১. স্ত্রীর অধিকারসমূহ:
(10680) নম্বর প্রশ্নের উত্তরে আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
২. সন্তানদের অধিকারসমূহ:
আল্লাহ পিতাদের উপর সন্তানদের কিছু অধিকার রেখেছেন, যেমনিভাবে সন্তানদের উপর পিতাদের কিছু অধিকার রেখেছেন।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: "আল্লাহ তাদেরকে 'আবরার' বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা তারা পিতাদের সাথে ও সন্তানদের সাথে সদাচরণ করেছে। তোমার পিতার যেমন তোমার উপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে তোমার সন্তানেরও তোমার উপর অধিকার রয়েছে।’[আল-আদাবুল মুফরাদ: ৯৪]
আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘তোমার সন্তানেরও তোমার উপর অধিকার রয়েছে।’[হাদীসটি মুসলিম (১১৫৯) বর্ণনা করেন]
পিতাদের উপর সন্তানদের কিছু অধিকার রয়েছে সন্তানদের জন্মের আগে। যেমন:
১- নেককার স্ত্রী বাছাই করা যেন সে নেককার মা হয়:
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “চারটি গুণ দেখে মহিলাকে বিবাহ করা হয়; তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারিতা দেখে। তুমি দ্বীনদার পাত্রী বিয়ে করে সফলকাম হও।”[হাদীসটি বুখারী (৪৮০২) ও মুসলিম (১৪৬৬) বর্ণনা করেন]
শাইখ আব্দুল গনী দেহলভী বলেন: “তোমরা নারীদের মধ্যে দ্বীনদার, নেককার ও সদ্বংশীয়া বাছাই করো। পাত্রী যেন হারামজাদা না হয়। কেননা এই মন্দ বৈশিষ্ট্য সন্তানদের দিকে সংক্রমিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ
“ব্যভিচারী পুরুষ ব্যভিচারিণী কিংবা মুশরিক নারী ছাড়া কাউকে বিয়ে করে না এবং ব্যভিচারিণীকেও কেবল ব্যভিচারী পুরুষ ও মুশরিক ছাড়া কেউ বিয়ে করে না।”[সূরা নূর: ৩] পাত্র-পাত্রীর কুফু (সমান হওয়া) খুঁজতে বলা হয়েছে যাতে পারস্পরিক মেলবন্ধন হয় এবং কলঙ্ক না পেয়ে বসে।”[শরহু সুনানি ইবনি মাজাহ: (১/১৪১)]
সন্তান জন্মের পরবর্তী অধিকারসমূহ:
১- নবজাতক শিশুকে তাহনীক করা সুন্নত
আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আবু তালহার এক ছেলে অসুস্থ ছিল। আবু তালহা বাইরে গেলে শিশুটি মারা যায়। আবু তালহা ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন: আমার ছেলে কেমন আছে? উম্মে সুলাইম বললেন: ‘সে আগের চেয়ে শান্ত আছে।’ এরপর তিনি তার সামনে রাতের খাবার পেশ করলেন। আবু তালহা রাতের খাবার খেলেন। তারপর উম্মে সুলাইমের সাথে সহবাস করলেন। সহবাস শেষ হলে উম্মে সুলাইম বললেন: শিশুটিকে দাফন করুন। পরদিন সকালে আবু তালহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে ঘটনাটি জানালেন। তিনি বললেন: “তোমরা কি গতরাতে সহবাস করেছিলে?” তিনি বললেন: হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “আল্লাহ তোমাদের জন্য এতে বরকত দান করুন।” অতঃপর উম্মে সুলাইম একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিলেন। আবু তালহা আমাকে বললেন: তাকে যত্ম করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে যাও। শিশুটিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আনা হলো। উম্মে সুলাইম শিশুটির সাথে কিছু খেজুরও পাঠালেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: “শিশুটির সাথে কি কিছু আছে?” তারা বলল: ‘হ্যাঁ, কয়েকটি খেজুর আছে।’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুরগুলো চিবিয়ে নিজের মুখ থেকে কিছু অংশ শিশুর মুখে দিলেন এবং তাকে তাহনীক করলেন। আর তার নাম রাখলেন ‘আবদুল্লাহ’।[হাদীসটি বুখারী (৫১৫৩) ও মুসলিম (২১৪৪) বর্ণনা করেন]
ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “আলেমরা একমত যে নবজাতক শিশুকে জন্মের পর খেজুর দ্বারা তাহনীক করা মুস্তাহাব। যদি খেজুর না পাওয়া যায় তবে খেজুরের স্থলাভিষিক্ত অনুরূপ মিষ্টি বস্তু দ্বারা করা যাবে। তাহনীককারী খেজুর চিবিয়ে এমন তরল করবেন যাতে করে সহজে গিলে ফেলা যায়। এরপর এই তরল খেজুর নবজাতকের মুখে রাখবেন যাতে এর কিছু অংশ তার পেটে যায়।”[শরহু নববী আলা সহীহি মুসলিম (১৪/১২২–১২৩)]
২- শিশুর সুন্দর নাম রাখা যেমন: আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।
