নিঃসন্দেহে আপনার ফুফাতো বোন সে সমস্ত আত্মীয়দের অন্তর্ভুক্ত যাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা, সদাচরণ করা ও হৃদ্যতা প্রকাশ করা উচিত। কিন্তু যে সকল রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব ফুফাতো বোন কি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে; এ নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতভেদ আছে।
এর বিবরণ হলো: রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা দুই প্রকার:
মাহরাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়। নন-মাহরাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়। মাহরাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় বলতে বুঝানো হয় এমন দু'জন ব্যক্তিকে যাদের একজনকে পুরুষ ও অন্যজনকে নারী ধরা হলে তাদের মাঝে বিবাহ বন্ধন জায়েয নয়। যেমন: বাবাগণ, মাগণ, ভাইগণ, বোনগণ, দাদা-নানাগণ ও দাদী-নানীগণ যত উপরের স্তরের হোন না কেন। আর সন্তানগণ, সন্তানদের সন্তানগণ যত নীচের স্তরের হোক না কেন। এছাড়া চাচাগণ, ফুফুগণ, মামাগণ ও খালাগণ। আর চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো ও খালাতো ভাই মাহরাম শ্রেণীর রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় নয়; কারণ তাদের সাথে বিবাহ বন্ধন জায়েয।
অন্যদিকে নন-মাহরাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় হলেন উপর্যুক্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অবশিষ্ট আত্মীয়-স্বজন। যেমন: আপনার ফুফাতো ভাই, ফুফাতো বোন, খালাতো ভাই, খালাতো বোন ইত্যাদি।
কিছু ফকীহ মনে করেন, যে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব তারা হলেন কেবল মাহরাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়গণ। নন-মাহরাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। এটা হানাফীদের একটি মত, মালেকীদের অপ্রসিদ্ধ একটি মত এবং হাম্বলী আলেম আবুল খাত্তাবের মত। তাদের দলীল হলো যদি এটা ওয়াজিব হত তাহলে সকল আদম সন্তানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব হয়ে যেত। আর এটা অসম্ভব। তাই এটিকে এমন আত্মীয়দের গণ্ডিতে সীমিত করতে হবে যাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা, সদাচরণ করা ওয়াজিব হবে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম হবে। আর সেটা হলো মাহরাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়।
তারা দলীল দিয়েছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের মাধ্যমে: “কোনো মহিলাকে তার ফুফুর সাথে অথবা খালার সাথে (একত্রে) বিয়ে করা যাবে না।” [হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম (১৪০৮) বর্ণনা করেছেন। হাদীসের বক্তব্যটা সহিহ মুসলিম থেকে চয়নকৃত]। হাফেয ইবনে হাজার বলেন: ত্বাবরানী ইবনে আব্বাসের হাদীসে কিছু বাড়তি বর্ণনা করেছেন: “যদি তোমরা এমনটা করো, তাহলে তোমরা তোমাদের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে।” ইবনে হিব্বান এটাকে সহিহ বলেছেন। আবু দাউদ তার ‘মারাসিল’ বইয়ে ঈসা ইবনে তালহা থেকে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো নারীর সাথে তার আত্মীয়কে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন; এ আশঙ্কায় যে বিয়ের কারণে তাদের মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন হবে।[‘আদ-দিরায়াহ ফী-তাখরীজি আহাদিসিল হিদায়াহ’ (২/৫৬) থেকে সমাপ্ত]।
এই হাদীস দিয়ে দলীল প্রদানের দিকটা কিছু মালেকী আলেম স্পষ্ট করেছেন। আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। ক্বারাফী বলেন: “অষ্টম মাসআলা: রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের প্রতি আবশ্যকীয় করণীয়: শাইখ তারতূশী বলেন: কিছু আলেম বলেন: রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা তখনই ওয়াজিব হবে, যখন সেখানে মাহরামের সম্পর্ক থাকবে। মাহরাম হলেন এমন দুই ব্যক্তি যাদের মধ্যে একজন পুরুষ হলে ও অন্যজন নারী হলে এই দুইজনের মধ্যে বিবাহ বন্ধন করা যায় না। যেমন: বাবাগণ, মাগণ, ভাইগণ, বোনগণ, দাদা-নানাগণ, দাদী-নানীগণ যত উপরের স্তরের হোক না কেন। আর সন্তানগণ, সন্তানদের সন্তানগণ যত নীচের স্তরের হোক না কেন। এছাড়া চাচাগণ, ফুফুগণ, মামাগণ ও খালাগণ। পক্ষান্তরে এদের সন্তানদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব নয়। যেহেতু তাদের সাথে বিবাহ জায়েয। এই মত সঠিক হওয়ার পক্ষে প্রমাণ হলো: দুই বোনকে, নারীর সাথে তার ফুফুকে এবং নারীর সাথে তার খালাকে একত্রে বিয়ে করা হারাম হওয়া। যেহেতু এর মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকরণ রয়েছে। আর হারাম ত্যাগ করা ওয়াজিব। আবার উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহার করা ও তাদেরকে কষ্ট দেওয়া পরিত্যাগ করাও ওয়াজিব। কিন্তু দুই চাচাতো বোন ও দুই খালাতো বোনকে একত্রে বিয়ে করা জায়েয, যদিও তারা একে অন্যকে ঈর্ষা করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে। কারণ তাদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব নয়।” [‘আল-ফুরুক’ (১/১৪৭) থেকে সমাপ্ত]
উক্ত মাসআলায় দ্বিতীয় মত হলো: সকল রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব। এ ক্ষেত্রে মাহরাম ও নন-মাহরাম ভেদে কোনো কোনো পার্থক্য নেই। “এটি হানাফীদের একটি মত এবং মালেকীদের প্রসিদ্ধ মত। আহমদের বক্তব্যও এটা। শাফেয়ীদের সাধারণভাবে আত্মীয়তা রক্ষা করার বক্তব্য থেকেও এমনটা বোঝা যায়। তাদের মাঝে কেউ আত্মীয়তা রক্ষা করাকে মাহরাম শ্রেণীর আত্মীয়দের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়নি।” [আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়াইতিয়্যাহ (৩/৮৩)]।
আরো দেখা যেতে পারে: সাফফারীনীর “গিযাউল আলবাব” (১/৩৫৪) ও “বারীকা মাহমূদিয়্যা” (৪/১৫৩)।
উক্ত মাসআলায় আরো কিছু মত রয়েছে। সুবুলুস সালাম বইয়ে (২/৬২৮) এসেছে:
“জেনে রাখুন, যে আত্মীয়তা রক্ষা করা ওয়াজিব এদের সীমা নির্ধারণে আলেমরা মতভেদ করেছেন।
কারো কারো মতে: এমন আত্মীয় যার সাথে বিবাহ বন্ধন হারাম। সেটা এভাবে যে, দুইজনের একজন যদি পুরুষ হয় তাহলে অন্য জনের জন্য সে হারাম। সুতরাং চাচাতো ভাই ও মামাতো ভাই এমন আত্মীয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না। এই মতের প্রবক্তারা দলীল দিয়েছেন এভাবে যে, কোন নারীর সাথে তার ফুফু ও খালাকে একত্রে বিবাহ করা হারাম হওয়ার বিষয়টা দিয়ে। যেহেতু দু'জনকে একত্রে বিবাহ করলে সেটার পরিণতি হয় আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া।
কারো কারো মতে: এমন আত্মীয় যার সাথে তার সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়ার সম্পর্ক আছে। এর পক্ষে দলীল হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “এরপর তোমার সবচেয়ে কাছের, (তারপর) তোমার সবচেয়ে কাছের।”
কারো কারো মতে: যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে; চাই সে তার ওয়ারিশ হোক; না হোক।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বেশ কিছু স্তর রয়েছে; যেমনটি বলেছেন কাযী ইয়ায। একটি অন্যটির উপরে। সর্বনিম্ন স্তরে হচ্ছে: সম্পর্ক ছিন্ন না-করা। সেটা কথা বলা; এমনকি সালাম দেয়ার মাধ্যমে হলেও। আর সক্ষমতা ও প্রয়োজনের ভিন্নতা অনুযায়ী সম্পর্ক রক্ষা করা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। এর কিছু ওয়াজিব; আর কিছু মুস্তাহাব। কেউ যদি আংশিক সম্পর্ক রক্ষা করে, পুরোপুরি রক্ষা করতে না করে; তাহলে সে সম্পর্ক ছিন্নকারী বলে গণ্য হবে না। আর যদি যা করা উচিত তা করার তার সক্ষমতা থাকে তাহলে সে সম্পর্ক রক্ষাকারী বলে গণ্য হবে না।
কুরতুবী বলেন: “যে সম্পর্ক রক্ষা করতে হয় সেটা সাধারণ এবং বিশেষ দুই রকম।
সাধারণ সম্পর্ক হলো দ্বীনের ভিত্তিতে যে সম্পর্ক। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, কল্যাণ কামনা, ন্যায়, ইনসাফ এবং ওয়াজিব ও মুস্তাহাব অধিকারগুলো আদায়ের মাধ্যমে এ ধরনের সম্পর্ক রক্ষা করা আবশ্যক।
আর বিশেষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাড়তি হলো: নিকটাত্মীয়ের জন্য ব্যয় করা, তার খোঁজ-খবর নেওয়া এবং তার ভুলত্রুটি উপেক্ষা করা।” [সমাপ্ত]
এই বিষয়ে আলেমদের বক্তব্যের সার-সংক্ষেপ এতটুকু।
কিন্তু সম্মানিত ভাই, আপনার কাছে নিশ্চয় অজানা নয় যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে কী বিপুল পরিমাণ নেকীর কথা বর্ণিত হয়েছে। আর ছিন্ন করলে কী যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির কথা উদ্ধৃত হয়েছে। এর দাবী হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে সতর্ক থাকা এবং দ্বীনের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং মতভেদের উর্ধ্বে থাকা। তাই আপনি আপনার ফুফাতো ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করুন, সাধ্যমত তার কল্যাণ করুন। কারণ এর নেকী আল্লাহর কাছে বৃথা যাবে না।
আরও জানতে দেখুন: (12292), (75057) ও (4631) নং প্রশ্নের উত্তর।
আল্লাহ আমাদেরকে ও আপনাকে (তাঁর কাছে) পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক কাজ করার তৌফিক দান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।