের অবতরণ সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল: ‘এই অবতরণ কেমন?’ ‘তাঁর ঊর্ধ্বত্ব কি তখনও থাকে?’ তিনি উত্তর দিলেন: ‘অবতরণ বোধগম্য, কিন্তু এর ‘ধরন’ অজ্ঞাত; এর প্রতি ঈমান আনা ফরজ, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।’”

যাহাবী বলেন: “বাগদাদের তৎকালীন ফকীহ ও আলিম সত্যই বলেছেন। কারণ ‘অবতরণ কেমন’ এ প্রশ্ন করা মূলতঃ অজ্ঞতা। সাধারণত প্রশ্ন করা হয় এমন কোনো শব্দ সম্পর্কে যা ভাষায় অপরিচিত। অথচ ‘অবতরণ’, ‘কথা বলা’, ‘শোনা’, ‘দেখা’, ‘জানা’ এবং ‘আরশে ওঠা’ এসব কথা শ্রোতার কাছে সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার। যখন এগুলো দিয়ে এমন এক সত্তাকে গুণান্বিত করা হয় যার কোনো প্রতিরূপ নেই তখন গুণও সত্তার অনুগামী। মানুষের কাছে গুণের ‘ধরন’ও অজানা।”[আল-উলু লিল-‘আলিইল গাফ্‌ফার’ (পৃ. ২১৩–২১৪)]

আবু বকর আল-ইসমাঈলী বলেন: “তিনি আরশের উপর উঠেছেন ‘কোনো ধরন নির্ধারণ ছাড়া’; কারণ কেবল এটুকুই বলা হয়েছে যে তিনি আরশের উপর উঠেছেন, কিন্তু কীভাবে উঠেছেন তা উল্লেখ করা হয়নি।”[মা‘আরিজুল কুবুল (১/১৯৮)]

সুতরাং আল্লাহ তাআলার গুণাবলির ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো: তারা গুণাবলি সাব্যস্ত করে, গুণগুলোর প্রকৃত অর্থ সাব্যস্ত করে ভাষাগতভাবে যে অর্থের জন্য সেটি গঠিত এবং এর ধরন ও বাস্তব রূপের জ্ঞান আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে। পাশাপাশি তারা বিশ্বাস করে যে, এসব গুণাবলি সাব্যস্ত করা থেকে আল্লাহ বা তাঁর কোনো গুণকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা বোঝায় না। কারণ তিনি নিজ সত্তায়ও সদৃশহীন, তাঁর গুণাবলীতেও সদৃশহীন।

দুই:

প্রশ্নকারী ভাইয়ের বক্তব্য যে: “আমরা যদি সকল গুণাবলির ক্ষেত্রে এমন কথা বলি তাহলে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হতে পারে: তাহলে আল্লাহর হাসির অর্থ কী’? অথবা আল্লাহর চেহারার অর্থ কী’?

আমরা বলব: আল্লাহর হাসির অর্থ হলো: আল্লাহ তাআলার জন্য হাসির গুণ প্রকৃত অর্থেই সাব্যস্ত করা, রূপক অর্থে নয়; এমনভাবে যা তাঁর সাথে উপযুক্ত, কোনো প্রতিরূপ স্থাপন বা ধরন নির্ধারণ ছাড়া। সুতরাং আমরা গুণকে সাব্যস্ত করব, আমরা অর্থকেও সাব্যস্ত করব। আর এর ধরনকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করব, যেমনটি আগেও বলা হয়েছে। এ কথা প্রত্যেক গুণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

শাইখ ইবনে জিবরীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমরা গুণ সাব্যস্ত করি এবং গুণ থেকে উপমা দানকে অস্বীকার করি। ‘উপমা দান’ কেবল সৃষ্টিকুলের সাথে নির্দিষ্ট। আমরা বলি: আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর জন্য এ গুণ সাব্যস্ত করেছেন, তাই আমরা তা সাব্যস্ত করি, কিন্তু, উপমায় অতিশয়ন করি না এবং এমন কিছু বলি না যা সত্য নয়। এ কথা সুবিদিত যে, সৃষ্টির গুণ তার উপযুক্ত; যেমন সৃষ্টির হাসি হলো জোরে শব্দ করা ও হা হা করে হাসা, যা কোনো আনন্দদায়ক বা খুশির কারণে হয়ে থাকে। কিন্তু রব যেভাবে চান সেভাবেই হাসেন, এমন এক গুণের মাধ্যমে, যার ধরন আমরা জানি না।”[ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে জিবরীন (৬৩/৯৬)]