নাফে‘ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের নামসমূহের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো আব্দুল্লাহ ও আবদুর রহমান।”[হাদীসটি মুসলিম (২১৩২) বর্ণনা করেন]
নবীদের নামে নাম রাখাও মুস্তাহাব:
আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আজ রাতে আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। আমি তার নাম রেখেছি আমার পিতা ইবরাহীমের নামে।”[মুসলিম (২৩১৫) হাদীসটি বর্ণনা করেন]
শিশুর নাম সপ্তম দিনে রাখা মুস্তাহাব। তবে জন্মের দিন রাখলেও অসুবিধা নেই যেমনটি উপর্যুক্ত হাদীস থেকে প্রমাণিত।
সামুরা ইবনে জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সাথে বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে আকিকার পশুটি জবাই করা হবে, তার মাথা মুণ্ডন করা হবে এবং তার নাম রাখা হবে।”[আবু দাউদ (২৮৩৮), শাইখ আলবানী সহিহুল জামে‘ (৪৫৪১) গ্রন্থে এটিকে সহীহ বলেছেন]
ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “নামকরণের উদ্দেশ্য হলো পরিচিত করা। কারণ জন্মগ্রহণের পর তার কোনো নাম থাকে না যা দিয়ে তাকে পরিচিত করা যাবে। সুতরাং জন্মের দিন নাম রাখা যেমন বৈধ, তেমনি নামকরণ বিলম্বিত করে তিন দিন পরে বা আকিকার দিনেও রাখা বৈধ। এর আগে ও পরেও নাম রাখা বৈধ। এ ব্যাপারে প্রশস্ততা রয়েছে।”[তুহফাতুল মাওদূদ (পৃ. ১১১)]
৩- সপ্তম দিনে শিশুর মাথার চুল ফেলা এবং চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সদকা করা সুন্নত:
আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসানের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আকিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন: “হে ফাতিমা, তার মাথা মুণ্ডন করো এবং চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সদকা করো।” তখন আমি তার চুল ওজন করলাম। চুলের ওজন ছিল এক দিরহাম বা তার কিছু কম।[হাদীসটি তিরমিযী (১৫১৯) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহুত তিরমিযী (১২২৬) গ্রন্থে হাদীসটিকে হাসান বলেন]
৪- পিতার উপর সন্তানের আকীকা করা মুস্তাহাব যেমনটি পূর্বোক্ত হাদীসে বলা হয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সাথে বন্ধক থাকে।”
সুতরাং ছেলে শিশুর জন্য দুটি ভেড়া (বা ছাগল) এবং মেয়ে শিশুর জন্য একটি ভেড়া (বা ছাগল) জবাই করা হবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন: “ছেলে শিশুর জন্য দুটি সমমানের দুইটি ভেড়া (বা ছাগল) এবং মেয়ে শিশুর জন্য একটি ভেড়া (বা ছাগল)।”[হাদীসটি তিরমিযী (১৫১৩), আবু দাউদ (২৮৩৪), নাসাঈ (৪২১২) ও ইবনে মাজাহ (৩১৬৩) বর্ণনা করেন]
৫- খতনা করা:
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “পাঁচটি বিষয় ফিতরতের অন্তর্ভুক্ত: খতনা করা, (নাভির নিচের) লোম কামানো, বগলের লোম উপড়ানো, নখ কাটা ও গোঁফ ছাঁটা।”[হাদীসটি বুখারী (৫৫৫০) ও মুসলিম (২৫৭) বর্ণনা করেছেন]
শিক্ষা ও প্রতিপালনের কিছু অধিকার:
আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার অধীনস্থদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, পুরুষ তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, দাস তার মালিকের সম্পদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”[হাদীসটি বুখারী (২৪১৬) ও মুসলিম (১৮২৯) বর্ণনা করেন]
অতএব পিতামাতার কর্তব্য হলো সন্তানদের দ্বীনি দায়িত্ব, শরীয়তের মুস্তাহাব নানান উত্তম বিষয়াবলি ও দুনিয়াবি জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।
প্রথমে তাদেরকে বিশুদ্ধ আকীদার ওপর গড়ে তুলতে হবে, শিরক ও বিদআত থেকে দূরে রাখতে হবে। এরপর ইবাদত বিশেষ করে নামায শিক্ষা দিতে হবে। তারপর তাদের উত্তম চরিত্র ও শিষ্টাচারের ওপর লালন-পালন করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
“(স্মরণ করো) যখন লোকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল: “হে বৎস! আল্লাহর সাথে (কোনো কিছুকে) শরীক করো না। নিশ্চয়ই শির্ক একটি মহা অন্যায়।”[সূরা লুকমান: ১৩]
