এ ধরনের বাজিতে অর্থ ব্যয় করা জায়েয নেই, হোক সেটি প্রতিযোগীদেরর কারো পক্ষ থেকে কিংবা অন্য কারো পক্ষ থেকে। কোনো কিছুর পূর্বাভাসের সঠিকতার বাজি ধরাও জায়েয নেই, যদিও সেটি অর্থ ছাড়া হয়ে থাকে। কেননা এতে করে গায়েবের ব্যাপারে আন্দাজ করা হয়। এ ধরনের বাজির সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর ডেভেলপ (প্রোগ্রামিং) করাও জায়েয নেই।
ক্রীড়ায় বাজি ধরা সংক্রান্ত কোনো অ্যাপ ডেভেলপ করার হুকুম
প্রশ্ন 334296
আমি একজন প্রোগ্রামার। জনৈক ক্লায়েন্ট আমাকে তার জন্য একটি অ্যাপ ডেভেলপ করে দিতে বলে। এই অ্যাপ খেলাধুলার বাজির সংবাদ কোনো একটা ওয়েবসাইট থেকে টেলিগ্রামের গ্রুপে পৌঁছে দিবে। আমি তাকে এই বাজির ধরন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে বলল যে এটা জুয়া থেকে ভিন্ন। এখানে কোনো অর্থ-সম্পদের ক্ষতি নেই। অ্যাপ শুধুমাত্র বাজির আপডেট দেয়। আমি বিষয়গুলো ভালোমত বুঝি না। এখানে থাকা বিভিন্ন খেলার মধ্যে আমি তীর নিক্ষেপও দেখেছি। উল্লেখ্য, খেলার ধরন ক্লায়েন্টই নির্ধারণ করে। এ ধরনের কাজের হুকুম কী? এটি কি হারাম হবে, যেহেতু অধিকাংশ খেলার ক্ষেত্রে বাজি ধরা জায়েয নেই?
উত্তরের সার-সংক্ষেপ
উত্তর
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:
ক্রীড়া জুয়া (স্পোর্টস বেটিং) বলতে বোঝানো হয়: কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচ বা প্রতিযোগিতায় কে জয়ী হবে, এ বিষয়ে একদল মানুষের অনুমান বা পূর্বাভাস। এ ধরনের বাজি হারাম, তা অর্থের উপর হোক বা পুরস্কারের উপর হোক কিংবা বিনামূল্যেই হোক। এর কারণ হলো:
১- এটি মিথ্যা ধারণার উপর ভিত্তি করে আন্দাজ করা। কারণ সে কীভাবে জানবে যে ফলাফল ঠিক এই অনুপাতে হবে, যেমনটি সে অনুমান করেছে?
২- যদি এই বাজি অর্থ বা পুরস্কারের উপর হয়, যা পরাজিত ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া হয়, তবে তা নিষিদ্ধ জুয়া। আর যদি তা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে নেওয়া হয়, তবে তা এমন বিষয়ে বিনিময় গ্রহণ যেখানে বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ নয়।
প্রকৃতপক্ষে বিনিময় বা পুরস্কার গ্রহণ করা বৈধ কেবল ঘোড়দৌড়, উটদৌড় ও তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় এবং সেগুলোর অনুরূপ সে সকল বিষয়ে যা দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে সহায়ক; যেমন: কুরআন, হাদীস ও ফিকহ বিষয়ক প্রতিযোগিতা। এর দলীল হলো আবু দাউদ (২৫৭৪), তিরমিযী কর্তৃক হাসান হিসেবে গণ্য (১৭০০) এবং ইবনে মাজাহ (২৮৭৮)-তে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তীর, উট ও ঘোড়া ছাড়া অন্য কিছুর উপর পুরস্কার (সাবাক) নির্ধারণ নেই।”[শাইখ আলবানী সহীহ আবু দাউদ ও অন্যান্য গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলেছেন]
‘সাবাক’ বলতে বোঝায়: যে ব্যক্তি জয়ী হবে তার জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক বা পুরস্কার। ইবনুল আসীর তাঁর ‘আন-নিহায়া’ (২/৮৪৪) গ্রন্থে বলেন: “যে অর্থ প্রতিযোগিতার উপর জামানত হিসেবে নির্ধারিত হয়।”[সমাপ্ত]
সিন্দী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “খাত্তাবী বলেছেন: প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা বৈধ নয়, কেবল এই দুইটি ক্ষেত্র ছাড়া: উট ও ঘোড়া। একই হেতুর অধীন হওয়ায় যুদ্ধের অন্যান্য সরঞ্জামকেও এ দু’টোর অধিভুক্ত করা হয়েছে। কারণ এসব ক্ষেত্রে পুরস্কার দেয়াটা জিহাদের প্রতি উৎসাহ ও আগ্রহ তৈরী করা।”[হাশিয়াতুস সিন্দী আলা সুনান ইবন মাজাহ (২/২০৬) থেকে উদ্ধৃত]
ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ‘আল-ফুরুসিয়া’ গ্রন্থে (পৃ. ৩১৮) বলেন:
‘এগারো নম্বর মাসআলা: কুরআন, হাদীস, ফিকহ ও অন্যান্য উপকারী জ্ঞান মুখস্থ করার প্রতিযোগিতা এবং মাসআলায় সঠিক উত্তর দেওয়ার প্রতিযোগিতা করা¾ এগুলো কি বিনিময় (পুরস্কার) নিয়ে জায়েয?
ইমাম মালিক, আহমদ ও শাফেয়ীর অনুসারীরা এটিকে নিষিদ্ধ বলেছেন। আর ইমাম আবু হানীফার অনুসারীরা ও আমাদের শায়খ এটিকে বৈধ বলেছেন। ইবনে আব্দিল বার এ মতটি ইমাম শাফেয়ি থেকেও বর্ণনা করেছেন। এটি জাল বোনা, কুস্তি খেলা ও সাঁতারের চেয়েও প্রাধান্য পাওয়ার অধিক উপযুক্ত। অতএব, যারা এগুলোর উপর বিনিময়সহ প্রতিযোগিতা করা বৈধ মনে করে, তবে জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতা বৈধ হওয়া আরও অধিক উপযুক্ত। এটি সেই ঘটনার অনুরূপ, যখন সিদ্দীক (আবু বকর) কুরাইশ কাফিরদের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সংবাদ দিয়েছিলেন সে সংবাদের সত্যতার উপর বাজি ধরেছিলেন। ইতঃপূর্বে আলোচান করা হয়েছে যে এটি ‘মানসুখ’ হওয়ার পক্ষে কোনো শরয়ি দলিল নেই এবং জুয়া হারাম হওয়ার পরও সিদ্দীক তাদের কাছ থেকে জামানত গ্রহণ করেছিলেন। দ্বীনের প্রতিষ্ঠা প্রমাণ উপস্থাপন করা ও জিহাদ করার মাধ্যমে সাধিত হয়। সুতরাং যদি জিহাদের সরঞ্জামের উপর বাজি ধরা বৈধ হয়, তবে ইলমের ক্ষেত্রে তা বৈধ হওয়া আরো অধিক যুক্তিযুক্ত। এ মতটিই প্রাধান্যপ্রাপ্ত।”[সমাপ্ত]
এছাড়া ‘আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়া’ (২৩/১৭১)-তে বলা হয়েছে:
‘রিহান (বাজি) শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো:
ঝুঁকি বা জুয়া: ‘লিসানুল আরব’-এ এসেছে: ‘রিহান’ ও ‘মুরাহানা’ মানে ঝুঁকি গ্রহণ করা। বলা হয়: সে অমুক বিষয়ে তার সঙ্গে বাজি ধরেছে, তারা পরস্পর বাজি ধরছে এবং তারা নিজেদের মধ্যে ঝুঁকি স্থাপন করেছে।
এই অর্থে বাজির একটি রূপ হলো: দুই ব্যক্তি বা দুই দল এমন একটি বিষয়ে বাজি ধরা যা হওয়াও সম্ভব, আবার না হওয়াও সম্ভব। যেমন উভয়ে বলল: যদি আগামীকাল বৃষ্টি না হয়, তবে তুমি আমাকে অমুক পরিমাণ অর্থ দেবে। আর যদি বৃষ্টি হয়, তবে আমি তোমাকে ততটা অর্থ দেব।
ইসলামের বিধান অনুসারী ফকীহদের ঐকমত্যে এই অর্থে বাজি ধরা হারাম, সে ব্যক্তি মুসলিম হোক বা যিম্মি হোক; কারণ প্রত্যেকেই এখানে লাভ বা ক্ষতির মধ্যে ঝুলে থাকে। আর এটি হারাম জুয়ারই একটি রূপ।”[সমাপ্ত]
‘ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দায়িমাহ’ (১৫/২৩৯)-এ এসেছে:
‘প্রশ্ন: যে বাজিকে ‘হক’ বলা হয়, তার বিধান কী? আর যদি তা এক পক্ষ থেকে হয়, যেমন কেউ বলল: যদি এই কাজটি সম্পন্ন হয়, তবে তোমাদের উপর আমার ‘হক’ (অধিকার) হবে যে আমি তোমাদেরকে দাওয়াত দেব। এমন বাজির বিধান কী? আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর: শরীয়ত যে বিষয়গুলোকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করেছে সেগুলো ছাড়া অর্থের ভিত্তিতে বাজি ধরা বৈধ নয়। ব্যতিক্রমগুলো হলো: ঘোড়দৌড়, উটদৌড় ও তীর নিক্ষেপের প্রতিযোগিতা। এগুলো ছাড়া অন্যান্য সব ধরনের বাজিতে অর্থ গ্রহণ করা বৈধ নয়। কারণ তা অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ এবং সেই জুয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হারাম করেছেন। আর কেউ যদি বলে: ‘যদি আমার এ কাজটি হয়ে যায় তবে তোমাদের জন্য আমার উপর অমুক বিষয় আবশ্যক হবে’, এটি প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত। সম্ভব হলে এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।
আল্লাহই তৌফিকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবীদের উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
ফতোয়া ও ইলমী গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি
বকর ইবনে আবদুল্লাহ আবু যাইদ … সালিহ ইবনে ফাওযান আল-ফাওযান … আব্দুল আযীয ইবনে আবদুল্লাহ আলুশ-শাইখ … আবদুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ ইবন বায’[সমাপ্ত]
শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:
“কিছু মানুষ বাজি ধরে এবং বলে: যদি এমন হয় তবে আমি তোমাকে অমুক অমুক মূল্যের জিনিস দেব। আর বিপরীত হলে তুমি দেবে। এটাকে তারা বাজি বলে। এটি কি হালাল; নাকি হারাম?”
তিনি উত্তর দেন:
“এটি হালাল নয়; বরং হারাম। এটি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত বাজি। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেছেন:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلاَمُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের এক একটি ঘৃণ্য কাজ; অতএব, এসব থেকে দূরে থাক, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”[সূরা মায়েদা: ৯০]
‘মাইসির’ হলো ‘জুয়া’। যেমন বলা হয়: যদি এমন হয় তবে এমন, আর যদি এমন হয় তবে তেমন। অথবা বলা হয়: যদি অমুক ব্যক্তি আসে তবে তোমার জন্য অমুক, আর যদি না আসে তবে তোমার বিরুদ্ধে অমুক। অথবা বলা হয়: যদি তোমার কাছে যা আছে তা পাথর হয় বা সোনা হয় (তাদের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ হয় তার উপর ভিত্তি করে)। অর্থাৎ এ ধরনের সব বাজিই জুয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘তীর, উট ও ঘোড়া ছাড়া অন্য কিছুর উপর পুরস্কার নির্ধারণ নেই।’
আর ‘সাবাক’ মানে হলো বিনিময় বা পারিশ্রমিক। অর্থাৎ: তীর নিক্ষেপ, উটদৌড় ও ঘোড়দৌড় ছাড়া অন্য কিছুর ক্ষেত্রে কোনো বিনিময় নেই। মানে তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায়, ঘোড়ার দৌড়ের বা উটের দৌড়ের প্রতিযোগিতায়।
কিন্তু ইলমী প্রতিযোগিতা এ শ্রেণীর নয়। বরং তা জি‘আলা (ঘোষিত পুরস্কারপ্রাপ্তি)-শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন কেউ বলল: যে ব্যক্তি কুরআন বা সুন্নাহ থেকে অমুক অমুক বিষয় শিখবে বা অমুক কিতাব থেকে শিখবে, তাকে এই এই দেওয়া হবে। এটি জি‘আলার অন্তর্ভুক্ত। এটি পারিশ্রমিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। অথবা কুরআন বা সুন্নাহ থেকে প্রশ্ন করা হলো, যে উত্তর দেবে তাকে এই এই দেওয়া হবে। এটি শিক্ষাদানের অন্তর্ভুক্ত, কল্যাণের দিকে দিকনির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত এবং ইলমের প্রতি উৎসাহ দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। এটা হারামের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এটি ইলম অর্জনে উৎসাহ দান ও কল্যাণের দিকে আহ্বানের জন্য। জি‘আলা (পুরস্কার) ও পারিশ্রমিক প্রদান ইলম অর্জনে সহায়ক হয়। অন্যদিকে বাজি হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াই। এক্ষেত্রে একজন বলে এক কথা, আরেকজন বলে আরেক কথা।”[ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব (১৯/৩০০) থেকে সমাপ্ত]
সারকথা হলো:
এই ধরনের বাজিতে কোনো বিনিময় বা পুরস্কার দেওয়া বৈধ নয়, তা প্রতিযোগীদের কোনো একজনের পক্ষ থেকে হোক বা তাদের বাইরে ভিন্ন কারো পক্ষ থেকে হোক।
এছাড়া পূর্বাভাসের সঠিকতা নিয়ে বাজি ধরাও বৈধ নয়, এমনকি অর্থ ছাড়া হলেও। কারণ এটি অদৃশ্য বিষয়ে আন্দাজ করার অন্তর্ভুক্ত। আর এ ধরনের বাজির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রোগ্রাম (অ্যাপ) ডেভেলপ করাও বৈধ নয়।
আমরা এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে, বৈধ ঘোড়দৌড় বা তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতার অর্থ হলো: দু’জন ব্যক্তি তাদের নিজেদের ঘোড়া নিয়ে দৌড় প্রতিযোগিতা করবে অথবা তাদের নিজেদের তীর দিয়ে প্রতিযোগিতা করবে যে কে লক্ষ্যভেদ করতে পারে। উদ্দেশ্য হলো প্রতিযোগিতা করা, প্রতিযোগীদের মধ্যে কে জিতবে তার উপর বাজি ধরা নয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সূত্র:
ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব