ব্যবসায়ীরা কীভাবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) বাস্তবায়ন করতে পারবে

প্রশ্ন 128891

আমি ব্যবসার ক্ষেত্রে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের (ভরসা) পদ্ধতি জানতে আগ্রহী।

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

মুসলিমের সমস্ত প্রয়োজনে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা তার ঈমানের অন্যতম আলামত। রিযিক অন্বেষণের ক্ষেত্রে এই তাওয়াক্কুল আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আবু হাতেম ইবনে হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য হলো: যিনি রিযিকের দায়িত্ব নিয়েছেন (আল্লাহ তায়ালা) তাঁর ওপর অবিচলভাবে তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা। কেননা, তাওয়াক্কুল হলো ইমানের ‘নিযাম’ (নিযাম হলো ঐ সুতা যাতে মালার গুটিগুলো গাঁথা হয়) এবং তাওহীদের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। আর এটিই হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ ও প্রশান্তি লাভের মাধ্যম। কোনো ব্যক্তি যখন তার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আল্লাহ তাআলার ওপর এমনভাবে তাওয়াক্কুল করে, যেখানে আল্লাহর জিম্মাদারি ও প্রতিশ্রুতির ওপর তার আস্থা, নিজের হাতের সঞ্চয়ের চেয়েও সুদৃঢ় হয়, তখন আল্লাহ তাকে কখনোই তাঁর বান্দাদের মুখাপেক্ষী করেন না এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারেনি।

মানসুর ইবনে মুহাম্মাদ আল-কারীযী আমাকে কবিতা বলেছেন:

তোমার প্রতিটি প্রয়োজনে ভরসা রাখো পরম করুণাময় রহমানের ওপর

যা কিছু তুমি চাও; নিশ্চয়ই আল্লাহই তা ফয়সালা করেন ও নির্ধারণ করেন।

আরশের মালিক যখন বান্দার ব্যাপারে কিছু করার ইচ্ছা করেন, সেটা তাকে পেয়ে বসে; আর বান্দার নির্বাচনের সুযোগ নেই।

কখনো মানুষ নিরাপদ ভেবে ধ্বংসে পতিত হয়, আবার কখনও আল্লাহর ইচ্ছায় বিপদ সংকুল থেকে বেঁচে যায়।

[রাওদাতুল উকালা ওয়া-নুযহাতুল ফুদালা: (পৃ. ১৫৩-১৫৪)]

আর ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুলের জন্য বান্দাকে যে সকল বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে সেগুলো হলো:

ক. সে বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ আদিকালেই তাঁর সৃষ্টিকুলের মাঝে রিযিক বণ্টন করেছেন এবং নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

আবু হাতেম ইবনে হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

“বুদ্ধিমান ব্যক্তি ভালো করেই জানেন যে, রিযিক বন্টনের কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। পরম সুউচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী (আল্লাহ তায়ালা) নিজেই বান্দাদের প্রয়োজনের মুহূর্তে তা পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দেওয়ার জিম্মাদারি নিয়েছেন। সুতরাং, যে বিষয়ের দায়িত্ব ও গ্যারান্টি স্বয়ং আল্লাহ নিয়েছেন, কেবল সেটা অন্বেষণের পেছনে (উদ্বিগ্ন হয়ে) মগ্ন থাকা দূরদর্শী ও দৃঢ়চেতা মানুষের চরিত্র নয়; তবে শর্ত হলো: ব্যক্তির অন্তরের বিশ্বাস যেন এমন বিশুদ্ধতায় আচ্ছন্ন থাকে যে, সে যদি তার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যে যথাযথ চেষ্ট নাও করতে পারে, তবুও তার রিযিক তার কাছে এমন উৎস থেকে চলে আসবে যা সে কল্পনাও করেনি।”[রাওদাতুল উকালা ওয়া-নুযহাতুল ফুদালা: পৃ. ১৫৫]।

খ. রিযিক অন্বেষণে মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর সাথে অন্তরের ভরসাগত সম্পর্ক ছিন্ন করা।

আবু হাতেম ইবনে হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

“তাওয়াক্কুল হল: সৃষ্টিকুলের আশা বর্জন করে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা থেকে অন্তরকে বিচ্ছিন্ন করা এবং সমস্ত অবস্থার পরিবর্তনকারী (আল্লাহর) সাথে অন্তরের মুখাপেক্ষিতাকে জুড়ে দেওয়া। কখনো কখনো একজন মানুষ দুনিয়াবী ক্ষেত্রে প্রাচুর্যশালী হতে পারেন, অথচ তিনি তাওয়াক্কুলকারী ও তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রেও সত্যনিষ্ঠ, যখন প্রাচুর্য থাকা ও না-থাকা উভয়ই তার কাছে সমান মনে হয় এবং এ দুটোর মধ্যে সে কোনো পার্থক্য দেখে না। সম্পদ থাকলে সে কৃতজ্ঞতা আদায় করে, আর না-থাকলে সে সন্তুষ্ট থাকে।

আবার কখনো এমনও হতে পারে যে, কোনো মানুষের কাছে কোনো কলা-কৌশলে দুনিয়ার কোনো কিছুই নেই, অথচ সে মোটেও তাওয়াক্কুলকারী নয়; (তা তখনই হয়) যখন তার কাছে অভাবের চেয়ে প্রাচুর্য বা পাওয়াটা বেশি প্রিয় হয়। ফলে সে অভাবের সময় নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে পারে না, আবার যখন কিছু পায়, তখনও তার সেই অবস্থানের জন্য শুকরিয়া আদায় করে না।”[রাওদাতুল উক্বালা ওয়া-নুযহাতুল ফুদালা: (পৃ. ১৫৬)]।

গ. রিযিক অন্বেষীর হৃদয় তার রব মহান আল্লাহর উপর নির্ভরশীল থাকবে, সাথে উপায়-উপকরণের সাহায্য নিবে এবং তা অন্বেষণে প্রচেষ্টা চালাবে।

তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে যে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে হবে এর সপক্ষে দলীল হলো: আবু তামীম আল-জাইশানীর হাদীস, তিনি বলেন: আমি উমরকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথাযথ তাওয়াক্কুল (ভরসা) করতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে সেভাবে রিযিক দিতেন, যেভাবে পাখিকে রিযিক দেন। পাখি ক্ষুধার্ত পেটে সকালে বের হয়ে যায়, আর ভরপেটে সন্ধ্যায় ফিরে আসে।” [হাদীসটি তিরমিযী (২৩৪৪) ও ইবন মাজাহ (৪১৬৪) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহুত তিরমিযীতে এটাকে সহীহ বলেছেন]।

ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

“উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের (ভরসার) সাথে সাংঘর্ষিক না। তারপর তিনি “তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথাযথ তাওয়াক্কুল করতে ... ” শীর্ষক হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন: আল্লাহ রিযিক অন্বেষণে পাখির সন্ধ্যায় ও সকালে গমন সাব্যস্ত করেছেন, যদিও পাখি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে। কারণ তিনিই সৃষ্টি করেন, পরিচালিত করেন এবং উপকরণ প্রদান করেন।”[তাফসীর ইবনে কাসীর: (৮/১৭৯)]।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

“সুতরাং বান্দার উচিত আল্লাহর উপর অন্তরকে নির্ভরশীল রাখা; কোনো উপকরণের উপর নয়। আল্লাহ তার জন্য এমন সব উপকরণ সহজ করে দিবেন যা দুনিয়া ও আখিরাতের অবস্থা সুষ্ঠু করে দিবে।” [মাজমুউল ফাতাওয়া (৮/৫২৮)]।

শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

“তাওয়াক্কুল দুটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে।

এক: আল্লাহর উপর নির্ভর করা এবং এ বিশ্বাস রাখা যে, তিনি কারণের স্রষ্টা ও তাঁর সিদ্ধান্ত কার্যকর। তিনি যাবতীয় বিষয় নির্ধারণ করে রেখেছেন, গণনা করেছেন এবং লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

দুই: উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা। উপকরণ গ্রহণ না করা তাওয়াক্কুল নয়। বরং তাওয়াক্কুল হলো: উপকরণ গ্রহণ করা এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করা, এ উভয়টার মাঝে সমন্বয়। যে ব্যক্তি উপকরণ গ্রহণ করল না, সে শরীয়ত ও বিবেক-বুদ্ধির বিরুদ্ধাচারণ করল।”[ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে বায: (৪/৪২৭)]।

দুই ইমামের কথা ও উক্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন (118262) নং প্রশ্নের উত্তর।

ঘ. মহান আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা করা এবং তার কাছে দোয়া করা, চাওয়া ও প্রার্থনা করার মাধ্যমে আশ্রয় নেওয়া।

শাইখুল ইসলাম বলেন: রিযিক নিয়ে চিন্তিত ব্যক্তির উচিত উক্ত বিষয়ে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা ও তাঁর কাছে দোয়া করা। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আল্লাহর বাণী বর্ণিত হয়েছে: “হে আমার বান্দারা! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত, তবে আমি যাকে খাদ্য দান করি সে ছাড়া। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের আহার করাব। হে আমার বান্দারা! তোমরা সবাই বস্ত্রহীন, কিন্তু আমি যাকে পরিধান করাই সে ব্যতীত। সুতরাং তোমরা আমার কাছে পরিধেয় চাও, আমি তোমাদের পরিধান করাবো।” (হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন)।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

ব্যবসা-বাণিজ্য
সৎ গুণাবলী

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

answer

সংশ্লিষ্ট প্রশ্নোত্তরসমূহ

at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android