ইসলামী জীবনই সর্বোত্তম জীবন ও এতে অবিচল থাকার উপায়সমূহ

প্রশ্ন 12804

ইসলামী জীবনযাপন একজন মানুষের জন্য যাপন করার মতো সর্বোত্তম জীবন। কিন্তু কখনো কখনো এটি কঠিন হয়ে যায়। এমনকি আমি ইসলামী জীবনযাপন চালিয়ে নেওয়ার আশা পাই না।

উত্তরের সার-সংক্ষেপ

ইসলামী জীবনযাপন একজন মানুষের জন্য যাপন করার মতো সর্বোত্তম জীবন। কিন্তু এই জীবনযাপনে ধৈর্য, তিতিক্ষা ও দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা প্রয়োজন হয়, যা খুব সহজ নয়। বরং ইসলামী জীবনযাপনকারী ব্যক্তি যেন জ্বলন্ত অঙ্গারকে আঁকড়ে ধরে থাকে। এই কাজে আল্লাহর তৌফিকের পরে একমাত্র যে বিষয়টি সাহায্য করে সেটি হচ্ছে এই পথের উপর ধৈর্যধারণ করা; যাতে করে বান্দা রবের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে যে কোনো অবহেলা করেনি, আবার (দ্বীনের) বিকৃতি সাধন করেনি। আপনার অন্তরে হতাশা জায়গা করে নেওয়া থেকে সাবধান থাকুন। এই উম্মতের বিজয় ও আধিপত্যের ব্যাপারে আল্লাহর দেওয়া ওয়াদার উপর নিশ্চিত ভরসা রাখুন।

উত্তর

ইসলামী জীবন সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য

প্রিয় প্রশ্নকর্তা ভাই, আল্লাহ মুবারকময় করুন। আপনি যখন বলেছেন যে ইসলামী জীবন একজন মানুষের যাপন করার মতো সর্বোত্তম জীবন, তখন আপনি যথার্থই বলেছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য, যা খুব কম মানুষই বুঝতে পারে। আর এই বিষয়টিতে আশ্বস্ত হওয়া তো দূরের ব্যাপার। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের একাধিক স্থানে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

“যে পুরুষ বা নারী ঈমানদার অবস্থায় সৎকাজ করবে, তাকে আমি উত্তম জীবন দান করব এবং অবশ্যই তাদেরকে তাদের শ্রেষ্ঠ কাজের পুরস্কার দিব।”[সূরা নাহল: ৯৭]

এছাড়া আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে কেউ যদি আল্লাহর উপর ঈমান আনা ও তাঁকে স্মরণিকা থেকে বিমুখ হয় তাহলে সে নিজেকে দুর্ভাগ্য ও কষ্টে পরিপূর্ণ জীবনের সম্মুখীন করল। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى * قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا* قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَى* وَكَذَلِكَ نَجْزِي مَنْ أَسْرَفَ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِآيَاتِ رَبِّهِ وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَشَدُّ وَأَبْقَى

“আর যে আমার স্মরণিকা থেকে বিমুখ হবে তার জন্য রয়েছে কষ্টের জীবন এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উঠাব। সে বলবে: ‘ওগো প্রভু! আমাকে আপনি অন্ধ অবস্থায় উঠালেন কেন? আমি তো (আগে) চোখে দেখতাম। তিনি বলবেন: এভাবেই তোমার কাছে আমার নিদর্শনসমূহ এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে (তার প্রতি গুরুত্ব দাওনি)। আজ তাই সেভাবেই তোমাকেও ভুলে যাওয়া হবে। এভাবেই আমি সেই ব্যক্তির প্রতিফল দিয়ে থাকি, যে বাড়াবাড়ি করে এবং তার প্রভুর নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করে। আর পরকালের শাস্তি তো অবশ্যই কঠিনতর ও অধিকতর স্থায়ী (হবে)।”[সূরা ত্বাহা: ১২৪-১২৭]

