মেয়ে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ানো

প্রশ্ন 20872

আমার সাথে আমার মায়ের আচরণ খুবই খারাপ ছিল। এমনকি আমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। আমি খুবই দ্বিধাগ্রস্ত ও দুর্বল মনের ব্যক্তি হয়ে গেছি। কোনো কাজ ঠিকমত করতে পারি না কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমি বিয়ে করেছি, আল্লাহ আমাকে একটি মেয়ে সন্তান দিয়েছেন। আমার সাথে যা ঘটেছে তা আমি এড়িয়ে যেতে চাই, যাতে করে এই পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতা আমার মেয়ের ক্ষেত্রেও না ঘটে। আমাকে আপনারা কী করার পরামর্শ দিবেন?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

দুই বছর বয়সে শিশু তার চারপাশের পৃথিবীর প্রতি তার মনোভাব গঠন করতে শুরু করে। কিছু বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী (Developmental Psychologists) মনে করেন যে আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি হলো সেই মনোভাবগুলোর মধ্যে প্রথম। দ্বিতীয় বছরে এই অনুভূতির তীব্রতা নির্ভর করে শিশু যে ধরনের যত্ন পেয়েছে তার উপর এবং তার শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পিতামাতার মনোভাবের উপর। এই পর্যায়ে শিশুর বিকাশের লক্ষণগুলো তার স্বাধীনতাচেতা বা স্বায়ত্তশাসিত হওয়ার প্রবণতার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় শিশুর কথা বলার স্বাধীনতা, হাঁটার স্বাধীনতা ও খেলার স্বাধীনতা প্রয়োজন। আর এই সব কিছুই আত্ম-প্রতিষ্ঠার চাহিদার সাথে জড়িত, যা কেবলমাত্র তাকে দেওয়া স্বাধীনতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। এটি ‘পরিপক্কতার মাধ্যমে বিকাশ তত্ত্ব’ দ্বারা সমর্থিত, যা শিশুর স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা ও তাকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়ার প্রতি আহ্বান করে।

কিছু মেয়ে নিজেদের উপর আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে বড় হয়। যেক্ষেত্রে তারা কম বা বেশি কোনো বিষয়েই নিজেদের উপর নির্ভর করতে পারে না। তারা খুব কমই নিজে থেকে কোনো কাজ শুরু করে এবং সবসময় এমন কাউকে খোঁজে যে তাদেরকে বলবে: ‘এটা করো, ওটা করো।’ যখন তারা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়, তারা থেমে যায়। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কখনও হয়তো সমস্যাকে এড়িয়ে যায়। কখনও কেঁদে ফেলে। এটি পিতামাতার পক্ষ থেকে সন্তানের প্রতি একটি অন্যায়, যা বিভিন্ন কারণে ঘটে:

  • প্রত্যেক ছোট-বড় বিষয়ে অতিরিক্ত আদেশ-নিষেধ করা, এমনকি যা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি শিশুর সৃজনশীলতা নষ্ট করে এবং নিজ কাজের উপর তার আস্থা কমিয়ে দেয়। ফলে সে সবসময় এমন কারো অপেক্ষা করে যে তার ভুল সংশোধন করবে এবং তাকে নিশ্চিত করবে যে তার কাজটি সঠিক।
  • তার প্রতিটি কাজের সমালোচনা ও নিন্দা করা এবং তার ভুলগুলো খুঁজে বেড়ানো ও তিরস্কার করা। শিশু হয়তো চেষ্টা করে, কিন্তু ভুল করে। যার ফলে সে যতটুকু তিরস্কার পাওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি নিন্দিত ও তিরস্কৃত হয়। অথচ সে তার পরিশ্রমের জন্য প্রশংসার অপেক্ষায় ছিল। এটি শিশুর কাজের প্রতি আগ্রহ ও সাফল্য অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নষ্ট করে দেয়।
  • শিশুকে অন্যদের সামনে কথা বলার সুযোগ না দেওয়া, এই ভয়ে যে সে ভুল বলবে বা অবাঞ্ছিত বিষয় নিয়ে কথা বলবে। অথবা কথা বলার অনুমতি দেওয়া হলেও তাকে কী বলতে হবে তা শিখিয়ে দেওয়া।
  • ঘন ঘন বিপদের সতর্কতা দেওয়া, যা তাকে সবসময় অনিষ্টকর কিছু আশা করতে এবং মনে করতে বাধ্য করে। তাকে ভাবিয়ে তোলে যে বিপদ চারদিক থেকে তাকে ঘিরে আছে।
  • তাকে অপমান করা ও অন্যদের সাথে তুলনা করা, যা তার নিজের মূল্যবোধ কমিয়ে দেয়।
  • বিদ্রূপ ও উপহাস করা।
  • তার প্রশ্নের প্রতি মনোযোগ না দেওয়া।
  • অতিরিক্ত সুরক্ষা, যার মধ্যে তার স্বাস্থ্য বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিমাত্রায় উদ্বেগ প্রকাশ পায়।

যে শিশু আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে তার উপর বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়, যেমন:

১. সে স্বাধীনভাবে কোনো কাজ করতে পারে না। যদি তাকে কিছু আনতে বলা হয় এবং যখন সে দেখে যে সেটা তাকে প্রদত্ত বর্ণনা থেকে আলাদা, সে থেমে যায়। সমস্যার মুখে পড়লে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

২. তার মধ্যে নির্বুদ্ধিতার উপস্থিতি এবং সৃজনশীলতার অভাব দেখা দেয়।

৩. তার উপর অর্পিত প্রতিটি কাজ থেকে বিরক্তি ও অস্বস্তি আসে, কারণ সে মনে করে তার কাজের জন্য তাকে সবসময় তিরস্কার করা হবে। সে আগে থেকেই ধরে নেয় যে সে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে না।

৪. তার ইচ্ছাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, সংকল্প ভেঙে যায় এবং পরাধীনতা, অযথা বশ্যতা, অবহেলা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

৫. উদ্বেগ, হতাশা এবং আক্রমণাত্মক প্রবণতা বা অন্তর্মুখিতা ও একাকীত্বের দিকে ঝোঁক দেখা দেয়।

শিশুকে এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পিতামাতার উচিত ছিল তার আত্মবিশ্বাস বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা। উদাহরণস্বরূপ (তবে এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়):

  • তার জন্য সাধারণ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা যা সে অনুসরণ করবে: আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা তাকে জানানো যাতে সে তা গ্রহণ করে, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা থেকে সতর্ক করা যাতে সে তা এড়িয়ে চলে। সচ্চরিত্র ও উচ্চ নৈতিকতার সাথে তাকে পরিচিত করানো। তার মনে খারাপ চরিত্র, কাজ ও কথার প্রতি ঘৃণা তৈরী করা এবং তুচ্ছ বিষয় থেকে দূরে থাকার মনোভাব জাগিয়ে তোলা। এরপর তাকে সৃজনশীলতার স্বাধীনতা দেওয়া।
  • মা তাকে এমন কিছু কাজের দায়িত্ব দেবেন যা সে করতে সক্ষম। যদি সে ভুল করে তার উদ্যোগের জন্য তাকে উৎসাহিত করবেন। তারপর কীভাবে করা উচিত তা বলে দিবেন। কখনো কখনো শুধু তার কাজের প্রশংসা করবেন এবং সরাসরি নির্দেশনা না দিয়ে মৃদুভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে সাহায্য করবেন। যদি কাজটি শিশুর সাধ্যের বাইরে হয় তার মতামত নেবেন এবং কখনো কখনো কোনো কোনো বিষয়ের ভালো-মন্দ বিচারে তার মতামত জানতে চাইবেন; যাতে শিশু বুঝতে পারে যে সবাই ভুলের এবং সঠিকের সম্মুখীন হয় এবং তার মাঝে দৃঢ় সংকল্প আসে।
  • আত্মীয়দের ও বন্ধুদের সামনে পিতা-মাতা তাকে উৎসাহিত করবেন, উপযুক্ত পুরস্কার দিবেন এবং তার ইবাদতমূলক কাজের প্রশংসা করবেন। যেমন নামায নিয়মিত পড়া, কুরআন মুখস্থ করা, পড়াশোনায় ভালো করা, উচ্চ নৈতিক চরিত্র ইত্যাদি।
  • তার জন্য একটি বিশেষ ডাকনাম রাখা যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। মন্দ উপাধি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা। যখন সে বাবা-মাকে নাখোশ করবে তখন তারা তাকে আসল নামে ডাকবে। সে তখন বুঝতে পারবে যে সে তাদের একজন বা উভয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে কসুর করেছে বা অন্যের প্রতি ভুল করেছে এবং সে সতর্ক হবে।
  • তার ইচ্ছাশক্তি শক্তিশালী করা। আর তা হলো দুটি বিষয়ে অভ্যস্ত করার মাধ্যমে:

ক) গোপনীয়তা রক্ষা করতে শেখানো: যখন সে গোপন কথা লুকিয়ে রাখতে শেখে এবং ফাঁস করে না, তখন তার ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি পায় ও শক্তিশালী হয় এবং ফলে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

খ) রোজা রাখার অভ্যাস করানো: যখন সে রোজায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকে, তখন সে বিজয় ও আত্মার উপর জয়ী হওয়ার আনন্দ অনুভব করে। ফলে তার ইচ্ছাশক্তি জীবনের মোকাবেলায় শক্তিশালী হয়, যা তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

  • তার সামাজিক আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী করা: এটি অর্জিত হবে বাড়ির প্রয়োজনীয় কাজ করা, পিতামাতার আদেশ পালন করা, বড়দের সঙ্গে ওঠাবসা করা এবং ছোটদের সাথে মেলামেশার মাধ্যমে।
  • তার জ্ঞানগত আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী করা: তার করতে হবে তাকে কুরআন শেখানো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এবং তাঁর মহান জীবনী শেখানোর মাধ্যমে। এতে সে ছোটবেলা থেকে প্রচুর জ্ঞান বহন করে বেড়ে উঠবে এবং তার জ্ঞানগত আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। কারণ সে কুসংস্কার ও কল্পকাহিনী থেকে দূরে থেকে জ্ঞানের প্রকৃত সত্য ধারণ করবে।

এর পাশাপাশি পিতামাতার উচিত ছিল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং নিরাময়মূলক উপায় গ্রহণ করা, যাতে শিশুকে হীনম্মন্যতার অনুভূতি থেকে মুক্ত করা যায়। এই প্রবণতার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: অবজ্ঞা, অপমান ও উপহাস। যেমন ভাই-বোন ও আত্মীয়দের সামনে, এমনকি কখনো কখনো বন্ধুদের সামনে বা এমন অপরিচিত মানুষদের সামনে যাদেরকে সে আগে কখনো দেখেনি। এমন পরিবেশগুলোতে তাকে কষ্টদায়ক শব্দ ও খারাপ উক্তি দিয়ে ডাকা। এতে সে নিজেকে হেয় ও অপমানিত মনে করে। ফলে তার মধ্যে মানসিক জটিলতা তৈরি হয় যা তাকে অন্যদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখতে এবং জীবন থেকে পালিয়ে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে প্ররোচিত করে।

যদিও পিতামাতার মুখ থেকে শিশুর প্রতি কষ্টদায়ক শব্দ বেরিয়ে যাওয়া কোনো বড় বা ছোট অপরাধ সংশোধনের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তবুও এই অপরাধ সংশোধনের পদ্ধতি হিসেবে এটি উপযুক্ত নয়। কারণ এটি শিশুর মানসিকতা ও ব্যক্তিগত আচরণে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, তাকে গালাগালি ও অশ্লীল ভাষায় অভ্যস্ত করে তোলে এবং মানসিক ও নৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেয়।

এই প্রবণতার সর্বোত্তম চিকিৎসা হলো: শিশু যখনই ভুল করে তখন তাকে নম্রভাবে সেই ভুলের প্রতি সতর্ক করা এবং সেই ভুল এড়ানোর যুক্তিসঙ্গত কারণ তার কাছে উপস্থাপন করা। পিতামাতা যেন উপস্থিত লোকজনের সামনে তাকে ধমক না দেন বা ভর্ৎসনা না করেন। প্রথমতঃ তার সাথে সংশোধন ও পরিচর্যায় উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আর সেটা হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংশোধন, শিক্ষা ও বক্রতা সংশোধনের অনুকরণ করে। কারণ শিশুর জগৎ অত্যন্ত সংবেদনশীল, দ্রুত প্রভাবিত হয়, তীব্র আবেগপ্রবণ, অল্প বোধশক্তিসম্পন্ন এবং সামান্য কৌশলী। শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা তার জীবনের সমস্ত পর্যায়ে তার ব্যক্তিত্ব নির্মাণের প্রথম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সূত্র

সন্তান প্রতিপালন

সূত্র

হানান আত্বিয়্যা আত-তূরী আল-জুহানীর ‘তানশিআতুল ফাতাতিল মুসলিমাহ’ (পৃ. ১৬৩)

Previous
পরবর্তী
at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android