দারিদ্র্যের নেতিবাচক প্রভাব ও ইসলামে তা বিমোচনের উপায়সমূহ

প্রশ্ন 95340

ইসলাম কীভাবে দারিদ্র্যকে মোকাবিলা করে?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

এক:

দারিদ্র্য এমন একটি বিপদ যাতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। সেটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি অথবা পরিবার অথবা সমাজের ক্ষেত্রে হতে পারে। আকীদা-বিশ্বাস ও আচার-আচরণের উপর দারিদ্র্যের বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। খ্রিষ্টধর্মের বহু প্রচারক বিভিন্ন জাতির দারিদ্র্যকে কাজে লাগিয়ে তাদের মাঝে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার করে যাচ্ছে। এছাড়া দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের অভাব পূরণ করতে গিয়ে বহু মন্দ স্বভাবও ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মাঝে চুরি, হত্যা, ব্যভিচার, হারাম বস্তু বিক্রির প্রবণতা বিস্তার লাভ করে। নিঃসন্দেহে ব্যক্তি ও সমাজের উপর এ সকল অপরাধের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের ব্যাপারে বলেছেন যে, তাদের কেউ কেউ হয় দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করত অথবা দারিদ্র্যে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় সন্তানদের হত্যা করত! আল্লাহ তাআলা প্রথম শ্রেণির ব্যাপারে বলেন:

وَلا تَقْتُلُوا أَوْلادَكُمْ مِنْ إِمْلاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ

“দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তোমাদেরকে ও তাদেরকে আমিই জীবিকা দান করি।”[সূরা আন’আম: ১৫১]

দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:

وَلا تَقْتُلُوا أَوْلادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْئاً كَبِيراً

“অভাবের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদের রুজির ব্যবস্থা করি এবং তোমাদেরও। তাদেরকে হত্যা করা নিশ্চয়ই একটি বড় পাপ।”[সূরা ইসরা: ৩১]

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ঐ নারীর ঘটনা বর্ণিত আছে যার অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল এবং যার সামনে পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে এসেছিল, এমন অবস্থায় সে তার চাচাতো ভাই ছাড়া কাউকে পায়নি। চাচাতো ভাই তাকে অর্থ দেয়ার বিনিময়ে তার সাথে ব্যভিচার করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পরে ঐ নারী তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে ভয় দেখালে আল্লাহ তাকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করে।

যাইহোক, দারিদ্র্যের ফলে যে অপরাধ ও অন্যায় ঘটে সেটি প্রসিদ্ধ বিষয়। তাই দারিদ্র্যে ভোগা জাতিগুলো দারিদ্রের সমাধান বের করার চেষ্টা করে থাকে। তবে একমাত্র ইসলামই এর (দারিদ্র্যের) সমাধান রয়েছে, যার বিধি-বিধানগুলো এসেছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য।

দুই:

দারিদ্র্যের সমস্যা সমাধান ও তা বিমোচনের জন্য আমাদের পবিত্র শরীয়তে যে সমস্ত উপায় বর্ণিত হয়েছে এর মধ্যে রয়েছে:

১. মানুষকে এই বিশুদ্ধ আকীদা শেখানো যে, রিযিক আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। তিনি রিযিকদাতা। আল্লাহ যা কিছু বিপদ-আপদ নির্ধারণ করেন সেগুলো কিছু প্রজ্ঞার জন্যই করে থাকেন। দরিদ্র মুসলিমের করণীয় হচ্ছে বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করা এবং নিজের ও পরিবারের দারিদ্র্য দূর করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ

“আল্লাহই তো জীবিকা দানকারী, ক্ষমতাশালী, মহাশক্তিমান।”[সূরা যারিয়াত: ৫৮]

তিনি আরো বলেন:

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ

“পৃথিবীতে চলমান সকল প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। তিনি তাদের অবস্থানস্থল ও সংরক্ষণস্থল জানেন। সবকিছুই এক স্পষ্ট গ্রন্থে (লিপিবদ্ধ) আছে।”[সূরা হূদ: ৬]

তিনি আরো বলেন:

أَمَّنْ هَذَا الَّذِي يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَهُ بَلْ لَجُّوا فِي عُتُوٍّ وَنُفُورٍ

“তিনি যদি তার রিযিক বন্ধ করে দেন, তাহলে কে আছে এমন যে তোমাদেরকে রিযিক দিতে পারে? (কেউ নেই,) বরং (নির্বোধের মত) তারা অবাধ্যতা ও অনীহার মধ্যে অটল রয়েছে।”[সূরা মুলক: ২১]

তিনি আরো বলেন:

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً

“অবশ্যই আমি আদম-সন্তানদেরকে (মানবজাতিকে) সম্মানিত করেছি, তাদেরকে স্থলে ও সাগরে চলাচলের বাহন দিয়েছি, উৎকৃষ্ট দ্রব্যাদি থেকে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের চেয়ে তাদেরকে আমি মর্যাদা দিয়েছি।”[সূরা ইসরা: ৭০]

এই বিশ্বাসগুলো থাকলে মানুষ দারিদ্র্যে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, রিযিক অন্বেষণে কেবল আল্লাহর কাছে ধর্ণা দেয়, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি তুষ্ট থাকে এবং রিযিক অন্বেষণে প্রচেষ্টা চালায়।

সুহাইব আর-রূমী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর! সকল অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। আনন্দকর কিছু পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে; ফলে এটি তার জন্য মঙ্গলকর হয়। আর অস্বচ্ছলতা বা বিপদে আক্রান্ত হলে সে সবর করে; ফলে এটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।”[হাদীসটি মুসলিম (২৯৯৯) বর্ণনা করেন]

অন্যদের দিকে দৃষ্টিপাত করার মাধ্যমে আমরা মুসলিমদের মাঝে এই আকীদার প্রভাব জানতে পারি। উদাহরণস্বরূপ জাপানে ২০০৩ সালে তেত্রিশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ: বেকারত্ব! বিবিসির ওয়েবসাইটে ১/৯/২০০৪ তারিখে প্রতিবেদনে এসেছে, তারা বলেন: ‘অফিসিয়াল হিসাব অনুসারে গত বছরে তেত্রিশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। জাপানি কর্তৃপক্ষ বলেন: আত্মহত্যার হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে জাপানে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, যা গত পঞ্চাশ বছরে সর্বোচ্চ। এটি বেকারত্বের হারকে এতটা বাড়িয়ে দিয়েছে যা অভূতপূর্ব। যার ফলে হতাশাগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে পৌঢ়ত্ব পৌঁছা পুরুষদের মাঝে এর হার বেশি।’[সমাপ্ত]

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِِنَّ رَبَّكَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ إِنَّهُ كَانَ بِعِبَادِهِ خَبِيراً بَصِيراً

“তোমার প্রভু যাকে চান তার জীবিকা বাড়িয়ে দেন, আবার সংকুচিত করেন। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর বান্দাদের সব খবর রাখেন এবং তাদের সবকিছু দেখেন।”[সূরা ইসরা: ৩০]

ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘আল্লাহর বাণী: “তোমার রব যাকে চান তার জীবিকা বাড়িয়ে দেন, আবার সংকুচিত করেন” অবগত করছে যে আল্লাহই রিযিকদাতা, সংকোচনকারী, সম্প্রসারণকারী এবং সৃষ্টির মধ্যে নিজের ইচ্ছামত কাজ করে থাকেন। তিনি যাকে ইচ্ছা বিত্তশালী করেন, যাকে ইচ্ছা দরিদ্র করেন। তিনি তাঁর প্রজ্ঞাবলে এটি করে থাকেন। তাই তিনি বলেছেন: “তিনি তার বান্দাদের সব খবর রাখেন এবং তাদের সব কিছু দেখেন।” অর্থাৎ কে বিত্তের উপযুক্ত, আর কে দারিদ্র্যের উপযুক্ত সে ব্যাপারে তিনি সব কিছু জানেন ও দেখেন। ... কিছু মানুষের জন্য বিত্তবান হওয়াটা তাকে পাকড়াও করার পূর্ব ধাপ হতে পারে। দারিদ্র্য কিছু মানুষের জন্য শাস্তি হতে পারে। তাই আল্লাহর কাছে এটা থেকে এবং ওটা থেকে পানাহ চাই।’[তাফসীরে ইবনে কাসীর (৫/৭১)]

২. আল্লাহর কাছে দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করতেন এবং যা উম্মাহকে শেখাতেন সেটি সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে। আর তা হলো: আল্লাহ তাআলার কাছে দারিদ্র্য থেকে পানাহ চাওয়া। যেহেতু ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের উপর দারিদ্রের প্রভাব রয়েছে।

মুসলিম ইবনু আবী বাকরা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমার বাবা প্রত্যেক নামাযের পরে পড়তেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ

“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কুফরী, দারিদ্র্য ও কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাই।” আমিও সেগুলো বলতাম। আমার পিতা বললেন: ‘বাবা! তুমি এটা কার কাছ থেকে শিখেছ?’ আমি বললাম: ‘আপনার কাছ থেকে।’ তিনি বললেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের পরে এ বাক্যগুলো বলতেন।’[হাদীসটি নাসাঈ (১৩৪৭) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহুন নাসাঈ গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْكَسَلِ وَالْهَرَمِ وَالْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ النَّارِ وَعَذَابِ النَّارِ وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْغِنَى وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْفَقْرِ

“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি— দারিদ্র্য, বার্ধক্য, পাপ ও ঋণ থেকে, কবরের ফিতনা ও কবরের আযাব থেকে, জাহান্নামের ফিতনা ও জাহান্নামের আযাব থেকে এবং বিত্তের ফিতনার অনিষ্ট থেকে। আপনার কাছে আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি— দারিদ্র্যের ফিতনার অনিষ্ট থেকে।”[হাদীসটি বুখারী (৬০০৭) ও মুসলিম (৫৮৯) বর্ণনা করেন]

৩. কাজ করা, উপার্জন করা ও রিযিক অন্বেষণের লক্ষ্যে পৃথিবীতে বিচরণ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولاً فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

“তিনি পৃথিবীকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে চলাচল করো এবং আল্লাহর দেওয়া জীবিকা থেকে আহার করো। তাঁর কাছেই (প্রত্যাবর্তনের জন্য তোমাদের) পুনরুত্থান (হবে)।”[সূরা মুলক: ১৫]

তিনি আরো বলেন:

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيراً لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

“অতঃপর যখন নামায সমাপ্ত হবে তখন যমীনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) সন্ধান করবে ও বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করবে, যাতে করে তোমরা সফলকাম হও।”[সূরা জুম’আ: ১০]

মিকদাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিজের হাতের কাজ থেকে উত্তম কিছু কেউ উপার্জন করেনি। আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।”[হাদীসটি বুখারী (১৯৬৬) বর্ণনা করেন]

যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে আনা এবং সেটা বিক্রি করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তার সম্মানকে রক্ষা করা মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম; চাই মানুষ তাকে ভিক্ষা দিক কিংবা না দিক।”[হাদীসটি বুখারী (১৪০২) বর্ণনা করেন]

৪. ধনীদের সম্পদে যাকাত আবশ্যক করা।

আল্লাহ তাআলা যাকাতের সম্পদে দরিদ্রদের অংশ রেখেছেন। দরিদ্রকে যাকাতের মালিক করে দিতে হবে। দরিদ্রকে এতটুকু দিতে হবে যাতে করে সে অমুখাপেক্ষী হয়ে যায় এবং তার দারিদ্র্য দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

“যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাতের কাজে নিয়োজিত কর্মী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের জন্য এবং ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে যারা আছে তারা ও মুসাফিরদের খাতে। এটি আল্লাহ কর্তৃক ফরযকৃত। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"[সূরা তাওবাহ: ৬০]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:

وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ . لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ

“যাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক (ন্যায্য অধিকার) রয়েছে যাচ্ঞাকারী ও বঞ্চিত ব্যক্তির জন্য।”[সূরা মা’আরিজ: ২৪, ২৫]

৫. দান-সদকা, ওয়াকফ করা ও এতিম-বিধবাদের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنْفِقُوا خَيْرًا لِأَنْفُسِكُمْ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

“অতএব, যতটা পারো আল্লাহকে ভয় করো। (তাঁর কথা) শোনো। (তাঁর) আনুগত্য করো এবং (তাঁর পথে) ব্যয় করো। এতে তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ রয়েছে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত তারাই সফলকাম।”[সূরা তাগাবুন: ১৬]

তিনি আরো বলেন:

وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ

“তোমরা (আল্লাহর রাস্তায়) যা কিছু ব্যয় করো তিনি এর প্রতিস্থাপন করে দিবেন। তিনি শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।”[সূরা সাবা: ৩৯]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:

وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا

“তোমরা নিজেদের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রিম পাঠাবে সেটা আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় পাবে যে, তা আরো ভালো ও পুরস্কার হিসেবে আরো বড়।”[সূরা মুয্‌যাম্মিল: ২০]

আদী ইবনে হাতিম বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকার সামর্থ্য রাখে সে যেন একটা খেজুরের টুকরা দিয়ে হলেও তাই করে।”[হাদীসটি বুখারী (১৩৪৭) ও মুসলিম (১০১৬) বর্ণনা করেন, হাদীসটির শব্দ মুসলিমের]

সাহ্‌ল ইবনে সা’দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি ও এতীম পালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলের মধ্যে সামান্য ফাঁকা রেখে ইশারা করে দেখালেন।”[হাদীসটি বুখারী (৪৯৯৮) ও মুসলিম (২৯৮৩) বর্ণনা করেন। মুসলিম হাদীসটি আবু হুরাইরা থেকে কাছাকাছি শব্দে বর্ণনা করেন]

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “বিধবা ও মিসকীনের জন্য (খাদ্য যোগাতে) সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের মত অথবা রাত জেগে ইবাদতকারী ও দিনভর সিয়াম পালনকারীর মত।”[হাদীসটি বুখারী (৫০৩৮) ও মুসলিম (২৯৮২) বর্ণনা করেন]

৬. সুদ ও জুয়া এবং ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতারণা হারাম করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لا تَظْلِمُونَ وَلا تُظْلَمُونَ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং (তোমাদের কাছে) যে সুদ বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা (প্রকৃত) ঈমানদার হয়ে থাকো। যদি তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে একটি যুদ্ধের ঘোষণা শুনে রাখো। আর যদি তোমরা তাওবা করো তাহলে তোমাদের মূলধন তোমাদের থাকবে। (এ ব্যাপারে) তোমরাও যুলুম করবে না এবং তোমাদের উপরও যুলুম করা হবে না।”[সূরা বাকারা: ২৭৮, ২৭৯]

তিনি আরো বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের এক একটি ঘৃণ্য কাজ। অতএব, এসব থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”[সূরা মায়েদা: ৯০]

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি খাদ্য স্তুপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি খাদ্যস্তুপের ভেতরে নিজের হাত প্রবেশ করিয়ে দেন। ফলে তাঁর আঙুলে কিছু ভেজা অনুভূত হল। তিনি বললেন: “হে খাদ্যের মালিক! এটা কী?” লোকটি বলল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! এতে বৃষ্টির পানি পড়েছে।’ তিনি বললেন: ‘কেন তুমি ঐ ভেজা অংশটি উপরে রাখলে না; তাহলে লোকেরা তা দেখতে পেত। যে ধোঁকাবাজী করে সে আমার দলভূক্ত নয়।”[হাদীসটি মুসলিম (১০২) বর্ণনা করেন]

সুদ, জুয়া ও প্রতারণামূলক ক্রয়বিক্রয় এগুলো মানুষদের মাঝে বিস্তার লাভের ফল হলো অন্যায়ভাবে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া। কখনো কখনো মানুষ এগুলোর কারণে নিজেদের সমস্ত সম্পদ হারিয়ে ফেলে। তাই সুস্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে এগুলোকে হারাম করা হয়েছে।

৭. দুস্থ ব্যক্তিকে সাহায্য করা ও দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো

নু’মান ইবনে বশীর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: মুমিনদের পারস্পারিক সম্প্রীতি, দয়া ও মায়া-মমতার উদাহরণ (একটি) দেহের মত। যখন দেহের কোন অঙ্গ পীড়িত হয় তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’[হাদীসটি বুখারী (৫৬৬৫) ও মুসলিম (২৫৮৬) বর্ণনা করেন]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সেই ব্যক্তি মুসলিম নয় যে পেট ভর্তি করে খায় অথচ তার প্রতিবেশি উপোস থাকে।”[হাদীসটি বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান গ্রন্থে (৯২৫১) হাদীসটি বর্ণনা করেন। হাদীসটি শাইখ আলবানী হাসান বলে গণ্য করেন]

মুয়াত্তা মালেক (১৭৪২) গ্রন্থে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর সাথে গোশতের একটি পূর্ণ থলে দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘এটি কী?’ জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ‘আমীরুল মুমিনীন! আমার গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হল। তাই এক দিরহাম দিয়ে গোশত ক্রয় করলাম।’ তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ‘তোমাদের কেউই কি এটা চায় না যে, নিজে না খেয়ে প্রতিবেশীকে খাওয়াবে কিংবা তার চাচাতো ভাইকে দিবে?! তোমাদের কাছ থেকে এই আয়াতটি কোথায় গেল: (যেখানে বলা হয়েছে যে) أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمْ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا    “তোমরা তোমাদের ভালো কর্মগুলো দুনিয়ার জীবনে শেষ করে ফেলেছ এবং ভালো কর্মগুলোর বিনিময় উপভোগ করেছ।”

পর সমাচার:

এটি দারিদ্র্যের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে এক ঝলক। এতে দারিদ্র্যের বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মুসলিম ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে দারিদ্র্য, ধনাঢ্যতা, দেয়া ও বঞ্চিত করা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত। তাই কষ্ট-বিপদ নেমে আসলে সে ধৈর্যধারণ করে। আর সুখ পেলে সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত হলো সে নিজের ও পরিবারের দারিদ্র্য দূর করার জন্য কাজ ও উপার্জন করবে। কেউ যদি নিজের শরীরিক অবস্থা অথবা দেশের অবস্থার কারণে উপার্জন করতে অক্ষম হয় তাহলে ইসলাম দরিদ্রকে যাকাত দেয়া ও দান করার মাধ্যমে তার দারিদ্র্য দূর করে। ধনীদের সম্পদে এটি দরিদ্রের প্রাপ্য অধিকার।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

লেনদেন

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android