তিন:

প্রশ্নকারীর বক্তব্য: “আমাদের জন্য কি এ গুণগুলোর আল্লাহর সাথে উপযোগী অর্থ জানা অনিবার্য হয়ে যায় না যাতে করে আমরা তাফবিদপন্থী (সমর্পনবাদী) ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত না হই?

প্রশ্ন নম্বর (138920)-এর উত্তরে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে ‘তাফবিদ’ (সমর্পন)-এর অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, তাফবিদ (সমর্পন) দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়:

প্রথম অর্থ: শব্দকে ও শব্দ থেকে জ্ঞাত অর্থকে সাব্যস্ত করা, এরপর এর ধরনের (কাইফিয়্যাহ) জ্ঞান আল্লাহর কাছে সমর্পন করা।

এই অর্থটি সঠিক এবং এটিই আহলুস সুন্নাহর মাযহাব।

দ্বিতীয় অর্থ: কেবল শব্দকে সাব্যস্ত করা, কিন্তু এর অর্থই না জানা। এটি বাতিল।

অতএব, অর্থ জানা ও গুণের বাস্তবতাকে সাব্যস্ত করা এবং গুণের ধরন জানা উভয়টার মাঝে পার্থক্য রয়েছে।

স্থায়ী কমিটির আলিমরা বলেন: “আল্লাহ নিজের জন্য যে গুণ সাব্যস্ত করেছেন তথা দুই হাত, দুই পা, আঙুলসমূহ ইত্যাদি যা কুরআন ও সুন্নাহতে উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলো আল্লাহর জন্য উপযোগী পন্থায় সাব্যস্ত করা ওয়াজিব; কোনো বিকৃতিকরণ (তাহরীফ), ধরন নির্ধারণ (তাকয়ীফ), সাদৃশ্য স্থাপন (তামসীল) ও অর্থবিযুক্তিকরণ (তা’ত্বীল) ছাড়া। গুণগুলো প্রকৃত অর্থবোধক; রূপক নয়।”[ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ (২/৩৭৬)]

তাই আমাদের উচিত হলো, দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করা: যে অর্থের ওপর ঈমান আনা ও তা সাব্যস্ত করা আবশ্যক, আর যেই ধরন আমাদের পক্ষে জানা সম্ভবপর নয়। কারণ আমাদের প্রভু আল্লাহ তাআলার কোনো প্রতিরূপ নেই।

শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

“সালাফদের ঐকমত্য (ইজমা) বর্ণনা করেছেন এমন একাধিক আলিমের বক্তব্য রয়েছে (তাঁদের মধ্যে খাত্তাবীও আছেন) যে, সালাফদের মাযহাব হলো: এসব গুণকে তার প্রত্যক্ষ অর্থের উপরই বহাল রাখা, পাশাপাশি এর ‘ধরন নির্ধারণ’ ও ‘সাদৃশ্য দান’-কে নাকচ করা। কারণ ‘গুণাবলি’ সম্পর্কে আলোচনা মূলত ‘সত্তা’ সম্পর্কে আলোচনারই শাখা, এতে ‘সত্তা’-র অনুসরণ ও অনুগমন করা হবে। সুতরাং যখন সত্তা সাব্যস্ত করা মানে সত্তার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করা; ‘ধরন’ নির্ধারণ করা নয়, তখন গুণাবলি সাব্যস্ত করা মানে গুণের অস্তিত্ব সাব্যস্ত করা; ধরন নির্ধারণ করা নয়।

অতএব আমরা বলব: তাঁর হাত আছে, তাঁর শ্রবণশক্তি আছে; কিন্তু আমরা বলব না যে ‘হাত’-এর অর্থ ‘কুদরত’ এবং ‘শ্রবণ’-এর অর্থ ‘জ্ঞান’। … এসব গুণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলারই গুণ, যা তাঁর মহিমার উপযোগীভাবে তাঁর পবিত্র সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত; যেমনিভাবে প্রত্যেক বস্তুর গুণ তার সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং জানা দরকার, ‘জ্ঞান’ হলো বিশেষিতের একটি সত্তাগত গুণ এবং এ গুণের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে; অনুরূপ কথা চেহারার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য…।

অনুরূপ কথা তাঁর ‘কর্ম’-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা জানি যে ‘সৃষ্টি করা’ মানে শূন্য থেকে অভিনবভাবে সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনা। যদিও আমরা সেই কর্মের ধরন-প্রকৃতি নির্ধারণ করি না এবং তা আমাদের কর্মের মতোও নয়। কারণ আমরা কাজ করি প্রয়োজনের তাগিদে। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত। তাঁর ‘সত্তা’-ও অনুরূপ। তাঁর সত্তাকে সামগ্রিকভাবে জানা যায়, যদিও তাঁর সত্তা সৃষ্টিসমূহের সত্তার মত নয় এবং তাঁর প্রকৃত স্বরূপ তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না এবং কেউ তার ধরন উপলব্ধি করতে পারে না। তাঁকে এসব গুণান্বিত করার মাধ্যমে এটাই ফুটে ওঠে এবং এ অর্থেই শব্দগুলোর অর্থ গ্রহণ করা আবশ্যক।

মুমিন এসব গুণের বিধি-বিধান ও প্রভাবসমূহ জানে। তার কাছ থেকে এটাই চাওয়া হয়েছে। মুমিন জানবে যে, আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান, আল্লাহ তাঁর জ্ঞানে সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন, কিয়ামতের দিনে সমগ্র পৃথিবী হবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আকাশমণ্ডলী হবে তাঁর ডান হাতে প্যাঁচানো। মুমিনরা জান্নাতে তাদের স্রষ্টার চেহারা দেখবে এবং এর দ্বারা এমন এক আনন্দ লাভ করবে, যার তুলনায় সব আনন্দ তুচ্ছ হয়ে যাবে ইত্যাদি।

অনুরূপভাবে সে জানবে যে, তার একজন রব, স্রষ্টা ও উপাস্য আছেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত রূপ সে জানে না। বরং সৃষ্টির জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমা এটাই, তারা কোনো বস্তুকে কিছু দিক থেকে জানে, কিন্তু তার পূর্ণ স্বরূপ পরিবেষ্টন করতে পারে না। নিজেদের সম্পর্কেও তাদের জ্ঞান এই পর্যায়েরই।”[মাজমুউল ফাতাওয়া (৬/৩৫৫–৩৫৮)]

চার:

প্রশ্নকারীর বক্তব্য: “সমস্যা হলো: আরবরা যখন গুণগুলোর অর্থকে ব্যাখ্যা করে তখন তারা যেসব সৃষ্টজীবকে দেখে সে আলোকে ব্যাখ্যা করে।”

আমরা বলব: আরবরা যখন সৃষ্টির গুণাবলির অর্থ ব্যাখ্যা করে, তখন তারা সে অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে যা তারা দেখে, জানে ও উপলব্ধি করে। কিন্তু, আল্লাহর গুণাবলির ধরন নিয়ে কীভাবে আলোচনা করা সম্ভব, যেখানে তিনি এমন সত্তা যার মতো কিছু নেই, যাঁকে দৃষ্টিসমূহ আয়ত্ত করতে পারে না এবং যাঁকে তারা জ্ঞান দিয়ে পরিবেষ্টন করতে পারে না?!

বিদআতীদের সংশয় থেকে কারো পক্ষে নিরাপদ থাকা সম্ভবপর নয়; কেবল সালাফদের পথ অনুসরণ করা ছাড়া এবং তাদের পদ্ধতি অবলম্বন করা ছাড়া।

আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android