জনৈক খ্রিষ্টানের সাথে ঐকান্তিক সংলাপ

প্রশ্ন 2690

আমি আপনাদের ওয়েবসাইট ব্রাউজ করছিলাম। ওয়েবসাইটটি সত্যিই আমার কাছে ভালো লেগেছে। আমি একটি খ্রিস্টান ধর্মীয় বিদ্যালয়ের ছাত্রী। আমি আরো জানতে আগ্রহী। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি আপনার মতামত জানতে চাই? এগুলো কি সত্য?

ইসলামে জান্নাত হলো: মদ, নারী ও গান। আর জান্নাতের পথ হলো: এইসব বিষয় থেকে দূরে থাকা এবং সাথে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ পালন করা।

ইসলামে সম্ভবতঃ মুক্তি বা পরিত্রাণের কোনো নিশ্চয়তা নাই। শুধু বলা হয়: জীবদ্দশায় এই পথ অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহর কাছ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমি এভাবে নিশ্চয়তা ছাড়া কোন জীবন যাপন করতে পছন্দ করি না। আমি জানি মুসলমানেরা ‘আদি পাপ’ (original sin)-এ বিশ্বাস করে না। কিন্তু মানুষ জন্মগতভাবে পাপী হোক বা না হোক, আপনি কি আমার সাথে একমত নন যে মানুষ ভুল করে এবং অনেক ভুল করে? সুতরাং মানুষ তার ভুল ও পাপের ব্যাপারে কী করবে? আমি তওবা (অনুতাপ) বুঝি। কিন্তু সম্ভবতঃ কেউই আল্লাহর কাছে নিশ্চিত মুক্তি অর্জন করতে পারবে না। এজন্যই আল্লাহ তাঁর পুত্রকে আমাদের জন্য ক্রুশবিদ্ধ হতে পাঠিয়েছেন; আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পাপ থেকে মুক্তির জন্য।

ইসলামে কোনো প্রকার মুক্তির নিশ্চয়তা নেই। এটা সত্যিই ভয়ের ব্যাপার¾ মুক্তির নিশ্চয়তা ছাড়া জীবন যাপন করা। আপনি সারাজীবন কাটিয়ে দিবেন কিন্তু কিয়ামতের দিন মুক্তির জন্য যথেষ্ট ভালো কাজ করেছেন কিনা তা জানতে পারবেন না। আপনি জানতে পারবেন না যে, আপনি যথেষ্ট নামায পড়েছেন; নাকি পড়েননি। ... এটি সত্যিই ভয়ংকর ব্যাপার।

আমি অনেক মুসলিম সহপাঠীকে জিজ্ঞাসা করেছি তারা কি নিশ্চিত যে তারা মৃত্যুর পর জান্নাতে বা জাহান্নামে যাবে? কিন্তু কেউই “হ্যাঁ” সূচক জবাব দেয়নি। ইসলামে কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ ইসলামে যীশু খ্রিস্টের প্রতি ঈমান আনার মাধ্যমে মুক্তির ধারণা নেই। বরং ইসলামে মুক্তি ব্যক্তির কাজ ও কর্মের ওপর নির্ভর করে।

আরও একটি বিষয়: আমি যদি মুসলিম হতে চাই, তাহলে আমি মুসলিম হতে পারব না। যদি মুসলমানেরা বিশ্বাস করে যে মানবজাতির মধ্যে তারাই মনোনীত। তা না হলে তারা তাদের ধর্ম প্রচার করে না কেন? এটা কি শুধু ভাগ্যের ব্যাপার যে, আপনি মুসলিম হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন?

কিন্তু যে কোনো লোক খ্রিস্টান হতে চায়, সেটা সে করতে পারে। যে কেউ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খ্রিস্টান হতে পারে। আমি জন্মের সময় খ্রিস্টান ছিলাম না। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে যীশু খ্রিস্টই প্রভুর কাছে পৌঁছার একমাত্র পথ।

যীশু নিজেই বলেছেন: ‘আমিই পথ, আমিই সত্য, আমিই জীবন। আমার মাধ্যম ছাড়া কেউ পিতার কাছে যেতে পারবে না।’ তিনি বলেননি: ‘আমি অনেক পথের একটি’, বরং বলেছেন ‘আমি-ই পথ।’

তিনি আরও বলেছেন: ‘আমি ও পিতা এক।’

আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে কোনো লোক এসব সত্যকে উপেক্ষা করতে পারে, যদি না তারা এসব কথা আগে না শুনে থাকে।

আমি আপনার কাছ থেকে একটি উত্তর ও মন্তব্য আশা করছি।

উত্তরের সার-সংক্ষেপ

ইসলামী আকীদা সম্পর্কিত কিছু বিষয়:

