দ্বীন ইসলামের তিনটি স্তর রয়েছে: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। প্রত্যেক স্তরের নির্দিষ্ট অর্থ ও স্তম্ভ রয়েছে যার বিবরণ বিস্তারিত উত্তরে আছে।
দ্বীন ইসলামের স্তরসমূহ কী কী?
প্রশ্ন 49023
দ্বীন ইসলামের স্তরসমূহ কী কী? প্রত্যেকটি স্তরের অবস্থাসমূহ কী? ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের মধ্যকার পার্থক্য কী? ইহসানের ক্ষেত্রে মুহসিনদের স্তর কীরূপ?
উত্তরের সার-সংক্ষেপ
উত্তর
বিষয়সূচী
দ্বীন ইসলামের তিনটি স্তর রয়েছে: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। প্রত্যেক স্তরের অর্থ রয়েছে এবং স্তম্ভ রয়েছে।
প্রথম স্তর: ইসলাম
ইসলাম শব্দের আভিধানিক অর্থ: আত্মসমর্পণ করা ও অবনত হওয়া।
শরয়ী অর্থ: ব্যবহারভেদে এর অর্থ বিভিন্ন হয়। এর দুটি অবস্থা রয়েছে:
প্রথম অবস্থা: ইসলাম শব্দকে ঈমানের সাথে সংযুক্ত না করে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহার করা। তখন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হবে গোটা দ্বীন বা ধর্ম। অর্থাৎ দ্বীনের সকল মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখা। এর মধ্যে সকল প্রকার বিশ্বাস, কথা ও কাজ শামিল থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
“আল্লাহর কাছে ধর্ম হচ্ছে ইসলাম।”[সূরা আলে-ইমরান: ১৯]
তিনি আরো বলেন:
وَرَضِيْتُ لَكُمُ الإسْلامَ دِيْنا
“ধর্ম হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য পছন্দ করলাম।”[সূরা মায়েদা: ৩]
এছাড়াও তিনি বলেন:
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلاَمِ دِيناً فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ
“কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম চাইলে তার থেকে সেটি কখনো গ্রহণ করা হবে না।”[সূরা আলে-ইমরান: ৮৫]
তাই কিছু আলেম ইসলামের সংজ্ঞায় বলেছেন: ইসলাম হলো— তাওহীদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর প্রতি নত হওয়া এবং শির্ক ও শির্ককারী থেকে (নিজেকে) মুক্ত ঘোষণা করা।
দ্বিতীয় অবস্থা: ইসলাম শব্দটিকে ঈমানের সাথে একত্রে ব্যবহার করা। তখন ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য হবে বাহ্যিক কথাবার্তা ও কাজকর্ম। যেমন, আল্লাহর বাণী:
قالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَٰكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ
“বেদুঈনরা বলল: ‘আমরা ঈমান এনেছি।’ বলে দাও, তোমরা ঈমান আনোনি (তাই ঈমান এনেছি না বলে) বরং বলো, ‘আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি।’ ঈমান তোমাদের অন্তরে এখনো প্রবেশ করেনি।”[সূরা হুজুরাত: ১৪]
সহীহ বুখারী (২৭) ও মুসলিম (১৫০)-এ সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদল লোককে কিছু দান করলেন। সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানে বসে ছিলেন। সাদ বলেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এক ব্যক্তিকে কিছু দিলেন না। সে ব্যক্তি আমার কাছে তাদের চেয়ে অধিক পছন্দের ছিল। তাই আমি আরয করলাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! অমুক ব্যক্তিকে আপনি বাদ দিলেন কেন? আল্লাহর শপথ! আমি তো তাকে মুমিন বলেই জানি।’ তিনি বললেন: “নাকি মুসলিম?” তখন আমি কিছুক্ষণ নীরব থাকলাম। অতঃপর আমি তার সম্পর্কে যা জানি তা (ব্যক্ত করার) প্রবল ইচ্ছা হলো। তাই আমি আমার বক্তব্য আবার বললাম: ‘আপনি অমুককে দান থেকে বাদ রাখলেন? আল্লাহর শপথ! আমি তো তাকে মুমিন বলেই জানি।’ তিনি বললেন: ‘নাকি মুসলিম?’ তখন আমি কিছুক্ষণ নীরব থাকলাম। তারপর আমি তার সম্পর্কে যা জানি তা (ব্যক্ত করার) প্রবল ইচ্ছা হলো। তাই আমি আবার বললাম: ‘আপনি অমুককে দান থেকে বাদ রাখলেন? আল্লাহর শপথ! আমি তো তাকে মুমিন বলেই জানি।’ তিনি বললেন: ‘নাকি মুসলিম? সাদ! আমি কখনো ব্যক্তি বিশেষকে দান করি, অথচ অন্যলোক আমার নিকট তার চেয়ে অধিক প্রিয়। তা এ আশঙ্কায় যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে যেন অধঃমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত না করেন।”
সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তাকে বললেন: ‘অমুককে আপনি কেন দান থেকে বাদ রাখলেন? আল্লাহর কসম! আমি তো তাকে মুমিন বলেই জানি।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য: ‘নাকি মুসলিম?’ এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে “তুমি তার ঈমান দেখনি; বরং বাহ্যিক আমল দিয়ে তার ইসলাম সম্পর্কে জানতে পেরেছ।”
দ্বিতীয় স্তর: ঈমান
ঈমানের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে— এমন বিশ্বাস যা গ্রহণ করা ও আনুগত্য করাকে আবশ্যক করে।
শরয়ী অর্থ: ব্যবহারভেদে এর অর্থ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এর দুটি অবস্থা রয়েছে:
প্রথম অবস্থা: 'ইসলাম' শব্দের সাথে একত্রিত না করে এককভাবে ব্যবহৃত হওয়া। তখন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় গোটা ইসলাম ধর্ম। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
ٱللَّهُ وَلِىُّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ
“আল্লাহ ঈমানদারদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন।”[সূরা বাকারা: ২৫৭]
তিনি আরো বলেন:
وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِين
“আর তোমরা যদি (যথার্থ) ঈমানদার হও তাহলে আল্লাহর উপরই আস্থা রাখো।”[সূরা মায়েদা: ২৩]
এ অর্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “জান্নাতে মুমিনরা ছাড়া কেউ প্রবেশ করবে না।”[হাদীসটি মুসলিম (১১৪) বর্ণনা করেন]
সে কারণে সালাফগণ ইজমা করেছেন যে, ঈমান হলো— অন্তরের বিশ্বাস (এর মধ্যে অন্তরের আমলসমূহ প্রবেশ করবে); মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। ঈমান আনুগত্যের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় এবং অবাধ্যতার মাধ্যমে হ্রাস পায়।”
এ কারণেই যে ব্যক্তি সমগ্র দ্বীনকে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে ধারণ করে আল্লাহ ঈমানকে তার মাঝে সীমাবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَاناً وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ * الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ * أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقّاً لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
“মুমিন তো তারাই, আল্লাহর কথা আলোচিত হলে যাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হলে যাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা তাদের প্রভুর উপরই ভরসা করে। (মুমিন তারাই) যারা নামায সুসম্পন্ন করে এবং আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা থেকে (সৎকাজে) ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকার মুমিন। তাদের জন্য তাদের প্রভুর কাছে রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিক।”[সূরা আনফাল: ২-৪]
আল্লাহ তাআলা ঈমানকে এই সমস্ত কিছু (আমল) দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন:
وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَة وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآَتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآَتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
“পুন্য এটা নয় যে, তোমরা পূর্ব দিকে ও পশ্চিম দিকে মুখ ফিরাবে। বরঞ্চ পুন্য হচ্ছে (তাদের পুন্য) যারা ঈমান এনেছে— আল্লাহর প্রতি, পরকালের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, কিতাবের প্রতি ও নবীগণের প্রতি এবং সম্পদের প্রতি ভালোবাসা সত্ত্বেও সম্পদ দান করেছে— আত্মীয়-স্বজনকে, এতিম-মিসকীনকে, মুসাফিরকে, ভিক্ষুককে ও দাস মুক্তিতে এবং নামায আদায় করেছে ও যাকাত প্রদান করেছে এবং যারা অঙ্গীকার করলে অঙ্গীকার পূরণকারী এবং প্রশংসা করছি তাদের যারা অভাব-অনটনে, রোগ-বিমারে ও তীব্র যুদ্ধকালে ধৈর্যধারণকারী।”
এই সমস্ত গুণ উল্লেখ করার পর আল্লাহ বললেন: “এরাই হচ্ছে সত্যবাদী এবং এরাই হচ্ছে মুত্তাকী।”[সূরা বাকারা: ১৭৭]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আব্দুল কাইস গোত্রের প্রতিনিধি দলের কাছে ঈমানকে এসব আমল দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। সহিহ বুখারী (৫৩) ও মুসলিম (১৭)-এ বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমি তোমাদেরকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিচ্ছি। তোমরা কি জানো এক আল্লাহর প্রতি ঈমান কী? তারা বলল: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালো জানেন। তিনি বললেন: এই সাক্ষ্য প্রদান করা যে তিনি ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই; আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানে রোযা রাখা ও গনীমত থেকে এক-পঞ্চমাংশ প্রদান করা।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে ঈমানের সাথে ও সওয়াবের নিয়তে রোযা রাখাকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত উল্লেখ করেছেন। একইভাবে কদরের রাতে ইবাদত করা, আমানত ফিরিয়ে দেওয়া, জিহাদ করা, হজ্জ করা, জানাযার পেছনে চলা ইত্যাদি আমলকে তিনি ঈমানের অন্তর্গত বলে উল্লেখ করেছেন। সহিহ বুখারী (৯) ও মুসলিমে (৩৫) রয়েছে: “ঈমানের সত্তরটির বেশি শাখা-প্রশাখা রয়েছে। সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে— 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে— রাস্তা থেকে অনিষ্ট বস্তু দূর করা।” এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আয়াত ও হাদীসের সংখ্যা অনেক যা উল্লেখ করলে আলোচনা দীর্ঘ হবে।
দ্বিতীয় অবস্থা: ঈমানকে ইসলামের সাথে সংযুক্ত করে ব্যবহার করা। এ অবস্থায় ঈমান দ্বারা অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসগুলো উদ্দেশ্য। যেমনিভাবে জিবরীলের হাদীসে কিংবা এর সমার্থক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযায় দোয়া করতে গিয়ে যেমনিভাবে বলেছেন: “হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যাকে আপনি বাঁচিয়ে রাখেন তাকে ইসলামের উপর বাঁচিয়ে রাখুন। আর যাকে আপনি মৃত্যু দেন তাকে ঈমানের উপর মৃত্যু দিন।”[হাদীসটি তিরমিযী (১০২৪) বর্ণনা করেন এবং বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ। শাইখ আলবানী সহীহু সুনানিত তিরমিযী (১/২৯৯) গ্রন্থে হাদীসটিকে সহীহ বলে গণ্য করেছেন] কেননা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল করা জীবিত অবস্থায় সম্ভব। কিন্তু মৃত্যুর সময় অন্তরের কথা ও অন্তরের আমল ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।
ইসলাম ও ঈমানের মাঝে পার্থক্য
সারকথা হচ্ছে— ইসলাম ও ঈমান দুটিকে যখন আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয় তখন এই দুটির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। বরং তখন উভয়টি স্বতন্ত্রভাবে সমগ্র দ্বীন ইসলামকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর যদি শব্দদ্বয় দ্বারা আলাদা আলাদা অর্থ করা উদ্দেশ্য হয় তখন পূর্বোক্ত ব্যাখ্যার আলোকে পার্থক্য করতে হবে (ইসলাম: অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশমান বাহ্যিক বিষয়াবলির সাথে সম্পৃক্ত। আর ঈমান অন্তরের গোপনীয় বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত।) জিবরীলের হাদীসও এটাই প্রমাণ করে। হাদীসটি মুসলিম তার সহিহ গ্রন্থে (৮) সংকলন করেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: একবার আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে আবির্ভূত হলো। তার পরনের কাপড়-চোপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুলগুলো ছিল মিশমিশে কালো। সফর করে আসার কোন চিহ্নও তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি। আমাদের কেউই তাঁকে চিনেও না। অবশেষে সে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বসলো। সে তাঁর হাঁটুদ্বয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাঁটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে দিলো এবং দুই হাতের তালু তাঁর (অথবা নিজের) উরুর উপর রাখলো এবং বললো, ‘হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে বলুন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘ইসলাম হচ্ছে— তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ (উপাস্য) নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল, নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমাযানের রোযা পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য থাকে তাহলে বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে।’ সে বললো: ‘আপনি সত্যই বলেছেন।’ বর্ণনাকারী (উমার) বলেন, আমরা তাঁর কথা শুনে আশ্চর্যান্বিত হলাম। কেননা সে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করছে আর (বিজ্ঞের ন্যায়) সমর্থন করছে। এরপর সে বললো: ‘আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাকুলের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর প্রেরিত নবীদের প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং ঈমান আনবে ভালো তাকদীর ও মন্দ তাকদীরের প্রতিও।’ সে বললো: ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ এবার সে বললো: ‘আমাকে ‘ইহসান’ সম্পর্কে বলুন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘ইহসান’ হলো— তুমি এভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে যেন তাঁকে দেখছো। যদি তাঁকে না দেখো তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করবে।’ এবার সে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাকে কিয়ামাত সম্বন্ধে বলুন!’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি কিছু জানে না।’ অতঃপর সে বললো: ‘তাহলে আমাকে কিয়ামতের কিছু নিদর্শন বলুন।’ তিনি বললেন, ‘দাসী তাঁর মনিবকে প্রসব করবে এবং (এককালের) নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র, বকরীর রাখালদের বড় বড় দালান-কোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় গর্ব-অহংকারে মত্ত দেখতে পাবে।’ বর্ণনাকারী (উমর) বলেন, এরপর লোকটি চলে গেলো। আমি বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন: ‘হে ‘উমার! তুমি কি জানো, এ প্রশ্নকারী কে?’ আমি বললাম: ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘তিনি জিবরীল। তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দ্বীন (ধর্ম) শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।’
তৃতীয় স্তর: ইহসান
ইহসান শব্দের আভিধানিক অর্থে হচ্ছে— কোনো কাজ নিখুঁত, যথাযথ ও একনিষ্ঠতার সাথে করা।
শরীয়তের দৃষ্টিতে ব্যবহার অনুসারে এর অর্থ বিভিন্ন হয়ে থাকে। এর দুটি অবস্থা:
প্রথম অবস্থা: ইসলাম ও ঈমান এই দুটির কোনোটির সাথে সংযুক্ত না হয়ে এককভাবে ব্যবহৃত হওয়া। তখন সমগ্র দ্বীন উদ্দেশ্য হবে; যেমনটি ইসলাম ও ঈমানের ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থা: এই দুটির সাথে একত্রে কিংবা কোন একটির সাথে একত্রে ব্যবহৃত হওয়া। তখন এর অর্থ হবে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরকে সুন্দর করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহসানের এমন ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন যা তিনি ছাড়া আর কোনো মানুষ ব্যাখ্যা প্রদান করতে সক্ষম নয়। কেননা তাকে স্বল্পভাষ্যে ব্যাপক ভাব প্রকাশের তৌফিক প্রদান করা হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইহসান হচ্ছে: তুমি এভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে যেন তাঁকে দেখছো। যদি তাকে না দেখো তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করবে।’ আর এটি দ্বীনের সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ স্তর। এই ইহসানের অধিকারী ব্যক্তিরাই কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত এবং সর্বোচ্চ মর্যাদার স্তরভুক্ত।
ইহসানের ক্ষেত্রে মুহসিনদের স্তর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন যে ইহসানের স্তর দুটি। ইহসানের ক্ষেত্রে মুহসিনদের দুটি স্তরের দ্বারা তারতম্য হয়ে থাকে:
প্রথম ও উচ্চতর স্তর: আপনি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবেন যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন। আলেমদের কেউ কেউ এই স্তরের নাম দিয়েছেন ‘মুশাহাদাহ’ তথা দর্শনের স্তর। এ স্তরে বান্দা এমনভাবে আমল করবে যেন সে অন্তর দিয়ে আল্লাহকে দেখছে। ফলে তার অন্তর ঈমানে আলোকিত হবে। এমনকি গায়েব পরিণত হবে চাক্ষুষ বিষয়ের মতো। যে ব্যক্তি এই অনুভূতি নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে যে সে আল্লাহর নিকটে আছে, তাঁর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তার সামনে উপস্থিত আছে, যেন সে আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছে; এই অনুভূতি তার হৃদয়ে আল্লাহভীতি, শঙ্কা, সংকোচ ও সম্মানবোধ আবশ্যক করবে।
দ্বিতীয় স্তর: ইখলাস তথা একনিষ্ঠতার স্তর। এটি হচ্ছে বান্দা এভাবে আমল করবে যেন আল্লাহ তাকে দেখছেন, তার দিকে তাকিয়ে আছেন এবং তার কাছে আছেন। বান্দা যদি আমলের ক্ষেত্রে এমনটি অনুভব করে এবং এ অনুযায়ী আমল করে তাহলে সে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ। কারণ আমলের ক্ষেত্রে তার এই মনোযোগ তাকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দিকে ফিরে তাকাতে কিংবা অন্য কারো উদ্দেশ্যে আমল করতে তাকে বাধা দেয়। বান্দা যদি এই স্তরে পৌঁছতে পারে, তাহলে তার জন্য প্রথম স্তরে পৌঁছানো সহজ। তাই তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমটির কারণ হিসেবে এটি উল্লেখ করে বলেন: ‘তুমি যদি তাকে দেখতে না পাও, তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন'– এমনটি অনুভব করো। কিছু বর্ণনায় শব্দটি এ রকম: ‘তুমি যদি তাকে না দেখে থাকো তাহলে তিনি কিন্তু তোমাকে দেখছেন।’ বান্দা যদি ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন অবস্থায় পৌঁছে যে আল্লাহ তাকে দেখতে পাচ্ছেন, তার প্রকাশ্য-গোপনীয় বিষয়গুলো জানছেন, তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিষয়গুলো অবহিত হচ্ছেন, তাঁর কাছে বান্দার কোনো বিষয়ই গোপনীয় নয়, তখন তার জন্য দ্বিতীয় স্তরে উন্নীত হওয়া সহজ হয়। আর সেটি হচ্ছে বান্দা সর্বদা আল্লাহর নৈকট্য ও তাঁর সাহচর্য অনুভব করা; যেন বান্দা আল্লাহকেই দেখতে পাচ্ছে। আমরা আল্লাহর কাছে তাঁর বিপুল অনুগ্রহ থেকে কিছু কামনা করছি।
আরো জানতে (219), (14055) ও (208110) নং প্রশ্নোত্তরগুলো দেখুন।
সূত্র: শাইখ হাফেয আল-হাকামীর ‘মাআরেজুল কুবুল’ (২/২০-৩৩, ৩২৬-৩২৮), ইবনে উছাই্মীনের ‘আল-মাজমুউস সামীন’ (১/৪৯, ৫৩) এবং ইবনে রজব হাম্বলীর ‘জামেউল উলূমি ওয়াল হিকাম’ (১/১০৬)।
সূত্র:
ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব