যে ব্যক্তি অনেকবার কসম করেছে; কিন্তু সেগুলোর কাফ্‌ফারা আদায় করেনি

প্রশ্ন 89677

আমি খুব দ্রুত রেগে যাই এবং দ্রুত কসম করি। প্রায়শঃ আমি যে কসম করি সেগুলো লঙ্ঘন করি। আমি জানি না কতগুলো কসমের কাফ্‌ফারা আমার জমা হয়েছে। সংখ্যায় সেগুলো গুণে শেষ করতে পারব না। আমি আমার উপর আবশ্যক হওয়া কাফ্‌ফারা আদায় করতে চাই। আমার করণীয় কী? কসম ভঙ্গের কাফ্‌ফারা আদায়ের জন্য কি পরিবার-আত্মীয়দের দুপুরবেলা খাবারের দাওয়াত দিলে হবে? স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কসম করে যদি সেটা ভাঙা হয়, তাহলে কি কাফ্‌ফারা আবশ্যক হবে? উল্লেখ্য, তালাক দেওয়ার শপথের সময়ে কৃত নিয়ত অজানা। কিন্তু প্রবল ধারণা যে সেটা তালাকের উদ্দেশ্য নয়।

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

এক:

বেশি বেশি কসম করা মাকরূহ। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর আপনি আনুগত্য করবেন না এমন প্রত্যেক ব্যক্তির যে অধিক শপথকারী, লাঞ্ছিত।”[সূরা কলম: ১০] এখানে এমন ব্যক্তির নিন্দা করা। এ নিন্দার দাবি হল তার কাজটি মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হওয়া হবে। যেমনটা ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ “আল-মুগনী” (১৩/৪৩৯) বইয়ে বলেছেন।

দুই:

যে ব্যক্তি একাধিক কসম করেছে এবং কসম ভঙ্গ করেছে, কিন্তু সেগুলোর কোনোটার কাফ্‌ফারা আদায় করেনি, তার দুটো অবস্থা:

প্রথম অবস্থা: কসমগুলো একই বিষয়ে হবে। যেমন সে বলল: আল্লাহর কসম! আমি ধূমপান করব না। তারপর কসম ভঙ্গ করল, কিন্তু কাফ্‌ফারা আদায় করেনি। এরপর আবার কসম করল। এমন ব্যক্তির উপর একটা কাফ্‌ফারা আবশ্যক হবে।

দ্বিতীয় অবস্থা: কসমগুলো ভিন্ন ভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে হবে। যেমন: আল্লাহর কসম, আমি পান করব না। আল্লাহর কসম, আমি জামা পরব না। আল্লাহর কসম, আমি অমুক জায়গায় যাব না। এই সবগুলোর ক্ষেত্রে যদি সে কসম ভঙ্গ করে, কিন্তু কোনোটার কাফ্‌ফারা না দেয়, তাহলে তার উপর কি একটা কাফ্‌ফারা আবশ্যক হবে; নাকি অনেকগুলো কাফ্‌ফারা? এটা নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতভেদ আছে। জুমহুর (অধিকাংশ মাযহাব)-এর মতে যতবার কসম ভঙ্গ করবে, ততবার কাফ্‌ফারা দিতে হবে। এটাই সঠিক মত। কারণ কসমগুলো ভিন্ন ভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে হয়েছিল। প্রতিটা কসম স্বতন্ত্র।

দেখুন: আল-মুগনী (৯/৪০৬)।

শাইখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আমি একজন যুবক। আমি আল্লাহর নামে তিনবারের বেশি কসম করেছিলাম যে, একটা হারাম কাজ থেকে আমি তাওবা করব। আমার প্রশ্ন হল: আমার উপর কি একটা কাফ্‌ফারা আবশ্যক; নাকি তিনটা কাফ্‌ফারা? এবং আমাকে কী কাফ্‌ফারা দিতে হবে?

তিনি উত্তর দেন: “আপনাকে একটা কাফ্‌ফারা দিতে হবে। সেটা হল দশজন মিসকীনকে খাবার দেওয়া কিংবা কাপড় দেওয়া কিংবা একজন দাস মুক্ত করা। যে ব্যক্তি এর কোনটি করতে পারবে না সে তিনদিন রোযা রাখবে। দলিল হলো আল্লাহ সুবহানাহু বলেন: “তোমাদের বৃথা কসমের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না, কিন্তু যেসব কসম তোমরা ইচ্ছে করে করো সেগুলোর জন্য তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। তারপর এর কাফফারা দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান করা, যে খাদ্য তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, বা তাদেরকে বস্ত্রদান করা, কিংবা একজন দাসকে মুক্ত করা। আর যার সামর্থ্য নেই তার জন্য তিন দিন রোযা রাখা। তোমরা কসম করে (ভঙ্গ করলে) এটাই তোমাদের কসমের কাফফারা। তোমরা তোমাদের কসম রক্ষা করো।” [মায়েদা: ৮৯] এভাবে কোনো একটি কাজ করা কিংবা না-করার ব্যাপারে কসম করা হলে তার জন্য মাত্র একটি কাফ্‌ফারা আবশ্যক হবে; এমনটি একাধিকবার কসম করা হলেও। শর্ত হলো যদি দুই কসমের মাঝে প্রথম কসমের কাফ্‌ফারা আদায় করা না হয়। আর যদি প্রথম কসমের কাফ্‌ফারা দেওয়ার পর পুনরায় কসম করে, তাহলে কসম ভঙ্গ করলে দ্বিতীয় বার কাফ্‌ফারা আবশ্যক হবে। এভাবে যদি দ্বিতীয় বার কসম ভঙ্গের কাফ্‌ফারা দেওয়ার পর তৃতীয় বার কসম ভঙ্গ করে, তাহলে তৃতীয় আরেকটা কাফ্‌ফারা আবশ্যক হবে।

আর যদি একাধিক কাজ করা বা না-করার ব্যাপারে বারবার কসম করা হয়, তাহলে প্রতিটি কসমের জন্য একটা করে কাফ্‌ফারা দিতে হবে। যেমন কেউ বলল: আল্লাহর কসম! আমি অমুকের সাথে কথা বলব না। আল্লাহর কসম! আমি ঐ খাবার খাবো না। আল্লাহর কসম! আমি অমুক জায়গায় যাব না। অথবা বলল: আল্লাহর কসম! আমি অমুকের সাথে কথা বলব। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তাকে মারব ইত্যাদি।

প্রত্যেক মিসকীনকে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রধান খাদ্যদ্রব্যের অর্ধ সা‘ পরিমাণ খাবার দেওয়া আবশ্যক। অর্ধ সা' এর পরিমাণ প্রায় দেড় কেজি।

পোশাকের ক্ষেত্রে যে পোশাক নামায পড়ার জন্য যথেষ্ট হয় এমন পোশাক দিতে হবে। যেমন: কামিজ অথবা লুঙ্গি ও চাদর। আর যদি মিসকীনদেরকে দুপুর বেলা অথবা রাতের বেলা দাওয়াত দিয়ে খাইয়ে দেয় তাহলে সেটাও যথেষ্ট হবে। কারণ ইতঃপূর্বে উল্লিখিত আয়াতটির ব্যাপকতা এটাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। আর আল্লাহ তৌফিকদাতা।” [মাজমূ ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে বায (২৩/১৪৫) থেকে সমাপ্ত]।

তিন:

আপনি যদি নিশ্চিতভাবে কসমের সংখ্যা না জেনে থাকেন, তাহলে কাছাকাছি সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা করুন। তারপর সেই কাছাকাছি সংখ্যার কাফ্‌ফারা প্রদান করুন (যদি সেই কসম ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে হয়ে থাকে) যতক্ষণ না আপনার প্রবল ধারণা হয় যে, আপনার উপর ওয়াজিব হওয়া কাফ্‌ফারা আপনি আদায় করতে পেরেছেন।

চার:

আপনার আত্মীয়রা যদি ফকির ও মিসকীন হয় এবং তাদের মধ্য থেকে দশজনকে আপনি দুপুরের বা রাতের খাবারে দাওয়াত দেন, তাহলে কসম ভঙ্গের কাফ্‌ফারা হিসেবে সেটা যথেষ্ট হবে। চাই আপনি তাদেরকে এক মজলিসে দাওয়াত দেন কিংবা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দাওয়াত দেন।

আর যে ব্যক্তি দাস মুক্ত করতে, খাওয়াতে কিংবা পোশাক দিতে পারবে না; সে তিন দিন রোযা রাখবে যেমনটি পূর্বোক্ত আয়াতে উদ্ধৃত হয়েছে।

পাঁচ:

তালাকের কসম ভয়াবহ বিষয়। অধিকাংশ ফকীহের মতে এই কসম ভঙ্গ করলে তালাক হয়ে যাবে। তাই এটা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কিছু আলেম মনে করেন এর জন্য কসমকারীর নিয়ত দেখতে হবে। যদি সে হুমকি দেয়া, উৎসাহিত করা, নিষেধ করা, সত্যায়ন করা বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য কসম করে থাকে, তারপর সেটা ভঙ্গ করে, তাহলে তার উপর কসম ভঙ্গের কাফ্‌ফারা আবশ্যক হবে। আর যদি তালাকের নিয়ত করে, তাহলে তালাক পতিত হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়তের ব্যাপারে নিজেই সবচেয়ে ভালো জানে। তার ধারণায় যদি কোনো একটা দিক প্রাধান্য পায়, তাহলে প্রবল ধারণার উপর ভিত্তি করেই সে আমল করবে।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

কসম ও মান্নত

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android