আবদুল মালিক ইবনে রাবি‘ ইবনে সাবরা তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে সাত বছর বয়সে নামাজ শেখাও এবং দশ বছর বয়সে নামায না পড়লে প্রহার কর।”[তিরমিযী (৪০৭), আবু দাউদ (৪৯৪), শাই্খ আলবানী সহীহুল জামে‘ (৪০২৫) গ্রন্থে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]
রুবাই্য়্যি বিনতে মু‘আওয়িয রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার সকালে আনসারদের গ্রামগুলোতে সংবাদ পাঠালেন: “যে ব্যক্তি সকালে খেয়েছে সে যেন বাকি দিন (না খেয়ে) পূর্ণ করে। আর যে রোযা রেখে সকালে উপনীত হয়েছে সে রোযা পূর্ণ করুক।” তিনি (রুবাইয়্যি) বলেন: পরবর্তীতে আমরা রোযা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদেরকেও রোযা রাখাতাম। তাদের জন্য রঙিন উলের খেলনা বানাতাম। কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে সেই খেলনা দিতাম। এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত।[হাদীসটি বুখারী (১৮৫৯), মুসলিম (১১৩৬) বর্ণনা করেন]
সাইব ইবনে ইয়াজিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হজ্জে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখন আমার বয়স ছিল সাত বছর।”[হাদীসটি বুখারী (১৭৫৯) বর্ণনা করেন]
শিষ্টাচার ও নৈতিকতার উপর প্রতিপালন:
প্রত্যেক পিতা-মাতার উচিত তাদের সন্তানদের উত্তম চরিত্র ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়া, হোক তা আল্লাহর সঙ্গে আচরণে, তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আচরণে, কুরআনের সঙ্গে আচরণে, নিজেদের উম্মাহর সঙ্গে আচরণে কিংবা যাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আছে এবং যাদের উপর তাদের হক রয়েছে, সবার সঙ্গেই। তারা যেন তাদের সঙ্গী-সাথী, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে খারাপ আচরণ না করে।
ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘পিতার উপর কর্তব্য হলো তার সন্তানকে শিষ্টাচার শেখানো এবং দ্বীনের প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ শিক্ষা দেওয়া। ছেলে-মেয়ে বালেগ হওয়ার আগেই এই শিক্ষা দেওয়া পিতার এবং অন্যান্য অভিভাবকদের উপর আবশ্যক। এ বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ ও তাঁর ছাত্ররা স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ী ও তাঁর ছাত্ররা বলেন: ‘পিতা না থাকলে মায়ের ওপরও এই শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক; কারণ এটি লালন-পালনের অন্তর্ভুক্ত এবং এ ক্ষেত্রে তাদেরও ভূমিকা রয়েছে। এই শিক্ষার খরচ সন্তানের সম্পদ থেকে নেওয়া হবে। যদি সন্তানের নিজস্ব সম্পদ না থাকে, তবে যার উপর তার ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে সে বহন করবে। কারণ এটি তার প্রয়োজনীয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।’[শরহুন নববী আলা সহীহি মুসলিম (৮/৪৪)]
অভিভাবকের উচিত সন্তানদের জীবনের প্রতিটি বিষয়ে আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়া; খাবার, পানীয়, পোশাক, ঘুম, ঘর থেকে বের হওয়া ও ঘরে প্রবেশ করা, যানবাহনে ওঠা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই। এছাড়াও তাদের অন্তরে পুরুষোচিত উত্তম গুণাবলি রোপণ করা; যেমন ত্যাগের মানসিকতা, পরোপকার, সাহসিকতা, বীরত্ব, দানশীলতা। তাদেরকে নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে দূরে রাখা। যেমন: কাপুরুষতা, কৃপণতা, ব্যক্তিত্বহীনতা, মহৎ কাজ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি।
মুনাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘যেমনি তোমার উপর তোমার পিতামাতার হক রয়েছে, তেমনি তোমার উপর সন্তানের তোমার হক রয়েছে। অর্থাৎ বহু অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: ফরয জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, শরীয়তসম্মত আদব-কায়দা শেখানো, সন্তানদের মধ্যে কিছু দেয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করা, হোক তা হেবা, উপহার, ওয়াকফ কিংবা অন্য কোনো দান। যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হয় তবে কিছু আলেমের মতে সেটা বাতিল গণ্য হবে; আর কারও মতে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হবে।’[ফাইযুল কাদীর (২/৫৭৪)]
