এক:
উক্ত মাসআলায় শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ সর্বশেষ যে মতে স্থিত হয়েছেন তা হলো হলুদাভ ও বাদামী স্রাব রক্তের সাথে সংযুক্ত হলেও ঋতুস্রাবের অন্তর্ভুক্ত না, চাই তা আগে হোক কিংবা পরে হোক। যেমনটি (37840) নং প্রশ্নের উত্তরে ইতঃপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।
তবে ঋতুস্রাব চলাকালে কিংবা রক্ত বন্ধ হওয়ার আগে যা নির্গত হয়, তা ঋতুস্রাবের অনুগামী হিসেবে গণ্য হবে।
তাঁকে ‘আল-লিকাউশ শাহরী’ (৭৩/৩৭)-তে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: ‘ফাযিলাতুশ শাইখ! অনুগ্রহ করে এই বিষয়টি স্পষ্ট করুন, কারণ এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। তা হলো: রক্ত বন্ধ হওয়ার পরে মহিলার শরীর থেকে যে বাদামী বর্ণের ও হলুদ বর্ণের স্রাব নির্গত হয় এর বিধান কী এবং মহিলার পবিত্রতা কখন সাব্যস্ত হবে? আর ‘কাস্সাতুল বায়দা’ (সাদা স্রাব) আসা কি আবশ্যক?’
তিনি উত্তরে বলেছেন: এটি এমন একটি মাসআলা যাতে আলিমরা মতভেদ করেছেন। আমার কাছে সর্বশেষ যা প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো: বাদামী স্রাব ও হলুদাভ স্রাব ধর্তব্য নয়, তবে যা ঋতুস্রাবের সময়কালে নির্গত হয় সেটা ছাড়া। অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ: কোনো মহিলার স্বাভাবিক ঋতুস্রাব পাঁচ দিন। সে তৃতীয় দিনে বাদামী বা হলুদাভ স্রাব দেখল, আমরা বলব: এটি ঋতুস্রাবের অনুগামী।
আর যে মহিলার রক্ত আসার আগেই বাদামী ও হলুদাভ স্রাব আসে, সেই বাদামী ও হলুদাভ স্রাব ধর্তব্য নয়।
আর অপর যে মহিলা ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়েছে, রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে এবং হলুদাভ ও বাদামী স্রাব অবশিষ্ট রয়েছে, সেটিরও কোনো হুকুম নেই।”[সমাপ্ত]
হলুদাভ স্রাব ও বাদামী স্রাব ঋতুস্রাবের অন্তর্ভুক্ত নয়, এই মতটি ইবনে হাযম রহিমাহুল্লাহুর মত এবং এটি চার মাযহাবসত অন্যান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমগণের মতের বিপরীত।
দেখুন: ‘আল-মুহাল্লা’ (মাসআলা ২৬৬, ২৬৯) ও দুবাইয়ানের ‘মাওসুআতুত তাহারাহ’ (৬/২৮৬)।
দুই:
আমরা শাইখ রহিমাহুল্লাহ কর্তৃক بعد الطهر (পবিত্রতার পরে) এই অতিরিক্ত অংশটিকে ‘যয়ীফ’ (দুর্বল) বলার কোনো উদ্ধৃতি পাইনি। বরং তিনি বিভিন্ন স্থানে এ অংশটি দিয়ে দলিল পেশ করেছেন এবং এটি সহিহ হওয়া সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। এটি আসলে সহিহ।
তিনি বলেছেন: ‘পবিত্রতার পরে যে বাদামী স্রাব, হলুদাভ স্রাব, ফোঁটা বা আর্দ্রতা থাকে¾ এসব কিছুই ঋতুস্রাব নয়। সুতরাং এগুলো নামায থেকে বিরত রাখবে না, রোযা থেকে বিরত রাখবে না এবং স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে বাধা দেবে না। কারণ এগুলো ঋতুস্রাব নয়। উম্মে আতিয়্যাহ বলেছেন: ‘আমরা হলুদাভ স্রাব ও বাদামী স্রাবকে কিছুই গণ্য করতাম না।’ বুখারী এটি বর্ণনা করেছেন এবং আবু দাউদ ‘বা‘দাত তুহর’ (পবিত্রতার পরে) অতিরিক্ত যোগ করেছেন। এর সনদ সহিহ।’[সমাপ্ত][মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উছাইমীন (১১/২৮১)]
তিনি রহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন: ‘উম্মে আতিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহার বক্তব্য: ‘আমরা পবিত্রতার পরে হলুদাভ স্রাব ও বাদামী স্রাবকে কিছুই গণ্য করতাম না।’ এটি আবু দাউদ সহিহ সনদে বর্ণনা করেছেন এবং বুখারীও এটি বর্ণনা করেছেন তবে ‘বাআদাত তুহর’ অংশটি ছাড়া। কিন্তু তিনি এ কথাটি দিয়ে পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে: ‘ঋতুস্রাবের দিনগুলো ছাড়া অন্য সময়ে হলুদাভ স্রাব ও বাদামী স্রাব’ শীর্ষক পরিচ্ছেদ।
‘ফাতহুল বারী’-তে এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: ‘তিনি এর দ্বারা আয়েশার পূর্ববর্তী হাদিস (যেখানে তিনি বলেছেন: "যতক্ষণ না তুমি সাদা স্রাব দেখতে পাও") এবং এই অধ্যায়ে উম্মু আতিয়্যার হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করার ইশারা করেছেন। এই সমন্বয় হলো: আয়িশার হাদিসটি সেই অবস্থার উপর প্রযোজ্য যখন ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে হলুদ বা বাদামী স্রাব দেখা যায়, আর অন্য সময়ে উম্মু আতিয়্যার কথা অনুযায়ী আমল হবে।’ আয়েশার যে হাদীসের উল্লেখ তিনি করেছেন তা হলো বুখারী এই অধ্যায়ের আগে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মহিলারা তাঁর কাছে কাপড়ের টুকরো পাঠাতেন।”[(১১/৩০৬)]
শাইখ রহিমাহুল্লাহ তাঁর সর্বশেষ মতের পরে উম্মু আতিয়্যার ‘বাদাত তুহর’ বক্তব্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করতেন যে, এখানে ‘তুহর’ (পবিত্রতা) বলতে উদ্দেশ্য হলো: রক্তপাত বন্ধ হওয়া। আর এর আগে তিনি মনে করতেন এখানে ‘তুহর’ মানে কাস্সাহ বায়দা (সাদা স্রাব) বের হওয়া অথবা সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়া অর্জিত হওয়া।
তিনি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: ‘যদি ঋতুস্রাবের রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায় এবং হলুদাভ স্রাব বা বাদামী স্রাব এর স্থলাভিষিক্ত হয়, তাহলে এটি ধর্তব্য নয়। অর্থাৎ রক্ত বন্ধ হওয়ার পরে বাদামী ও হলুদাভ স্রাব ধর্তব্য নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُل هُوَ أَذًى
“তারা আপনাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলুন: এটি কষ্টদায়ক (বা নাপাকি)।”[আল-বাকারাহ: ২২২]। আর কষ্টদায়ক বস্তু হলো: রক্ত।
উম্মু আতিয়্যাহ বলেছেন: ‘আমরা হলুদাভ স্রাব ও বাদামী স্রাবকে কিছুই গণ্য করতাম না’ এমনটই বুখারীর বর্ণনা।
আবু দাউদে রয়েছে: ‘পবিত্রতার পরে কিছুই গণ্য করতাম না।’ তবে রক্তপাত বন্ধ হলেই পবিত্রতা অর্জিত হয়।
সুতরাং আমরা এই মহিলাকে বলব: যেহেতু সে সাত দিন ঋতুস্রাব (অর্থাৎ রক্ত) দেখে, তারপর বাদামী বা হলুদাভ স্রাব আসে, তাহলে সে ঋতুস্রাবের রক্ত বন্ধ হওয়ার সময় গোসল করবে (অর্থাৎ সাত দিন পূর্ণ হলে)। তারপর নামায পড়বে, রোযা রাখবে এবং তার স্বামী যদি থাকে তবে তার সাথে সহবাস করবে, যদিও তার থেকে হলুদাভ স্রাব বা বাদামী স্রাব নির্গত হতে থাকে।’[সমাপ্ত][আল-লিকাউশ শাহরী (৩৬/২২)]
শাইখের আরেকটি দলিল হলো: ঋতুস্রাব হলো: রক্তস্রাব; হলুদাভ বা বাদামী স্রাব নয়।[আল-লিকাউশ শাহরী (৫১/৮)]
আর আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনাকে তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করতেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রক্তস্রাব বন্ধ হওয়ার আগে হলুদাভ স্রাব আসা, যেমনটি পূর্বে উম্মু আতিয়্যার হাদীসে বুখারীর শিরোনামের ব্যাখ্যায় বর্ণিত হয়েছে।
যাইহোক; এই মাসআলায় প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলো: ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে বাদামী স্রাব ও হলুদাভ স্রাব ‘ঋতুস্রাব’। ফকীহরা এটিকে ‘যামানুল ইমকান’ (সম্ভাব্য সময়কাল) বলে প্রকাশ করেন। আর তা ঋতুস্রাবের শুরুতে রক্তস্রাবের সাথে সংযুক্ত হোক বা মাঝখানে হোক বা শেষে হোক, যখন রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে বাদামী ও হলুদাভ স্রাব চলমান থাকুক; সবই ঋতুস্রাব। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের মাযহাব। এমনকি এই মর্মে ইজমা (ঐকমত্য)ও বর্ণিত হয়েছে।
তিন:
সর্বস্তরের ফকীহদের মতে স্থানটি শুকিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পবিত্রতা বাস্তবায়িত হয়, তবে ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তা ছাড়া। তার মতে, যে মহিলা সাদা স্রাব দেখে সে শুষ্কতা দ্বারা পবিত্র হবে না।
শাইখ আবু উমার আদ-দুবাইয়ান ‘মাওসুআতুত তাহারাহ’ (৭/৩৭)-তে বলেছেন:
‘চতুর্থ আলোচনা: ঋতুবতী মহিলার পবিত্রতার আলামত:
একটি মত হলো: ঋতুস্রাব বন্ধ হলেই পবিত্রতা হাসিল হবে নিঃশর্তভাবে; চাই এর পরে সাদাস্রাব বের হোক বা না হোক। এটি হানাফী, শাফিঈ ও হাম্বলীদের মাযহাব।
আরেকটি মত হলো: যে মহিলা সাদাস্রাব দেখে, সে তা না দেখা পর্যন্ত পবিত্র হবে না। আর যে মহিলা তা দেখে না তার পবিত্রতা হবে শুষ্কতা দ্বারা। এটি ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহুর ‘আল-মুদাওওয়ানাহ’-তে উল্লিখিত মত।
আরেকটি মত হলো: যার পবিত্রতা সাদাস্রাব দ্বারা হয়, সে শুষ্কতা দেখলে সেও পবিত্র হয়ে গেল। আর যার পবিত্রতা শুষ্কতা দ্বারা হয়, সে সাদাস্রাব দেখলে পবিত্র হবে না; যতক্ষণ না শুষ্কতা দেখে।
আরেকটি মত হলো: পবিত্রতার দুটি আলামত রয়েছে: শুষ্কতা ও সাদাস্রাব। মহিলা এদুটোর কোনো একটি দেখাই তার পবিত্র হওয়ার আলামত। চাই সে মহিলা সাধারণতঃ সাদা স্রাব দ্বারা পবিত্র হোক বা শুষ্কতা দ্বারা পবিত্র হোক। এ মত দিয়েছেন ইমাম মালিকের সাথীদের মধ্যে ইবনে হাবীব রাহিমাহুল্লাহ।
আরেকটি মত হলো: যখনই সে লাল রক্তের চিহ্ন দেখে বা গোশত ধোয়া পানির মতো বা হলুদাভ স্রাব বা বাদামী স্রাব বা সাদা স্রাব বা সম্পূর্ণ শুষ্কতা দেখে; তখনই সে পবিত্র হয়ে গেছে। এটি ইবনে হাযমের মাযহাব।
এর থেকে বোঝা গেল মতসমূহ নিম্নরূপ:
প্রথম: ধর্তব্য হলো: নিরেট শুষ্কতা।
দ্বিতীয়: সাদাস্রাব শুষ্কতার উপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, যদি মহিলা তা দেখে।
তৃতীয়: শুষ্কতা সাদাস্রাবের উপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, যদি মহিলা উভয়টি দেখে।
চতুর্থ: শুষ্কতা ও সাদা স্রাব উভয়টিই পবিত্রতার আলামত।
পঞ্চম: যখনই সে লাল রক্তের চিহ্ন দেখে বা গোশত ধোয়া পানির মতো বা হলুদাভ স্রাব বা বাদামী স্রাব বা সাদা স্রাব বা সম্পূর্ণ শুষ্কতা দেখে; তখনই সে পবিত্র হয়ে গেছে।’
এরপর তিনি বলেছেন:
‘যারা বলেছেন যে, মহিলা সাদাস্রাব দেখলে শুষ্কতা ধর্তব্য নয়, তাদের দলিল:
ঈসা ইবনে দীনার বলেছেন: সাদাস্রাব জরায়ু মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে শুষ্কতার চেয়ে বেশি সুস্পষ্ট।
আর হাফিয ইবনে হাজার বলেছেন: ‘তুলার টুকরো কখনো কখনো (ঋতুস্রাবের) মাঝখানে শুকনো অবস্থায় বের হয়। সুতরাং তা সাদাস্রাবের বিপরীতে ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার দলিল হয় না।’[সমাপ্ত]
শুষ্কতা যে পবিত্রতার আলামত, এ বিষয়ে কোনো মতভেদ বর্ণিত হয়নি। তবে ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত পূর্বোল্লিখিত মতটি ছাড়া।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।