স্বামীর উপর স্ত্রীর বেশ কিছু আর্থিক অধিকার রয়েছে। যথা: মোহরানা, ভরণ-পোষণ, বাসস্থান। আর কিছু অধিকার রয়েছে যা আর্থিক নয়। যেমন: স্ত্রীদের মাঝে বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায় বজায় রাখা, তাদের সাথে উত্তমরূপে জীবনযাপন করা, স্ত্রীর ক্ষতি না করা। অন্যদিকে স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকারসমূহের মাঝে রয়েছে: আনুগত্যের আবশ্যকতা, স্বামীর কাছে নিজেকে উপভোগের জন্য সমর্পণ করা, স্বামীর অপছন্দনীয় কাউকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া, স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সদাচরণ করা।
স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার ও স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার
প্রশ্ন 10680
কুরআন-সুন্নাহ অনুসারে স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকারমূহ কী কী? অন্যভাবে বললে, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্বসমূহ কী কী?
উত্তরের সার-সংক্ষেপ
উত্তর
ইসলাম স্ত্রীর প্রতি স্বামীর বেশ কিছু অধিকার আবশ্যক করেছে। এর বিপরীতে স্বামীর প্রতি স্ত্রীরও কিছু অধিকার দিয়েছে। কিছু অধিকার রয়েছে যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উপরই আবশ্যক। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এবং আলেমদের বক্তব্য ও ব্যাখ্যার সাহায্যে আমরা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে উল্লেখ করব।
স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকারসমূহ
স্ত্রীর বিশেষ অধিকারসমূহ:
স্বামীর উপর স্ত্রীর কিছু আর্থিক অধিকার রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে: মোহরানা, ভরণ-পোষণ ও বাসস্থান। আর রয়েছে কিছু অধিকার যা আর্থিক নয়। যেমন: স্ত্রীদের মাঝে বণ্টন, স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ ও স্ত্রীর ক্ষতি না করা।
১. আর্থিক অধিকারসমূহ:
ক. মোহরানা: মোহরানা হলো সেই অর্থ যা স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে বিবাহ চুক্তির মাধ্যমে অথবা দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে পাওয়ার অধিকারী হয়। এটি নারীর প্রতি পুরুষের উপর আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
“নারীদেরকে সানন্দে তাদের মোহরানা দিয়ে দাও।”[সূরা নিসা: ৪] মোহরানার বিধান বিধিবদ্ধ করার মাধ্যমে বৈবাহিক চুক্তির গুরুত্ব ও অবস্থান প্রকাশ করা হয়েছে এবং নারীকে সম্মানিত ও মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে।
অধিকাংশ ফকিহের মতে মোহরানা বিবাহের শর্ত বা রুকন নয়; বরং এটি বিবাহের ফলস্বরূপ প্রাপ্য অধিকার। যদি বিবাহের সময় মোহরানা উল্লেখ না করা হয়, তবুও বিবাহ সঠিক হবে, এ বিষয়ে অধিকাংশ আলেম একমত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَّا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِن طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ مَا لَمْ تَمَسُّوهُنَّ أَوْ تَفْرِضُوا لَهُنَّ فَرِيضَةً
“স্ত্রীদের স্পর্শ করার কিংবা তাদের জন্য মোহরানা ধার্য করার আগেই যদি তোমরা তাদেরকে তালাক না দাও তাহলে তোমাদের কোনো দোষ হবে না।”[সূরা বাকারা: ২৩৬]
স্পর্শ এবং মোহরানা নির্ধারণের আগে তালাকের বৈধতা প্রমাণ করে যে, বিবাহের সময় মোহরানা নির্ধারণ না করাও বৈধ।
যদি বিবাহের সময় মোহরানা নির্ধারণ করা হয়, তবে স্বামীর উপর তা আদায় করা আবশ্যক। আর যদি নির্ধারণ না করা হয়, তবে স্ত্রী ‘মহরে মিসল’ (তার সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী) পাওয়ার অধিকারী হবে।
