পরীক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন করা হারাম। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি জালিয়াতি করে, সে আমার দলভুক্ত না।” [মুসলিম (১০২)]।
কেউ যদি এমনটা করে থাকে, তার উচিত আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওবা করা।
উক্ত সনদপত্র দিয়ে চাকুরি করতে সমস্যা নেই, যদি সে যথাযথভাবে কাজ করতে পারে। কারণ কোনো চাকুরিতে সনদপত্রের শর্ত দেওয়ার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো: সনদধারী ঐ কাজের যোগ্য সেটা নিশ্চিত করা, এমনকি তা প্রবল ধারণার মাধ্যমে হলেও।
অথচ প্রত্যেক যে ব্যক্তি সনদপত্র দিতে বলে কিংবা সনদপত্র থাকার শর্ত করে, সেও জানে যে সনদপত্রধারীদের অনেকে তার চাকুরী করার যোগ্য নয়। কখনো হয়তো এমন হয়েছে যে সনদপত্র অর্জন করতে গিয়ে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন বা অনুরূপ কিছু করে ফেলেছে, যেটা প্রসিদ্ধ ও সর্বজনবিদিত ব্যাপার। কিন্তু, তদুপরি চাকুরির যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে সনদপত্রকে যথেষ্ট আলামত হিসেবে গ্রহণ করে। তারপর দেখে সে বাস্তবে কাজটি করতে পারে কিনা।
সে যদি তার বা তার সম পর্যায়ের লোকজনের কাছ থেকে কাজটা যেমন কাঙ্ক্ষিত, তেমনটা করতে সমর্থ হয়, তাহলে কাজের জন্য প্রদত্ত শর্তের উদ্দেশ্য পূরণ হলো।
সনদপত্র অর্জন করতে গিয়ে তার জীবনে সীমালঙ্ঘন, অসদুপায় অবলম্বন বা অনুরূপ বিষয় সংঘটিত হয়েছে কিনা সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান করতে যাওয়া মানে নিঃসন্দেহে মানুষকে জটিলতায় ফেলে দেয়া এবং কাজের যোগ্যতার প্রমাণস্বরূপ সনদপত্র থাকার বিষয়টিকে কঠিন করে ফেলা।
শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: একজন মানুষ একটা সনদপত্র দিয়ে কাজ করে অথচ সে এটা অর্জনে অসদুপায় অবলম্বন করেছে। বর্তমানে সে কাজটা খুব ভালো পারে যেমনটা তার অধস্তন ব্যক্তিরা সাক্ষ্য দেয়। তার এই বেতনের হুকুম কী? এটা কি হালাল; নাকি হারাম?
তিনি উত্তর দেন: “ইন শা আল্লাহ এতে কোনো সমস্যা নেই। সে যে অসদুপায় অবলম্বন করেছে, সেটা থেকে তাকে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। সে যদি যথাযথভাবে কাজ করে থাকে, তাহলে উপার্জন করতে তার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পূর্বে অসদুপায় অবলম্বন করে সে ভুল করেছে। আল্লাহর কাছে তাকে এর জন্য তাওবা করতে হবে।” [মাজমূ ফাতাওয়া ইবনে বায (১৯/৩১)]।
এর সপক্ষে ‘আধিক্য বিবেচ্য ও স্বল্পতা উপেক্ষিত’ এই নিয়ম দিয়ে দলীল দেয়া যায়। তাই যে ব্যক্তি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করেছে, আর যে ব্যক্তি জাল সনদপত্র নিয়ে এসেছে− এই দুইয়ের মাঝে পার্থক্য করা হয়।
চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠান যদি নির্দিষ্ট সনদপত্রের শর্ত করে, যেটা সে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের মাধ্যমে অর্জন করেছে, তাহলে শর্ত পূরণ হয়েছে। সে যে পাপে জড়িয়েছিল, সেটা ক্ষমা করা হবে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে জাল সনদপত্র নিয়ে এসেছে, তার সনদপত্র বিবেচনা করা হবে না।
তার থেকে যেভাবে কাজটা চাওয়া হয় কিংবা তার সমপর্যায়ের ব্যক্তিরা যেভাবে কাজটা করে, সেভাবে করার পাশাপাশি যদি তার দ্বারা সংঘটিত সীমালঙ্ঘন ও অসদুপায় অবলম্বন থেকে সে তাওবাহ করে থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে তাকে ছাড় দেয়ার দিকটি আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ শরীয়তের অন্যতম লক্ষ্য হলো তাওবাহকারীকে তাওবা করার কাজে সাহায্য করা এবং তাওবাহর আগে তার দ্বারা সংঘটিত সব কিছু ক্ষমা করে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যারা সুদ খায় তারা তাঁর ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে তারা বলে, ‘ক্রয়-বিক্রয় তো সুদেরই মত। অথচ আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। অতএব যার নিকট তার রবের পক্ষ হতে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।”(সূরা বাকারা: ২৭৫)
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“এ বিধান এমন প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ যার কাছে তার রবের কাছ থেকে উপদেশ এসেছে, আল্লাহ অতীতের বিষয়গুলো তার জন্যই দিয়ে দিয়েছেন।
এটা যে মুসলিমের অধিকার হিসেবে সাব্যস্ত হবে এর দলীল হলো এর পরের আয়াত: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং যে সুদ অবশিষ্ট রয়েছে তা ছেড়ে দাও।” আল্লাহ তাদেরকে অবশিষ্ট সুদ ছেড়ে দিতে বলেছেন। কিন্তু তারা আগে যা হস্তগত করেছিল, তা ফিরিয়ে দিতে বলেননি। সুতরাং প্রমাণিত হল যে সেটা তাদের জন্যই। এর সাথে: “তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে।” আল্লাহর এ কথা তো আছেই। আর আল্লাহ তার বান্দাদের থেকে তাওবা কবুল করেন।
কেউ যদি বলে: এটা কাফেরদের সাথে খাস?
উত্তরে বলা হবে: কুরআনে এমন কিছু নেই যা দিয়ে এর সপক্ষে প্রমাণ দেয়া যায়। আল্লাহ শুধু বলেছেন: “যার কাছে তার রবের থেকে উপদেশ আসার পর আসার পর সে বিরত হল, তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে।” এ কথা মুসলিমকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করবে...।
বরঞ্চ এটাও বলা যেতে পারে: এ কথা ঐ ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করবে যে হারাম হওয়ার বিষয়টা জানত, তার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হয়েছে। কারণ যে ব্যক্তি তাওবা করে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। ফলে তার অতীতের কর্মগুলো থেকেও না থাকার মতই। “তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে” এ আয়াতটা তাকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।
এর পক্ষে দলীল হলো এর অব্যবহিত পরই আল্লাহর বক্তব্য: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো, আর সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও; যদি তোমরা মুমিন হও। অতঃপর যদি তোমরা না করো তবে আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও। আর যদি তোমরা তাওবা করো তাহলে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই।”(সূরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯)
তাওবা করার হুকুম: কাফেরকে যেমন অন্তর্ভুক্ত করে তেমনি পাপী মুসলিমকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ...” [জামেউল মাসাইল (১/২৭১) এবং তৎপরবর্তী অংশ থেকে সমাপ্ত]।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।