তাওবার পর হারাম সম্পদ থেকে মুক্ত হওয়ার বিধানসমূহ

2

প্রশ্ন 219679

তাওবার পর হারাম সম্পদ থেকে নিষ্কৃতি লাভের বিষয়ে আমি বহু ফতোয়া পড়েছি। এই বিষয়ে সঠিক মত আমার কাছে স্পষ্ট হয়নি। একবার দান করে দেওয়াকে আবশ্যক করা হয়। আবার মালিককে ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়। অন্যবার এর থেকে উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়। হারাম সম্পদের মধ্যেও কি রকমফের আছে? এ বিষয়ে সঠিক বক্তব্য কী?

উত্তর

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

হারাম সম্পদের বহু রূপ ও অবস্থা রয়েছে। সম্পদ সত্তাগত কারণে হারাম হতে পারে। আবার উপার্জনের পদ্ধতির কারণে হারাম হতে পারে। যে সম্পদ উপার্জনের পদ্ধতির কারণে হারাম হয় তা কখনো মালিকের সম্মতিতে নেওয়া হতে পারে, আবার কখনো তার সম্মতি ছাড়া নেওয়া হতে পারে। কখনো উপার্জনকারী ব্যক্তি হারাম হওয়া জানতে পারে, আবার কখনো নাও জানতে পারে, আবার কখনো ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে। প্রতিটি অবস্থার স্বতন্ত্র বিধান রয়েছে।

এক:

যে ব্যক্তি এমন সম্পদ উপার্জন করেছে যা সত্ত্বাতভাবে হারাম অথবা এমন কোনো বস্তু যা শরীয়ত বিক্রি করা, রাখা বা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করেছে, এটি যে পথেই উপার্জন করা হোক না কেন; সেটি মালিককে ফেরত দেবে না এবং নিজের কাছেও রেখে দিবে না। বরং তা ধ্বংস করে ফেলা তার উপর আবশ্যক। আর তা থেকে উপকার গ্রহণ করা জায়েয নেই; চাই সেটা বিক্রির মাধ্যমে হোক, কেনার মাধ্যমে হোক, উপহার দেওয়ার মাধ্যমে হোক, সংরক্ষণ করার মাধ্যমে হোক কিংবা অন্য কোনোভাবে হোক।

সত্ত্বাগভাবে হারাম সম্পদ বলতে বোঝায়: “যে বস্তুর ওপর নিষেধাজ্ঞা তার সত্তাগত কারণেই আরোপিত হয়েছে”। যেমন: মদ, মূর্তি, শুকর ইত্যাদি।

দুই:

যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ও মালিকের অসম্মতিতে বা অনুমতি ছাড়া গ্রহণ করেছে; যেমন চুরিকৃত সম্পদ, জবরদখলকৃত সম্পদ, আত্মসাৎকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রতারণা ও ধোঁকার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ, বাড়তিপ্রদেয় সুদ যা ব্যক্তি বাধ্য হয়ে বা নিরুপায় হয়ে দেয় এবং প্রদেয় ঘুষ যা ব্যক্তি নিজের অধিকার পাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে প্রদান করে; এ ধরনের সম্পদ অবশ্যই এর প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। এ ছাড়া দায়মুক্তি হবে না।

যদি সে এটি খরচ করে ফেলে বা তছরূপ করে ফেলে, তবে যতদিন না সে তা মালিককে ফেরত দিতে সক্ষম হবে, ততদিন তা তার ওপর ঋণ হিসেবে রয়ে যাবে।

ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যদি গ্রহণ করা বস্তুটি মালিকের সম্মতি ছাড়া নেওয়া হয়ে থাকে এবং এর বিনিময় পরিশোধ করা না হয়ে থাকে; তবে তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি তাকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর না হয় তবে তা তার উপর ঋণ হিসেবে জেনে পরিশোধ করে দিবে। যদি এটিও সম্ভবপর না হয় তাহলে তা মালিকের উত্তরাধিকারীদেরকে ফিরিয়ে দিবে। আর যদি সেটিও সম্ভবপর না হয় তাহলে এটি তার পক্ষ থেকে সদকা করে দিতে হবে।

যদি কিয়ামতের দিন মালিক সদকার সওয়াব গ্রহণ করতে চায়, তবে সেটা তার জন্য হবে। আর যদি সে তার সম্পদ ভক্ষণকারী থেকে নেক আমল ছাড়া অন্য কিছু নিতে রাজি না হয় তাহলে সে তার সম্পদের সমপরিমাণ নেক আমল তার থেকে গ্রহণ করবে। আর সদকাকারী সদকার সওয়াব পাবে। এভাবে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে সাব্যস্ত।”[যাদুল মা‘আদ (৫/৬৯০)]

এই ধরনের হারাম সম্পদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা দেখা যেতে পারে (83099) ও (169633) নম্বর প্রশ্নের উত্তর।

তিন:

যে ব্যক্তি কোনো হারাম লেনদেনের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জন করেছে, কারণ সে জানত না যে এই লেনদেন হারাম অথবা কোনো বিশ্বস্ত আলেমের ফতোয়ার ওপর ভিত্তি করে তা বৈধ মনে করেছিল, তবে তার ওপর কোনো কিছু আবশ্যক হবে না। শর্ত হলো: যখনই সে এর হারাম হওয়ার বিষয়টি জানবে, তখনই এর থেকে বিরত হতে হবে।

আল্লাহ বলেন:

فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ

অতএব যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে (সুদ খাওয়া থেকে) বিরত হলো, তবে যা আগে হয়ে গেছে তা তারই থাকবে।[সূরা বাকারা: ২৭৫]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমাদের কাছে যা সন্দেহাতীত, তা হলো: যে ব্যক্তি ভুল ব্যাখ্যা বা অজ্ঞতার কারণে কিছু গ্রহণ করেছে, তার জন্য আগে যা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বৈধ। যেমনটি কুরআন, সুন্নাহ ও যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত।”[তাফসীরু আয়াতিন আশকালাত আলা কাসীরিম মিনাল উলামা (২/৫৯২)]

তিনি আরো বলেন: “যে সব লেনদেনের ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে মতভেদ রয়েছে এমন কোনো লেনদেনের মাধ্যমে যে ব্যক্তি কোনো সম্পদ অর্জন করেছে এবং এক্ষেত্রে সে তা’বীলকারী (ভুল ব্যাখ্যাকারী) ও জায়েয বিশ্বাসকারী; সেটা ইজতিহাদের কারণে বা তাকলিদের কারণে বা কোনো আলেমের অনুসরণে কিংবা যেহেতু কোনো আলেম তাকে এই মর্মে ফতোয়া দিয়েছেন বা অনুরূপ কোনো কারণে: তার উপার্জিত ও গৃহীত এ সম্পদগুলো ফেরত দেওয়া তার উপর আবশ্যক নয়। যদিও পরে তার কাছে স্পষ্ট হয় যে সে ভুল করেছিল এবং যে ব্যক্তি তাদেরকে ফতোয়া দিয়েছিল তিনিও ভুল ফতোয়া দিয়েছিলেন…

তাই দলিলকে তা’বীলকারী (ব্যাখ্যাকারী) কোনো মুসলিম বৈধ বিশ্বাস করে যে সব বেচাকেনা, ভাড়াপ্রদান ও লেনদেন সম্পাদন করেন, যেগুলোর বৈধতার পক্ষে কিছু আলেমের ফতোয়া রয়েছে এবং এ লেনদেনগুলোর মাধ্যমে কিছু সম্পদ হস্তগতও করেছেন এবং পরবর্তীতে তাদের কাছে যদি স্পষ্ট হয় যে, সঠিক অভিমত হচ্ছে এগুলো হারাম: সেক্ষেত্রে তারা ব্যাখ্যার মাধ্যমে যে সম্পদগুলো গ্রহণ করেছেন সেগুলো তাদের জন্য হারাম হবে না।”[মাজমূউল ফাতাওয়া (২৯/৪৪৩)]

তিনি আরো বলেন: “যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করল যে কাজকে সে হারাম বলে জানত না, পরবর্তীতে সে জেনেছে: তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না। যদি কেউ জায়েয বিশ্বাস করে কিছু সুদী লেনদেন করে এবং এ লেনদেন থেকে যা গ্রহণ করার তা গ্রহণ করে, পরে তার কাছে তার রবের উপদেশ পৌঁছে তখন সে এর থেকে বিরত হয় তবে পূর্বের উপার্জন তার জন্য বৈধ।”[সমাপ্ত][তাফসীরু আয়াতিন আশকালাত আলা কাসীরিম মিনাল উলামা (২/৫৭৮)]

ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ফতোয়াতে এসেছে (১৫/৪৬): “আপনি চাকুরীর জন্য ব্যাংকে যে সময় কাটিয়েছেন, আমরা আশা করছি আল্লাহ তা‘আলা আপনার সেই সময়ের গুনাহ ক্ষমা করবেন। আর সেই সময়ের চাকুরীর মাধ্যমে আপনি যে অর্থ উপার্জন করেছেন ও গ্রহণ করেছন, যদি সে সময় আপনি এ বিষয়ে শরয়ি হুকুম না জেনে থাকেন তাহলে এর জন্য আপনার কোনো গুনাহ নেই।”[সমাপ্ত][ফাতাওয়াল লাজনা আদ-দাইমা (১৫/৪৬)]

শাইখ উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যদি সে না জানে যে এটি হারাম, তবে সে যা গ্রহণ করেছে সবই তার জন্য বৈধ এবং তার উপর অন্য কিছু বর্তাবে না। কিংবা সে যদি কোনো আলেমের ফতোয়ার মাধ্যমে বিভ্রান্ত হয়ে থাকে যে, ‘এটি হারাম নয়’, তাহলে তাকে কোনো কিছু পরিশোধ করতে হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ

অতএব যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে (সুদ খাওয়া থেকে) বিরত হলো, তবে যা আগে হয়ে গেছে তা তারই থাকবে। আর তার বিষয় আল্লাহর উপর ন্যস্ত।’”[সমাপ্ত][আল-লিকাউশ শাহরী (১৯/৬৭), শামেলা সংস্কারণ]

চার:

যে ব্যক্তি জেনেশুনে হারাম উপার্জন করেছে এবং তা মালিকের অনুমতি ও সন্তুষ্টিতে গ্রহণ করেছে; যেমন বাতিল চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ, হারাম পেশার বেতন, হারাম ব্যবসার লাভ, হারাম সেবার পারিশ্রমিক (যেমন মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, সুদের দলীল লেখা), ঘুষ হিসেবে নেওয়া অর্থ যাতে দাতা এমন কিছু পায় যা তার প্রাপ্য নয় কিংবা জুয়া, লটারি, গণকবিদ্যা ইত্যাদির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ… এ ধরনের উপার্জনের কারণে হারাম হওয়া অর্থ মালিককে ফেরত দেওয়া আবশ্যক না হওয়ার মতটি আলেমদের দু’টি মতের মাঝে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।

ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যদি প্রদানকারীর সন্তুষ্টিতে গৃহীত বিনিময় গ্রহণ করা হয় এবং প্রদানকারী এর বিপরীতে হারাম বিনিময় আদায় করে নেয়, যেমন কেউ মদের বিনিময় গ্রহণ করল, শূকরের বিনিময় গ্রহণ করল, ব্যভিচার বা অশ্লীল কাজের বিনিময় গ্রহণ করল; তাহলে এই প্রদানকারীকে গৃহীত বিনিময় ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়। কারণ সে স্বেচ্ছায় এ বিনিময় দিয়েছে এবং হারাম বিনিময় গ্রহণ করেছে। সুতরাং তাকে বিনিময় ও বিনিমেয় উভয়টি একসাথে দেওয়া জায়েয নয়। কেননা এর মাধ্যমে তাকে গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহায়তা করা হয় এবং পাপীদের জন্য কাজ সহজ করা হয়।

তাছাড়া ব্যভিচারী বা কুকামে লিপ্ত ব্যক্তি আর কী-ই বা চাইতে পারে, যদি সে জানতে পারে যে সে নিজের কুউদ্দেশ্যও সফল করতে পারবে, আবার তার অর্থও ফেরত পেয়ে যাবে! অতএব, শরীয়ত এই ধরণের বিধান দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র এবং এমন মত পোষণ করা কোনোভাবেই সংগত নয়।”[যাদুল মা‘আদ (৫/৬৯১)]

অধিকাংশ আলেমের মতে, এ ধরনের হারাম অর্থ থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় হলো তা গরীব-মিসকিনদের মাঝে ও জনকল্যাণমূলক কাজ ইত্যাদিতে সদকা করে দেওয়া। যদি সে তা যেকোনোভাবে খরচ করে ফেলে, তবে তা তার দায়িত্বে ঋণ হিসেবে থেকে যাবে এবং সামর্থ্য হলে তাকে তা সদকা করতেই হবে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যে ব্যক্তি কোনো হারাম বস্তু বা হারাম উপকারের বিনিময় গ্রহণ করেছে; যেমন মদ বহনকারীর মজুরি, ক্রুশ নির্মাতার মজুরি, বেশ্যার পারিশ্রমিক ইত্যাদি: তার উচিত ঐ সম্পদ সদকা করে দেওয়া এবং ঐ হারাম কাজ থেকে তাওবা করা। এই সদকা তার কৃত কাজের কাফফারা হবে। কারণ এই অর্থ থেকে উপকার নেওয়া জায়েয নয়। যেহেতু এটি নিকৃষ্ট বিনিময়। আর এটি এর মালিককে ফেরতও দেওয়া হবে না। কারণ সে এর বিনিময় ইতোমধ্যেই গ্রহণ করেছে। বরং এটি সদকা করে দিতে হবে, যেমনটি কিছু আলেম বলেছেন। অনুরূপ কথা ইমাম আহমদ মদ বহনকারীর ব্যাপারেও বলেছেন। মালিকী আলেমসহ অন্যরাও এটি স্পষ্টভাবে বলেছেন।”[মাজমূউল ফাতাওয়া (২২/১৪২)]

আল-ইখতিয়ার লি-তা’লীলিল মুখতার (৩/৬১) প্রণেতা বলেন: ‘নিকৃষ্ট মালিকানার পথ হলো সদকা করে দেওয়া।’[সমাপ্ত]

ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দাইমাহ (১৪/৩২)-তে এসেছে: “যদি হারাম উপার্জনের সময় সে জানে যে তা হারাম, তবে তাওবার মাধ্যমে এটি তার জন্য হালাল হবে না। বরং তা থেকে মুক্ত হতে হবে সৎকাজে ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার মাধ্যমে।”[ফাতাওয়াল-লাজনা আদ-দাইমা (১৪/৩২)]

শাইখ ইবনে উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “পক্ষান্তরে, যদি সে জেনে থাকে যে তা হারাম, তাহলে সদকা করে দেয়ার মাধ্যমে তাকে সুদ থেকে মুক্ত হবে অথবা মসজিদ নির্মাণ, রাস্তা সংস্কার কিংবা অনুরূপ কাজে তা খরচ করতে হবে।”[সমাপ্ত][আল-লিকাউশ শাহরী (৬৭/১৯), শামেলা সংস্করণ]

ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহর মনোনীত অভিমত হচ্ছে: যদি সে দরিদ্র হয় তবে সে এর থেকে তার প্রয়োজন মাফিক নিতে পারবে। তিনি বলেন: “এর থেকে মুক্ত হওয়ার পথ এবং পূর্ণ তাওবা হলো: সদকা করা। তবে যদি সে দরিদ্র হয়, তাহলে সে নিজের প্রয়োজন পরিমাণ নিতে পারবে এবং বাকিটা সদকা করে দিবে। এই বিধান সব নিকৃষ্ট উপার্জনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; চাই তা বস্তু হোক অথবা কোনো ধরনের উপকার হোক।”[যাদুল মা‘আদ (৫/৬৯১) থেকে সমাপ্ত]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ অন্য এক বক্তব্যে যে মতের দিকে ঝুঁকেছেন তা হলো: যেহেতু সে তাওবা করেছে সুতরাং সে তা সদকা না করে নিজেও ভোগ করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন: “আর যদি হারাম জেনেও উপার্জন করে তবে এ বিষয়ে আরও গভীর চিন্তা করা প্রয়োজন। কারণ বলা যেতে পারে: এই নীতির ধারাবাহিকতায় যে ব্যক্তি হারাম জেনেও মদ বিক্রির মূল্য থেকে অর্থ উপার্জন করেছে অতীতের উপার্জন তারই থাকবে (দান করা বা ফেরত দেওয়া লাগবে না)।

অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি হারাম সম্পদ উপার্জন করেছে এবং পরবর্তীতে তাওবা করেছে— যদি তা প্রদানকারীর সন্তুষ্টির মাধ্যমে উপার্জন করে থাকে তবে সেই সম্পদ তারই থাকবে। একই বিধান বেশ্যার পারিশ্রমিক বা গণকের উপার্জনের ক্ষেত্রেও অনিবার্য হবে।

এই বিধান শরিয়তের মূলনীতিগুলো থেকে দূরবর্তী নয়। কারণ শরীয়ত তাওবাকারী ও তাওবা না-করা ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করে। যেমন আল্লাহ বলেন:

فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ

অতএব যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে (সুদ খাওয়া থেকে) বিরত হলো, তবে যা আগে হয়ে গেছে তা তারই থাকবে।[সূরা বাকারা: ২৭৫]

এছাড়া আল্লাহ বলেন:

قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ

কাফেরদেরকে বলুন, যদি তারা বিরত হয় তবে পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করা হবে।[সূরা আনফাল: ৩৮]

... এ মতকে আরও যে বিষয়টি শক্তিশালী করে তা হলো: এই অর্থ নষ্ট করা যাবে না ¾ এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। সুতরাং হয় এটি সদকা করে দেয়া হবে অথবা পাপে অটল থাকা সত্ত্বেও ব্যভিচারী ও মদ্যপের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে অথবা তা এই তাওবাকারীর কাছেই থাকবে।

ব্যভিচারী বা মদ্যপকে ফেরত দেওয়া হলে ভয়াবহ অনিষ্ট ঘটবে। কেউ জেনেবুঝে এই মত দিতে পারে না। যদিও ফকীহদের মধ্যে কেউ কেউ এই কথা বলেন। কেননা এতে দ্বিগুণ অনিষ্ট রয়েছে। ... বরং সদকা করাই উত্তম পথ।

তবে বলা যায়: এই তাওবাকারী অন্যদের তুলনায় এর বেশি হকদার। বিশেষতঃ যদি সে গরিব হয়। অন্যান্য দরিদ্র ব্যক্তিদের চেয়ে সে এর বেশি হকদার। আমি বহুবার এভাবেই ফতোয়া দিয়েছি। যদি সে গরিব হয় তবে তার প্রয়োজন পরিমাণ নেওয়া তার জন্য বৈধ। কারণ সে অন্যের চেয়ে এর বেশি হকদার এবং এর মাধ্যমে তাকে তাওবায় সহায়তা করা হয়। যদি তাকে এর থেকে মুক্ত হতে বাধ্য করা হয়, তবে সে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাওবা নাও করতে পারে। কেউ যদি শরীয়তের মূলনীতিগুলো নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করে তাহলে সে জানতে পারবে যে, শরীয়ত মানুষের জন্য তাওবার সকল পথকে সহজ করে।

অধিকন্তু, তার জন্য এটি গ্রহণ করায় কোনো অনিষ্ট নেই। কারণ এই অর্থ মালিকের মালিকানা থেকে বের হয়ে গেছে এবং বস্তুটি সত্তাগতভাবে হারাম নয়। বরং হারাম হয়েছে হারামের ক্ষেত্রে এর সহায়তা গ্রহণ করার কারণে। আর তা তাওবার মাধ্যমে ক্ষমা হয়ে গেছে। তাই দারিদ্র্যের অবস্থায় এটি নিঃসন্দেহে তার জন্য হালাল। ধনীর ক্ষেত্রেও তা নেওয়ার একটি যুক্তি রয়েছে। এ অভিমতের মাধ্যমে যে ব্যক্তি এমন সম্পদ উপার্জন করেছে তার জন্য তাওবাকে সহজীকরণ করা হয় ...

আল্লাহ তাআলা বলেন: অতএব যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে (সুদ খাওয়া থেকে) বিরত হলো, তবে যা আগে হয়ে গেছে তা তারই থাকবে। আর তার বিষয় আল্লাহর উপর ন্যস্ত। আল্লাহ বলেননি: ‘যে ইসলাম গ্রহণ করেছে’ কিংবা ‘যার কাছে হারাম স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে’ বরং তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তির কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হয়েছে। আর এই উপদেশ যে ব্যক্তি হারামকে জানেনি তার তুলনায় যে ব্যক্তি হারামকে জেনেছে, তার ক্ষেত্রে বেশি গুরুতর। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা পুনরায় এরকম কাজ কখনো না করো; যদি তোমরা ঈমানদার হও।[সূরা নূর: ১৭][তাফসীরু আয়াতিন আশকালাত আলা কাসীরিম মিনাল উলামা (২/৫৯৩-৫৯৬) থেকে সমাপ্ত]

মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাতে (৭/২৮৫) বর্ণিত হয়েছে: এক ব্যক্তি আবু জাফরের কাছে অন্য এক লোক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বলল: “আমার এক বন্ধু হারাম সম্পদ উপার্জন করেছে এবং তা নিজের ও পরিবারের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছে। পরে সে বুঝতে পেরেছে যে সে হারামে ছিল। এখন সে হজ্জ করেছে ও এই ঘরের পাশে (মক্কায়) বসবাস করছে। তার ব্যাপারে আপনার মত কী?”

তিনি বলেন: “আমি মনে করি, সে আল্লাহকে ভয় করবে এবং আর ঐ কাজে ফিরে যাবে না।”

শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা’দী বলেন: “আল্লাহ তাওবার পর সুদের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ ফেরত দিতে বলেননি; বরং যে সুদ এখনো গ্রহণ করা হয়নি, সেটি বর্জন করতে বলেছেন। আর যেহেতু ওটা মালিকের সন্তুষ্টিতে গ্রহণ করা হয়েছে, তাই তা আত্মসাৎ এর মতো নয়। এবং যেহেতু এতে তাওবাকে সহজীকরণ ও তাওবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করণ রয়েছে। যে সহজীকরণ তাওবার জন্য অতীতে কৃত সব লেনদেন ফেরত দিতে বাধ্য করার মধ্যে নেই। সেটা যত বেশি হোক বা (ফিরিয়ে দেওয়া) যত কঠিন হোক।”[আল-ফাতাওয়া আস-সা‘দিয়া (পৃ. ৩০৩) থেকে সমাপ্ত]

সারকথা:

  • শরীয়ত যে হারাম বস্তুগুলোর মূল্যমান বাতিল করেছে সেগুলো থেকে কোনোভাবেই উপকার নেওয়া যাবে না; বরং সেগুলো থেকে মুক্ত হতে হবে।
  • যে সম্পদ মালিকের অনুমতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা হয়েছে তা অবশ্যই মালিককে বা তার ওয়ারিশকে ফেরত দিতে হবে। এছাড়া সে এর থেকে দায়মুক্ত হবে না। আর মালিকের কাছে পৌঁছাতে না পারলে তার পক্ষ থেকে সদকা করে দিতে হবে।
  • যে ব্যক্তি কোনো হারাম সম্পদ উপার্জন করেছে ঠিক তবে সে জানত না যে, এই লেনদেন হারাম কিংবা এক্ষেত্রে সে কোনো আলেমের ফতোয়ার অনুসরণ করেছে: এ লেনদেন হারাম হওয়া জানার পর ও এর থেকে তাওবা করার পর এই সম্পদ থেকে মুক্ত হওয়া তার উপর আবশ্যিক নয়। বরং সে এটি ভোগ করতে পারবে।
  • আর যে ব্যক্তি জেনেশুনে হারাম উপার্জন করেছে এবং মালিকের অনুমতি ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে উক্ত সম্পদ হস্তগত করেছে এবং পরে এর থেকে তাওবা করেছে: তবে সে উক্ত সম্পদ ফেরত দেবে না। আলেমগণ এ নিয়ে মতভেদ করেছেন যে, সে কি তা সদকা করে দিবে, নাকি নিজে ভোগ করতে পারবে যেটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার মত।

আমরা যে পরামর্শ দিব:

  • যদি এই তাওবাকারী ধনী হয় ও এই অর্থ থেকে মুক্ত হতে সমর্থ হয় এবং এতে তার মন তুষ্ট থাকে: তবে গরিবদের মধ্যে এটি সদকা করে দেওয়াই উত্তম। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত এবং তার দ্বীনদারির জন্য নিরাপদ।
  • আর যদি তার মন এতে তুষ্ট না থাকে বা এটি তার তাওবার পথকে বাধাগ্রস্ত করে, তাওবার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় কিংবা সে নিজে গরীব ও অর্থের মুখাপেক্ষী হয়; তাহলে সে এটি ভোগ করতে পারবে। এটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার অভিমত।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র

হারাম সম্পদ থেকে তওবা

সূত্র

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

Previous
পরবর্তী
at email

নিউজলেটার

ওয়েবসাইটের ইমেইল ভিত্তিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

phone

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব অ্যাপ্লিকেশন

কন্টেন্টে আরও দ্রুত পৌঁছতে ও ইন্টারনেট ছাড়া ব্রাউজ করতে

download iosdownload android