শরিয়তসম্মত ওসিয়তের নমুনা কেমন হবে?

প্রশ্ন 69827

ইন্টারনেটের বেশ কিছু ওয়েবসাইটে ওসিয়তের নমুনা পাওয়া যায়। সেগুলো কতটুকু বৈধ তা আমি জানতে চাই। ওসিয়তের কি সুনির্দিষ্ট রূপ বা ধরন আপনাদের কাছে রয়েছে?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

বুখারী (২৭৩৮) ও মুসলিম (১৬২৭) কর্তৃক বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কোন মুসলিম ব্যক্তির উচিত নয় যে, তার ওসিয়তযোগ্য কিছু (সম্পদ) রয়েছে, সে দুই রাত কাটাবে অথচ তার নিকট তার ওসিয়ত লিখিত থাকবে না।”

নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “এই হাদীসে ওসিয়তের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলিমরা উক্ত বিষয়ে আদিষ্ট। কিন্তু আমাদের এবং অধিকাংশের মাযহাব হলো ওসিয়ত করা মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। দাউদসহ কিছু যাহেরীর মত হলো ওসিয়ত করা উক্ত হাদীসের কারণে ওয়াজিব। এই হাদীসে তাদের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। হাদীসটিতে স্পষ্টত আবশ্যকতার কথা বলা হয়নি। কিন্তু যদি কোনো মানুষের ঋণ, অধিকার, আমানত বা অনুরূপ কিছু থাকে, তাহলে তার জন্য সে বিষয়ে ওসিয়ত করা আবশ্যক হয়ে যাবে। শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: হাদীসটির অর্থ: মুসলিমের বিচক্ষণতা ও নিরাপত্তার পরিচায়ক হলো তার কাছে নিজের ওসিয়ত লেখা থাকবে।

ওসিয়ত আগেভাগে করে ফেলা মুস্তাহাব। সুস্থ অবস্থায় ওসিয়ত লিখবে। ওসিয়তের ব্যাপারে সাক্ষীও রাখবে। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সেখানে লিখবে। নতুন কোনো বিষয়ে ওসিয়তের প্রয়োজন হলে সেটা সংযুক্ত করবে। তারা বলেন: প্রতিদিনের তুচ্ছ লেনদেন এবং বারংবার ঘটে যাওয়া ছোটখাট বিষয় লেখা দায়িত্ন নয়।” [সমাপ্ত]

ওসিয়ত দুই প্রকার:

ওয়াজিব ওসিয়ত: ব্যক্তির দায়ে ও ব্যক্তির প্রাপ্য যে সকল অধিকার রয়েছে সেগুলোর বিবরণ সম্বলিত ওসিয়ত। যেমন: ঋণ, কর্জ, তার কাছে সঞ্চিত আমানত কিংবা মানুষের জিম্মায় তার থাকা কিছু অধিকার। এখানে নিজ সম্পদের সুরক্ষা ও নিজের দায় মুক্তির জন্য ওসিয়ত করা ওয়াজিব।

মুস্তাহাব ওসিয়ত: এটা হলো নিছক দান। যেমন: ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বা এর কম পরিমাণ ওয়ারিশ নয় এমন আত্মীয়ের জন্য বা অন্য কারো জন্য ওসিয়ত করা। অথবা দরিদ্র-মিসকীন কিংবা কল্যাণকর খাতে দান করার মত নেক কাজে ওসিয়ত করা। দেখুন, [ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দাইমাহ (১৬/২৬৪)]।

মানুষ তার পরিবারকে জানাযার সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয়ে ওসিয়ত করতে পারে। যেমন: কে তাকে গোসল দিবে, কে তার জানাযা পড়াবে ইত্যাদি। তাদেরকে বিদাত পরিত্যাগের ওসিয়ত করতে পারে। এছাড়া বিলাপসহ অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে বিরত থাকার ওসিয়তও করতে পারে। বিশেষতঃ যদি সে জেনে থাকে যে তারা হয়তো এমন কিছু কাজে লিপ্ত হবে।

এর পক্ষে প্রমাণ হলো মুসলিমের হাদীস (১২১), আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু মুমূর্ষু অবস্থায় বলেন: “আমি মারা যাওয়ার পর কোনো বিলাপকারিণী এবং (ধূপের) আগুন যেন আমার সঙ্গী না হয়।”

তিরমিযী (৯৮৬) ও ইবনে মাজাহ (১৪৭৬) বর্ণনা করেন, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমি মারা গেলে তোমরা আমাকে নিয়ে কোনো ঘোষণা দিবে না। আমার আশঙ্কা হয় যে, এটা মৃত্যু সংবাদ প্রচার বলে ধরা হবেআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মৃত্যুসংবাদ প্রচারে নিষেধ করতে শুনেছি।”[শাইখ আলবানী সহীহুত তিরমিযীতে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন]।

আহমদ (১০১৪১) বর্ণনা করেন, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমার কবরে তাঁবু টানাবে না। (ধূপের) আগুন নিয়ে আমার পিছে পিছে আসবে না। আমাকে দ্রুত আমার রবের কাছে নিয়ে যাবে। কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: নেককার বান্দা বা ব্যক্তিকে খাটিয়ায় রাখার পর সে বলতে থাকে: “তোমরা আমাকে সামনে এগিয়ে দাও। তোমরা আমাকে সামনে এগিয়ে দাও।” আর বদকার হলে সে বলতে থাকে: “তোমাদের ধ্বংস হোক! তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?” [শুয়াইব আরনাউত্ব মুসনাদ আহমদের তাহকীকে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন]।

হাকেম মুস্তাদরাক বইয়ে (১৪০৯) বর্ণনা করেন, কাইস ইবনে আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় স্বজনদের ওসিয়ত করেন: “আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমাকে নিয়ে বিলাপ করবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে বিলাপ করা হয়নি।” হাকেম বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। তারা দু’জন (বুখারী ও মুসলিম) এটা বর্ণনা করেননি। যাহাবী তালখীস বইয়ে বলেন: হাদীসটি সহীহ।

এটা ছাড়া অন্যান্য হাদীস প্রমাণ করে যে, জানাযার সাথে জড়িত কিছু বিষয়সহ বিলাপ থেকে সতর্ক করা বা অনুরূপ কাজে ওসিয়ত করা বৈধ।

কিন্তু ওসিয়তের এমন কোনো নির্দিষ্ট নমুনা নেই, যেটা মানুষকে মেনে চলতে হবে। বরং মানুষ তার পরিবারের অবস্থা এবং তার দায়ে ও তার প্রাপ্য যে অধিকারগুলো রয়েছে সেগুলোর উপযুক্ত ওসিয়ত করবে, যেমনটা ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ হলো: এটা বিশ্বাস করা যাবে না যে, ওসিয়তের কিছু নির্দিষ্ট বাক্য রয়েছে যেগুলো একজন মানুষকে মেনে চলতে হবে।

ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে ‘হাযিহি ওয়াসিয়্যাতি আশ-শারইয়্যাহ’ পুস্তিকায় উল্লিখিত ওসিয়তের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। কমিটি এর উত্তরে বলেন:

“উল্লিখিত ওসিয়ত পাঠ করে শরীয়তের বিপরীত কিছু পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এভাবে ওসিয়তের নমুনা প্রণয়ন করে মানুষের মাঝে বিতরণ করলে ভুল ধারণা তৈরি হবে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উক্ত নমুনা অনুযায়ী ওসিয়ত করা, এটা ক্রয় করা এবং মৃত্যুর পর যে তার সকল কিছুর দায়িত্ব নিবে তাকে এটা দেওয়া মুস্তাহাব। অথচ এর প্রয়োজন নেই। কেননা এতে উল্লিখিত বিধি-বিধান ফিকহের বইসমূহে রয়েছে। যার প্রয়োজন সে পড়ে নিবে। এর জন্য পরামর্শ দেওয়া এবং বিতরণ করার প্রয়োজন নেই। বিশেষতঃ যেহেতু আল্লাহর অনুগ্রহে এই অঞ্চলে জানাযার হুকুমের ক্ষেত্রে মুসলিমদের আমল সুন্নাহর অনুগামী।” [সমাপ্ত] [ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ: (১৬/২৮৯)]।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

জানাযা ও কবর সংক্রান্ত বিধিবিধান

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android