উত্তম জীবনের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও তিতিক্ষা

সম্মানিত ভাই, আপনি যেহেতু বিষয়টি জেনেছেন, আপনার অন্তরে সেটি স্থির হয়েছে এবং আপনার মন তাতে প্রশান্ত হয়েছে। হে দুর্বল অসহায় সৃষ্টি! তারপর আপনি এও জেনেছেন যে, আল্লাহ তাআলা এই জগতের যমীন-আসমান, সমুদ্র, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, সমতল ভূমি, উপত্যকা, মরুভূমি এ সবই আল্লাহ আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন; যেমনটা আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا

“তিনি সেই মহান সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।”[সূরা বাকারা: ২৯]

তারপর এটাও জেনেছেন যে এই পৃথিবীতে আপনার অস্তিত্বের পেছনে নিহিত মহান প্রজ্ঞা হচ্ছে আপনার রব, সৃষ্টিকর্তা ও অস্তিত্বদাতার ইবাদত করা, যিনি সকল কিছু উত্তমরূপে সৃষ্টি করেছেন:

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

“জ্বিন ও মানুষকে আমি আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।”[সূরা যারিয়াত: ৫৬]

আপনি এও জেনেছেন যে, তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যেন বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন এবং যাচাই করে দেখেন যে তারা এই ইবাদত আদায়ে এবং এক্ষেত্রে আল্লাহর হক পূরণ করছে কিনা:

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ

“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন; এ জন্য যে তোমাদেরকে পরখ করে দেখবেন, কে তোমাদের মধ্যে কাজে সেরা। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।”[সূরা মুলক: ২]

তারপর আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করে তাদের মধ্যকার সৎকর্মশীলদেরকে এই পৃথিবীতে ওয়াদা দিয়েছেন যে তাদের জন্য পরকালে রয়েছে আসমান-যমীন বিস্তৃত জান্নাত। সেই জান্নাতে থাকবে এমন কিছু যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি ও কোনো মানসপটে কল্পনাও জাগেনি। অন্যদিকে মন্দ কাজে লিপ্ত, আল্লাহর হকের ব্যাপারে অবহেলাকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ এমন আগুনের ভয় দেখিয়েছেন যা তাকে ঝলসে দিবে। সে এখানে মারাও যাবে না, আবার জীবিত থাকবে না। সেখানে এমন-সব দণ্ড ও শাস্তি রেখেছেন যা শুনলে শিশুও ভয়ে বুড়ো হয়ে যায়, দেখা তো আরও গুরুতর। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য ও আপনার জন্য নিরাপত্তার দোয়া করছি। ...আমীন।

আপনি যখন দৃঢ়-বিশ্বাসের সাথে এটি জানলেন তখন এও জেনে রাখুন যে, এই মহান নিয়ামত লাভ ও কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সফলতা কষ্ট-ক্লেশের একটি সেতু অতিক্রম করা ছাড়া অর্জিত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, তিতিক্ষা ও প্রয়াস। কিন্তু এই কষ্ট খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। এর পরে আসবে এক চিরন্তন সুখ ও স্থায়ী আনন্দ। ক্ষণিকের কষ্ট ও ব্যথাকে যদি চিরন্তন সুখ ও স্থায়ী আনন্দের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে তা কি কোনোভাবে সমান হবে বলে আশা করা যায়? .. আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে ও আপনাকে তার অনুগ্রহ ও জান্নাত প্রদান করেন। .. আমীন।

ইসলামের সূচনা মুষ্টিমেয় লোকজনের মাধ্যমে, সূচনালগ্নের মতোই অতি সত্ত্বর তা (মুষ্টিমেয় লোকজনের মাঝে) ফিরে যাবে

সম্মানিত ভাই, আল্লাহ আপনাকে তাঁর হেদায়াত লাভের তৌফিক দান করুন। জেনে রাখুন, বর্তমান সময়ের মতো দ্বীন যত অপরিচিত হয়ে পড়বে, হক আঁকড়ে ধরা লোকজন যত কমে যাবে, দ্বীনের উপর অবিচল থাকা ও অধিকাংশ মানুষের বিপরীতে যাওয়া মানবাত্মার জন্য ততই কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আল্লাহর প্রজ্ঞা ও বদান্যতার দাবি হচ্ছে ঈমানদার, সত্যবাদী ও সত্যের উপর অবিচল ব্যক্তিদের নেকী বৃদ্ধি করা; যারা তাঁর সন্তুষ্টিকে অন্য সব কিছুর উপর প্রাধান্য দিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে দামী ও মূল্যবান সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে। সহিহ মুসলিমে (১৪৫) আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুষ্টিমেয় লোকদের মাধ্যমে ইসলামের সূচনা হয়েছে। সত্বর তা মুষ্টিমেয় লোকদের মধ্যেই ফিরে যাবে, যেমনটি সূচনাতে ছিল। অতএব, সে সকল মুষ্টিমেয় লোকদের জন্য সুসংবাদ।”

সুনানুত তিরমিযী (৩০৫৮)-তে আবু সা’লাবা আল-খুশানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের সামনে এমন কিছু দিন আসবে যে দিনগুলোতে ধৈর্যধারণ করা জ্বলন্ত অঙ্গার আঁকড়ে ধরার মত। ঐ সময়ে আমলকারীর জন্য রয়েছে এমন পঞ্চাশজন আমলকারীর সমান নেকী যারা তোমাদের মত আমল করে।” এক বর্ণনায় আছে: জিজ্ঞাসা করা হলো: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যকার পঞ্চাশ জনের আমল? নাকি তাদের মধ্যকার পঞ্চাশ জনের আমল?’ তিনি বললেন: “না; বরং তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশ জনের আমল।”[হাদীসটি শাইখ আলবানী সহীহুত তারগীব ওয়াত-তারহীব (৩১৭২) গ্রন্থে সহীহ বলে গণ্য করেছেন]

এই সকল গুরুত্বপূর্ণ হাদীসসহ অন্যান্য হাদীস প্রমাণ করে যে শেষ যমানায় খারাপ ও নিকৃষ্ট মানুষ বেড়ে যাবে এবং উত্তম, তাকওয়াবান ও নেককার মানুষ কমে যাবে। এর কারণ ফিতনার আধিক্য, পাপ ও প্রলোভনের বিস্তৃতি। ফলে দ্বীন আঁকড়ে ধরা মানুষ জনতার মাঝে অপরিচিত হয়ে পড়বে। এমনকি হয়তো নিজ পরিবার-পরিজনের মাঝেও সে একাকী হয়ে যাবে।

এছাড়াও এই হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে দ্বীন আঁকড়ে ধরা সহজ বিষয় নয়। বরং দ্বীন আঁকড়ে ধরা ব্যক্তির অবস্থা জ্বলন্ত অঙ্গার আঁকড়ে ধরা ব্যক্তির মত। এই পথে টিকে থাকতে আল্লাহর তৌফিকের পর সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সাহায্য করে সেটি হচ্ছে ধৈর্য। (এই পথের উপর অবিচল থেকে) বান্দা কোনো প্রকার অবহেলা না করলে ও বদলে না গেলে সে তার রবের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে রব তার উপর সন্তুষ্ট; ক্রুদ্ধ নয়। ফলে আল্লাহ তার নেকী বহুগুণ বাড়িয়ে দিবেন। যে ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে এ বিষয়টি অবগত হয়েছে তার জন্য আল্লাহর পথে যা কিছু সহ্য করতে হয় তা হালকা হয়ে যায়। কারণ সে জানে যে আল্লাহর নিকট তার জন্য যা অপেক্ষা করছে তা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, করুণা ও অনুগ্রহের ফলে অনেক উত্তম।

আমরা এ কথাগুলো এ জন্য বললাম যদি আপনি নিজের জন্য বিষয়টিকে কঠিন মনে করেন, আপনার যদি আশঙ্কা হয় যে আপনার ধৈর্য কমে আসবে এবং দৃঢ়তার পথ থেকে পদস্খলন ঘটবে।

আপনার অন্তরে হতাশা জায়গা করে নেওয়া থেকে সাবধান হোন

কিন্তু আপনি যদি এমন কিছু অনুভব করেন যে, আপনি যে ইসলামি জীবন যাপন করছেন, তা আপনার চারপাশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার এবং তাদেরকে সেই জীবনে ফিরিয়ে আনার যে দায়িত্ব আপনার ওপর আছে, সেটা আপনি পূরণ করতে পারার আশা নেই। যেহেতু আপনি প্রচণ্ড বাধা, বিরোধিতা ও আপনার নির্মিত কাঠামো ভেঙে দেওয়ার নানা উপাদানের সম্মুখীন হচ্ছেন। তাহলে জেনে রাখুন, আপনি এ পথে যে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলেন প্রত্যেকটি পদক্ষেপই একটি করে বিজয়, একটি করে সাদাকা। একটি ভালো কথাও সাদাকা। আপনি জানেন না, কখন আপনার বলা কোনো কথা শ্রোতাদের কারও মনে প্রভাব ফেলবে; এমনকি সেটা কিছুকাল পরে হলেও। কোনদিন এই উপকার থেকে আপনি নিরাশ হওয়া উচিত হবে না। তাই সেই উপকারের আশা আপনার মন থেকে দূর হয়ে যাওয়া উচিত নয়:

وَإِذْ قَالَتْ أُمَّةٌ مِنْهُمْ لِمَ تَعِظُونَ قَوْمًا اللَّهُ مُهْلِكُهُمْ أَوْ مُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا قَالُوا مَعْذِرَةً إِلَى رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ

“যখন তাদের একটি দল বলেছিল: ‘কেন তোমরা এমন লোকদের উপদেশ দিচ্ছ যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিবেন কিংবা কঠিন শাস্তি দিবেন?’ তখন তারা বলেছিল: ‘তোমাদের প্রভুর কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য, আর যাতে তারা নিবৃত্ত হয়’।”[সূরা আ’রাফ: ১৬৪]

আপনার অন্তরে হতাশা অতি সন্তর্পণে জায়গা করে নেওয়া থেকে সাবধান হোন। কারণ:

لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ

“বস্তুত কাফেররা ছাড়া আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না।”[সূরা ইউসুফ: ৮৭]

আর আপনি পুরা আশা ছেড়ে দেওয়া থেকেও সতর্ক থাকুন, কেননা তা ভ্রষ্টতা:

وَمَنْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ

“বিপথগামীরা ছাড়া কেউ তার রবের অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয় না।”[সূরা হিজর: ৫৬]

জেনে রাখুন, আপনার পদক্ষেপসমূহ বৃথা যাবে না। আপনি যতক্ষণ রাস্তায় আছেন, যে জায়গায় এসে আপনার জীবন ফুরিয়ে যাবে সেটিই আপনার গন্তব্য। আল্লাহ বলেন:

وَمَنْ يَخْرُجْ مِنْ بَيْتِهِ مُهَاجِرًا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ يُدْرِكْهُ الْمَوْتُ فَقَدْ وَقَعَ أَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করে নিজের ঘর থেকে বের হয়, তারপর (হিজরতে থাকা অবস্থায়) মারা যায়, তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, দয়াময়।”[সূরা নিসা: ১০০]

তারপর আপনার পরবর্তী ব্যক্তিদের ভূমিকা আসবে। তারা আপনার হয়ে পতাকা বহন করে বাকি রাস্তা পূর্ণ করবে। এই উম্মতে কত অবশিষ্ট ব্যক্তি যে আছে! “আল্লাহ্‌ সর্বদা এই দ্বীনের মধ্যে একটি গাছ রোপণ করতে থাকবেন (এমন লোক সৃষ্টি করতে থাকবেন) যাদের তিনি তাঁর আনুগত্যে নিয়োজিত রাখবেন।”[হাদীসটি ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন; শাইখ আলবানী ‘সুনান ইবনে মাজাহ’ (১/৫) গ্রন্থে এটিকে হাসান বলে গণ্য করেন]

আল্লাহর দেওয়া বিজয় ও ক্ষমতায়নের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন

আল্লাহ এই উম্মতকে যে বিজয় ও ক্ষমতায়নের ওয়াদা করেছেন সে ব্যাপারে ভরসা রাখুন।

وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ

“আমি উপদেশের পর (যাবূর) কিতাবে লিখে দিয়েছি যে, নিশ্চয় আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে।”[সূরা আম্বিয়া: ১০৫]

“অবশ্যই রাত-দিন যেখানে যেখানে পৌঁছে এ দ্বীন সেখানে সেখানে পৌঁছ যাবে। আল্লাহ কোন (শহরের) ঘর ও (বেদুঈন) শিবিরে এ দ্বীন প্রবিষ্ট না করে ছাড়বেন না; সম্মানিত ব্যক্তির সম্মানের সাথে হোক কিংবা অসম্মানিত ব্যক্তির অসম্মানের সাথে হোক। এমন সম্মান, যার দ্বারা আল্লাহ ইসলামকে সম্মানিত করবেন এবং এমন অসম্মান, যার দ্বারা আল্লাহ কুফরীকে লাঞ্ছিত করবেন।”[হাদীসটি আহমদ বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী ‘সিলসিলাতুস সহিহা (৩২) গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন] (আপনি চাইলে لا تيأس فالنصر قادم শীর্ষক আলোচনাটি শুনতে পারেন)

প্রিয় ভাই,

আমি আপনাকে উপদেশ দিব যে আপনি দ্বীনকে আঁকড়ে ধরুন। বহু ফিতনা, প্রলোভন ও নানান বাধা-প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও এর থেকে কোনোভাবে সরে যাবেন না। জেনে রাখুন, শুভ পরিণতি মুত্তাকীদের জন্য।

যে সমস্ত মাধ্যম আপনাকে আল্লাহর দ্বীনে অবিচল থাকতে সাহায্য করে, সেগুলো (সংরক্ষণের) ব্যাপারে সচেতন থাকুন। এই ওয়েবসাইটে দ্বীনের উপর অবিচল থাকার উপায় ও মাধ্যমসমূহ সম্পর্কে একটি পুস্তিকা পাবেন। আপনাকে সেটি পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।

দ্বীনকে আঁকড়ে ধরার উৎসাহ দেয় এমন কিছু আয়াত

সম্মানিত ভাই,

আলোচনার শেষভাগে আমি আপনার সামনে আল্লাহর কিতাবের এই মহান আয়াতগুলো পেশ করতে চাই্, যে আয়াতগুলো আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ করেছেন; যাতে সেগুলো মুমিনদের হৃদয়ের জন্য নিরাময়ক হয়, রোগগুলোর চিকিৎসা হয়। আপনি মনোযোগ ও পর্যবেক্ষণের সাথে আয়াতগুলো পড়ুন। যদি এই আয়াতগুলোর কোনো সংক্ষিপ্ত তাফসীর পড়তে পারেন তাহলে সেটি অনেক ভালো। যেমন: শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা’দীর রচিত তাফসির কিংবা তাফসিরে ইবনে কাছীর।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ

“তোমরা কি মনে করো যে, জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের পূর্বে যারা চলে গিয়েছে তাদের মত অবস্থা তোমাদের এখনো আসেনি। তারা অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্টের কবলে পড়েছিল এবং (ভয়ে) এমনভাবে কম্পিত হয়েছিল যে রাসূল ও তাঁর সঙ্গী ঈমানদাররা বলেছিল: “কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে?” জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।”[সূরা বাকারা: ২১৪]

তিনি আরো বলেন:

الم * أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ * وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ

“আলিফ লাম মীম। মানুষ কি মনে করে যে, “আমরা ঈমান এনেছি” বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকেও আমি পরীক্ষা করেছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই সত্যবাদী থেকে মিথ্যাবাদীদেরকে (সুস্পষ্টভাবে) জেনে নেবেন।”[সূরা আনকাবূত: ১-৩]

তিনি বলেন:

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُدْخِلَنَّهُمْ فِي الصَّالِحِينَ * وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ وَلَئِنْ جَاءَ نَصْرٌ مِنْ رَبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ أَوَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ

“আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে আমি অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করব। কিছু মানুষ আছে যারা বলে: ‘আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি’ কিন্তু তারা যখন আল্লাহর পথে নিপীড়িত হয় তখন তারা মানুষের নিপীড়নকে আল্লাহর আযাবের মত গণ্য করে। আর যখন তোমার রবের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য বা বিজয় আসে তখন তারা বলে: ‘আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম।’ আল্লাহ কি বিশ্ববাসীর অন্তরের কথা সম্যক অবগত নন?”[সূরা আনকাবূত: ৯-১০]

তিনি বলেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ

“মানুষের মাঝে এমন মানুষও আছে যে এক প্রান্তে (সন্দেহের মধ্যে) থেকে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার ভালো কিছু হয় তাহলে সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে। আর যদি তার উপর কোনো পরীক্ষা আসে, তাহলে সে নিজের মুখের উপর (আগের কুফরির অবস্থায়) ফিরে যায়। সে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই হারায়। এটাই হল প্রকাশ্য ক্ষতি।”[সূরা হজ্জ: ১১]

তিনি বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ

যারা বলে: “আমাদের রব আল্লাহ” তারপর (সত্যের উপর) অটল থাকে, তাদের কাছে (মৃত্যুর সময়) ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, “তোমরা ভয় করো না, চিন্তিত হয়ো না। তোমাদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা করা হত তার সুসংবাদ গ্রহণ কর।”[সূরা ফুসসিলাত: ৩০]

তিনি বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ * أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ خَالِدِينَ فِيهَا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

“যারা বলে: ‘আমাদের রব আল্লাহ’ এবং তারপর (সৎপথে) অটল থাকে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (দুনিয়ায়) তারা যেসব ভালো কাজ করত সে সবের বিনিময়ে ওটা তাদের পুরস্কার।”[সূরা আহকাফ: ১৩-১৪]

এছাড়া আরো যেসব আয়াত দ্বীনকে আঁকড়ে ধরার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্যবাদী ঈমানদারদের জন্য আল্লাহ যা প্রস্তুত করে রেখেছেন তার বিবরণ দেয়। এই ভাবকে সাব্যস্ত করে, স্পষ্ট করে ও বিবরণ দেয় এমন বহু আয়াতে আল্লাহর কিতাব পরিপূর্ণ। সুতরাং ভাই আমার, আপনাকে পরামর্শ দিব আপনি মনোযোগ দিয়ে, বুঝেবুঝে কুরআন পড়ুন। ইন শা আল্লাহ কুরআনেই আপনি এমন সাহায্য পাবেন যা আপনকে ধৈর্য ধরা, বিরক্ত না হওয়া, হতাশ না হওয়া এবং পথকে দীর্ঘ মনে না করার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এই দুনিয়ার জীবন খুব শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে। তারপর বান্দা তার কৃতকর্ম নিয়ে স্বীয় রবের সাক্ষাৎ করবে। যদি উত্তম হয় তাহলে উত্তম, আর যদি মন্দ হয় তাহলে মন্দ।

يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُحْضَرًا وَمَا عَمِلَتْ مِنْ سُوءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَبَيْنَهُ أَمَدًا بَعِيدًا وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ

“যেদিন প্রত্যেকেই তার ভালো কাজ উপস্থিত পাবে এবং তার খারাপ কাজও। সেদিন সে কামনা করবে, যদি তার ও খারাপ কাজের মধ্যে একটি বড় দূরত্ব থাকত! আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে (তাঁর শাস্তি সম্পর্কে) তোমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছেন। আল্লাহ (তাঁর) বান্দাদের প্রতি দয়াশীল।”[সূরা আলে-ইমরান: ৩০]

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন কল্যাণের জন্য আপনার বক্ষকে উন্মোচন করে দেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎ লাভ পর্যন্ত এর উপর আপনাকে অবিচল রাখেন। তিনি যেন আপনার থেকে অনিষ্ট ও মন্দ দূর করে দেন। তিনি সর্বশ্রোতা ও নিকটবর্তী। আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ ও সর্বজ্ঞ।

অগণিত দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর বান্দা ও নবী মুহাম্মাদের প্রতি, তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীবর্গের প্রতি।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

সৎ গুণাবলী

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android