ইসলাম বিবাহের বিধান প্রদান করেছে এবং বিবাহের ফলে যে সমস্ত কল্যাণকর বিষয় ঘটে থাকে সেগুলোর জন্য বিবাহ করার আদেশ দিয়েছে। অন্যদিকে তালাকের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করেছে। প্রশ্নকর্তা যেমনটি বলছে যে ইসলাম তালাক দেয়াকে সহজ করছে, সেটি সঠিক নয়। ইসলাম তালাকের এমন কিছু শর্ত ও বিধি-বিধান প্রদান করেছে যেগুলো পুরুষের জন্য তালাক দেওয়াকে সংকীর্ণ করে দেয় ও তালাক সংঘটন কমিয়ে দেয়। ইসলাম তালাককে স্বামীর হাতে এমনভাবে দেয়নি যে সে যখন ইচ্ছা তখন তালাক দিয়ে দিবে।
মুসলিমরা যদি এই বিধি-বিধান মেনে চলত, তাহলে তালাকের মাত্রা খুবই কম হত। কেবল তখনই তালাক ঘটত যখন স্বামীর বাস্তবেই এর প্রয়োজন পড়ত। কিন্তু, অধিকাংশ মানুষ এই বিধানগুলো মেনে চলেনি। বরং তারা আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করেছে। সে কারণেই তালাক বেড়ে গিয়েছে। আর কেউ কেউ মনে করতে শুরু করেছে যে ইসলামে তালাক সহজ।
তালাক সংঘটন হ্রাসের জন্য আল্লাহ যে সমস্ত বিধান প্রণয়ন করেছেন তার মধ্যে রয়েছে:
১. মৌলিকভাবে তালাক দেয়া নিষিদ্ধ; হয় তো হারাম হিসেবে নয়তো মাকরূহ হিসেবে।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাই্মিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘মৌলিকভাবে তালাক নিষিদ্ধ। প্রয়োজন অনুপাতে এটিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে: জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইবলীস (শয়তান) সমুদ্রের পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনীকে চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তানই তার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশি ফিতনায় ফেলতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে: আমি মানুষের যতক্ষণ না অমুকটা করিয়ে ছেড়েছি, ততক্ষণ তার সাথেই ছিলাম। এক পর্যায়ে এক শয়তান এসে বলে: আমি মানুষটাকে ততক্ষণ ছাড়িনি, যতক্ষণ না তার মাঝে ও তার স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়েছি। তখন শয়তান এ কথা শুনে তাকে কাছে এনে বসিয়ে বলে: তুমিই (উত্তম কাজ) করেছো। এরপর ইবলীস তার সাথে আলিঙ্গন করে”। আল্লাহ তায়ালা জাদুর নিন্দা করতে গিয়ে বলেন:
فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ
“তারা তাদের কাছে এমন কিছু শিখত, যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারত।”[সূরা বাকারা: ১০২] [মাজমুউল ফাতাওয়া (৩৩/৮১) থেকে সমাপ্ত]
তিনি আরো বলেন: ‘যদি তালাকের প্রয়োজন না থাকত তাহলে (শরয়ি) দলীলের দাবি হচ্ছে এটি হারাম হওয়া; যেমনিভাবে সাহাবীদের থেকে বর্ণনাসমূহ ও শরয়ি মূলনীতিসমূহ নির্দেশ করছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের প্রতি রহমত হিসেবে তালাককে বৈধ করেছেন; কেননা কখনও কখনও এটি তাদের প্রয়োজন হয়।’[মাজমুউল ফাতাওয়া (৩২/৮৯) সমাপ্ত]
২. আল্লাহ তালাককে স্বামীর হাতে রেখেছেন; স্ত্রীর হাতে নয়।
তালাক যদি স্ত্রীর হাতে দেয়া হত, তাহলে আজকে যে পরিমাণ তালাক দেখতে পাচ্ছেন তার চেয়ে বহুগুণে বেশি তালাক দেখতে পেতেন। কারণ নারী সহজেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে।
হানাফী ইমাম ইবনুল হুমাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: শরীয়তে তালাকের বিধানের অন্যতম সৌন্দর্য হচ্ছে এটিকে পুরুষদের হাতে রাখা হয়েছে; নারীদের হাতে নয়। এর কারণ হচ্ছে: পুরুষ নিজেকে বেশি সংযত রাখতে পারে এবং পরিণতির ব্যাপারে সে বেশি চিন্তা করে।[দেখুন: ফাতহুল কাদীর (২/৪৬৩)]
৩. কোনো পুরুষের জন্য স্ত্রীকে হায়েয বা ঋতুমতী অবস্থায় কিংবা এমন তুহুর বা পবিত্র অবস্থায় তালাক দেয়া জায়েয নেই যে পবিত্রতায় তার সাথে সহবাস করেছে।
এ ধরণের তালাকের ব্যাপারে ফকীহরা মতভেদ করেছেন যে, এটি কি সংঘটিত হবে; নাকি হবে না?
(72417) নং প্রশ্নের উত্তরে এ ব্যাপারে বিস্তারিত পড়ুন।
কেউ যদি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চায় অথচ তার স্ত্রী ঋতুমতী অবস্থায় থাকে কিংবা এমন তুহুরে (পবিত্রতায়) থাকে যে তুহুরে সে তার সাথে সহবাস করেছে, তাহলে তাকে পরবর্তী তুহুর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর ঐ তুহুরে তার সাথে সহবাস করার আগে তালাক প্রদান করবে। এই সময়ের পরিমাণ কখনো এক মাসের মত হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী এই সময়টুকু অপেক্ষা করলে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যায়। যে কারণে সে তালাক দিতে চেয়েছিল সেটি দূর হয়ে যায়।
৪. তালাক হয়ে যাওয়ার পর স্ত্রীকে তার ঘর থেকে বের করে না দেওয়া এবং তার জন্য বের হওয়া বৈধ না হওয়া। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْراً
“হে নবী! তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিলে তাদের ইদ্দতের (ইদ্দত: তালাকপ্রাপ্ত মহিলাদের নির্দিষ্ট সময়কাল) প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে এবং (ঠিকভাবে) ইদ্দত গণনা করবে। আর তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তাদেরকে তাদের ঘর থেকে বের করে দিবে না এবং তারা নিজেরাও যেন বের না হয়ে যায়। তবে তারা কোনো প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে ভিন্ন কথা। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা (বিধান)। যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে সে তার নিজের উপরই যুলুম করে। তুমি জানো না, আল্লাহ হয়তো এর পরে (এই তালাকের পরে) কোনো একটি পথ বের করবেন।”[সূরা তালাক: ১]
এতে নিহিত প্রজ্ঞা হচ্ছে— স্বামী-স্ত্রীকে সমস্যা সমাধানের সুযোগ প্রদান করে। অন্য কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারা, যাদের হস্তক্ষেপ সমস্যা নিরসনের পরিবর্তে সম্পর্ক নষ্টের কারণ হতে পারে।
নিছক তালাক সংঘটনের পরই যদি স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে (যেমনটি বাস্তবে হয়) বিরোধ আরো বেড়ে যায় এবং স্বামী তাকে ফিরিয়ে না নেওয়ার ব্যাপারে আরো অনড় অবস্থান গ্রহণ করে।
আল্লাহ তাআলা একই আয়াতে এই বিধানের অর্ন্তনিহিত প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ করে বলেন: “আল্লাহ হয়তো এর পরে (এই তালাকের পরে) কোনো একটি পথ বের করবেন।” অর্থাৎ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া এবং স্ত্রীকে স্বামীর ফিরিয়ে নেওয়া।
৫. শরীয়ত স্বামীর হাতে তিনটি তালাক প্রদান করেছে।
এতে নিহিত প্রজ্ঞা স্পষ্ট। যাতে করে পুরুষের জন্য এ সুযোগ থাকে, সে তালাক দিয়ে অনুতপ্ত হলে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে। হয়তবা তাদের দুইজনের মধ্যে যে ভুলকারী সে নিজের ভুল শুধরে নিবে। তারপর স্বামীকে আরও একটি সুযোগ দেয়া হয়েছে। যদি স্বামী তৃতীয় তালাক দেয় তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক টিকবে না। তখন বিচ্ছেদ ছাড়া আর কিছু বাকি থাকে না।
ত্বাহের ইবনে আশূর রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
‘উক্ত গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধানে নিহিত প্রজ্ঞা হলো: স্বামীদেরকে তাদের স্ত্রীদের অধিকারের ব্যাপারে অবহেলা করা থেকে এবং স্ত্রীদেরকে নিজেদের ঘরে খেলনা বানিয়ে ফেলা থেকে প্রতিহত করা। স্বামীর ক্ষেত্রে প্রথম তালাক হচ্ছে পদস্খলন, দ্বিতীয়টি হচ্ছে পরীক্ষামূলক। আর তৃতীয়টি হচ্ছে বিচ্ছেদ। ঠিক যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসা ও খিযিরের ঘটনায় বলেছেন: ‘মুসার প্রথম আপত্তি ছিল ভুলক্রমে। দ্বিতীয়টি ছিল শর্ত মোতাবেক। আর তৃতীয়টি ছিল ইচ্ছাকৃত। এ কারণে খিযির তৃতীয় বারে তাকে বলেন: هَذَا فِرَاقُ بَيْنِي وَبَيْنك ‘এটাই আমার ও তোমার মাঝে বিচ্ছেদ।’[সূরা কাহফ: ৭৮][হাদীসটি বুখারী (২৫৭৮) ও আহমদ (৩৫/৫৬) বর্ণনা করেন। মুহাক্কিকরা এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন][আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর (২/৪১৫)]
ইবনুল হুমাম আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ শরীয়তে তালাকের সংখ্যা তিন হওয়ার মাঝে নিহিত প্রজ্ঞার বিবরণ দিয়ে বলেন: ‘কারণ মানুষের মন মিথ্যুক। হয়তো তাকে বোঝাবে যে এ স্ত্রীর প্রয়োজন নেই অথবা তাকে পরিত্যাগ করার প্রয়োজন বুঝিয়ে তাকে প্ররোচিত করবে। আবার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করার পর তার অনুশোচনা হবে, অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং ধৈর্য হারিয়ে যাবে। তাই আল্লাহ তাআলা এ কারণে তিনবার তালাক দেয়ার বিধান আরোপ করেছেন। যাতে করে সে প্রথমবার তালাক দিয়ে নিজেকে পরীক্ষা করতে পারে। যদি বাস্তবে নিজের মনকে তালাক দেয়ায় বিশ্বস্ত পায় তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত সে তালাক টিকিয়ে রাখবে। আর যদি মনকে বিশ্বস্ত না পায় তাহলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারল। তারপর যদি তার মন প্রথম তালাকের মত অবস্থায় চলে যায় এবং তার উপর বিজয়ী হয়ে তাকে তালাক দিয়ে ফেলায়, তাহলে সে মনের কী পরিবর্তন ঘটে সেটা লক্ষ্য করবে। এরপর তৃতীয় তালাক কেবল তখনই দিবে যখন সে নিজের মনকে ভালোভাবে যাচাই করেছে এবং নিজের মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরেছে। তিন তালাকের পর আর কোনো ওজরের সুযোগ নেই।’[সমাপ্ত][দেখুন, ফাতহুল কাদীর (৩/৪৬৫-৪৬৬)]
৬. স্ত্রীকে উপদেশ দেওয়া, বিছানায় পরিত্যাগ করা, স্বামীর অবাধ্যতা ও বেয়াদবি করার আশঙ্কা করলে তাকে মৃদু প্রহার করা বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَاللاَّتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلاَ تَبْغُواْ عَلَيْهِنَّ سَبِيلاً إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيراً
“আর যে নারীদের মধ্যে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে (প্রথমে) উপদেশ দাও, (তাতে কাজ না হলে) বিছানায় তাদেরকে বর্জন করো এবং (তাতেও কাজ না হলে) তাদেরকে (মৃদু) প্রহার করো। এতে যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পথ অন্বেষণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ উপরিস্থ, মহান।”[সূরা নিসা: ৩৪]
তাই স্ত্রীর সাথে সামান্যতম সমস্যা হলেই স্বামী তাকে তালাক দিবে না। বরং তালাকের আগে সমাঝোতার নানান প্রচেষ্টা করে যেতে হবে।
৭. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে সমস্যাগুলো হয়ে থাকে, সেগুলোর সমাধানে নিজেরা ব্যর্থ হলে দুজনের মাঝে মীমাংসার জন্য সালিশ নির্ধারণ করা বৈধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُواْ حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلاَحًا يُوَفِّقِ اللّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
“তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন সালিশ ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করো। তারা যদি মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ তাদের মাঝে মিলসাধন করে দিবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, সবকিছু অবগত।”[সূরা নিসা: ৩৫]
সমস্যা সমাধান করা না গেলেই স্বামী তালাকের দিকে ছুটে যাবে না। বরং এই দুই সালিশের মাধ্যমে অন্য একটি সমাধানের চেষ্টা করবে।
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে: ইসলাম তালাকের বিধান ও সংঘটন সহজ করে দেয়নি। বরং পুরুষের জন্য তা কঠিন ও সংকীর্ণ করে দিয়েছে; যাতে করে তালাক কম পরিমাণে সংঘটিত হয়। এর কারণ শুধু এটাই যে, তালাক আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, প্রিয় কিছু নয়।
শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:
ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের শেষ উপায় হিসেবে তালাককে রেখেছে। তালাকের আগে সমাধানের বেশ কিছু প্রাথমিক পথ উন্মুক্ত করে রেখেছে। শাইখ, স্বামী-স্ত্রী তালাকের আশ্রয় নেওয়ার আগে তাদের মাঝে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করার লক্ষ্যে ইসলাম যে সমস্ত সমাধান রেখেছে সেগুলো যদি আমাদেরকে বলতেন?
তিনি উত্তর দেন:
“আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাধ মীমাংসা করার বিধান প্রদান করার পাশাপাশি এমন পদ্ধতিসমূহ গ্রহণ করতে বলেছেন যেগুলো মেলবন্ধন তৈরী করে এবং তালাকের ছায়া দূর করে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে: উপদেশ দেয়া, বিছানায় পরিত্যাগ এবং উপদেশ ও পরিত্যাগে কাজ না হলে মৃদু প্রহার করা। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاللاَّتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلاَ تَبْغُواْ عَلَيْهِنَّ سَبِيلاً إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا
“আর যে নারীদের মধ্যে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে (প্রথমে) উপদেশ দাও, (তাতে কাজ না হলে) বিছানায় তাদেরকে বর্জন করো এবং (তাতেও কাজ না হলে) তাদেরকে (মৃদু) প্রহার করো। এতে যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পথ অন্বেষণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ উপরিস্থ, মহান।”[সূরা নিসা: ৩৪]
এর মধ্যে আরো রয়েছে: স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ ঘটলে উভয়ের মাঝে বিবাদ নিরসনের জন্য উভয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে একজন করে শালিস নিযুক্ত করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُواْ حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلاَحًا يُوَفِّقِ اللّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
“তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন সালিশ ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করো। তারা যদি মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ তাদের মাঝে মিলসাধন করে দিবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, সবকিছু অবগত।”[সূরা নিসা: ৩৫]
যদি এই উপায়গুলো কাজ না করে, সমাঝোতা সহজ না হয়, বিবাদ চলমান থাকে আর এর কারণ স্বামী হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ স্বামীর জন্য তালাকের বিধান রেখেছেন। অন্যদিকে ভুল অথবা বিদ্বেষ যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রীর জন্য অর্থের বিনিময়ে মুক্তির সুযোগ রেখেছেন, যদি স্বামী অর্থ ছাড়া তাকে তালাক দিতে সম্মত না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الطَّلاَقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ وَلاَ يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُواْ مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلاَّ أَن يَخَافَا أَلاَّ يُقِيمَا حُدُودَ اللّهِ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلاَّ يُقِيمَا حُدُودَ اللّهِ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ تِلْكَ حُدُودُ اللّهِ فَلاَ تَعْتَدُوهَا وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللّهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
“(বিধানসম্মত) তালাক দুইবার। এরপর (স্ত্রীকে) হয় যথোচিতভাবে ধরে রাখতে হবে, না হয় ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দিতে হবে। আর তোমরা তাদেরকে যা যা দিয়েছ তা থেকে কিছুই নিয়ে নেওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়; তবে যদি (স্বামী-স্ত্রী) দুজনে আল্লাহর সীমারেখা (বিধান) ঠিক রাখতে না পারার আশঙ্কা করে তাহলে ভিন্ন কথা। তাই তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে, তারা দুজনে আল্লাহর সীমারেখা ঠিক রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী নিজেকে মুক্ত করতে (স্বামীকে) কিছু বিনিময় দিলে তাতে দু'জনের কারো পাপ হবে না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা; তোমরা এগুলো লঙ্ঘন করো না। যারা আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে তারাই যালেম।”[সূরা বাকারা: ২২৯]
কেননা সুন্দরভাবে বিচ্ছেদ হওয়া বিবাধ ও বিরোধের চেয়ে উত্তম। তাছাড়া বিবাহের বিধান যে উদ্দেশ্যসমূহকে সামনে রেখে আরোপ করা হয়েছে, সেগুলো এমন (বিরোধপূর্ণ) বিবাহে অর্জিত হয় না। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِن يَتَفَرَّقَا يُغْنِ اللّهُ كُلاًّ مِّن سَعَتِهِ وَكَانَ اللّهُ وَاسِعًا حَكِيمًا
“আর যদি তারা (স্বামী-স্ত্রী) পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে আল্লাহ তাঁর প্রাচুর্য (সম্পদ) দ্বারা প্রত্যেককে অভাবমুক্ত করবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাবান।”[সূরা নিসা: ১৩০]
তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: সাবেত ইবনে কাইস আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুমার স্ত্রী তাকে ভালোবাসত না এবং তার সাথে থাকতে পারছিল না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাকে অনুমতি দেন দেনমোহর হিসেবে প্রাপ্ত বাগানটি ফিরিয়ে দিতে। আর সাবেতকে নির্দেশ দেন বাগানটি গ্রহণ করে স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে দিতে। তখন তিনি সেটাই করেন।[হাদীসটি বুখারী সহিহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে]
[ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম (পৃ. ৪৯৪, ৪৯৫)]
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।