মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন যে তিনি কিছু নবীকে কিছু নবীর উপর মর্যাদা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন: “আর যারা আসমানসমূহ ও যমীন আছে তাদের সম্পর্কে আপনার রব অধিক অবগত। আর অবশ্যই আমরা নবীদের কিছু সংখ্যককে কিছু সংখ্যকের উপর মর্যাদা দিয়েছি এবং দাউদকে দিয়েছি যাবূর।” (সূরা ইসরা: ৫৫)।
মুসলিম উম্মাহ একমত যে রাসূলরা নবীদের চেয়ে উত্তম। এরপর রাসূলদের মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য বিদ্যমান, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “সে রাসূলগণ, আমরা তাদের কাউকে অপর কারো উপর শ্ৰেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছেন যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন, আবার কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। আর মারইয়াম-পুত্র ঈসাকে আমরা স্পষ্ট প্রমাণাদি প্রদান করেছি ও রুহুল কুদুস দ্বারা তাকে শক্তিশালী করেছি। আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের পরবর্তীরা তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণাদি সমাগত হওয়ার পরও পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হত না; কিন্তু তারা মতভেদ করলো। ফলে তাদের কেউ কেউ ঈমান আনলো এবং কেউ কেউ কুফরী করল। আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তারা পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হত না; কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছে তা করেন।” (সূরা বাকারা: ২৫৩)
নবী-রাসূলদের মাঝে সর্বোত্তম পাঁচজন। যথা: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, নূহ, ইব্রাহীম, মুসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালাম।
এরা রাসূলদের মাঝে ‘উলুল আযম’ (দৃঢ় প্রতিজ্ঞ) লবকধারী। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “অতএব আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্ৰতিজ্ঞ রাসূলগণ।” (সূরা আহকাফ: ৩৫)
কুরআন কারীমের দুটি স্থানে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর স্মরণ করুন, যখন আমরা নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকেও, আর নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম পুত্ৰ ঈসার কাছ থেকেও৷ আর আমরা তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।” (সূরা আহযাব: ৭)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে, আর যা আমরা ওহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মুসা ও ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি কর না। আপনি মুশরিকদেরকে যার প্রতি ডাকছেন তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে তার দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয় তাকে তিনি দ্বীনের দিকে হেদায়াত করেন।” (সূরা শূরা: ১৩)
আল্লাহ যাদেরকে মর্যাদা প্রদান করেছেন, তাদেরকে এমন বিশেষ কিছু দিয়েছেন, যার কারণে তাদেরকে মর্যাদা দেওয়া আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।
কুরতুবী তার তাফসীরে (৩/২৪৯) বলেন: “তাদের কিছু সংখ্যককে অন্যদের উপর প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টা সেই কিছু সংখ্যককে প্রদত্ত কিছু মর্যাদা ও মাধ্যমের ভিত্তিতে।” [সমাপ্ত]
তিনি নূহকে যমীনবাসীর প্রতি প্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরণ করে সম্মানিত করেছেন। তাকে ‘কৃতজ্ঞ বান্দা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইব্রাহীমকে ‘খলীল’ (অন্তরঙ্গ বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করে মর্যাদা দিয়েছেন। “আর আল্লাহ ইবরাহীমকে খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু)-রূপে গ্রহণ করেছেন।” (সূরা নিসা: ১২৫) তাকে বানিয়েছেন মানুষদের ইমাম: “তিনি বললেন: নিশ্চয় আমি আপনাকে মানুষের ইমাম বানাবো।” (সূরা বাকারা: ১২৪)
মুসার সাথে সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করেছেন। “তিনি বললেন, হে মূসা! আমি আপনাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দিয়ে মানুষের উপর বেছে নিয়েছি; কাজেই আমি আপনাকে যা দিলাম তা গ্রহণ করুন এবং শোকর আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হোন।” (সূরা আ’রাফ: ১৪৪) আল্লাহ তাকে নিজের জন্য প্রস্তুত করেছেন: “আর আমি আপনাকে আমার নিজের জন্য প্রস্তুত করে নিয়েছি।” (সূরা ত্বহা: ৪১) তাকে নিজের দৃষ্টিসীমার মাঝে প্রস্তুত করেছেন: “আর যাতে আপনি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হন।” (সূরা ত্বহা: ৩৯)
ঈসাকে তিনি মর্যাদাবান করেছেন তাকে রাসূল বানিয়ে, তাঁকে মারইয়ামের প্রতি নিক্ষেপকৃত শব্দ বানিয়ে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ বানিয়ে। তিনি কোলে থাকা অবস্থায় মানুষের সাথে কথা বলতেন।
আরো এক দিক থেকে নবীরা একে অন্যের উপর মর্যাদা লাভ করে:
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ মাজমূউল ফাতাওয়া (৩৪/৩৫)-তে বলেন: “আদতে কিছু নবুয়তের মাঝে আছে রাজত্ব। সুতরাং নবীর তিন অবস্থা হতে পারে:
- যাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়। তার অনুসরণ করা হয় না ও তার আনুগত্য করা হয় না। তিনি হলেন এমন নবী যাকে রাজত্ব দেওয়া হয়নি।
- অথবা তার আনুগত্য করা হয়। তার এই আনুগত্য করাটাও একটা রাজত্ব। কিন্তু তিনি যদি শুধু এমন নির্দেশ প্রদান করেন যে নির্দেশ প্রদানের ব্যাপারে তিনি আদিষ্ট হয়েছেন, তাহলে তিনি দাস ও রাসূল, তাঁর কোনো রাজত্ব নেই।
- আর যদি তিনি যে কাজকে বৈধ বলতে চান সেটার নির্দেশ দিতে পারেন, তাহলে তিনি রাজার মর্যাদায়। যেমনটা সুলাইমানকে বলা হয়েছিল: “এটা আমাদের অনুগ্রহ, অতএব এ থেকে আপনি অন্যদেরকে দিতে বা নিজে রাখতে পারেন। এর জন্য আপনাকে হিসাব দিতে হবে না।” তিনি হলেন নবী ও রাজা।
সুতরাং ‘রাজা’ এখানে ‘দাস’ ও ‘রাসূল’ এই প্রকারের বিপরীত প্রকার। যেমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছিল: ‘আপনি বাছাই করুন, হয় বান্দা ও রাসূল, নতুবা রাজা ও নবী।’ আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা হলো: তিনি ছিলেন এমন বান্দা ও রাসূল যিনি সাহায্যপ্রাপ্ত, আনুগত্যপ্রাপ্ত ও অনুসরণীয়। তাকে আনুগত্যপ্রাপ্ত ও অনুসরণীয় হওয়ার সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল, যেন তিনি তার অনুসারীর সমান নেকী অর্জন করেন এবং যাতে সৃষ্টিকুল তাঁর দ্বারা উপকৃত হয়, তাঁর কারণে অনুগ্রহ লাভ করে এবং তিনিও যেন তাদের কারণে অনুগ্রহ লাভ করেন। তিনি ‘রাজা’ হওয়াকে বাছাই করেননি; যাতে তার আখিরাতের প্রাপ্যাংশ কমে না যায়। কেননা রাজা হলে নেতৃত্ব ও সম্পদ ভোগের সুযোগ পাওয়া যায়। আর আল্লাহর কাছে রাজা-নবীর চেয়ে বান্দা-রাসূলের মর্যাদা বেশি। আর এ কারণেই নূহ, ইব্রাহীম, মুসা ও ঈসা ইবনে মারইয়াম আল্লাহর কাছে দাউদ, সুলাইমান ও ইউসুফের চেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী।” [সমাপ্ত]
আমরা আল্লাহর কাছে নবীদের মর্যাদার স্তরের বিবরণ এভাবে দিতে পারি। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন হলেন ‘দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ’ রাসূলরা। আর ‘দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ’ নবীদের মাঝে সবচেয়ে সম্মানিত হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সর্দার হবো এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে। আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি।” [হাদীসটি ইমাম মুসলিম (৪২২৩) বর্ণনা করেছেন]।
এছাড়া নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে যে বিন্যাস ও মর্যাদা প্রদানের বিষয় আছে, তার কোনো দলীল কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহতে নেই। মুসলিমের জন্য কৃত্রিমভাবে সেটার অনুসন্ধান করার প্রয়োজনীয়তা নেই। সে কারণে আলেমদের কেউ আকীদা ও উসূলুস সুন্নাহর বইসমূহে সেগুলোর কোনোটি উল্লেখ করেননি।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।