ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব
শনিবার, ১৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
১৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
শরিক হোন
শনিবার, ১৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
১৩ জুমাদাল আউওয়াল ১৪৪৮ AH
শরিক হোন

বগলের ও নাভির নিচের চুল উপড়ে ফেলার বিধান আরোপের মাঝে নিহিত প্রজ্ঞা

1

প্রশ্ন 202827

নাভির নিচের ও বগলের নিচের চুল মুণ্ডন করার কারণ কী? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সবাই কীভাবে এই চুল মুণ্ডন করত? এই চুল ছোট করা কি যথেষ্ট হবে? নাকি মুণ্ডন করা আবশ্যক?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

এক:

বগলের ও নাভির নিচের চুল উপড়ে ফেলার বিধানের ব্যাপারে সুন্নাহ থেকে দলীল রয়েছে। বুখারী (৫৮৮৯) ও মুসলিম (২৫৭) বর্ণনা করেন: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “ফিতরাত (সহজাত) পাঁচটি বা ফিতরতের কাজ পাঁচটি: খতনা করা, ক্ষুর ব্যবহার করা (নাভির নিচে), বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নখ কাটা ও গোঁফ খাটো করা।”

এই দুই স্থান থেকে চুল দূর করার বিধান প্রণয়নের মাঝে নিহিত গূঢ় রহস্য বা প্রজ্ঞা (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন) হলো: এগুলো দূর করার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পরিচ্ছন্নতা অর্জিত হয় এবং এই চুলগুলো দূর না করে রেখে দিলে যে দুর্গন্ধ বের হত, সেটার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়াও বেশ কিছু কল্যাণ ও মহান প্রজ্ঞা রয়েছে।

হাফেয ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এই (ফিতরাতের) স্বভাবগুলোর সাথে নানান দ্বীনী ও দুনিয়াবী কল্যাণ সম্পৃক্ত। অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেগুলো বোঝা যায়। তন্মধ্যে রয়েছে:

  • শারীরিক গড়ন সুন্দর করা
  • সমগ্র শরীর পরিষ্কার করা
  • অযু ও গোসলের পবিত্রতার ব্যাপারে নিরাপদ থাকা
  • সঙ্গী-সাথী দুর্গন্ধে যে কষ্ট পেতে পারে সেটা প্রতিহত করার মাধ্যমে সঙ্গীর প্রতি সদাচরণ করা
  • অগ্নিপূজারী, ইহুদী, খ্রিষ্টান ও মূর্তিপূজারী কাফেরদের আচারের বিরোধিতা করা
  • শরীয়ত প্রণেতার নির্দেশ মানা
  • আল্লাহ “তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন এবং সে আকৃতিকে করেছেন সুন্দর” বাণীর মাধ্যমে যে বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন সেটা সংরক্ষণ করা। কেননা এই স্বভাবগুলোর যত্ন নিলে সুন্দর আকৃতি সংরক্ষিত হয়। যেন এখানে বলা হয়েছে: আমি তোমাদের আকৃতি শোভন করেছি, তোমরা বিশ্রী কিছু করে এই আকৃতিকে বিকৃত করো না। অথবা যা কিছু আকৃতির সৌন্দর্যকে বজিয়ে রাখে সেগুলো পালন করো। এই স্বভাবগুলো ধারণ করার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের সাথে সুসম্পর্কও রক্ষিত হয়। কারণ মানুষ যদি তার সুন্দর আকৃতিতে (মানুষদের সামনে) নিজেকে প্রকাশ করে তাহলে অন্যরা তার দিকে ধাবিত হয়। ফলে তার কথা গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং তার মতামতও প্রশংসনীয় বলে গণ্য হয়। এর বিপরীত কাজ করলে সেটার ফলও বিপরীত হয়।” [ফাতহুল বারী থেকে সমাপ্ত]।

দুই:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যে বিষয়টা প্রসিদ্ধ ছিল সেটা হলো, তারা মুণ্ডন করার কাজে ক্ষুর ব্যবহার করতেন।

বুখারী (৫০৭৯) ও মুসলিম (৭১৫) বর্ণনা করেন: জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। মদীনায় ফেরার পর ঘরে ঢুকতে গেলে তিনি আমাদেরকে বললেন: “তোমরা অপেক্ষা করো। আমরা রাতে প্রবেশ করব, যেন এলোকেশী স্ত্রী নিজের অবিন্যস্ত কেশরাশি বিন্যস্ত করতে পারে এবং প্রবাসী স্বামীর স্ত্রী নিজের লোম ক্ষুর দিয়ে পরিষ্কার করতে পারে।”

হাফেয ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ “ফাতহুল বারী” বইয়ে বলেন: অর্থাৎ যে নারীর স্বামী অনুপস্থিত। এর দ্বারা উদ্দেশ্য তার চুল দূর করা। এক্ষেত্রে ক্ষুর দিয়ে কামানোর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুল অপসারণে ক্ষুর ব্যবহার করা হয়। এ কথায় ক্ষুর ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে দূর করার নিষেধাজ্ঞা নেই।” [সমাপ্ত]

বুখারী (৩৯৮৯) খুবাইব ইবনে আদী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা বর্ণনা করেন, সেখানে রয়েছে: “তারা (কাফেররা) তাকে (খুবাইবকে) হত্যার ব্যাপারে সবাই সম্মত হওয়ার পর তিনি ক্ষৌর কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে হারিসের এক মেয়ে থেকে একটা ক্ষুর ধার চাইলেন। হারিসের মেয়ে তাকে একটা ক্ষুর ধার দিল। ...” হাদীসটি।

তিন:

নাভির নিচের চুলের ক্ষেত্রে সুন্নাহ হলো: ‘মুণ্ডন করা’। আর বগলের নিচের চুলের ক্ষেত্রে সুন্নাহ হলো: ‘উপড়ে ফেলা’। ব্যক্তি যদি (মুণ্ডন না করে) শুধু ছোট করে; তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু এটা উত্তম নয়।

ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: হাদীসে উল্লিখিত ‘ইস্তেহদাদ’ তথা ক্ষুর দিয়ে নাভির নিচের চুল কামানোর যে কথা বলা হয়েছে, সেটা মুস্তাহাব। কারণ এটা ফিতরাত তথা সহজাত অভ্যাসের দাবি। আর এটা কামানো ছেড়ে দিলে বড় হয়ে যায়। সুতরাং চুল দূর করাটা মুস্তাহাব। যে কোনো বস্তু দিয়ে ব্যক্তি চুল দূর করতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু, উদ্দেশ্য হলো দূর করা। আবু আব্দুল্লাহকে (অর্থাৎ ইমাম আহমদ) বলা হয়েছিল: ‘ব্যক্তি নিজের নাভির নিচের চুল যদি কাঁচি দিয়ে কাটে এবং পুরোটা উপড়ে না ফেলে, সেটা কি আপনি সঠিক মনে করেন?’ তিনি উত্তর দেন: “আমি আশা করি এটা যথেষ্ট হবে ইন শা আল্লাহ।” [আল-মুগনী (১/৬৫) থেকে সমাপ্ত]।

নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: হাদীসের ‘ইস্তেহদাদ’ হলো নাভির নিচের চুল কামানো। এর নাম ‘ইস্তেহদাদ’ দেওয়ার কারণ হলো এই কাজে লোহার টুকরো তথা ক্ষুর ব্যবহার করা হয়। এটা সুন্নাহ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ স্থানটুকু পরিষ্কার করা। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম হল ‘মুণ্ডন করা’। তবে চুল কাটা, উপড়ে ফেলা কিংবা নূরা (চুল অপসারক উপাদান) ব্যবহার করা জায়েয। ... আর বগলের নিচের চুল উপড়ে ফেলা সর্বসম্মতিক্রমে সুন্নত। এক্ষেত্রে উত্তম হলো উপড়ে ফেলা, যিনি উপড়ে ফেলার শক্তি রাখেন। আবার মুণ্ডন করা কিংবা নূরা (চুল অপসারক উপাদান) ব্যবহার করার মাধ্যমেও এটা করা যায়। ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা বলেন: আমি শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহুর কাছে ঢুকে দেখতে পেলাম নাপিত তার বগলের নিচের চুল মুণ্ডন করছে। শাফেয়ী বললেন: আমি জানি উপড়ে ফেলাই সুন্নাহ। কিন্তু আমার ব্যথা সহ্য করার শক্তি নেই। [নববীর শারহু মুসলিম (৩/১৪৯)]।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

মানবিক সহজাত সুন্নতসমূহ

সূত্র: 

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

App StoreGoogle Play