১. জান্নাতের নিয়ামত শুধু শারীরিক বা ইন্দ্রিয়গত নয়; বরং আত্মিকও। সেটা হলো অন্তরের প্রশান্তির মাধ্যমে, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি ও আল্লাহর নৈকট্যে মাধ্যমে। বরং জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো মহান আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখা।

২. ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা শুধু বর্জনের (কিছু না করার) নির্দেশ দেয় না; বরং কাজ করারও নির্দেশ দেয়। তাই মুক্তিলাভ শুধু নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকলেই অর্জিত হবে না; বরং ফরয কাজগুলো পালন করতে হবে এবং হারাম থেকে বিরত থাকতে হবে। সুতরাং ইসলাম হচ্ছে নির্দেশিত কার্যাবলী পালন করা এবং নিষিদ্ধ কার্যাবলী বর্জন করা।

৩. ইসলাম নিশ্চয়তা দেয় যে, প্রত্যেক নিষ্ঠাবান মুসলিম যে মৃত্যু অবধি আল্লাহর আনুগত্যের উপর অবিচল থাকবে সে অবশ্যই নিশ্চিতভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

৪. মানুষের পাপ সম্পর্কে ইসলামী বিশ্বাস হলো: একজন ব্যক্তি নিজের কৃতকর্মের দায় নিজে বহন করবে; অন্য কেউ এর দায় বহন করবে না। অনুরূপভাবে সে নিজে অন্যের কৃতকর্মের দায় বহন করবে না।

৫. ইসলামে প্রবেশের চাবিকাঠি মাত্র দুটি বাক্য: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই” এবং “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।” এই ঘোষণার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মুসলিম হতে পারে। এর জন্য বাপ্তিস্ম, যাজক বা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে (মসজিদ বা অন্য কোথাও) যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

উত্তর

পর সমাচার:

প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনি ইসলাম ধর্মের কিছু বিষয় সম্পর্কে কিছু ধারণা পেশ করে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমরা এ জিজ্ঞাসাকে মূল্যায়ন করি। আমরা আশা করব: আপনি যা লিখেছেন তার কিছু বিষয়ে পর্যালোচনা এবং কিছু বিষয়ে ভুল ধারণার সংশোধন করা যেন সত্যে পৌঁছানো ও সত্যকে গ্রহণ করার পথ হয়ে উঠে।

জান্নাতের নেয়ামত কি শুধুই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও দৈহিক?

আপনি জান্নাত সম্পর্কে যে ইসলামী আকিদা তুলে ধরে বলেছেন যে এটি কেবল মদ, নারী ও সঙ্গীতের নেয়ামত; এটি এ বিষয়ে সঠিক বিশ্বাস থেকে অনেক দূরে ও অসম্পূর্ণ। কেননা জান্নাতের নেয়ামত শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়গত বা শারীরিক নয়; বরং এটি হৃদয়ের প্রশান্তি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টি ও তাঁর সান্নিধ্যের মাধ্যমে আত্মিক নেয়ামতও বটে। বরং জান্নাতের সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাক্ষাৎ লাভ করা। যখন জান্নাতবাসীরা তাঁর মহিমান্বিত চেহারা দেখতে পাবে, তখন তারা তাদের সমস্ত নেয়ামতের কথা ভুলে যাবে। জান্নাতে এমন সব বিষয় থাকবে যা মন চায় এবং যা দেখলে চোখ তৃপ্ত হয়। সেখানে কোনো অর্থহীন কথাবার্তা বা পাপের কথা শোনা যাবে না। কেবল শোনা যাবে ‘সালাম, সালাম।’ “কোনো আত্মাই জানে না তার জন্য কী পুরস্কার লুকিয়ে রাখা হয়েছে, এ হলো তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার”। মোদ্দাকথা: জান্নাতবাসীদের নেয়ামত আপনি যা বলেছেন তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এর চেয়ে অনেক ব্যাপক।

ইসলামে কি শুধু নিষিদ্ধ বিষয় বর্জনের মাধ্যমেই মুক্তি পাওয়া যায়?

আপনি বলেছেন যে জান্নাতে প্রবেশ করা কিছু নির্দিষ্ট হারাম বিষয় বর্জনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। এইভাবে বলা এটিও একটি বড় ভুল। কেননা ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা শুধু বর্জনের (কিছু না করার) নির্দেশ দেয় না; বরং কাজ করারও নির্দেশ দেয়। তাই মুক্তিলাভ শুধু নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকলেই অর্জিত হবে না; বরং ফরয কাজগুলো পালন করতে হবে এবং হারাম থেকে বিরত থাকতে হবে। সুতরাং ইসলাম হচ্ছে নির্দেশিত কার্যাবলী পালন করা এবং নিষিদ্ধ কার্যাবলী বর্জন করা। এছাড়া জান্নাতের সমস্ত নেয়ামত এমন নয় যে দুনিয়ায় যা হারাম ছিল এর পুরস্কারস্বরূপ তা দেওয়া হবে। বরং জান্নাতে এমন অনেক নেয়ামত আছে যা দুনিয়াতেও বৈধ ছিল। যেমন বিবাহ দুনিয়াতে বৈধ এবং তা জান্নাতেরও নেয়ামত। ডালিম, ডুমুর ইত্যাদি সুস্বাদু ফলমূল দুনিয়ায় বৈধ এবং জান্নাতেরও নেয়ামত। দুধ ও মধু পান করা দুনিয়ায় বৈধ এবং জান্নাতেরও নেয়ামত প্রভৃতি।

বরং দুনিয়ায় হারাম বস্তুর মধ্যে যে ক্ষতিকারক রয়েছে, সেটি জান্নাতে সরিয়ে নেওয়া হবে যদি তা জান্নাতের নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত হয়; যেমন: মদ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জান্নাতের মদ সম্পর্কে বলেছেন:

لَا فِيهَا غَوْلٌ وَلَا هُمْ عَنْهَا يُنزَفُونَ

এতে ক্ষতিকর কিছু নেই এবং এটি পান করলে কেউ মাতালও হয় না। সুতরাং এই মদ মস্তিস্কের বিকৃতি ঘটাবে না, মাথা ব্যথা ও পেট ব্যথার কারণও হবে না। অর্থাৎ এর প্রকৃতি দুনিয়ার মদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। মোদ্দাকথা: জান্নাতের নেয়ামত কেবল দুনিয়ার হারাম বস্তুগুলোকে বৈধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা দরকার যে, এমন অনেক হারাম বিষয় আছে যা দুনিয়ায় বর্জন করার পুরস্কারস্বরূপ আখেরাতে তার সমতুল্য কিছু দেওয়া হবে না; চাই তা খাবার হোক, পানীয় হোক বা কোনো কাজ বা কথা হোক। যেমন বিষ দুনিয়ায় হারাম হলেও তা আখেরাতে নেয়ামত হবে না। তেমনি সমকামিতা ও মাহরামদের সাথে বিবাহ বন্ধন দুনিয়ায় নিষিদ্ধ এবং আখেরাতেও তা বৈধ হবে না। আলহামদুলিল্লাহ এটি স্পষ্ট।

ইসলামে জান্নাতের কোনো নিশ্চয়তা আছে কি?

আপনি বলেছেন যে জান্নাতের কোনো নিশ্চয়তা না থাকলে আপনার কথা অনুযায়ী মানুষের জীবন নিকৃষ্ট ও কদর্য হয়ে যাবে। এর উত্তর হলো: এই ধরনের ভুল ধারণাই এমন উপসংহারে পৌঁছে দেয়। বরং আপনি যদি বলতেন: ‘যদি প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা থাকত, তাহলে সেটিই হতো মহাবিপদ’। কেননা তখন মানুষ সেই নিশ্চয়তার উপর ভর করে সব হারাম কাজ করত এবং সমস্ত নিষিদ্ধ বিষয়ে লিপ্ত হতো।

ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা অপরাধী তারা অনেক সময় এই ভুল নিশ্চয়তা এবং পাদ্রীদের কাছ থেকে পাপমোচনের সনদ ও ক্ষমার আবেদনের উপর নির্ভর করে পাপকাজ করে থাকে। আমাদের রব তাদের সম্পর্কে বলেছেন:

وَقَالُوا لَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ إِلا مَنْ كَانَ هُودًا أَوْ نَصَارَى تِلْكَ أَمَانِيُّهُمْ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

তারা (ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা) বলে: ইহুদি কিংবা খ্রিস্টান ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এটাতো তাদের অলীক আশা। বলুন: তোমরা সত্যবাদী হলে তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আসো।[সূরা আল-বাকারা: ১১১]

আমাদের (মুসলমানদের) কাছে জান্নাতের বিষয়টি আমাদের ইচ্ছা বা অন্যদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। যেমন আমাদের রব বলেছেন:

لَيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلا أَمَانِيِّ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ يَعْمَلْ سُوءاً يُجْزَ بِهِ وَلا يَجِدْ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلا نَصِيرًا

বিষয়টি তোমাদের আশা অনুযায়ী কিংবা কিতাবধারীদের আশা অনুযায়ী হবে না। যে খারাপ কাজ করবে তাকে প্রতিফল দেওয়া হবে এবং আল্লাহ ছাড়া সে নিজের জন্য কোনো অভিভাবক বা সাহায্যকারী পাবে না।[সূরা আন-নিসা: ১২৩]

নিচে ইসলামী আকিদায় পরিণতির নিশ্চয়তা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:

ইসলাম এই নিশ্চয়তা দেয় যে, প্রত্যেক নিষ্ঠাবান মুসলিম যে মৃত্যু অবধি আল্লাহর আনুগত্যের উপর অবিচল থাকবে সে অবশ্যই নিশ্চিতভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে বলেছেন:

وَالَّذِينَ ءامَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, আমি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাব যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা অনন্তকাল বাস করবে। এটি আল্লাহর সত্য ওয়াদা। কথায় আল্লাহর চেয়ে কথায় সত্যবাদী আর কে আছে?[সূরা আন-নিসা: ১২২]

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ ءامَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ

যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহান পুরস্কার।[সূরা মায়িদাহ: ৯]

جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ عِبَادَهُ بِالْغَيْبِ إِنهُ كَانَ وَعْدُهُ مَأْتِيًّا

চিরস্থায়ী জান্নাতে, করুণাময় আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে অদৃশ্যে যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি তো সেই সত্তা যার প্রতিশ্রুতি অবশ্যম্ভাবী।[সূরা মারইয়াম: ৬১]

قُلْ أَذَلِكَ خَيْرٌ أَمْ جَنَّةُ الْخُلْدِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ كَانَتْ لَهُمْ جَزَاءً وَمَصِيرًا

বলুন: এটা (জাহান্নামের সেই শাস্তি) উত্তম; নাকি সেই চিরস্থায়ী জান্নাত যার প্রতিশ্রুতি মুত্তাকীদেরকে দেওয়া হয়েছে? এটাই হবে তাদের পুরস্কার ও গন্তব্য।"[সূরা আল-ফুরকান: ১৫]

لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِنْ فَوْقِهَا غُرَفٌ مَبْنيَّةٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ وَعْدَ اللَّهِ لا يُخْلِفُ اللَّهُ الْمِيعَادَ

কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে কক্ষের উপরে আরও কক্ষ। যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। এটা আল্লাহর ওয়াদা, আল্লাহ কখনো ওয়াদা খেলাফ করেন না।[সূরা আয-যুমার: ২০]

একইভাবে ইসলাম এই নিশ্চয়তাও দেয় যে, যে কাফির আল্লাহর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ বলেছেন:

وَعَدَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا هِيَ حَسْبُهُمْ وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ وَلَهُمْ عَذَابٌ مُقِيمٌ

আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী এবং কাফিরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাদের অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি।[সূরা আত-তাওবা: ৬৮]

وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ

যারা কুফরি করেছে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অবিশ্বাসীকে শাস্তি দিই।[সূরা ফাতির: ৩৬]

هَذِهِ جَهَنَّمُ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ*اصْلَوْهَا الْيَوْمَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ

এই সেই জাহান্নাম, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হত। আজ তোমরা এতে প্রবেশ করো; কারণ তোমরা কুফরি করতে।[সূরা ইয়াসিন: ৬৩-৬৪]

আল্লাহর প্রতিশ্রুতি উভয় দলের ক্ষেত্রেই লঙ্ঘিত হবে না। যেমন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পর উভয় দলের অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়েছে:

ونَادَى أَصْحَابُ الْجَنَّةِ أَصْحَابَ النَّارِ أَنْ قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا فَهَلْ وَجَدْتُمْ مَا وَعَدَ رَبُّكُمْ حَقًّا قَالُوا نَعَمْ فَأَذَّنَ مُؤَذِّنٌ بَيْنَهُمْ أَنْ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ

জান্নাতের অধিবাসীরা জাহান্নামের অধিবাসীদের ডেকে বলবে: আমাদের রব আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা ঠিকমতো পেয়েছি। তোমাদের রব তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তোমরা কি তা ঠিকমতো পেয়েছ? তারা বলবে: হ্যাঁ। তখন একজন ঘোষক তাদের মধ্যে ঘোষণা করবেন: জালিমদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।[সূরা আল-আরাফ: ৪৪]

সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমান এনে সৎকাজ করবে এবং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে কুফরি করবে, মন্দ কাজ করবে এবং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে অবশ্যই জাহান্নামে যাবে। তারপর ইসলামের একটি মহান মূলনীতি হলো: একজন মুমিন ভয় ও আশার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করবে। সে নিজেকে জান্নাতী বলে হুকুম দিবে না; কারণ এতে সে আত্মপ্রবঞ্চনায় পড়ে যাবে। তাছাড়া সে জানে না কোন অবস্থায় তার মৃত্যু হবে। অন্যদিকে সে নিজেকে জাহান্নামী বলেও রায় দিবে না; কারণ এটি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া; যা হারাম। সে সৎকাজ করবে এবং আশা রাখবে যে আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন। অন্যদিকে সে আল্লাহর আযাবের ভয়ে মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকবে। যদি সে পাপ করে ফেলে তাহলে ক্ষমা পাওয়ার জন্য তওবা করবে এবং তওবার মাধ্যমে জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে। আল্লাহ তওবাকারীদের তওবা কবুল করেন এবং পাপ মাফ করেন। মুমিন ব্যক্তি যখন এই ভয় করবে যে, সে যা ভালো কাজ করেছে তা যথেষ্ট নয় (আপনার ভাষায়) তাহলে এই ভয় ও আশার কারণে সে আরও বেশি আমল করবে।

সে যতই সৎকাজ করুক না কেন, সে সেগুলোর উপর নির্ভর করে বসে থাকবে না, প্রবঞ্চিত হবে না। কারণ এমনটি হলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। বরং সে আমল করে যায় এবং সওয়াবের আশা রাখে। একইসাথে সে তার আমল নিয়ে রিয়া (লৌকিকতা), আত্মতুষ্টি ও বাতিল হওয়ার ভয় পায়। যেমনটি আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ব্যাপারে বলেছেন:

وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا ءاتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ

“এবং যারা তাদের যা দান করার তা দান করে এই অবস্থায় যে, তাদের অন্তর ভীত-কম্পিত; কারণ তারা তাদের রবের কাছে ফিরে যাবে।”[সূরা আল-মুমিনুন: ৬০]

এভাবে মুমিন আমল করে যায়; আশা নিয়ে ও ভয় সহকারে যতক্ষণ না সে তাওহীদ ও সৎকাজের উপর বলবৎ থেকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে। পরিণতিতে সে প্রভুর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করে। আপনি যদি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে এগুলোই আমলের সঠিক প্রেরণা এবং জীবনে সঠিক পথে চলা কেবল এভাবেই সম্ভব।

আদি পাপ-এর ব্যাপারে ইসলামী আকীদার অবস্থান

আপনি আদি পাপের বিষয়ে যা উল্লেখ করেছেন তা কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যায়:

প্রথমত: মানুষের পাপের ব্যাপারে ইসলামী আকিদার অবস্থান হলো: একজন ব্যক্তি নিজের কৃতকর্মের দায় নিজে বহন করবে; অন্য কেউ এর দায় বহন করবে না। অনুরূপভাবে সে নিজে অন্যের কৃতকর্মের দায় বহন করবে না। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন: “এক পাপী অন্য পাপীর পাপ বহন করবে না।” এই আয়াতের মাধ্যমে আদি পাপের ধারণা খণ্ডিত হয়ে যায়। কেননা বাবা পাপ করলে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের কী দোষ যে তারা অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে? যে খ্রিস্টীয় আকিদা সন্তানদের উপর বাপের পাপের বোঝা চাপিয়ে দেয় তা সুস্পষ্ট জুলুম। কোনো বিবেকবান মানুষ কি বলতে পারে যে— ‘পাপ’ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতির মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে চলতে থাকবে এবং দাদার পাপ সন্তানদেরকে, নাতি-নাতনিদেরকে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে কলঙ্কিত করবে??

দ্বিতীয়ত: পাপ করা মানুষের প্রকৃতিগত। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানই পাপপ্রবণ।[তিরমিযি: ২৪২৩] কিন্তু আল্লাহ মানুষকে পাপের সামনে অসহায় করে রাখেননি যে সে কিছুই করতে পারবে না। বরং আল্লাহ তাকে সুযোগ দিয়েছেন এবং তওবা ও প্রত্যাবর্তনের দরজা খোলা রেখেছেন। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগের হাদিসের শেষে বলেছেন: আর পাপপ্রবণদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তওবাকারীরা।

ইসলামের শরীয়তে ‘আল্লাহর রহমত’ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যখন তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ডেকে বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

(আমার এই কথা লোকদেরকে) বলে দাও: হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।[সূরা আয-যুমার: ৫৩]

এটিই মানব আত্মার প্রকৃতি, এটিই তার পথ এবং পাপের সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায়। পক্ষান্তরে, এই মানবীয় প্রকৃতিকে (পাপপ্রবণতাকে) মানুষ ও প্রভুর মধ্যে অপ্রতিরোধ্য দেয়াল বানানো এবং এটি মনে করা যে, মানুষ কিছুতেই প্রভুর সন্তুষ্টির নাগাল পাবে না যতক্ষণ না প্রভু তাঁর (কথিত) পুত্রকে পাঠান যাতে সে (কথিত) পিতার দৃষ্টি ও শ্রবণের সামনে অপমানিত ও লাঞ্ছিত অবস্থায় ক্রুশবিদ্ধ হয় এবং তবেই তিনি মানবজাতিকে ক্ষমা করবেন— এটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ও হাস্যকর। এই বাতিল কথাটি উল্লেখ করাই এর খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট।

আমি একবার একজন খ্রিস্টানের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলাম: তোমরা যদি বলো যে আল্লাহ তাঁর পুত্রকে ক্রুশবিদ্ধ হতে পাঠালেন সে সময়কার মানবজাতির পাপমুক্তির জন্য কিংবা যারা ক্রুশবিদ্ধের পর আসবে তাদের পাপমুক্তির জন্য। তাহলে যারা যীশুর জন্মের আগে পাপ করে মরে গেছে এবং ক্রুশবিদ্ধকরণের এই আকিদা জানার সুযোগ পায়নি বলে এর প্রতি বিশ্বাস করতে পারেনি, তাদের কী অবস্থা হবে? তখন লোকটি শুধু এইটুকু বলল: আমাদের পাদ্রীদের কাছে নিশ্চয় এর উত্তর আছে! যদি উত্তর পাওয়াও যায়, তা হবে কেবল মনগড়া কথা। এছাড়া তারা আর কী বলতে পারবে?

আপনি যদি নিরপেক্ষ বিবেক দিয়ে খ্রিস্টানদের ‘আদি পাপ’-এর বিশ্বাস পর্যালোচনা করেন তাহলে দেখবেন যে, তারা বলে: প্রভু তাঁর একমাত্র প্রথমজাত পুত্রকে মানুষের পাপের পায়শ্চিত্ত হিসেবে বলি দিয়েছেন। আর এই পুত্রই হলো উপাস্য (ইশ্বর)। যদি উপাস্যকে প্রহার করা হয়, গালি দেওয়া হয় ও ক্রুশবিদ্ধ করা হয়, ফলে তিনি মারা যান; তাহলে এই বিশ্বাস নিজেই নিজের অভ্যন্তরে আল্লাহর প্রতি নাস্তিকতা ধারণ করছে এবং প্রভুকে দুর্বলতা ও অক্ষমতায় অভিযুক্ত করছে।

প্রভু কি সমস্ত মানুষের পাপ এক কথায় মাফ করতে অক্ষম? যদি তিনি মাফ করতে পারেন, আর তিনি তো সর্বশক্তিমান (খ্রিস্টানেরা এতে দ্বিমত করে না), তাহলে কোন জিনিস তাঁকে নিজ পুত্রকে বলি দিতে বাধ্য করল? (আল্লাহ তাআলা অন্যায়কারীদের কথা থেকে বহু ঊর্ধ্বে।)

بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ أَنَّى يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ وَلَمْ تَكُنْ لَهُ صَاحِبَةٌ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

“তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা। কীভাবে তাঁর সন্তান থাকবে, অথচ তাঁর কোনো সঙ্গিনী (স্ত্রী) নেই? তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি সবকিছু সম্পর্কে সুবিজ্ঞ।”[সূরা আল-আনআম: ১০১]

একজন সাধারণ মানুষও মেনে নেয় না যে তার সন্তানকে কোনো অনিষ্ট স্পর্শ করুক। বরং সে নিজের সন্তানকে রক্ষা করে, শত্রুর হাতে তুলে দেয় না; যে শত্রু তাকে কষ্ট দিবে বা গালি দেবে। থাকতো তাকে শূলে চড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করার জন্য ছেড়ে দিবে। যদি একজন সাধারণ সৃষ্টির অবস্থা এরকম হয় তাহলে প্রভুর অবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

তৃতীয়ত: ‘আদি পাপ’-এর পায়শ্চিত্তের যে বিশ্বাস খ্রিস্টানেরা ধারণ করে বাস্তব জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। কারণ আপনি যেমন উল্লেখ করেছেন যে, খ্রিস্টীয় বিশ্বাস মানুষের উপর কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। তাকে শুধু বিশ্বাস করতে হবে যে আল্লাহ তাঁর পুত্রকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন ক্রুশবিদ্ধ হতে; যাতে তিনি মানুষের পাপের পায়শ্চিত্ত হিসেবে মারা যান। এর মাধ্যমেই সে খ্রিস্টান হয়ে যাবে এবং প্রভুর সন্তুষ্টি ও জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা লাভ করবে। শুধু তাই নয়, বরঞ্চ একজন খ্রিস্টান বিশ্বাস করবে যে আল্লাহর পুত্রের সাথে যা ঘটেছে সেটা তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমস্ত পাপের পায়শ্চিত্ত। এরপর তো আর প্রশ্ন করার সুযোগ নেই যে, খ্রিস্টান সমাজে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, মদ্যপান ইত্যাদি ক্রমাগত হারে বাড়ছে কেন... যীশু কি সেগুলোর পায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে মারা যাননি? সেগুলো মাফ করে দেয়া হয়েছে এবং মুছে দেয়া হয়েছে। সুতরাং তারা পাপ থেকে নিবৃত হবে কেন?

আপনি কি আমাকে বলবেন: কেন আপনারা কখনও কখনও খুনিকে মৃত্যুদণ্ড দেন, অপরাধীকে কারাগারে বন্দি করেন এবং বিভিন্ন শাস্তি প্রদান করেন; যদি আপনাদের দৃষ্টিতে সেই অপরাধীর পাপ যীশুর খুনের মাধ্যমে মাফ হয়ে গিয়ে থাকে? এ কী অদ্ভুত দ্বিচারিতা নয়?

মুসলমানরা যদি নিজেদেরকে ‘মনোনীত’ মনে করে, তাহলে তারা নিজেদের ধর্ম প্রচার করে না কেন?

আপনি বলেছেন যে মুসলমানরা যেহেতু নিজেদের মানবজাতির মধ্য থেকে ‘মনোনীত’ মনে করে, তাহলে তারা তাদের বিশ্বাস প্রচার করে না কেন? এর উত্তর হলো: তাদের মধ্যে যারা নিষ্ঠাবান, আল্লাহর কিতাব মেনে চলেন তারা এটি করেছেন। অন্যথায় ইসলাম মক্কা থেকে ইন্দোনেশিয়া, সাইবেরিয়া, মরক্কো, বসনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশে কীভাবে পৌঁছাল? আজকে কিছু মুসলমানের আচরণে যে ভুলত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর দায় ইসলামের নয় এবং ইসলাম এর কারণও নয়। বরং এসব ঘটেছে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণের ফলেই। কোনো মতাদর্শকে তার অনুসারীদের ভুলের জন্য ও বিচ্যুতির জন্য দায়ী করা ন্যায়সংগত নয়।

মুসলমানেরা যখন স্বীকার করে যে, পাপী আল্লাহর শাস্তির হুমকিপ্রাপ্ত যদি না সে তওবা করে এবং যখন তারা স্বীকার করে যে, কিছু পাপের জন্য দুনিয়াতে এমন দণ্ড (শাস্তি) রয়েছে যা পাপীকে নিবৃত করবে এবং তা আখিরাতের শাস্তির পায়শ্চিত্ত হবে; যেমন হত্যা, চুরি ও যিনার দণ্ড ইত্যাদি; তখন কি তারা খ্রিস্টানদের চেয়ে অধিক ন্যায়পরায়ণ নয়?

ইসলামে প্রবেশ করা কি কঠিন?

আপনি বলেছেন যে খ্রিস্টধর্মে প্রবেশ করা ইসলামের তুলনায় সহজ— এটি একটি সুস্পষ্ট ভুল ধারণা। কেননা ইসলামের চাবিকাঠি হলো মাত্র দুটি বাক্য: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ‘আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই’ এবং ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’ এই বাক্য দু’টির মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই ইসলামে প্রবেশ করতে পারেন। এর জন্য কোনো বাপ্তিস্মের দরকার নেই, কোনো পাদ্রীর দরকার নেই, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার দরকার নেই; মসজিদেও না, অন্য কোথাও না।

এর সাথে তুলনা করুন খ্রিস্টানদের বাপ্তিস্মের হাস্যকর আনুষ্ঠানিকতা, যা তারা কাউকে খ্রিস্টধর্মে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে সম্পাদন করে থাকে।

এছাড়াও খ্রিস্টানেরা ক্রুশকে পবিত্র মনে করে; যে ক্রুশে যীশুকে শূলে চড়ানো হয়েছিল, যা তাঁর পিঠে কষ্ট দিয়েছিল ও যন্ত্রণা দিয়েছিল (তাদের দাবি অনুযায়ী!)। কিন্তু এই ক্রুশকে তারা পবিত্র, বরকতময় ও সুস্থতার প্রতীক মনে করে। অথচ এটিকে নিন্দনীয় ও ঘৃণার বস্তু মনে করা উচিত ছিল।  এটিকে আল্লাহর পুত্রের মৃত্যুর জন্য জঘন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত ছিল! এটিই তাঁর পিঠে কষ্ট দিয়েছিল এবং তাঁর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।

সত্যের অধিকারী হিসেবে মুসলমানরাই অগ্রগণ্য

আপনি কি আমার সাথে একমত নন যে মুসলমানরাই সত্যের অধিকারী হওয়ার বেশি যোগ্য? কেননা তারা সমস্ত নবী ও রাসুলকে বিশ্বাস করে, তাদেরকে সম্মান করে এবং বিশ্বাস রাখে যে তাঁরা সকলেই সত্য ও একেশ্বরবাদের (তাওহীদের) উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তারা আরও বিশ্বাস করে যে আল্লাহ প্রতিটি নবীকে সেই কাল ও স্থানের উপযোগী শরীয়ত সহকারে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

একজন ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান যদি দেখেন যে মুসলমানরা মুসা, ঈসা (যীশু) ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে বিশ্বাস করে এবং মূল তাওরাত, মূল ইঞ্জিল ও কুরআন কারীমকে বিশ্বাস করে, তারপর দেখে যে তার স্বজাতি খ্রিস্টানেরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করে, তাঁর নবুয়তকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর কিতাবকে মিথ্যা বলে; তাহলে কি তার ন্যায়বোধ তাকে মুসলমানদের পাল্লাকে ভারী মনে করার দিকে পরিচালিত করবে না?

যাীশু কি সত্যিই বলেছিলেন আমার মাধ্যম ছাড়া কেউ পিতার কাছে যেতে পারবে না?

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, যীশু (ঈসা) বলেছেন: “আমার মাধ্যম ছাড়া কেউ পিতার কাছে যেতে পারবে না।” প্রথমত: এই উক্তিটি প্রমাণ করতে হবে, যীশুর উক্তি হিসেবে এর সত্যতা সাব্যস্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত: এটি সুস্পষ্টভাবে ভুল। কেননা মানবজাতি নূহ, হুদ, সালিহ, ইউনুস, শুআইব, ইব্রাহিম, মুসা এবং অন্যান্য নবীদের যুগে আল্লাহকে কীভাবে চিনল?

আর যদি এই উক্তির অর্থ এটা হয় যে ইসরাইলের বংশধরেরা (বনী ইসরাইল) ঈসা (যীশু) আলাইহিস সালামের যুগে ও তার পরবর্তীতে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত কেবল ঈসা আলাইহিস সালামের মাধ্যমেই আল্লাহর ধর্ম ও শরীয়তে পৌঁছতে পারবে, তাহলে আমরা বলব একথা সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত।

আমি ও পিতা এক এই বাক্য কি যীশুর উপাস্য হওয়া প্রমাণ করে?

আপনি সবশেষে যীশুর উক্তি ‘আমি ও পিতা এক’ উল্লেখ করেছেন। এই বিশ্বাস প্রত্যাখ্যাত। আপনি যদি ইনসাফের পথ অনুসরণ করেন এবং প্রবৃত্তির প্রভাব থেকে মুক্ত হন, তাহলে আপনার কাছে এটি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে যে ‘আমি ও পিতা’ কথাটি একটি সংযোজ্য (معطوف) ও সংযোজিত পদ (معطوف عليه) দিয়ে এবং তাদের মধ্যে সংযোগকারী অব্যয় (أداة العطف) দিয়ে গঠিত।

ভাষাবিজ্ঞানে সংযোজন (عطف) ভিন্নতা বোঝায়। অর্থাৎ ‘পুত্র’ একটি সত্তা এবং ‘পিতা’ ভিন্ন আরেকটি সত্তা। যদি কোনো ব্যক্তি বলে ‘আমি ও অমুক’, তাহলে প্রতিটি বিবেকবান মানুষ বুঝবে যে তারা ভিন্ন দু’টি সত্তা। আর ১+১+১=১ এমনু সমীকরণ সকল বিবেকবান মানুষ (গণিতবিদ হোক বা অন্য যে কেউ) প্রত্যাখ্যান করবেন।

পরিশেষে, আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি এবং আমার মনে হয় না আপনি এই উপদেশ প্রত্যাখ্যান করবেন: আপনি যা কিছু পড়েছেন আল্লাহর জন্য নিষ্ঠাবান হয়ে নিজের মনের মধ্যে তা নিয়ে চিন্তা করুন; সব ধরনের পূর্বধারণা ও পুরনো মতামত থেকে মুক্ত হয়ে, সব ধরনের প্রবৃত্তি ও গোষ্ঠীগত পক্ষপাত থেকে বিরত হয়ে, কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে সঠিক পথের প্রার্থনায় বিশ্বস্ত হয়ে। আল্লাহ এমন বান্দাকে নিরাশ করার মতো নন যে এভাবে তাঁর কাছে ফিরে আসে। বরং তিনি মহানুভব। আল্লাহই সরল পথের দিশা দানকারী, তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কার্যনির্বাহী।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতী কাজ

সূত্র

শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android