খ. ভরণপোষণ: ইসলামের আলেমরা একমত যে, স্ত্রীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীদের উপর ফরয, যদি স্ত্রী স্বামীর জন্য নিজেকে সমর্পণ করে এবং অবাধ্য না হয়। যদি স্ত্রী নিজেকে সমর্পণ না করে কিংবা অবাধ্য হয়, তবে সে ভরণপোষণের অধিকারী হবে না।
ভরণপোষণ আবশ্যক হওয়ার মাঝে নিহিত প্রজ্ঞা হলো: বিবাহের চুক্তির ফলে স্ত্রী স্বামীর অধীনে থাকে এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়া উপার্জনের উদ্দেশ্যে ঘরের বাইরে যেতে পারে না। তাই স্বামীর কর্তব্য হলো তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা এবং তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে স্ত্রী স্বামীকে দাম্পত্য অধিকার ও উপভোগের সুযোগ প্রদান করে।
ভরণপোষণ বলতে বোঝায়: স্ত্রীর প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান ও পোশাকের ব্যবস্থা করা। স্ত্রী ধনী হলেও এসব তার প্রাপ্য অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“সন্তানের পিতাকে যথোচিতভাবে মায়েদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করতে হবে।”[সূরা বাকারা: ২৩৩]
তিনি আরো বলেন:
لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ ۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ
“বিত্তবান ব্যক্তি তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবিকা সীমিত (সংকুচিত) করা হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে।”[সূরা তালাক: ৭]
সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা এসে স্বামীর ভরণ-পোষণ না দেওয়ার অভিযোগ করলে তিনি তাকে বললেন: “তুমি তার সম্পদ থেকে ন্যায়সঙ্গতভাবে তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য যা যথেষ্ট হয় তা গ্রহণ কর।”
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রবেশ করে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান কৃপণ ব্যক্তি, সে আমাকে ও আমার সন্তানদের জন্য যথেষ্ট খরচ দেয় না। আমি কি তার অজান্তে তার সম্পদ থেকে নিতে পারি?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “ন্যায়সঙ্গতভাবে তোমার ও তোমার সন্তানদের জন্য যা যথেষ্ট হয় তা গ্রহণ করো।”[হাদীসটি বুখারী (৫০৪৯) ও মুসলিম (১৭১৪) বর্ণনা করেন]
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, বিদায় হজের ভাষণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানতের মাধ্যমে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর বাণীর মাধ্যমে তাদের লজ্জাস্থান হালাল করেছ। তাদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো: তারা যেন এমন কাউকে তোমাদের বিছানায় বসতে না দেয় যাকে তোমরা অপছন্দ করো। যদি তারা তা করে, তবে তাদের হালকা প্রহার করতে পারো (যা কষ্টদায়ক নয়)। আর তাদের ওপর তোমাদের দায়িত্ব হলো, ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা।”[হাদীসটি মুসলিম (১২১৮) বর্ণনা করেন]
গ. বাসস্থানের অধিকার:
এটিও স্ত্রীর অধিকার। স্বামী তার সামর্থ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী স্ত্রীর জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنتُم مِّن وُجْدِكُمْ
“তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে রকম বাসস্থানে থাকো তাদের জন্যও তেমন বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে।”[সূরা তালাক: ৬]
অ-আর্থিক অধিকারসমূহ:
ক. স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার:
যদি স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকে, তবে প্রত্যেক স্ত্রীর মধ্যে রাত্রিযাপন, ভরণপোষণ ও পোশাকের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা তার ওপর কর্তব্য।
খ. সদাচরণ (উত্তম ব্যবহার):
