শনিবার 18 যুলক্বদ 1440 - 20 জুলাই 2019
বাংলা

যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) সম্পর্কে তার একাধিক প্রশ্ন

প্রশ্ন

আমি বিবাহিত। আমার একজন বাচ্চা আছে। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। আমার মা মৃত। আমার বাবার কোন আর্থিক রোজগার নেই। আমি নিম্নোক্ত প্রশ্নের জবাব পেতে চাই। ১। যে পরিমাণ যাকাতুল ফিতর আদায় করা আমার উপর ওয়াজিব। উল্লেখ্য, ব্যাংকে আমার প্রায় ১৫০০ দিনার রয়েছে। ২। আমি যা কিছুর মালিক; যেমন- গাড়ী, বাসার আসবাবপত্র, আমার স্ত্রীর স্বর্ণ, আমার বাবা ভাইদেরকে বলেছেন যে, ফ্ল্যাটের অর্ধেক আমার নামে লিখে দিবেন; সে সবের বিপরীতেও কি যাকাতুল ফিতর পরিশোধ করব? ৩। কাদের কাদের পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর পরিশোধ করব? আমি কি আমার বাবার যাকাতুল ফিতরও পরিশোধ করব? ৪। যাকাতুল ফিতর কারা পাওয়া ওয়াজিব? আমি কি অন্য দেশে অবস্থানরত আমার পরিবারকে যাকাতুল ফিতর পরিশোধ করতে পারব; যাদের অবস্থা সংকটপূর্ণ। ৫। যাকাতুল ফিতর কি অর্থের পরিবর্তে অন্য কিছু হতে পারে। খাওয়ার উপযুক্ত একটি পশু দিয়ে পরিবর্তন করে সে পশু তাদের মাঝে বণ্টন করলে? ৬। ঈদের দুই সপ্তাহ আগে কি আমি যাকাতুল ফিতর আদায় করে দিতে পারি; যাতে করে তাদের জন্য সহযোগিতা হয়। ৭। যাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ কত?

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।

এক:

প্রথমেই জেনে রাখা উচিত: 'যাকাতুল ফিতর' (ফিতরা) যা রমযান মাসের শেষে দিতে হয় আর 'সম্পদের যাকাত' এ দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। ফিতরা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয: এক 'স্বা' করে তাদের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা যাদের খরচ বহন করা তার উপর আবশ্যক; যদি সেটা নিজের ও পোষ্যদের ঈদের দিন ও রাতের খাদ্যের অতিরিক্ত হিসেবে তার কাছে থাকে।

ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার জন্য সম্পদের নির্দিষ্ট নেসাব শর্ত নয়, বছর পূর্তি শর্ত নয়, যাকাতের ক্ষেত্রে আরও যে সব শর্ত প্রযোজ্য সেগুলোও শর্ত নয়।

ফিতরার সাথে ব্যক্তি যা কিছুর মালিক যেমন- অর্থকড়ি, স্থাবর সম্পত্তি বা গাড়ী এগুলোর কোন সম্পর্ক নেই। কেননা ফিতরা ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে ও যাদের পোষণ করা আবশ্যক তাদের পক্ষ থেকে আদায় করে থাকে।

আরও জানতে দেখুন: 12459 নং ও 49632 নং প্রশ্নোত্তর।

দুই:

প্রশ্নে উদ্ধৃত তথ্যানুযায়ী আপনার উপর আবশ্যক হল: আপনার নিজের, আপনার স্ত্রীর, আপনার শিশুর এবং আপনার পিতার ফিতরা আদায় করা; যদি আপনার পিতার এমন কোন সম্পদ না থাকে যেমনটি প্রশ্নে উদ্ধৃত হয়েছে।

আর গর্ভস্থিত সন্তানের ফিতরা পরিশোধ করা ইজমা অনুযায়ী ওয়াজিব নয়। কিন্তু আপনি যদি তার পক্ষ থেকেও পরিশোধ করেন তাতে কোন অসুবিধা নেই। ফিতরার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: 146240 নং, 124965 নং প্রশ্নোত্তর।  

তিন:

ফিতরার ক্ষেত্রে ওয়াজিব হল: যেটা স্থানীয় লোকদের অধিকাংশের খাদ্য সেটা দিয়ে আদায় করা।

শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায (রহঃ) বলেন:

"সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু সাইদ আল-খুদরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় সেটা (ফিতরা) পরিশোধ করতাম এক স্বা খাদ্য, কিংবা এক স্বা খেজুর, কিংবা এক স্বা যব, কিংবা এক স্বা কিসমিস।

আলেমদের একদল এ হাদিসে উদ্ধৃত খাদ্য-কে গম দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। আর অন্য একদল আলেমের ব্যাখ্যা হচ্ছে: কোন এলাকার মানুষ যেটাকে প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে; সেটা গম, ভুট্টা, কাউন যাই হোক না কেন; খাদ্য দ্বারা সেটাই উদ্দেশ্য। এটাই সঠিক অভিমত। কেননা ফিতরা দেওয়া হয় ধনীদের পক্ষ থেকে গরীবদের প্রতি সহমর্মিতাস্বরূপ। তাই কোন মুসলিমের উপর তার এলাকার খাদ্য নয় এমন কিছু দিয়ে সহমর্মী হওয়া ওয়াজিব নয়।"[সমাপ্ত]

এটাই শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর মনোনীত অভিমত। শাইখ উছাইমীন ও অন্যান্য আলেমও এই অভিমতকে মনোনয়ন করেছেন।

এর মাধ্যমে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ফিতরা সাধারণ খাদ্য থেকে পরিশোধ করতে হবে; অর্থ দিয়ে নয়, যেমনটি প্রশ্নে উদ্ধৃত হয়েছে এবং অর্থের অন্য কোন বদলা দিয়েও নয়।

যাকাত প্রদানকারী তিনি যাকাতুল ফিতর আদায়কারী হন বা সম্পদের যাকাত আদায়কারী হন, তার এ অধিকার নেই যে: তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে যাকাতকে বণ্টন করবেন, তিনি তার যাকাতের বদলে গরীবদেরকে কিছু কিনে দিবেন; যেমন- তাদেরকে গোশত কিনে দিলেন কিংবা পোশাক কিনে দিলেন কিংবা অন্য কিছু কিনে দিলেন।

আরও জানতে দেখুন: 22888 নং ও 66293 নং প্রশ্নোত্তর।

চার:

আপনি আপনার যাকাতুল ফিতর বা সম্পদের যাকাত আপনার নিজ দেশে স্থানান্তর করে সেখানে অবস্থানরত স্বজনদেরকে দিতে কোন অসুবিধা নেই; যদি তারা এমন অভাবী হয় যা ফিতরা স্থানান্তরের দাবী রাখে। স্থানান্তরের বিষয়টি সে সব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরও বেশি তাগিদপূর্ণ হয় যারা এমন কোন দেশে চাকুরী করেন যে দেশের অধিকাংশ মানুষ সচ্ছল ও ধনী; পক্ষান্তরে তাদের নিজেদের দেশের মানুষ দরিদ্র ও ক্ষুধাগ্রস্ত। বিশেষতঃ তাদের অনেকে যে দেশে চাকুরী করেন সেই দেশে কারা যাকাত পাওয়ার হকদার তাদের ব্যাপারে জানার চেয়ে নিজ দেশের গরীবদের ব্যাপারে ভাল জানেন।

এ বিষয়টি আরও বেশি তাগিদপূর্ণ হবে: যদি তিনি যে দেশে চাকুরী করেন সেই দেশ থেকে তার যাকাতটা স্থানান্তর করে নিজ দেশে অবস্থানরত নিকটাত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করা হয়।

আরও জানতে দেখুন: 81122 নং ও 43146 নং প্রশ্নোত্তর।

পাঁচ:

রমযানের সর্বশেষ দিনের সূর্য ডোবার মাধ্যমে ফিতরা ওয়াজিব হয় এবং ঈদের নামাযে যাওয়ার আগে পরিশোধ করা ওয়াজিব। প্রয়োজন সাপেক্ষে ঈদের একদিন বা দুইদিন আগে পরিশোধ করাও জায়েয।

অতএব, ঈদের এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ বা এ পরিমাণ অন্য কোন সময়ের আগে পরিশোধ করা জায়েয হবে না।

কিন্তু, আপনি যদি আশংকা করেন যে, অর্থটা পৌঁছতে ঈদের সময়ের চেয়ে বিলম্ব হয়ে যাবে; সেক্ষেত্রে আপনি যথেষ্ট সময় আগে এমনকি রমযানের আগেই অর্থটা পাঠিয়ে দিতে পারেন এবং নির্ভরযোগ্য একজনকে দায়িত্ব দিতে পারেন যিনি আপনার ফিতরাটা কিনে রাখবেন। কিন্তু পরিশোধ করবেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে।

আরও জানতে দেখুন: 81164 নং, 27016 নং ও 7175 নং প্রশ্নোত্তর।

আর সম্পদের যাকাত: যেমনটি ইতিপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি রমযানের সাথে বা অন্য কোন মাসের সাথে সম্পৃক্ত নয়। বরং যখনই সম্পদ নেসাব পরিমাণ হবে এবং এর বর্ষপূর্তি হবে তখনই যাকাত পরিশোধ করা ওয়াজিব।

যদি বছর পূর্তি হতে কিছু সময় বাকী থাকে: এক মাস বা এক মাসের বেশি বা এক মাসের কম এবং যাকাত আদায়কারী আগেই যাকাত পরিশোধ করে দিতে চান তাহলে অগ্রিম যাকাত আদায় করা জায়েয; যদি অগ্রিম আদায় করার কোন প্রয়োজন থাকে।

বিস্তারিত জানতে দেখুন: 98528 নং প্রশ্নোত্তর।

ইতিপূর্বে 145558 নং প্রশ্নোত্তরে যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা এবং সম্পদের যাকাতের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে।

ছয়:

অর্থের উপর যাকাত ফরয হওয়ার জন্য শর্ত দুটো বিষয়:

১। নেসাব পরিমাণ হওয়া।

২। এই নেসাবের বর্ষ পূর্তি হওয়া।

যদি কারো সম্পদ নেসাবের চেয়ে কম হয় তাহলে তার সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হবে না। আর যদি কোন সম্পদ নেসাব পরিমাণ হয় এবং সম্পদের পরিমাণ নেসাব পরিমাণে পৌঁছার পর এক বছর পূর্ণ হয়; অর্থাৎ একটি চন্দ্র বর্ষ (হিজরী) অতিবাহিত হয় তাহলে যাকাত ওয়াজিব হবে।

নেসাবের পরিমাণ হল: ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ বা ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্যের সমমূল্য।

যে পরিমাণ সম্পদ যাকাত হিসেবে পরিশোধ করা ওয়াজিব সেটা হল: চল্লিশ ভাগের এক ভাগ (২.৫%)।

আরও বেশি জানতে দেখুন: 93251 নং ও 50801 নং প্রশ্নোত্তর।

আপনার ব্যবহারের গাড়ী ও বসত বাড়ী কোনটার উপর কোন যাকাত আসবে না। আরও জানতে দেখুন: 146692 নং প্রশ্নোত্তর।

আপনার পিতা তার সম্পদের যা ইচ্ছা আপনাকে লিখে দিতে কোন অসুবিধা নেই। তবে তার যদি আপনি ছাড়া আরও সন্তান থাকে তাহলে তাদেরকে বাদ দিয়ে আপনাকে কোন কিছু দেওয়া বৈধ হবে না। বরং কোন কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের মাঝে সমতা বজায় রাখা তার উপর ওয়াজিব। আপনার বাবা আপনাকে যা লিখে দিচ্ছেন এটা যদি আপনার অন্য ভাইয়েরা কোনরূপ লজ্জাবোধ ও জবরদস্তি ছাড়া সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়, তাহলে যতটুকু তারা সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয় ততটুকু আপনার জন্য লিখে দেওয়া জায়েয হবে।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

মতামত প্রেরণ