যখন মানুষ সেই মহান স্থানে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে এবং তীব্র গরম, ভয়াবহ পরিস্থিতি ও দুঃখ-কষ্টের মাঝে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের অবস্থা কেমন হবে সেই সময়ে, যখন আল্লাহ তোমাদের সবাইকে এভাবে একত্রিত করবেন ঠিক যেভাবে তীরগুলোকে তূণীরে একত্রিত করা হয়; এভাবে থাকবে পঞ্চাশ হাজার বছর। তারপরও আল্লাহ তোমাদের প্রতি দৃষ্টি দেবেন না?’ [সিলসিলাহ সহীহাহ (২৮১৭)]
তখন বান্দারা সম্মানিত ব্যক্তিদের খুঁজতে থাকবে যেন তারা তাদের রবের কাছে বিদ্যমান বিপদ দূর করার জন্য সুপারিশ করে এবং বান্দাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করার জন্য যেন আল্লাহ আসেন। তখন তারা আদমের কাছে যাবে। তিনি অপারগতা পেশ করবেন। তারপর তারা নূহের কাছে আসবে। নূহও অপারগতা পেশ করবেন। তারপর তারা ইব্রাহীমের কাছে যাবে। ইব্রাহীমও অপারগতা পেশ করবেন। তারপর তারা মুসার কাছে আসবে। মুসাও অপারগতা পেশ করবেন। তারপর তারা ঈসার কাছে আসবে। ঈসাও অপারগতা পেশ করবেন। তারপর তারা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসবে। তখন তিনি বলবেন: “এর জন্য আমিই আছি। এর জন্য আমিই আছি।” তারপর তিনি ময়দানে উপস্থিত সবার জন্য সুপারিশ করবেন যাতে বিচার করা হয়। এটাই হচ্ছে সেই মাকামে মাহমুদ (প্রশংসিত মর্যাদা) যার ওয়াদা আল্লাহ নিম্নোক্ত বাণীতে করেছেন:
وَمِنْ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا
“আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন; আপনার জন্য অতিরিক্ত হিসেবে। আশা করা যায় আপনার প্রভু আপনাকে মাকামে মাহমুদে (প্রশংসিত মর্যাদায়) অধিষ্ঠিত করবেন।”[সূরা ইসরা: ৭৯]
শাফায়াত সম্পর্কে সুদীর্ঘ হাদীসটি হলো: আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমাদেরকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন কিয়ামতের দিন হবে মানুষ ভীড়ে ঠাসাঠাসি করবে, অতঃপর তারা আদম আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে: আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন: আমি এর উপযুক্ত নই। তবে তোমরা ইবরাহিমের কাছে যাও। কারণ তিনি রহমানের খলিল। তখন তারা ইবরাহিমের কাছে আসবে। তিনি বলবেন: আমি এর উপযুক্ত নই। তবে তোমরা মুসার কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর সাথে কথোপকথনকারী। তখন তারা মুসার কাছে আসবে। তিনি বলবেন: আমি এর উপযুক্ত নই। তবে তোমরা ঈসার কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর (পক্ষ থেকে বিশেষ) রূহ ও তাঁর বাণী। তখন তারা ঈসার কাছে আসবে। তিনি বলবেন: আমি এর উপযুক্ত নই। তবে তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও। তখন অতঃপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি বলব: “আমিই এটির জন্য”। তখন আমি আমার রবের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে এবং তিনি আমাকে এমন কিছু প্রশংসার বাক্য শিক্ষা দিবেন যা দ্বারা আমি তাঁর প্রশংসা করব; যে বাক্যগুলো এখন আমি জানি না। আমি তাঁর প্রশংসা করব এবং সেজদায় লুটিয়ে পড়ব। তিনি বলবেন: “হে মুহাম্মাদ মাথা উঠান, আপনি কথা বলুন; আপনার কথা শোনা হবে। আপনি প্রার্থনা করুন, আপনাকে দেয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন; আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” আমি বলব: “হে আমার রব! আমার উম্মত, আমার উম্মত।” তিনি বলবেন: “যান, সেখান থেকে (জাহান্নাম থেকে) এমন ব্যক্তিকে বের করে আনুন যার অন্তরে যবের পরিমাণ পরিমাণ ঈমান রয়েছে”। তখন আমি গিয়ে তা করব। অতঃপর ফিরে আসব এবং সে প্রশংসার বাক্যগুলো দ্বারা তাঁর প্রশংসা করব। অতঃপর তাঁর সেজদায় লুটিয়ে পড়ব। অতঃপর বলা হবে: “হে মুহাম্মাদ, মাথা উঠান। কথা বলুন, আপনার কথা শোনা হবে। আপনি প্রার্থনা করুন, আপনাকে দেয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” আমি বলব: “হে আমার রব, আমার উম্মত, আমার উম্মত।” তিনি বলবেন: “যান, সেখান থেকে এমন ব্যক্তিকে বের করুন যার অন্তরে পিঁপড়ার মাথা পরিমাণ কিংবা সরিয়া পরিমাণ ঈমান রয়েছে”। তখন আমি গিয়ে তা করব। অতঃপর ফিরে এসে সে বাক্যগুলো দ্বারা তাঁর প্রশংসা করব। অতঃপর সেজদায় লুটিয়ে পড়ব। তিনি বলবেন: “হে মুহাম্মদ মাথা উঠান। কথা বলুন, আপনার কথা শোনা হবে। আপনি প্রার্থনা করুন, আপনাকে দেয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন, কবুল করা হবে”। অতঃপর আমি বলব: “হে আমার রব, আমার উম্মত, আমার উম্মত।” তিনি বলবেন: “যান, বের করুন যার অন্তরে সরিষা দানার ক্ষুদ্রের ক্ষুদ্রের ক্ষুদ্র পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করুন।” তখন আমি গিয়ে সেটাই করব।” আমরা যখন আনাসের কাছ থেকে প্রস্থান করলাম, তখন আমি আমাদের কিছু সাথীকে বললাম: ‘আমরা যদি পথিমধ্যে হাসান বসরীর সাথে সাক্ষাৎ করে যাই, তার কাছে আনাসের হাদিস বর্ণনা করি!’ তখন তিনি আবু খলিফার ঘরে আত্মগোপনে ছিলেন। আমরা তার কাছে আসলাম এবং তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমাদেরকে অনুমতি দিলেন। আমরা তাকে বললাম: “আবু সাঈদ, আমরা আপনার কাছে আপনার ভাই আনাস ইবনে মালেকের কাছ থেকে এসেছি। তিনি আমাদেরকে সুপারিশ সম্পর্কে যা শুনিয়েছেন তা কখনো শুনেনি। তিনি বললেন: ‘বলো’, আমরা তাকে হাদীসটি বললাম এবং এখানে এসে শেষ করলাম। তিনি বললেন: ‘আরো বলো’, আমরা বললাম ‘এর থেকে বেশি বলেন নি।’ তিনি বললেন: ‘তিনি আমাকে হাদিসটি শুনিয়েছেন পূর্ণ বিশ বছর পূর্বে। আমি জানি না তিনি ভুলে গেছেন; নাকি তোমাদের (পক্ষ থেকে কম আমলের উপর) নির্ভর করে থাকাকে অপছন্দ করেছেন।’ আমরা বললাম: ‘হে আবু সাঈদ! আপনি আমাদেরকে হাদিসটি শুনান’। তিনি হাসলেন ও বললেন: ‘মানুষকে তড়িৎ প্রবণ করে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমি তো তোমাদেরকে বলার জন্যই উল্লেখ করেছি। তিনি তোমাদেরকে যতটুকু বলেছেন আমাকেও তা বলেছেন।’ তিনি আরও বলেছেন: “অতঃপর আমি চতুর্থবার ফিরে আসব এবং সে বাক্যগুলো দ্বারা তার প্রশংসা করব। অতঃপর তাঁর সেজদায় লুটিয়ে পড়ব। তখন বলা হবে: ‘হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠান। কথা বলুন, আপনার কথা শোনা হবে। প্রার্থনা করুন, আপনাকে দেয়া হবে। সুপারিশ করুন, কবুল করা হবে।’ তখন আমি বলব: “হে আমার রব! যারাই لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দিন।” তখন তিনি বলবেন: “আমার ইজ্জত, বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও সম্মানের কসম, যে ব্যক্তিই لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলেছে অবশ্যই আমি তাকে জাহান্নাম থেকে বের করব।”।[হাদীসটি বুখারী (৭৫১০) বর্ণনা করেন]
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কিয়ামাতের দিনে আমিই হবো সকল মানুষের সর্দার। তা কীভাবে তোমরা কি জানো? কিয়ামাত দিবসে যখন আল্লাহ্ তা’আলা শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষকে একই মাঠে এমনভাবে জমায়েত করবেন যে, একজনের আহ্বান সকলে শুনতে পাবে, একজনের দৃষ্টি সকলকে দেখতে পাবে। সূর্য নিকটবর্তী হবে। মানুষ অসহনীয় ও চরম দুঃখ-কষ্ট ও পেরেশানীতে পড়ে যাবে। নিজেরা পরস্পর বলাবলি করবে: ‘কী দুর্দশায় তোমরা আছ, দেখছ না? কী অবস্থায় তোমরা পৌঁছেছো তা উপলব্ধি করছ না? এমন কাউকে দেখবে কী যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন?’ তারপর একজন আরেকজনকে বলবে: ‘তোমরা আদমের কাছে যাও।’ সুতরাং তারা আদমের কাছে আসবে” ... এভাবে হাদীসের বাকি অংশ বলে এ পর্যায় পর্যন্ত আসলেন: “তখন আমি সুপারিশের জন্য যাব এবং আরশের নীচে এসে রবের উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ আমার অন্তরকে খুলে দিবেন এবং সর্বোত্তম প্রশংসা ও হামদ জ্ঞাপনের শিক্ষা প্রদান করবেন; যা ইতঃপূর্বে আর কাউকে খুলে দেননি। এরপর আল্লাহ বলবেন: “হে মুহাম্মাদ! মাথা উত্তোলন করুন। প্রার্থনা করুন, আপনার প্রার্থনা কবূল করা হবে। সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” আমি মাথা তুলে বলব: “হে আমার রব! উম্মাতী (আমার উম্মাত, এদেরকে মুক্তি দান করুন)। হে আমার রব! উম্মাতী। হে আমার রব! উম্মাতী। তারপর বলা হবে: “হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মাতের যাদের উপর কোন হিসাব নেই তাদেরকে জান্নাতের ডানের দরজার দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। তারা এছাড়াও অন্য দরজায় মানুষের সঙ্গে শরীক হবে।” তারপর তিনি বললেন: “কসম ঐ সত্ত্বার যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নিশ্চয় জান্নাতের দুই চৌকাঠের মধ্যকার দূরত্ব মক্কা ও হিময়ারের দূরত্বের মতো। অথবা বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ও বুসরার দূরত্বের ন্যায়।[হাদীসটি বুখারী (৪৭১২) বর্ণনা করেন]
কিয়ামতের ময়দানে এটিই সেই বৃহত্তম শাফায়াত। এই শাফায়াত তথা সুপারিশ করা হবে বিচার শুরু করার জন্য।
কিয়ামতের দিন শাফায়াত দুই প্রকার হবে:
১. গ্রহণযোগ্য বা সাব্যস্ত শাফায়াত। তথা শরিয়তের দলিলগুলো যে শাফায়াতকে সাব্যস্ত করেছে। এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে।
২. অগ্রহণযোগ্য বা নাকচকৃত শাফায়াত। তথা কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্যে যে সমস্ত শাফায়াতকে নাকচ করা হয়েছে। এর বিবরণও আসবে।
গ্রহণযোগ্য শাফায়াত কয়েক প্রকার:
১. বৃহত্তম সুপারিশ যাকে বলা হয় "মাকামে মাহমুদ"। এর জন্য পূর্ববর্তী মানুষ ও পরবর্তীরা মানুষ সকলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাবে; যাতে তিনি তাদেরকে হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করেন। এর বিবরণ ইতঃপূর্বে গিয়েছে।
২. তাওহীদে বিশ্বাসী কবীরা গুনাহতে লিপ্ত যে সমস্ত ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করেছে তাদেরকে বের করার জন্য সুপারিশ। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আমার শাফায়াত আমার উম্মতের কবীরা গুনাহগারদের জন্য।”[হাদীসটি সহিহ। সুনানুত তিরমিযী (১৯৮৩)]
৩. এমন লোকদের ব্যাপারে রাসূলের শাফায়াত যাদের নেকী ও বদ সমান হয়ে গেছে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য শাফায়াত। আর অন্য একটি দলকে জাহান্নামে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে; তাদেরকে যেন জাহান্নামে প্রবেশ না করানো হয়।
৪. বিনা হিসাবে একদল লোককে জান্নাতে প্রবেশ করানোর সুপারিশ।
৫. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে সুপারিশ। এই সুপারিশের ফলে তার থেকে জাহান্নামের আগুন কমানো হবে। এটি বিশেষভাবে চাচা আবু তালিবের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে বিশেষ সুপারিশ।
৬. মুমিনদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ।
গুনাহগারদের জন্য সুপারিশ কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস নয়। বরং এই সুপারিশে অন্যান্য নবী, শহীদ, আলেম, নেককার ও ফেরেশতারা শামিল হবে। হয়তো কোনো ব্যক্তির জন্য তার নেক আমলও সুপারিশ করবে। তবে সুপারিশের সবচেয়ে বড় অংশটা থাকবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য।
শাফায়াত যে নবীসহ অন্যরাও করবে তার প্রমাণ শাফায়াতের এই হাদীসটি: আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমরা বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি কিয়ামতের দিন আমাদের রবকে দেখতে পাবো?’ ... তিনি হাদীসটি উল্লেখ করলেন। সে হাদিসের এক পর্যায়ে তিনি মুমিনদের পুলসিরাত অতিক্রম করা এবং তাদের ভাইদের মধ্যে যারা জাহান্নামে প্রবেশ করেছে তাদের জন্য তাদের সুপারিশের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন: “তারা বলবে: হে আমাদের রব! আমাদের ভাইয়েরা আমাদের সাথে সালাত আদায় করত, আমাদের সাথে সিয়াম পালন করত এবং আমাদের সাথে আমল করত। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: ‘যাও যার অন্তরে তোমরা এক দিনার পরিমাণ ঈমান পাবে তাকে বের করে আন।’ আল্লাহ ঐসব ব্যক্তিদের আকৃতিকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। যখন তারা তাদের নিকটে আসবে তখন তাদের কেউ পা পর্যন্ত জাহান্নামে অদৃশ্য হয়ে গেছে, কেউ পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে গেছে। তারা যাদেরকে চিনবে তাদেরকে বের করে আনবে। অতঃপর তারা ফিরে আসবে। আল্লাহ বলবেন: ‘যাও, যার অন্তরে অর্ধেক দিনার পরিমাণ ঈমান পাবে তাকে বের করে আন।’ তারা যাদেরকে চিনবে তাদেরকে বের করে আনবে। অতঃপর তারা ফিরে আসবে। আল্লাহ বলবেন: ‘যাও, যার অন্তরে পিঁপড়ার মাথা পরিমাণ ঈমান পাবে তাকেও বের করে আন’। তখন তারা যাদেরকে চিনবে তাদেরকে বের করে আনবে”। আবু সাঈদ বলেন: যদি তোমরা আমাকে বিশ্বাস না কর তাহলে পড়ো:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ۖ وَإِن تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِن لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا
“নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলম করেন না। আর যদি সেটি ভাল কাজ হয়, তিনি তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে মহা প্রতিদান প্রদান করেন”।
