শুক্রবার 7 সফর 1442 - 25 সেপ্টেম্বর 2020
বাংলা

তারাবীর নামায কি একাকী পড়বে; নাকি জামাতের সাথে? রমযান মাসে কুরআন খতম করা কি বিদাত?

প্রশ্ন

আমি শুনেছি যে, তারাবীর নামায একাকী পড়াই মুস্তাহাব; যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাকী পড়েছেন; কেবল ৩ বার ছাড়া। এ কথা কি সঠিক? আমি আরও শুনেছি যে, রমযান মাসে তারাবীর নামাযে গোটা কুরআন খতম করা বিদাত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা করেননি। এ কথাও কি সঠিক?

আলহামদু লিল্লাহ।.

এক:

রমযান মাসে তারাবীর নামায জামাতের সাথে আদায় করা শরিয়তসম্মত। একাকী পড়াও শরিয়তসম্মত। তবে একাকী পড়ার চেয়ে জামাতের সাথে পড়া উত্তম। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে নিয়ে কয়েক রাতে জামাতের সাথে পড়েছেন।

সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে নিয়ে কয়েক রাতে নামায পড়েছেন। তৃতীয় রাতে কিংবা চতুর্থ রাতে তিনি আর বের হননি। ভোরবেলায় তিনি বলেন: "অন্য কোন কারণ আমাকে বের হতে বাধা দেয়নি; তবে আমি তোমাদের উপর ফরয করে দেয়ার আশংকা করছি।"[সহিহ বুখারী (১১২৯)] সহিহ মুসলিমের (৭৬১) ভাষ্যে এসেছে "কিন্তু আমি আশংকা করেছি তোমাদের উপর কিয়ামুল লাইল ফরয করে দেয়ার। এমনটি হলে পরে তোমরা তা আদায় করতে পারবে না।"

তাই তারাবীর নামায জামাতের সাথে আদায় করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও উল্লেখ করেছেন যে, জামাতের সাথে নামায পড়া অব্যাহত না রাখার কারণ হল: ফরয করে দেয়ার আশংকা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর মাধ্যমে এ আশংকা দূর হয়ে গেছে। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর মাধ্যমে ওহী আসা বন্ধ হয়ে যায়। তাই ফরয হওয়ার আশংকা নাই। যেহেতু ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কারণটি দূরে হয়ে গেছে; কারণটি হল ফরয হওয়ার ভয়; সেহেতু জামাতের সাথে তারাবী আদায় করার সুন্নতটি বলবৎ হবে।"[শাইখ উছাইমীন রচিত 'আল-শারহুল মুমতি' (৪/৭৮)]

ইমাম ইবনে আব্দুল বার্‌র (রহঃ) বলেন:

"এ হাদিসে রয়েছে যে: রযমান মাসে কিয়ামুল লাইল পালন করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ, মুস্তাহাব ও কাম্য। উমর (রাঃ) নতুন কোন সুন্নত জারী করেননি; বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা ভালবেসেছেন ও পছন্দ করেছেন সেটাকে পূর্নজীবিত করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিরবচ্ছিন্নভাবে সেটা পালন করে যাননি তাঁর উম্মতের উপর ফরয করে দেয়ার আশংকা থেকে। তিনি ছিলেন মুমিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও দয়ালু। উমর (রাঃ) যেহেতু এ কারণটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জেনেছেন এবং তিনি জানেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর ফরয ইবাদত বাড়া বা কমার সুযোগ নাই: তাই তিনি এ সুন্নতটি বাস্তবায়ন করা শুরু করলেন, এটিকে পুর্নজীবিত করলেন এবং মানুষকেও নির্দেশ দিলেন। এটা ছিল হিজরি ১৪ সালে। এটি এমন একটি আমল যা আল্লাহ্‌ তার জন্য মজুত করে রেখেছিলেন এবং এর দ্বারা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন।"[আত-তামহীদ (৮/১০৮, ১০৯)]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর সাহাবায়ে কেরাম এ নামাযটি দলবদ্ধভাবে ও বিচ্ছিন্নভাবে আদায় করেছেন। এক পর্যায়ে উমর (রাঃ) তাদেরকে এক ইমামের পেছনে একত্রিত করেন।

আব্দুর রহমান বিন আব্দ আল-ক্বারী বলেন: "একবার রমযানের একরাত্রিতে আমি উমর (রাঃ) এর সঙ্গে মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলাম। এসে দেখলাম লোকেরা বিক্ষিপ্তভাবে নামায আদায় করছে। কেউ একাকী নামায পড়ছে। আবার কেউ একজন নামায পড়ছেন; আর তার পিছনে একদল লোক নামায পড়ছে। তখন উমর (রাঃ) বললেন: আমি মনে করি আমি যদি এদের সবাইকে একজন ক্বারীর পেছনে একত্রিত করি সেটা উত্তম। এরপর তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সবাইকে উবাই বিন কা’ব (রাঃ) এর পেছনে একত্রিত করলেন। এরপর অন্য এক রাতে আমি তাঁর সাথে বের হলাম। গিয়ে দেখলাম লোকেরা তাদের ক্বারীর পেছনে নামায পড়ছে। তখন উমর (রাঃ) বলেন: এটি কতই না ভাল বিদাত! তারা যে সময়টায় ঘুমিয়ে থাকে সে সময়টা এখন যে সময়ে নামায পড়ছে সে সময়ের চেয়ে উত্তম (তিনি শেষ রাতের কথা বুঝাতে চেয়েছেন)। লোকেরা প্রথম রাত্রিতে নামায পড়ত।"[সহিহ বুখারী (১৯০৬)]

উমর (রাঃ) এর এ উক্তি "এটি কতইনা ভাল বিদাত" দিয়ে যারা বিদাত জায়েয হওয়ার পক্ষে দলিল দেন তাদের প্রত্যুত্তরে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: "রমযান মাসে তারাবীর নামায পড়ার সুন্নত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তাঁর উম্মতের জন্য জারী করেছেন। তিনি তাদেরকে নিয়ে কয়েক রাত তারাবীর নামায আদায় করেছেন। তাঁর যামানায় লোকেরা দলবদ্ধভাবে ও বিচ্ছিন্নভাবে তারাবীর নামায আদায় করত। কিন্তু তারা এক জামাতে তারাবী আদায় করাটা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যায়নি; যাতে করে তাদের উপর ফরয করে দেয়া না হয়। অতপর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেলেন শরিয়ত (ইসলামী বিধি-বিধান) স্থিতিশীল হয়ে গেল। তখন উমর (রাঃ) তাদেরকে এক ইমামের পেছনে একত্রিত করলেন। তিনি ছিলেন উবাই বিন কাব (রাঃ)। উমর (রাঃ) এর নির্দেশে উবাই (রাঃ) মানুষকে তারাবী পড়ার জন্য একত্রিত করলেন। উমর (রাঃ) হচ্ছেন খোলাফায়ে রাশেদীনের একজন। যাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে: "তোমাদের উপর আবশ্যক আমার সুন্নত (আদর্শ) অনুসরণ করা এবং আমার পরবর্তীতে সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীন এর সুন্নত (আদর্শ) অনুসরণ করা। তোমরা মাড়ির দাঁত দিয়ে সুন্নতকে আঁকড়ে ধর।" যেহেতু মাড়ির দাঁত অধিক শক্তিশালী। উমর (রাঃ) যা করেছেন সেটা সুন্নত; বিদাত নয়। কিন্তু তিনি যে বলেছেন: "এটি কতইনা ভাল বিদাত" যেহেতু আভিধানিক অর্থে এটি বিদাত। যেহেতু তারা এমন কিছু করছেন যা তারা রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় করেনি। অর্থাৎ এ ধরণের ইবাদতের জন্য জমায়েত হওয়া। এটি ইসলামী শরিয়তের একটি সুন্নত।"[মাজমুউল ফাতাওয়া (২২/২৩৪, ২৩৫)]

আরও জানতে দেখুন: 21740 নং ও 45781 নং প্রশ্নোত্তর।

দুই:

রমযান মাসে নামাযে কিংবা নামাযের বাইরে কুরআন খতম করা প্রশংসনীয়। প্রতি রমযানে জিব্রাইল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোটা কুরআন অধ্যয়ন করতেন। যে বছর তিনি মারা যান সে বছর দুইবার অধ্যয়ন করেন।

ইতিপূর্বে 66504 নং প্রশ্নোত্তরে এ বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব