এক:
আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য যে শরীয়ত (আইন) অবতীর্ণ করেছেন তা মানুষদের আকীদা, ইবাদত ও লেনদেনের যাবতীয় প্রয়োজনকে অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ এটি চূড়ান্ত শরীয়ত, যা নিয়ে শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের কাছে প্রেরিত হয়েছেন। তার পরে কোনো নবী নেই, তার শরীয়তের পরে কোনো শরীয়ত নেই। এমনকি ঈসা আলাইহিস সালাম শেষ যমানায় নামার পর এই শরীয়ত অনুসারে ফয়সালা করবেন।
যে ব্যক্তি কুরআন অনুধাবন করবে, সুন্নাহ পড়বে এবং ফিকহ ও সমসাময়িক মাসয়ালার বইসমূহ পড়বে, সে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে।
শরয়ি বিধানগুলো কুরআন-সুন্নাহতে হয়তো প্রত্যক্ষভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। এর অধীনে শরিয়তের বিধিবিধানের মূলনীতিসমূহ ও মানুষের খুঁটিনাটি যা কিছু প্রয়োজন হয় সেগুলোর অধিকাংশ বিধান অন্তর্ভুক্ত।
কিংবা বিধানগুলো প্রত্যক্ষভাবে বিদ্যমান নেই। কিন্তু, একজন ফকীহ (ইসলামী আইনজ্ঞ) অন্যান্য শরয়ি দলীলের ভিত্তিতে এগুলোর বিধান জানতে সক্ষম হবেন। সেই অন্য দলীলগুলোর উদাহরণ হলো: সাহাবীদের বর্ণনা, প্রত্যক্ষ বিধানগুলোর উপর কিয়াস, ইস্তিসহাব (আদি অবস্থা বহাল থাকা), মাসলিহ মুরসালাহ, সাদ্দুয যারায়ে‘ (অনিষ্টের পথরোধ করা)।
এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلاً وَالَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْلَمُونَ أَنَّهُ مُنَزَّلٌ مِنْ رَبِّكَ بِالْحَقِّ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ
“(বলুন,) আমি কি তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো হুকুমদাতা খুঁজব? অথচ তিনিই তোমাদের কাছে বিস্তারিতভাবে কিতাব নাযিল করেছেন। আর আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা জানে যে, এটি সত্যিকারভাবে আপনার রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। অতএব, আপনি কিছুতেই সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।”[সূরা আন’আম: ১১৪]
এছাড়া আল্লাহ বলেন:
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ
“আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি; সবকিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়ে।”[সূরা নাহল: ৮৯]
হাদীসে এসেছে: “তোমাদেরকে জান্নাতের নিকটে নিয়ে যায় এমন প্রতিটি কাজের নির্দেশই আমি দিয়েছি। তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এমন প্রতিটি কাজ করতে আমি নিষেধ করেছি। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন রিযিক আসতে দেরী হওয়ার অভিযোগ না করে। জিবরীল আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছে যে, তোমাদের কেউ ততক্ষণ দুনিয়া থেকে বের হবে না যতক্ষণ সে তার রিযিক পূর্ণ না করবে। সুতরাং হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং রিযিক অনুসন্ধানকে সুন্দর করো। তোমাদের কারো রিযিক আসতে দেরী হলে সে যেন আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে সেটির অনুসন্ধান না করে। কারণ আল্লাহর অবাধ্যতা দিয়ে তার অনুগ্রহ পাওয়া যায় না।”[হাদীসটি ইবনু আবী শাইবা তার মুসান্নাফ (৩৪৩৩২) এবং হাকেম তার মুস্তাদরাক (৫/২) গ্রন্থে বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সহীহুত তারগীব ওয়াত-তারহীব’ (১৭০০) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন]
শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
‘শরয়ি বিধানসমূহ দুই ভাগে বিভক্ত:
একটি ভাগ আছে যেটি শরীয়তপ্রণেতা দ্ব্যর্থহীনভাবে ব্যক্ত করেছেন। যেমন:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ
“তোমাদের জন্য (খাওয়া) নিষিদ্ধ করা হয়েছে: মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাইকৃত প্রাণী। ...”[সূরা মায়েদা: ৩] আয়াতটির শেষ পর্যন্ত।
অনুরূপভাবে আল্লাহর বাণী:
وَأُحِلَّ لَكُمْ مَا وَرَاءَ ذَلِكُمْ
“উল্লিখিত কয়েক প্রকার নারী ছাড়া অন্য সব নারীকে বিয়ে করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে।”[সূরা নিসা: ২৪] অর্থাৎ ঐ নারীদেরকে। এ ধরণের উদাহরণ অনেক।
অন্য ভাগ হচ্ছে যা শরীয়তপ্রণেতা নির্দিষ্টভাবে সরাসরি ব্যক্ত করেননি। কিন্তু, শরীয়তের সাধারণ নীতি ও ব্যাপক দলিলের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। যেহেতু শরীয়ত সকল ইস্যুকে অন্তর্ভুক্তকারী সাধারণ। আর প্রত্যেক মাসআলায় আলাদা সরাসরি বক্তব্য প্রদান করা সম্ভবপর নয়। কারণ এর জন্য বহু কিতাবের প্রয়োজন হবে; যেগুলো বহন করার জন্য বহু উট বা বহু গাড়িও যথেষ্ট হবে না।
কিন্তু কিছু সাধারণ মূলনীতি দেয়া আছে। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি তার যে সমস্ত বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করেন তারা শাখাগত একক মাসয়ালাগুলোকে সাধারণ মূলনীতির অধিভুক্ত করতে সক্ষম হন। যেমন: “ক্ষতি করা নয়; পাল্টাপাল্টি ক্ষতি করাও নয়।” এই হাদীসটির সহিহ হওয়া নিয়ে যদিও প্রশ্ন আছে তবে শরীয়তের মূলনীতিসমূহ এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। এই মূলনীতির অধিভুক্ত হতে পারে এমন হাজার হাজার মাসয়ালা যেগুলোতে ক্ষতি বিদ্যমান এবং এমন আরও হাজারও মাসয়ালা যেগুলোতে পাল্টাপাল্টি ক্ষতি বিদ্যমান। যদিও সে মাসয়ালাগুলোর ব্যাপারে সরাসরি কোন বক্তব্য (নস) নেই।
উদাহরণস্বরূপ আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর যমানায় দুজন লোকের মাঝে বিবাদ ছিল। একজনের দুখণ্ড জমি ছিল। তার জমিদ্বয়ের মাঝখানে অন্যজনের একটি জমি ছিল। দুইটি জমির মালিক চাইল যে মাঝের জমির উপর দিয়ে তার একজমি থেকে অপর জমিতে পানি প্রবাহিত করতে। কিন্তু মাঝের জমির মালিক এতে সম্মত হল না। সে বলল: ‘আমার জমির উপর দিয়ে তুমি পান প্রবাহিত করতে পারবে না।’ বিষয়টি আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে উত্থাপন করা হল। তখন তিনি জোরপূর্বক তার জমির উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত করার নির্দেশ দিয়ে বললেন: ‘তোমার পেটের (অথবা বললেন: পিঠের) উপর দিয়ে হলেও পানি প্রবাহিত করব।’ কারণ এই প্রতিবেশি তার জমির উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত করতে অসম্মতি জানিয়ে তার প্রতিবেশীর ক্ষতি করতে চেয়েছিল। নতুবা এই কাজে তার উপকারই ছিল। অর্থাৎ প্রবাহিত এই পানি দিয়ে সে কিছু বপণ করতে ও চাষ করতে পারত। সুতরাং এতে উভয়েরই কল্যাণ নিহিত।’[লিকাউল বাবিল মাফতূহ (১৮/১২২) থেকে সমাপ্ত]
আমরা যে আয়াতগুলো উল্লেখ করলাম সেগুলো থেকে বোঝা যায় যে শুধুমাত্র কুরআনেই মানুষের যাবতীয় প্রয়োজনের বিবরণ রয়েছে। আলেমদের দৃষ্টিতে এর দুটো ব্যাখ্যা রয়েছে:
এক: কুরআনের মধ্যে সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস প্রমাণ হওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক যে বিধান এ দলীলগুলোর মাধ্যমে সাব্যস্ত হবে সেগুলোর ক্ষেত্রে এ কথা বলা সঠিক হবে যে: কুরআনে এর প্রমাণ রয়েছে।
দুই: কুরআনে কোনো না কোনো দিক থেকে বিধানটি অন্তর্ভুক্ত হওয়া। এমনকি কোনো কোনো মাসয়ালায় যদি সেটা البراءة الأصلية (আদি মুক্ততা) বহাল রাখার মাধ্যমে হয় তবুও।
যদিও এখানে আলোচনার বিষয় কুরআন সকল বিধি-বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এ বিষয়টি সাব্যস্ত করা নয়; বরং এখানে আলোচনার বিষয় হচ্ছে শরীয়তের গ্রহণযোগ্য উৎসগুলো যাবতীয় বিধি-বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে সেটি বর্ণনা করা। তবুও দ্বিতীয় পয়েন্টের পক্ষে আল-রাযী (রহঃ) যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সেটি আমরা এখানে অতিরিক্ত তথ্য হিসেবে উল্লেখ করছি। তিনি প্রথমে প্রথম মতটি উল্লেখ করে বলেছেন যে সেটি অধিকাংশ ফকীহের মত।
আল-রাযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘কুরআন সকল উসূলী (মূলনীতি) ও শাখাগত (ফিকহী) জ্ঞানকে ধারণ করে না— তার এমন বক্তব্যের ব্যাপারে আমি বলব: উসূলের জ্ঞান এতে (কুরআনে) পুরোপুরি রয়েছে। কারণ মৌলিক দলীলগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বিভিন্ন মাযহাবের মতামত ও মতভেদের বিস্তারিত উল্লেখ থাকার প্রয়োজন নেই।
আর শাখাগত জ্ঞানের বিস্তারিত বিবরণ প্রসঙ্গে বলব:
এ বিষয়ে আলেমদের দু’টি মত রয়েছে:
প্রথম মত: তারা বলেন যে, কুরআন প্রমাণ করে যে ইজমা, খবরে ওয়াহিদ ও কিয়াস শরীয়তের প্রমাণ। সুতরাং প্রত্যেক যে মাসয়ালার পক্ষে এই তিনটি মূল দলিলের কোন একটি প্রমাণ করে সেটি কার্যত কুরআনে রয়েছে।
ওয়াহেদী রাহিমাহুল্লাহ এ কথার সপক্ষে তিনটি উদাহরণ দিয়েছেন:
প্রথম উদাহরণ: ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন: ‘আমি কেন তাকে অভিশাপ দিব না যাকে আল্লাহ তার কিতাবে অভিশাপ দিয়েছেন?’ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে নারী উল্কি আঁকে, যার গায়ে উল্কি আঁকা হয় এবং যে নিজে পরচুলা লাগায়, যে অন্যকে লাগিয়ে দেয়। বর্ণিত আছে এক মহিলা পুরো কুরআন পড়ার পর তার কাছে এসে বলেন: ‘হে ইবনে উম্মে আব্দ! আমি গতরাতে দুই মোড়কের ভেতরে থাকা পুরো কুরআন পড়েছি। কিন্তু কোথাও উল্কি অঙ্কনকারী ও উল্কিগ্রহণকারীকে অভিশাপ দেওয়ার কথা পাইনি।’ ইবনে মাসউদ বললেন: ‘তুমি যদি পড়তে তাহলে পেয়ে যেতে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ “রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ করো।”[সূরা হাশর: ৭] আমাদেরকে রাসূল যা দিয়েছেন তার মাঝে এটাও রয়েছে যে: “আল্লাহ উল্কি অঙ্কনকারী ও উল্কি গ্রহণকারীকে অভিশাপ দিন।”
আমি বলব: আল্লাহর কিতাবে এর চেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া সম্ভব। কারণ আল্লাহ সূরা নিসায় বলেন: وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا لّعَنَهُ اللهُ “তারা (মুশরিকরা) কেবল অবাধ্য শয়তানকেই ডাকে; যাকে আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন।” [সূরা নিসা: ১১৭, ১১৮] আল্লাহ শয়তানকে অভিশাপ দিয়েছেন। তারপর তার বেশ কিছু মন্দ কাজের বিবরণ দিয়েছেন। তন্মধ্যে একটি মন্দ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন: وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ “আমি অবশ্যই তাদেরকে আদেশ দিব যার ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবে।”[সূরা নিসা: ১১৯] উক্ত আয়াতের প্রত্যক্ষ অর্থ দাবি করে যে, আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি করা অভিশাপ দেয়াকে আবশ্যক করে।
দ্বিতীয় উদাহরণ: বর্ণিত আছে শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে হারামে বসে ছিলেন। তিনি বললেন: ‘তোমরা আমাকে যে বিষয়েই প্রশ্ন করবে আমি তার উত্তর কুরআন থেকে দিব।’ এক লোক বলল: ‘ইহরাম পরিহিত ব্যক্তি যদি ভীমরুল হত্যা করে, তার ব্যাপারে কী বলেন?’ তিনি বললেন: ‘তার উপর কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।’ লোকটা বলল: ‘আল্লাহর কিতাবে এটি কোথায় আছে?’ শাফেয়ী বললেন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ
“রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ করো”। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সনদসহ বর্ণনা করেন: “তোমরা আমার সুন্নত ও আমার পরে সত্যপথপ্রাপ্ত খলীফাদের সুন্নত অনুসরণ করবে।” তারপর ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করলেন যে: "ইহরাম পরিহিত ব্যক্তি ভীমরুলকে মারার অধিকার আছে।"
ওয়াহেদী বলেন: “তিনি আল্লাহর কিতাব থেকে তিন ধাপে উদ্ভাবন করে জবাব দিলেন।”
আমি বলব: এখানে আরও কাছের একটি পদ্ধতি রয়েছে। সেটি হচ্ছে: মুসলিমদের সম্পদে মূল অবস্থা হচ্ছে হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন: لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ “সে যা (ভালো) উপার্জন করে তার সুফল তার প্রাপ্য, আবার যা (মন্দ) উপার্জন করে তার কুফলও তার প্রাপ্য।”[সূরা বাকারা: ২৮৬] তিনি আরো বলেন: وَلا يَسْأَلْكُمْ أَمْوَالَكُمْ “তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের সম্পদ চান না।”[সূরা মুহাম্মাদ: ৩৬] তিনি আরো বলেন: لا تَأْكُلُوا أَمْوالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْباطِلِ إِلاَّ أَنْ تَكُونَ تِجارَةً عَنْ تَراضٍ مِنْكُمْ “তোমরা পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ছাড়া একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।”[সূরা নিসা: ২৯] সুতরাং আল্লাহ ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো পন্থায় মানুষের সম্পদ খেতে নিষেধ করেছেন। তাই ব্যবসা ছাড়া অন্যান্য অবস্থায় মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করা মূল নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অতএব, এই ব্যাপকতার দাবি হচ্ছে, যে ইহরামকারী ব্যক্তি ভীমরুল হত্যা করলে তার উপর কোনো কিছু আবশ্যক হবে না। কারণ এই ব্যাপক বিষয়গুলো আঁকড়ে ধরা এক স্তরেই হুকুম আবশ্যক করে। ...
তৃতীয় উদাহরণ: ওয়াহেদী বলেন: ব্যভিচারী মজুরের হাদীসে বর্ণিত আছে: তার বাবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: ‘আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুসারে বিচার করুন।’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুসারে বিচার করব।” তারপর তিনি ঐ মজুরের ক্ষেত্রে তিনি চাবুকাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তরের ফয়সালা করলেন। আর নারী যদি ব্যভিচারের বিষয়টি স্বীকার করে তাহলে তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যার নির্দেশ দিলেন।
ওয়াহেদী বলেন: কুরআনে চাবুকাঘাত ও দেশান্তরের কথা উল্লেখ নেই। এটি প্রমাণ করে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও্য়াসাল্লাম যে সমস্ত ফয়সালা করেছেন সেটাই আল্লাহর কিতাব।
আমি বলি: এই উদাহরণ সত্য। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন: لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ “যাতে মানুষের কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা তাদেরকে পরিষ্কার করে বোঝাতে পারো।”[সূরা নাহল: ৪৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছুর বিবরণ দিয়েছেন তা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং এই উদাহরণসমূহের মাধ্যমে স্পষ্ট হলো যে কুরআন যেহেতু প্রমাণ করেছে ইজমা প্রমাণ, খবরে ওয়াহেদ প্রমাণ ও কিয়াস প্রমাণ, সেহেতু এই তিনটির মাধ্যমে যে বিধানই সাব্যস্ত হয়েছে তা মূল কুরআনের দ্বারাই সাব্যস্ত। এর মাধ্যমে আল্লাহর এই বাণীর যথার্থতা সাব্যস্ত হয়: مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ “আমরা কিতাবে কোনো কিছুই উল্লেখ করতে অবহেলা করিনি।”
এটিই এই মতের মূলকথা। অধিকাংশ ফকীহ এই মতটি সমর্থন করেছেন ...
দ্বিতীয় মত: এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কারো মত হচ্ছে কুরআন সকল বিধানের বিবরণকে অন্তর্ভুক্তকারী।
এর ব্যাখ্যা হচ্ছে: সব ধরনের শরয়ী দায়িত্বের (তাকলীফ) ক্ষেতে মূল বা প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে ব্যক্তি এগুলো থেকে দায়মুক্ত থাকা। কারো দায়িত্বে কিছু আসার জন্য পৃথক দলীল প্রয়োজন। যে বিষয়ে কোনো দায়িত্ব বর্ণিত হয়নি, সে রকম কোনো প্রকারের বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ যে সমস্ত বিষয়ে কোনো দায়িত্ব বর্ণিত হয়নি, সেগুলোর প্রকারভেদ অগণিত। আর অসীম পরিমাণের বিবরণ দেওয়া অসম্ভব। বরং বিবরণ দিতে হয় এমন কিছুর যা সীমিত বা গণনা করা যায়।
যেমন ধরণ: আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের উপর এক হাজার দায়িত্ব আছে। তিনি কুরআনে তা উল্লেখ করেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেই হাজার দায়িত্ব পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর বলেছেন: “আমরা এই কিতাবে কোনো কিছুই উল্লেখ করতে অবহেলা করিনি।” তার অর্থ হচ্ছে সৃষ্টজীবের ক্ষেত্রে এই এক হাজারের পর আল্লাহর প্রতি আর কোনো দায়িত্ব নেই। তারপর আল্লাহ এই আয়াতকে জোরদার করে বলেছেন: الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম।” [সূরা মায়েদা: ৩] তিনি আরো বলেছেন: وَلا رَطْبٍ وَلا يابِسٍ إِلَّا فِي كِتابٍ مُبِينٍ “যে আর্দ্র বা শুষ্ক বস্তুটি আছে তাও একটি স্পষ্ট গ্রন্থে লিখিত রয়েছে।”[সূরা আন’আম: ৫৯] এই মতাবলম্বীদের ব্যাখ্যা এটাই। এর বিস্তারিত বিবরণের উপযুক্ত স্থান উসূলুল ফিকহের গ্রন্থ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।’[তাফসীরুর রাযী (১২/৫২৭, ৫২৮) থেকে সমাপ্ত]
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
আল্লাহর বাণী: مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ “আমরা এই কিতাবে কোনো কিছুই উল্লেখ করতে অবহেলা করিনি।”[সূরা আনআম: ৩৮] এর ক্ষেত্রে সঠিক মত হলো এর দ্বারা উদ্দেশ্য লাওহে মাহফুয, যেখানে তিনি সৃষ্টিকুলের ভাগ্য লিখে রেখেছেন। আয়াতটির তাফসীরে এটিই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত মত।
তবে দলীল পেশের জন্য এই আয়াতের পরিবর্তে আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীই যথেষ্ট:
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ
“আমি তোমার কাছে সবকিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা হিসেবে কিতাব (কুরআন) নাযিল করেছি।”[সূরা নাহল: ৮৯]
দেখুন: তাফসীরু ইবনে জারীর (৯/২৩৪), তাফসীরু ইবনে কাসীর (৩/২৫৩), তাফসীরুস সা’দী (পৃ. ২৫৫)।
দুই:
যদি নতুন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যার কথা আল্লাহ তাআলার কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতে নেই, যেমন: চিকিৎসা, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয় যেমন: ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজিটাল মুদ্রায় লেনদেন প্রভৃতি। তাহলে এই সমস্ত বিষয়ের হুকুম প্রদান করার জন্য আলেমরা কিয়াস, ইস্তিম্বাত (উদ্ভাবন), সাধারণ মূলনীতি প্রয়োগ এবং শরিয়তের উদ্দেশ্যসমূহ বিবেচনা করে ইজতিহাদ করবেন।
বিষয়টি যেমনই হোক, আলেমদের জন্য শরীয়ত অনুসারে এর বিধান উদঘাটন করা সম্ভব। এমনকি কোনো নকলী দলীল না থাকলে মৌলিক বৈধতা অথবা নিষেধাজ্ঞার মূলনীতি ব্যবহার করার মাধ্যমে হতে পারে। এমন কোনো মাসয়ালা নেই যার বিধান ইসলামী শরীয়তে নেই।
আরো জানতে দেখুন: শাইখ শাঙ্কীত্বীর ‘তাফসীরু আদ্বওয়াউল বায়ান’-এ আল্লাহর এই আয়াতের ব্যাখ্যা: إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ “নিশ্চয়ই এই কুরআন সর্বাধিক সঠিক পথ দেখায়।”[সূরা ইসরা: ৯]
সারকথা হলো:
মানুষের যাবতীয় বিষয়ে যে সমস্ত বিধি-বিধান প্রয়োজন হয়, শরীয়ত সেগুলোকে পরিব্যাপ্ত করেছে। কারণ এটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের সর্বশেষ শরিয়ত, যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের জন্য আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ধর্ম হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য পছন্দ করলাম।”[সূরা মায়েদা: ৩]
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।