তারপর নবী, ফেরেশতা ও মুমিনরা সুপারিশ করবেন। তখন আল্লাহ বলবেন: “আমার সুপারিশ বাকি রয়েছে”। তখন তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুষ্টি তুলে নিবেন। ফলে এমন লোক বের হয়ে আসবে যারা পুড়ে গিয়েছে। তাদেরকে জান্নাতের দরজার কাছে অবস্থিত নহরে নিক্ষেপ করা হবে। যাকে বলা হয় সঞ্জীবনী পানি। ফলে তারা এর দুই পাশে এমনভাবে গজিয়ে উঠবে যেভাবে প্রবহমান পানির উর্বর মাটিতে শস্য গজিয়ে উঠে। তোমরা পাথর ও গাছের পাশে এভাবে গজিয়ে উঠতে দেখেছ। এর মধ্যে যেগুলো রোদ পায় সেগুলো সবুজ হয় এবং যেগুলো ছায়ায় থাকে সেগুলো সাদা হয়। এরপর তারা এভাবে বের হবে; যেন তারা মুক্তা। তাদের গর্দানে সীলমোহর দেওয়া হবে। অতঃপর তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। তখন জান্নাতিরা বলবে: ‘তারা হচ্ছে রহমানের নাজাতপ্রাপ্ত, তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন কোনো আমলের বিনিময়ে নয়, যা তারা করেছে বা কোন এমন কল্যাণের বিনিময়ে নয়, যা তারা অগ্রে প্রেরণ করেছে।’ অতঃপর তাদেরকে বলা হবে: ‘তোমাদের জন্য রয়েছে তোমরা যা দেখছ তা এবং এর সাথে তদানুরূপ’।[হাদীসটি বুখারী (৭৪৪০) বর্ণনা করেন]
কিয়ামতের দিন কেবল তিন শর্ত থাকলেই কোনো ব্যক্তির জন্য সুপারিশ হবে। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী:
وَكَمْ مِنْ مَلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئاً إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى
“আসমানে এমন অনেক ফেরেশতা আছে, যাদের সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না; তবে আল্লাহর যার জন্য চান এবং যার উপর তিনি সন্তুষ্ট, তার পক্ষে তিনি সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়ার পরই (তা কাজে আসবে)।”[সূরা নাজম: ২৬]
يَوْمَئِذٍ لا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلاً
“করুণাময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন এবং যার কথা তিনি পছন্দ করবেন কেবল সে ছাড়া অন্য কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।”[সূরা ত্বাহা: ১০৯]
يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلا يَشْفَعُونَ إِلا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُمْ مِنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ
“তাদের সামনে যা আছে এবং তাদের পেছনে যা আছে তিনি তা জানেন। তারা কেবল তার জন্যই সুপারিশ করতে পারে যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট। আর তারা তাঁর ভয়ে আতঙ্কিত থাকে।”[সূরা আম্বিয়া: ২৮]
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلا بِإِذْنِهِ
“এমন কে আছে যে তার অনুমতি ছাড়া তার কাছে সুপারিশ করতে পারে?”[সূরা বাকারা: ২৫৫]
শর্তগুলো হলো:
১. সুপারিশকারীকে আল্লাহ কর্তৃক সুপারিশের অনুমতি।
২. সুপারিশকারীর ব্যাপারে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
৩. সুপারিশকৃত ব্যক্তির ব্যাপারে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে: কিয়ামতের দিন কিছু মানুষের শাফায়াত গ্রহণ করা হবে না। তাদের মাঝে আছে এমন-সব মানুষ যারা বেশি বেশি অভিশাপ দিত। মুসলিম (২৫৯৮) বর্ণনা করেন: আবুদ-দারদা বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “বেশি বেশি অভিশাপ দেয় এমন ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন সাক্ষী ও সুপারিশকারী হতে পারবে না।”
প্রত্যাখ্যাত নাকচকৃত শাফায়াত হচ্ছে:
এমন শাফায়াত যাতে অনুমতি বা সন্তুষ্টির মত গ্রহণযোগ্য শাফায়াতের শর্তগুলো অনুপস্থিত। যেমন: মুশরিকরা তাদের উপাস্যসমূহের ব্যাপারে যে সুপারিশে বিশ্বাস করে। তারা এই সমস্ত উপাস্যের ইবাদত এ জন্যই তো করত যে সে সকল উপাস্য তাদের হয়ে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। তারা এই উপাস্যগুলোকে নিজেদের এবং আল্লাহর মাঝে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