স্বামীর ওপর কর্তব্য হলো স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা, নম্র হওয়া এবং এমন সব কাজ করা যা তার হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে বসবাস করো।”[সূরা নিসা: ১৯]
তিনি আরো বলেন:
وَلهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالمَعْرُوفِ
“নারীদের উপর যেমন (পুরুষের) অধিকার রয়েছে তেমনি (পুরুষের উপর) নারীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে।”[সূরা বাকারা: ২২৮]
হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমরা নারীদের সাথে সদাচরণের উপদেশ গ্রহণ করো।”[হাদীসটি বুখারী (৩১৫৩) ও মুসলিম (১৪৬৮) বর্ণনা করেন]
স্ত্রীদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম আচরণের কয়েকটি দৃষ্টান্ত (তিনিই আমাদের আদর্শ):
১. যাইনাব বিনতে আবু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একই চাদরের নিচে ছিলাম, হঠাৎ আমার ঋতুস্রাব শুরু হলো। আমি সেখান থেকে সরে গিয়ে ঋতুস্রাবের কাপড় পরলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন: “তোমার কি ঋতুস্রাব হয়েছে?” আমি বললাম: ‘হ্যাঁ।’ তখন তিনি আমাকে ডেকে আবার তাঁর সঙ্গে একই চাদরের নিচে নিলেন। তিনি আরো বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা অবস্থায় আমাকে চুমু দিতেন এবং আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্রে গোসল করতাম।’[হাদীসটি বুখারী (৩১৬) ও মুসলিম (২৯৬) বর্ণনা করেন]
২. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: আমি দেখেছি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হাবশিরা মসজিদে বর্শা দিয়ে খেলাধুলা করছিল। তিনি আমাকে তাঁর চাদর দিয়ে আড়াল করলেন যাতে আমি তাদের খেলা দেখতে পারি এবং আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকলেন যতক্ষণ না আমি নিজে সরে গেলাম।[হাদীসটি বুখারী (৪৪৩) ও মুসলিম (৮৯২) বর্ণনা করেন]
৩. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে নামায পড়তেন এবং বসে কিরাত করতেন। যখন প্রায় ত্রিশ বা চল্লিশ আয়াত বাকি থাকত, তখন দাঁড়িয়ে সেগুলো পড়তেন, তারপর রুকু ও সিজদা করতেন। দ্বিতীয় রাকাতেও একইভাবে করতেন। নামায শেষে যদি আমি জেগে থাকতাম, তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন, আর যদি আমি ঘুমিয়ে থাকতাম, তবে তিনি শুয়ে পড়তেন।[হাদীসটি বুখারী (১০৬৮) বর্ণনা করেন]
গ. স্ত্রীর ক্ষতি না করা:
এটি ইসলামের মৌলিক নীতির অন্তর্ভুক্ত। অপরিচিত মানুষের ক্ষতি করা যদি হারাম হয়, তবে স্ত্রীর ক্ষতি করা তো আরও বেশি মাত্রায় নিষিদ্ধ।
উবাদা ইবনে সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদানেও ক্ষতি করা যাবে না।”[ইবনে মাজাহ ২৩৪০। হাদীসটি ইমাম আহমদ, হাকেম, ইবনুস সালাহ ও অন্যান্যরা বিশুদ্ধ বলে গণ্য করেছেন। দেখুন: খুলাসাতুল বাদরুল মুনীর (২/৪৩৮)]
এই বিষয়ে শরীয়ত আরও যে বিষয়টির প্রতি সতর্ক করেছে তা হলো: মারধর যেন কষ্টদায়ক না হয়।
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেন: “নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করো, যদি তারা তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে তোমাদের বিছানায় বসতে দেয়, তবে তাদের এমনভাবে প্রহার করবে যা কষ্টদায়ক নয়। আর তাদের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে (লোকাচার অনুযায়ী) খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা তোমাদের দায়িত্ব।”[হাদীসটি মুসলিম (১২১৮) বর্ণনা করেছেন]
স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকারসমূহ
স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকারসমূহ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধিকারগুলোর অন্তর্ভুক্ত। বরং স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকারের চেয়ে বেশি গুরুত্ববহ। এর দলিল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার বাণী:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
“নারীদের উপর যেমন (পুরুষের) অধিকার রয়েছে তেমনি (পুরুষের উপর) নারীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে। তবে তাদের উপরে পুরুষদের একটি (বিশেষ) মর্যাদা রয়েছে।”[সূরা বাকারা: ২২৮]
জাসসাস রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের ওপর অধিকার রয়েছে এবং স্বামীর জন্য স্ত্রীর ওপর একটি বিশেষ অধিকার রয়েছে, যা স্ত্রীর জন্য স্বামীর ওপর নেই।
ইবনুল আরাবী বলেন: ‘এটি স্পষ্ট দলিল যে, বিবাহসংক্রান্ত অধিকারের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর উপর প্রাধান্যপ্রাপ্ত ও অগ্রাধিকারযোগ্য।’
স্বামীর অধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ক. আনুগত্য করার আবশ্যকতা:
আল্লাহ তাআলা পুরুষকে নারীর উপর অভিভাবক ও দায়িত্বশীল করেছেন; নির্দেশনা, তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে, যেমনিভাবে শাসক তার প্রজাদের দায়িত্ব পালন করে। এটি এজন্য যে, আল্লাহ পুরুষকে কিছু শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যে নারীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তার ওপর আর্থিক দায়িত্ব আরোপ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
“পুরুষেরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক; কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা (পুরুষেরা) তাদের সম্পদ থেকে (নারীদের জন্য) ব্যয় করে থাকে।”[সূরা নিসা: ৩৪]
ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
আলী ইবনে আবি তালহা (রহঃ) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করে বলেন: “পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল” এর অর্থ হলো: তারা তাদের উপর শাসকস্বরূপ। অর্থাৎ নারী আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী স্বামীর আনুগত্য করবে। আর স্বামীর আনুগত্য হলো— সে তার পরিবারের কল্যাণ করবে এবং তার সম্পদের হেফাজত করবে।” মুকাতিল, সুদ্দি ও দাহহাকও একই কথা বলেছেন।[তাফসির ইবনে কাসীর (১/৪৯২)]
খ. স্বামীর জন্য নিজেকে ভোগ করার সুযোগ করে দেওয়া:
স্ত্রীর উপর স্বামীর আরেকটি অধিকার হলো: স্ত্রী তাকে উপভোগ করার সুযোগ দেবে। যদি কোনো পুরুষ এমন কোনো নারীকে বিবাহ করে যে সহবাস করার উপযুক্ত, তখন চুক্তির মাধ্যমেই স্বামী চাওয়ামাত্র স্ত্রীর কর্তব্য হবে নিজেকে স্বামীর কাছে সমর্পণ করা।
তবে শর্ত হলো: স্বামী তার নগদ প্রদেয় মোহরানা আদায় করে দিবে এবং স্ত্রী যদি প্রস্তুতির জন্য সময় চায় (যেমন দুই বা তিন দিন) তবে তাকে সেই সময় দেওয়া হবে। কারণ এটি তার প্রয়োজন এবং সাধারণ প্রচলনও এমন।
স্ত্রী যদি কোনো শরঈ ওজর যেমন: হায়েয, ফরয রোযা, অসুস্থতা ইত্যাদি ছাড়া স্বামীর ডাকে সাড়া না দেয়, তবে সে গুনাহের মধ্যে পতিত হবে এবং কবীরা গুনাহ করেছে বলে গণ্য হবে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে শয্যায় আহ্বান করে আর সে অস্বীকৃতি জানায় এবং স্বামী তার ওপর রাগ করে রাত কাটায়, তখন সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”[হাদীসটি বুখারী (৩০৬৫) ও মুসলিম (১৪৩৬) বর্ণনা করেন]
গ. স্বামীর অপছন্দনীয় কাউকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া:
স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার হলো— সে যেন তার ঘরে এমন কাউকে প্রবেশ করতে না দেয় যাকে স্বামী অপছন্দ করে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “স্বামী উপস্থিত থাকা অবস্থায় তার অনুমতি ছাড়া কোনো নারীর জন্য (নফল) রোযা রাখা হালাল নয় এবং তার ঘরে (কারো প্রবেশের) অনুমতি দেওয়া বৈধ নয়…”[হাদীসটি বুখারী (৪৮৯৯) ও মুসলিম (১০২৬) বর্ণনা করেন]