পিতামাতার দায়িত্ব হলো ছেলে-মেয়েদের এমন সকল বিষয় থেকে রক্ষা করা যা তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে (জাহান্নামের) আগুন থেকে রক্ষা করো; যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর, যার দায়িত্বে রয়েছে নির্দয় ও কঠোর ফেরেশতারা। তারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না এবং যা করার নির্দেশ পায় তাই করে।”[সূরা তাহরীম: ৬]
কুরতুবী বলেন: ‘এই আয়াত সম্পর্কে হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “তাদেরকে আদেশ দিবে এবং নিষেধ করবে।” কিছু আলেম বলেন: আল্লাহ যখন বলেন ‘নিজেদেরকে রক্ষা করো’, তখন এর মধ্যে সন্তানরাও অন্তর্ভুক্ত। কারণ সন্তান মানুষেরই অংশ। যেমন আল্লাহ বলেন:
وَلا عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَنْ تَأْكُلُوا مِنْ بُيُوتِكُمْ
“তোমাদের নিজেদের ঘর থেকে খাওয়াতে তোমাদের কোনো বাধা নেই”—এখানেও সন্তানদেরকে অন্যান্য আত্মীয়দের মতো আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি (যদিও তারা নিকটতম আত্মীয়)।
অতএব তাকে হালাল-হারাম শিক্ষা দিবে, গুনাহ ও অপরাধ থেকে বিরত রাখবে এবং এছাড়া তাকে অন্যান্য বিধানও শিক্ষা দিবে।’[তাফসীরে কুরতুবী (১৮/১৯৪–১৯৫)]
ভরণ-পোষণ:
এটি পিতার ওপর সন্তানদের ব্যাপারে অন্যতম আবশ্যকীয় দায়িত্ব। এতে অবহেলা বা গাফিলতি করা বৈধ নয়; বরং সর্বোত্তমভাবে তা পালন করা আবশ্যক।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার ওপর রয়েছে, তাদের অবহেলা করাই একজন মানুষের গুনাহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।”[হাদীসটি আবু দাউদ (১৬৯২) বর্ণনা করেন, শাইখ আলবানী সহীহুল জামে‘ (৪৪৮১) গ্রন্থে এটিকে হাসান বলে গণ্য করেন]
আরো একটি মহান ও গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো: বিশেষভাবে কন্যাসন্তানের উত্তম লালন-পালন ও যত্ন নেওয়া।
এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহ প্রদান করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: এক মহিলা তার দুই মেয়েকে নিয়ে আমার কাছে সাহায্য চাইতে এলো। আমার কাছে একটি মাত্র খেজুর ছাড়া কিছুই ছিল না। আমি সেটি তাকে দিলাম। সে খেজুরটিকে দুই মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিল, তারপর উঠে চলে গেল। পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে আমি তাঁকে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন: “যে ব্যক্তি এই মেয়েদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে এবং তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দা হয়ে যাবে।”[হাদীসটি বুখারী (৫৬৪৯) ও মুসলিম (২৬২৯) বর্ণনা করেন]
সন্তানদের অধিকারগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা।
এই অধিকারের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদীসে ইঙ্গিত করে বলেছেন: “আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।”[হাদীসটি বুখারী (২৪৪৭) ও মুসলিম (১৬২৩) বর্ণনা করেন]
অতএব মেয়েদের ওপর ছেলেদের প্রাধান্য দেওয়া যেমন জায়েয নয়, তেমনি ছেলেদের উপর মেয়েদের প্রাধান্য দেওয়াও জায়েজ নয়। যদি পিতা এই ভুল করে এবং সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য এবং ইনসাফ না করে, তবে তা বহু ক্ষতির কারণ হয়। এর মধ্যে একটি ক্ষতি হলো এই যে:
এর প্রভাব পিতার নিজের উপরই পড়ে। যাদের বঞ্চিত করা হয় তারা বড় হয়ে পিতার প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে (১৬২৩) নুমানের পিতাকে উদ্দেশ্য করে এই দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন: “তুমি কি চাও তারা সবাই তোমার সাথে সমানভাবে সদাচরণ করুক?” তিনি বললেন: হ্যাঁ। অর্থাৎ তুমি যদি তাদের থেকে সমান সদাচরণ চাও, তবে কিছু দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।
আরেকটি ক্ষতি হলো, ভাইবোনদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হওয়া এবং তাদের মধ্যকার শত্রুতা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বলে ওঠা।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।