ألا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ
“জেনে রাখো, খাঁটি দ্বীন কেবল আল্লাহরই। আর যারা তার পরিবর্তে (অন্যদের) অভিভাবক (উপাস্য) গ্রহণ করে, (তারা বলে,) “আমরা তো এ জন্যই তাদের উপাসনা করি, যাতে তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের মতভেদের ব্যাপারে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে হেদায়াত করেন না।”[সূরা যুমার: ৩]
আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে এই সুপারিশ ঘটবে না এবং কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَمَا تَنْفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِينَ
“ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকারে আসবে না।”[সূরা মুদ্দাস্সির: ৪৮]
তিনি আরো বলেন:
وَاتَّقُوا يَوْماً لا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئاً وَلا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلا هُمْ يُنْصَرُونَ
“আর তোমরা এমন একটি দিনকে ভয় করো যেদিন কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না। কারো কোনো সুপারিশ গৃহীত হবে না। কারো থেকে কোনো বিনিময় গ্রহণ করা হবে না এবং তাদেরকে (পাপীদেরকে) কোনো সাহায্য করা হবে না।”[সূরা বাকারা: ৪৮]
তিনি বলেন:
وَاتَّقُوا يَوْماً لا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئاً وَلا يُقْبَلُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلا تَنْفَعُهَا شَفَاعَةٌ وَلا هُمْ يُنْصَرُونَ
“আর এমন একটি দিনকে (কেয়ামতের দিন) ভয় করো যখন কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না, কারো থেকে কোনো বিনিময় গ্রহণ করা হবে না, কোনো সুপারিশ কারো উপকারে আসবে না এবং তাদেরকে (পাপীদেরকে) কোনো সাহায্য করা হবে না।”[সূরা বাকারা: ১২৩]
তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ يَوْمٌ لا بَيْعٌ فِيهِ وَلا خُلَّةٌ وَلا شَفَاعَةٌ وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّالِمُونَ
“হে ঈমানদারগণ! এমন দিন আসার পূর্বে আমার দেওয়া জীবিকা থেকে ব্যয় করো যখন কোনো ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব কিংবা সুপারিশ (করার সুযোগ) থাকবে না। আর অবিশ্বাসীরাই অন্যায়কারী।”[সূরা বাকারা: ২৫৪]
এ কারণেই আল্লাহ তার খলীল ইবরাহীম কর্তৃক মুশরিক পিতা আযরের জন্য সুপারিশ গ্রহণ করবেন না। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কিয়ামতের দিন ইবরাহিম তার পিতা আযরের সাথে দেখা করবে। আযরের চেহারার ওপর থাকবে বিষন্নতা ও ধুলো-বালি (অবসাদ)। ইবরাহিম তাকে বলবে: ‘আমি কি আপনাকে বলিনি আমার অবাধ্য না হতে?’ অতঃপর তার পিতা তাকে বলবে: ‘আজ তোমার অবাধ্য হব না।’ অতঃপর ইবরাহিম বলবে: ‘হে আমার রব, আপনি আমাকে ওয়াদা দিয়েছেন যেদিন উঠানো হবে আমাকে অসম্মান করবেন না। আমার পতিত পিতার অপমানের চেয়ে বড় অপমান কী!’ অতঃপর আল্লাহ বলবেন: ‘নিশ্চয় আমি কাফেরদের ওপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।’ অতঃপর বলা হবে: ‘হে ইবরাহিম, তোমার পায়ের নিচে কী? তখন সে দেখতে পাবে রক্তে নিমজ্জিত একটি হায়েনা, যার পা ধরে টেনে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”[হাদীসটি বুখারী (৩৩৫০) বর্ণনা করেন]