সুলাইমান ইবনে আমর ইবনে আহওয়াস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার পিতা আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিদায় হজে উপস্থিত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করলেন, উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন:
“তোমরা নারীদের ব্যাপারে উত্তম উপদেশ গ্রহণ করো। তারা তোমাদের কাছে আটক। স্পষ্ট কু-কাম করা ছাড়া তাদের বিষয়ে তোমাদের কোনো কিছু করার অধিকার নেই। যদি তারা তা করে তাহলে তাদেরকে শয্যায় পরিত্যাগ করো এবং হালকা প্রহার করো (যা কষ্টদায়ক নয়)। আর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ খুঁজো না। নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার রয়েছে এবং তোমাদের ওপর স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। তোমাদের অধিকার হলো— তারা যেন তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে তোমাদের বিছানায় বসতে না দেয় এবং তোমাদের ঘরে এমন কাউকে প্রবেশ করতে না দেয়, যাকে তোমরা অপছন্দ করো। আর তাদের অধিকার হলো— তোমরা তাদেরকে ভরণপোষণ দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে।”[হাদীসটি তিরমিযী (১১৬৩) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: এটি হাসান সহীহ। ইবনে মাজাহ (১৮৫১)]
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “স্ত্রীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা আল্লাহর আমানতের মাধ্যমে তাদেরকে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর বাণীর মাধ্যমে তাদের লজ্জাস্থান হালাল করেছ। তাদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো— তারা যেন তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে তোমাদের বিছানায় বসতে না দেয়। যদি তারা এমন কিছু করে তবে তাদেরকে এমনভাবে প্রহার করবে যা কষ্টদায়ক নয়। আর তাদের অধিকার হলো— তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে (লোকাচার অনুযায়ী) তাদের খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করবে।”[হাদীসটি মুসলিম (১২১৮) বর্ণনা করেন]
ঘ. স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া:
স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো: সে যেন স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হয়।
শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমরা বলেন: ‘স্ত্রীর জন্য তার অসুস্থ পিতাকে দেখতে যাওয়া স্বামীর অনুমতি ছাড়া বৈধ নয় এবং স্বামী চাইলে এতে তাকে বাধা দিতে পারে। কারণ স্বামীর আনুগত্য করা ফরয। আর যা ফরয নয় তার জন্য ফরয কাজ ত্যাগ করা বৈধ নয়।’
ঙ. শাসন করা:
স্ত্রী যদি স্বামীর ভালো আদেশ অমান্য করে, পাপের আদেশ নয়; তবে স্বামীর জন্য তাকে শাসন করা বৈধ। কারণ আল্লাহ তাআলা অবাধ্যতার ক্ষেত্রে নারীদের শয্যা আলাদা করা ও হালকা প্রহারের মাধ্যমে শাসন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
হানাফী আলেমরা চারটি ক্ষেত্রে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে শাসন করা (হালকা প্রহার) বৈধ বলেছেন। সেগুলো হলো:
১. স্বামী সাজগোজ করা চাইলে স্ত্রী যদি তা না করে।
২. স্ত্রী পবিত্র অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও স্বামীর শয্যার আহ্বানে সাড়া না দিলে।
৩. নামাজ না পড়লে।
৪. স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বাইরে গেলে।
শাসন করা বৈধ হওয়ার পক্ষে দলীলসমূহ:
আল্লাহর বাণী:
وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ
“আর যে নারীদের মধ্যে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদেরকে (প্রথমে) উপদেশ দাও, (তাতে কাজ না হলে) বিছানায় তাদেরকে বর্জন করো এবং (তাতেও ফল না দিলে) তাদেরকে (মৃদু) প্রহার করো।”[সূরা নিসা: ৩৪]
আল্লাহর বাণী:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে (জাহান্নামের) আগুন থেকে রক্ষা করো; যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।”[সূরা তাহরীম: ৬]
ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: তুমি তোমাদের পরিবারকে আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ করবে এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করবে। আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে তাদের তত্ত্বাবধান করবে, তাদেরকে নির্দেশ দিবে ও সাহায্য করবে। আর যখন তাদের মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা দেখবে তখন তাদেরকে তা থেকে বিরত রাখবে এবং কঠোরভাবে নিষেধ করবে।
অনুরূপ কথাই বলেছেন দাহহাক ও মুকাতিল: একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো: তার আত্মীয়-স্বজন, দাস-দাসী ও অধীনস্থদেরকে আল্লাহ যা ফরয করেছেন এবং যা নিষিদ্ধ করেছেন তা শিক্ষা দেওয়া।”[তাফসির ইবনে কাসীর (৪/৩৯২)]
চ. স্ত্রীর স্বামীর সেবা করা:
এ বিষয়ে বহু দলিল রয়েছে। যার কিছু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “স্ত্রীর ওপর স্বামীর সেবা করা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আবশ্যক। এই সেবা পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হয়। গ্রাম্য নারীর সেবা শহুরে নারীর সেবার মতো নয়। আর শক্তিশালী নারীর সেবা দুর্বল নারীর সেবার মতো নয়।”[আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা (৪/৫৬১)]
ছ. স্ত্রী নিজেকে সমর্পণ করা:
যখন বিয়ের চুক্তির শর্তগুলো পূরিপূর্ণ হয় এবং চুক্তিটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় তখন স্ত্রীর ওপর আবশ্যক তার নিজেকে স্বামীর কাছে সমর্পণ করা এবং স্বামীকে উপভো করার সুযোগ দেওয়া। কারণ বিবাহ-চুক্তির মাধ্যমে স্বামী একটি বিনিময়ের অধিকারী হয়। সেটি হলো— স্ত্রীকে উপভোগ করা। আর স্ত্রী আরেকটি বিনিময়ের অধিকারী হয়। সেটি হলো— মোহরানা।
জ. স্বামীর সাথে স্ত্রীর সদ্ভাবে জীবনযাপন:
এটি আল্লাহ তাআলার বাণীর ভিত্তিতে:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“নারীদের উপর যেমন (পুরুষের) অধিকার রয়েছে তেমনি (পুরুষের উপর) নারীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে।”[সূরা বাকারা: ২২৮]
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
‘ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: ‘স্ত্রীদের যেমন অধিকার আছে: উত্তম সঙ্গ ও সুন্দর আচরণের ক্ষেত্রে, তেমনি তাদের উপরও স্বামীদের প্রতি আনুগত্যের কর্তব্য রয়েছে, যা আল্লাহ তাদের ওপর ফরয করেছেন।’
আরেক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: ‘স্ত্রীদের অধিকার হলো: স্বামীরা যেন তাদের ক্ষতি না করে, যেমনিভাবে স্ত্রীদের উপরও স্বামীদেরকে ক্ষতি না করার কর্তব্য রয়েছে।’[তাবারী]
ইবনে যাইদ বলেন: “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে, যেমনিভাবে নারীরা তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে।”
বক্তব্যগুলোর অর্থ কাছাকাছি এবং এই আয়াত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সকল অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করে।’[তাফসীরুল কুরতুবি (৩/১২৩–১২৪)]
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সূত্র:
শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